নওগাঁ-৩ আসনে অনুকূলে জামায়াত, চ্যালেঞ্জে বিএনপি
২১ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৩২
এনামুল কবীর এনাম, বদলগাছী (নওগাঁ) : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন দলের মনোনীত ও সম্ভাব্য প্রার্থীরা। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা না করলেও সম্ভাব্য রোডম্যাপ ধরে এগোচ্ছে। এমতাবস্থায় সারা দেশের মতো নওগাঁ-৩ আসনে মাঠ গোছানোর কাজে দিনরাত ছুটে চলেছেন জামায়াত ও বিএনপির প্রার্থীরা। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশর রাজনৈতিক আবহে ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন প্রার্থী ও সাধারণ ভোটাররা। বাড়তি উচ্ছ্বাসও রয়েছে সবার। নওগাঁ-৩ (বদলগাছী ও মহাদেবপুর) আসনটির কর্ণধার কে হবেন, তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনাও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে ভোটারদের মাঝে। তবে ৫৪ বছরের রেকর্ড ভেঙে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মাহফুজুর রহমান শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন এ জনপদে। জনজরিপে এগিয়েও রয়েছেন তিনি। তার নানামুখী প্রচার ও জনসেবামূলক কাজের গ্রহণযোগ্যতায় রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী।
এদিকে সচেতন মহলের ধারো ও চায়ের আড্ডায় আলোচনায় বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন তিনজন। গত ৩ নভেম্বর বিএনপির হাইকমান্ড কৃষক দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও বদলগাছী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফজলে হুদা বাবুলকে সম্ভাব্য মনোনয়ন দেওয়ায় অন্তর্দ্বন্দ্বে মাঠে জনি ও বুলেট গ্রুপ। তবে কিছু সমর্থক নিজেদের খোলস পাল্টিয়ে ধানের শীষে চলছে। ফজলে হুদা বাবুলের পেছনে শক্ত অবস্থানে মিঠাপুর ইউনিয়ন যুবদল ও উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটি। জাতীয় পার্টি ও ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় বিএনপির অন্তর্কোন্দল জামায়াতের পাল্লা ভারী করবে বলে মনে করেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী রবিউল আলম বুলেট, পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী জনি, ফজলে হুদা বাবুল, জামায়াতের মাওলানা মাহফুজুর রহমান নিজ নিজ গতিতে রাজনীতির মাঠে এগিয়ে। কিন্তু ফজলে হুদা বাবুল কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা। দল তাকে মনোনয়ন দিলে জনি গ্রুপের নেতাদের সমর্থন নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্বে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বিএনপি। আসনটি ১৯৮০ সালের পর জাতীয় পার্টি দুবার, বিএনপি ৩ বার, আওয়ামী লীগ ৩ বার নিজ নিজ দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছে। ২০২৪ সালে ডামি ভোটে সাবেক সচিব সৌরেন্দ্রনাথ নির্বাচিত হয়েছিল নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মহাদেবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিল ছলিম উদ্দিন তরফদার। তরফদার ২০১৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী কলস মার্কা নিয়ে বিপুল ভোটে নৌকাকে হারিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে আসনটিতে সেলিম উদ্দিন তরফদার দলীয় প্রতীক নৌকা পেলে বিএনপির প্রার্থী পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী জনি এক লাখের বেশি ভোটে ধানের শীষকে হারিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে মাঠে নেই জাতীয় পার্টিসহ আওয়ামী লীগ। আসনটিতে জাতীয় পার্টির সংগঠনের হাল ধরার মতো নেতা নেই, সমর্থক আছে। এর মধ্যে কতিপয় সমর্থক জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে।
গত ১৯৮০ সালের পর বদলগাছী-মহাদেবপুর আসনটি জাতীয় পার্টির দখলে ছিল দুবার। মাহবুদজ্জামান লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে কৃষিমন্ত্রী হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে সুজাউদ্দৌলাকে হারিয়ে আক্তার হামিদ সিদ্দিকী নান্নু ধানের শীষ প্রতীকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে এমপি, ২০০১ সালে ধানের শীষ নিয়ে নৌকাকে হারিয়ে এমপি নির্বাচিত হয়ে ডেপুটি স্পিকার হয়েছিলেন।
২০০৮ সালে মহাজোটের ব্যানারে বদলগাছীর ড. আকরাম হোসেন চৌধুরী ডেপুটি স্পিকার নান্নুর ধানের শীষকে হারিয়ে নৌকা প্রতীকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের তরফদার স্বতন্ত্র প্রার্থী কলস মার্কা নিয়ে আকরাম হোসেন চৌধুরী নৌকা প্রতীককে হারিয়ে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এ আসনটিতে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর হেভিওয়েট সিনিয়র নেতা ও শিক্ষাবিদ মহাদেবপুরের কৃতিসন্তান, ঢাকা উত্তর মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মাওলানা মাহফুজুর রহমান আসনটিতে রেকর্ড ভাঙতে পারেন বলে অনেকে ধারণা করছেন। তাদের মতে, জাতীয় পার্টিসহ আওয়ামী লীগ মাঠে নেই। নারী ভোটে আশাবাদী তারা। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর তরুণ ও নারীদের সমর্থনে এগিয়ে যাবেন জামায়াতের প্রার্থী।
জামায়াত নেতাদের দাবি, এ আসনে বিএনপি তিন ভাগে বিভক্ত। নেতাকর্মীদের ব্যাপক অনিয়মের কারণেই জামায়াত এগিয়ে চলেছে। জামায়াত সাংগঠনিকভাবে সুকৌশলে এগিয়ে চলছে বলে জানান উপজেলা জামায়াত নেতা আলম হোসেন। আব্দুস সামাদ দাবি করেন, বিএনপির অনিয়মসহ হুমকির কারণে জামায়াতের ভোট ও সমর্থন বেড়ে চলেছে। সাবেক ডেপুটি স্পিকারের ছেলে পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকীর সমর্থকরা এখনো আশার আলো ছাড়েনি। আরেফিন সিদ্দিকী জনি বলেন, আমি জিয়া পরিবারের রাজনীতি করি। ২০১৮ সালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আওয়ামী লীগের রোষানলে ভোট করেছি। জনির অনেক নেতা ও সমর্থক জানিয়েছে, শেষ পর্যন্ত আমরা আছি।
বদলগাছী উপজেলা জামায়াত নেতা সামাদ জানান, আমরা আগামী নির্বাচনের জন্য উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডসহ গ্রাম কমিটি করেছি। প্রতিনিয়ত মাঠের এমপি পদপ্রার্থী মাহফুজ ভাইকে এমপি নির্বাচিত করতে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এমপি প্রার্থী মাহফুজুর রহমান বিভিন্ন সভা সমাবেশ ও মতবিনিময় সভা; এমনকি উঠান বৈঠকে বক্তব্য রাখছেন। তিনি জানান, আমি আল্লাহ ও রাসূলের সন্তুষ্টির এবং এ আসনের সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য রাজনীতি করছি। উপজেলা জামায়াত নেতা আলম হোসেন, বাচ্চু, সামাদ, ইলিয়াস হোসেনসহ বিভিন্ন নেতারা বলেন, আমরা এ আসনের বিগত ৫৪ বছরের ইতিহাস ভেঙে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করতে পারি বলে আশা করছেন সাধারণ ভোটাররা।