এআই’র ব্যবহার এবং আগামীর চ্যালেঞ্জ


১৫ নভেম্বর ২০২৫ ১৫:৩৩

॥ ইবরাহীম খলিল ॥
সাম্প্রতিক সময়ে এসে আমাদের জীবনাচারকে নাটকীয়ভাবে পাল্টে দেয়ার সক্ষমতার জানান দিচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। অবশ্য সেটির ভালো বা মন্দ দুটি দিকই রয়েছে। তা নির্ভর করছে তার ব্যবহারের ওপর। বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের জায়গাটা হলো- আগামীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে বিরাট উন্নতি হতে যাচ্ছে, সেটির জন্য কতটা প্রস্তুতি রয়েছে বর্তমান প্রজন্মের? আগামীতে যে চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে, তা মোকাবিলায় কীবা প্রস্তুতি রয়েছে আমাদের! বিশেষ করে এর ইতিবাচক এবং নেতিবাচক ব্যবহারের বিষয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহারে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। টেলি যোগাযোগ খাত, মোবাইল ব্যাংকিং, কৃষিসহ নানা খাতে এর ব্যবহার যেমন বাড়ছে তেমনি অপব্যবহারও রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ব্যাপকহারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক অপপ্রচার চলছে। এর প্রতিকার কতটুকু করতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ সংশয় তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে কারো বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো বা হেয় করা, রাজনৈতিকভাবে কোনো ব্যক্তিকে অপদস্থ করা, মানবিক ঘটনার ফায়দা লোটার জন্য এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করা হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে আলাপ আলোচনাটা নতুন নয়। বেশ কয়েক কছর আগে যখন এর প্রাথমিক ব্যবহার শুরু হয়, তখনই ওপেনএআই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাদের তৈরি এ সফটওয়্যার সবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করবে না। তাদের আশঙ্কা ছিল, মানুষ এটি ব্যবহার করে খারাপ উদ্দেশ্য ব্যাপক হারে অপপ্রচার এবং মিথ্যাচার চালাবে। ওপেনএআই-এর গবেষক দল বলেছিল, এটি খুব বেশি বিপজ্জনক।
২০১৯ সালে ওপেনএআই নামের একটি গবেষক দল এমন একটি সফটওয়্যার তৈরি করেছিল, যেটি কয়েক মাত্র প্যারাগ্রাফের একটি অর্থবহ টেক্সট লিখতে পারতো। এছাড়া এ সফটওয়্যার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ছাড়া কোনো কিছু পড়ে মোটামুটি তা বুঝতে পারতো, কিছুটা বিশ্লেষণ করতে পারতো। এরপর ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে তিন বছর সামনে আসা যাক। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে। এরপর সাংবাদিক এবং বিশেষজ্ঞরা যখন এ প্রোগ্রামিং এর চ্যাটবট-জিপিটির সক্ষমতা পরীক্ষা করে দেখছিলেন, তখন তারা চমকে গিয়েছিল। দেখা গেল চ্যাটবট-জিপিটি ব্যবহার করে হাজার হাজার সংবাদ প্রতিবেদন এবং সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট লেখা হয়েছে।
গল্পটা ২০২৩ সালের। ওপেনএআই সে বছর মার্চ মাসে যখন তাদের সর্বশেষ সংস্করণ জিপিটি-ফোর চালু করে, তখন তারা বলেছিল, অপব্যবহার বন্ধের জন্য এটির ভেতরে নানা ব্যবস্থা করা আছে। প্রথম যারা এর গ্রাহক হয়েছে তাদের মধ্যে আছে মাইক্রোসফট, মার্কিন ব্যাংক মেরিল লিঞ্চ এবং আইসল্যান্ডের সরকার। ওই বছর মার্চ মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের অস্টিনে এক সম্মেলনে জড়ো হয়েছিলেন বিশ্বের প্রযুক্তি খাতের নীতিনির্ধারক, বিনিয়োগকারী এবং নির্বাহীরা। সেখানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সম্ভাবনা এবং ক্ষমতা।
ফিউচার টুডে ইনস্টিটিউটের প্রধান এবং নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যামি ওয়েব এআই নিয়ে বিপর্যয়কর দৃশ্য-কল্প অনুমান করছিলেন। তার উদ্বেগের বিষয় ছিলÑ সেখানে ডেটা নিয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা থাকবে কম, অল্প কটি কোম্পানির হাতে অনেক বেশি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হবে, এবং এআই মানুষের চাহিদা আগে থেকেই অনুমান করবে। তবে এর ফলে তাদের অনেক সময় ভুল হবে অথবা মানুষের পছন্দকে তারা অনেক বেশি সংকুচিত করে ফেলবে। তিনি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সম্ভাব্য ফল কী দাঁড়াবে, তার একটা চিত্র দেয়ার চেষ্টা করলেন। তার মতে, আগামী দশ বছরে এটি দুই বিপরীত দিকে যেতে পারে।
আজকের প্রেক্ষাপটে অ্যামি ওয়েবের আশঙ্কাই সত্যি হলো। আজকের জামানায় নতুন যে এআই প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে, সেগুলো কিন্তু ফেসবুক, ইউটিউব বা টুইটারের মতো সাইটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এরপর এগুলোকে টগবগ করে ফুটতে থাকা ভুল তথ্য আর মিথ্যাচারের এক সমুদ্রে পরিণত করে ফেলেছে। কারণ সত্যিকারের মানুষ থেকে ভুয়া মানুষের পোস্ট আলাদা করা তখন আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়ে পরিচালিত ভুয়া একাউন্টগুলো তখন এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছে যে, বিশ্বাস না করার কোনো কারণ খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সরকার যদি সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন নীতি তৈরিতে সফলও হয়, ততদিনে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ভুয়া তথ্যের বন্যায় ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যাবে। এসব নতুন রেগুলেশন তখন অর্থহীন হয়ে পড়বে। আমাদের সামনে ত্রয়োদশ নির্বাচন সামনে রেখে এর অপব্যবহারের বাস্তবতা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে।
মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন, এআই এবারের নির্বাচনের জন্য ভয়ংকর। কারণ এদেশের ৪০ শতাংশ মানুষ মিসইনফরমেশন বিশ্বাস করেন। বোদ্ধা ব্যক্তিরাও মনে করেন, এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স), সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এগুলোই হচ্ছে মূল চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু বাংলাদেশই নয়, বরং বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এআই প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে এর ব্যবহার ও অপব্যবহার দুই-ই বাড়ছে। তবে বিশ্বের অনেক দেশেই এ প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে বিভিন্ন আইনি কাঠামো রয়েছে। দেশগুলোর পূর্ণাঙ্গ আইন, এক্সিকিউটিভ আদেশ, নীতিমালা, পলিসি বা স্ট্র্যাটেজি, বিল এমন নানা ধরনের আইনি পরিকাঠামো রয়েছে। ফলে সেসব দেশে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কোন ছবি, ভিডিও বা কনটেন্ট তৈরির সীমা যেমন রয়েছে, তেমনি অপব্যবহার রোধের ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সীমা বা অপব্যবহার রোধে এখনো আইনি কোনো কাঠামো নেই। অর্থাৎ কোনো সমন্বিত গাইডলাইন বা বিধিমালা, পলিসি বা নীতিমালা এমনকি স্ট্র্যাটেজিও নেই বাংলাদেশে।
তবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানিয়েছেন, পলিসি তৈরিতে কাজ করছে সরকার। আমরা এখন আরও বেশ কয়েকটি পলিসি নিয়ে কাজ করছি। এ পলিসিগুলো যদি শেষ হয়, তখন আমরা ন্যাশনাল এআই পলিসিটাকে এগিয়ে নিয়ে যাব। সেখানেই সংশ্লিষ্ট সবগুলো বিষয়কে আমরা অ্যাড্রেস করবো।
এর আগে ২০২০ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশল’ প্রণয়ন করে। যেটিতে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং প্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে এআই ব্যবহারের রূপরেখা তৈরি করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি সেটি। একই সাথে গত বছর ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার এআই-এর একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছিল। যদিও খসড়া ‘ন্যাশনাল এআই পলিসি’ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ নীতির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে এআই উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি গ্রহণে অগ্রগামী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তরে সহায়তা করতে তা করা হচ্ছে।
এ খসড়া নীতিমালায় যেসব খাতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলোÑ সরকারি সেবা ও বিচারিক ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ, ডাটা গভর্ন্যান্স, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা, কৃষি, গবেষণা ও উদ্ভাবন ইত্যাদি খাত। একটি স্বাধীন ন্যাশনাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সেন্টার অব এক্সিলেন্স প্রতিষ্ঠা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এর অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে ওই খসড়া নীতিমালায়।
ইউনেস্কোর ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র ২০২১ সালের নভেম্বরে সর্বসম্মতিক্রমে ‘এথিকস অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (ইউনেস্কো, ২০২২)’ অনুমোদন করে। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বোত্তম ব্যবহার এবং ঝুঁকি হ্রাস করাই ইউনেস্কোর এ বৈশ্বিক কাঠামোর লক্ষ্য।
অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ যাতে তাদের পলিসি ও প্রস্তুতির সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেজন্যই ইউনেস্কো ‘রেডিনেস অ্যাসেসম্যান্ট মেথোডলজি’ তৈরি করেছে। নৈতিক এআই অনুশীলনের ক্ষেত্রে একটি দেশের প্রস্তুতি নির্ধারণ করা হয় এ র‌্যামের মাধ্যমে।
এআই প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ও বৈচিত্র্যের সাথে তাল মিলিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের এক প্রতিবেদনে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এআই শব্দটি রয়েছে এমন আইন থাকা দেশের সংখ্যা ২০২২ সালে ছিল ২৫টি, যা ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১২৭টিতে পৌঁছেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গত বছরের মার্চে এআই আইন অনুমোদন করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের এআই অ্যাক্টের মাধ্যমে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থাকে আলাদা শ্রেণিভুক্ত করে নির্দিষ্ট নীতিমালায় বেঁধে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিষয়ে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের ‘ইউনাইটেড স্টেটস অ্যাপ্রোচ টু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এআই নিয়ে একটি এক্সিকিউটিভ অর্ডার বা নির্বাহী আদেশ দেন। ‘নিরাপদ, সুরক্ষিত ও বিশ্বাসযোগ্য এআই ডেভেলপমেন্ট এবং ব্যবহারে’ ওই আদেশ দেওয়া হয়। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে স্বতন্ত্র আইন। এছাড়াও এআই সম্পর্কিত আইনের ধারা বা বিধানও রয়েছে দেশটিতে। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য আইন হলো ন্যাশনাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইনিশিয়েটিভ অ্যাক্ট-২০২০, এআই ইন গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট এবং অ্যাডভান্সিং অ্যামেরিকান এআই অ্যাক্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের ১১৭তম কংগ্রেসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত কমপক্ষে ৭৫টি বিল উত্থাপন করা হয়েছিল। যার মধ্যে ছয়টি আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। কানাডায় এআই এবং ডাটা অ্যাক্ট দুটিই রয়েছে। ভারত ২০১৮ সালেই ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ নামে কৌশল প্রণয়ন করেছে। দেশটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতভিত্তিক এআই ব্যবহারের কৌশলপত্র করেছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের এআই নিয়ে কৌশল নীতি রয়েছে ২০৩১ সাল পর্যন্ত। চীন অ্যালগরিদমের ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণে এনেছে- যেন তা রাষ্ট্রবিরোধী বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরিতে ব্যবহার না হয়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, অপরাধ বিশ্লেষক।