নিরপেক্ষ প্রশাসনের জন্য জনসচেতনতার বিকল্প নেই
২০ নভেম্বর ২০২৫ ২১:১৪
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। সরকার রাষ্ট্রের মালিক নয়, একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য জনগণের সম্মতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র পরিচালনার অস্থায়ী অঙ্গ হলো সরকার। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আরেকটি উইং হলো প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা। অর্থাৎ চাকরিজীবীরা। এ উইংটির কার্যকাল অনেক বেশি। উনারা যৌবনকালে দেশ ও জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। যতদিন কর্মক্ষম থাকেন, অর্থাৎ বাংলাদেশে নিয়মানুয়ায়ী ৬০ বছর; বিশেষ ক্ষেত্রে ৬৫ বছর পর্যন্ত নিয়োজিত থাকবেন। আমাদের দেশে রাষ্ট্রের এ কর্মচারীদের সরকারি চাকরিজীবী বলা হয়। আসলে তারা সরকারের চাকরি করেন না, তারা রাষ্ট্রের চাকরি করেন। তারা জনগণের সেবক। কিন্তু কর্মজীবনে প্রবেশের সাথে সাথেই তাদের মনে এমন ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, উনারা সরকারি চাকরিজীবী। তাই যখন যারা বা যে রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করে, তারা তাদের চাকরে পরিণত হন। জনগণের কথা ভুলে যান। সংবিধান ও রাষ্ট্রের প্রচলিত বিধি মেনে দেশ ও জনগণের সেবা করার বদলে তারা সরকারের সেবায় ব্রত হন। সরকার ‘যাহা আদেশ করেন, তাহারা তাহাই করিতে প্রাণোৎসর্গ করিয়া ধন্য হন।’ তারা ভুলে যান- সরকার ও তারা উভয়ই রাষ্ট্রের; আর রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। তাই তাদের উভয়ের দায়িত্ব সংবিধান ও প্রচলিত আইন মেনে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করা।
ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকল থেকে মুক্তি মিললেও বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের অনেক দেশই এখনো তাদের সেই প্রভু-ভৃত্য মানসিকতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। তাই দেখা যায়, দলীয় গণতান্ত্রিক কিংবা ফ্যাসিস্ট সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকার যে সরকারই আসুক না কেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করার সাহস দেখাতে পারেন না। সরকারে যাদের জোর থাকে, সেই দিকে ঝুঁকে যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিপ্লবের মূল চেতনা রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া। গণতন্ত্রের মূল চেতনাও তাই। জনগণই রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতার উৎস। অবশ্য একজন মুসলিম বিশ্বাস করেন, আল্লাহর খলিফা হিসেবে জনগণই সমস্ত ক্ষমতার উৎস। রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন ও জনগণের সেবাদানের ক্ষেত্রে আল্লাহর সীমানা মেনে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামত গুরুত্ব দিতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘যারা মালিকের ডাকে সাড়া দেয় (আল্লাহর ইবাদত করে)। তারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, তারা পরস্পর পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করে। তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে আল্লাহর পথে দান করে। (সূরা আশ শুরা : ৩৮)।
উল্লেখিত বিধান মেনে মানবিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করলে কারো পক্ষে সত্য ও ন্যায়ের পরিপন্থী কোনো আদেশ মানার সুযোগ নেই। তাই রাষ্ট্রের স্থায়ী ও অস্থায়ী দুটি উইং-এই যারা দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের মধ্যে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যগুলো থাকা জরুরি। চাকরিজীবী উইংয়ের কর্মচারীদের নিয়োগ দেয়া হয় নির্দিষ্ট বিধান মেনে শিক্ষাগত ও মানবিক যোগ্যতা বিচার করে। অন্যদিকে সরকার নির্বাচিত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে। তাই প্রশাসন ও সরকার কতটা নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব এবং দেশপ্রেমিক তার দায়দায়িত্ব জনগণ এড়াতে পারে না। নিরপেক্ষ ও দক্ষ সরকার এবং প্রশাসন গঠনে জনসচেতনতা জরুরি। এক্ষেত্রে জনগণের সংগঠিত প্রতিনিধি রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
আশা করি, জনগণ সচেতন হলে এবং রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের পক্ষে ভূমিকা পালন করলে প্রশাসনের কারো ক্ষমতা নেই, আইন ও সংবিধানের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে জনস্বার্থবিরোধী কাজ করার।