তথ্যপ্রযুক্তিতে মুসলিম বিশ্বের করণীয়


১৫ নভেম্বর ২০২৫ ১৫:৩২

॥ আনিসুর রহমান এরশাদ ॥
তথ প্রযুক্তি আজ এমন এক অনিবার্য বাস্তবতা, যার বিস্ময়কর অগ্রগতি ও প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করেছে জ্ঞান, শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও জীবনাচারের প্রতিটি ক্ষেত্রে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জনসংখ্যা মুসলিম হলেও এ প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে তারা কাক্সিক্ষত মানে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারছে না। আজ যখন এক ক্লিকেই মানুষ প্রবেশ করছে অসীম তথ্যের সমুদ্রে, তখন মুসলিম বিশ্বের জন্য সর্বাগ্রে বিবেচ্য হয়ে উঠেছে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও সময়োপযোগী প্রযুক্তি-দক্ষতা অর্জন।
বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে নানা চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। বাড়ছে সাইবার অপরাধ, শিশুদের জন্য অনুপযুক্ত অনলাইন কনটেন্ট, কর্মক্ষেত্রে নজরদারি, ব্যক্তিগত তথ্যের অবৈধ ব্যবহার, সফটওয়্যার পাইরেসি, ভাইরাস, স্বাস্থ্যগত সমস্যা এবং হ্যাকিং। এসব শুধু প্রযুক্তিগত নয়, নৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গভীর সমস্যা। মুসলিম বিশ্বের জন্য এ চ্যালেঞ্জ আরও গুরুতর। কারণ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে সততা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার ঘাটতি অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট। অনৈতিক তথ্য ব্যবহার, ব্যক্তিগত ডেটা চুরি, ডিজিটাল নিরাপত্তা লঙ্ঘন, পর্নোগ্রাফি প্রচার, অননুমোদিত অ্যাক্সেস বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব কেবল ক্ষতির কারণ নয়, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধেরও অবমূল্যায়ন ঘটায়। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের আচরণ ‘আমানাহ’ বা দায়িত্বের লঙ্ঘন। প্রযুক্তিকে সঠিক নৈতিকতার নির্দেশনায় পরিচালনা করাই কর্তব্য।
মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে জ্ঞান ও গবেষণার যে গৌরবময় ধারা ছিল, তা আজ প্রায় নিস্তব্ধ। আল-খারিজমি, ইবনে সিনা, ইবনে হায়সামদের যুগে মুসলমানরা ছিলেন গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও দর্শনের পথপ্রদর্শক। অথচ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জগতে মুসলিম দেশগুলোর অবস্থান তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। এর অন্যতম কারণ প্রযুক্তিকে ‘পাশ্চাত্যের আবিষ্কার’ হিসেবে দেখা এবং তা যথাযথভাবে গ্রহণে অনীহা। অথচ ইসলাম জ্ঞান অর্জনে সবসময় উৎসাহিত করেছে ‘পড় তোমার প্রভুর নামে’ যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা আল-আলাক : ১)।
তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ইসলাম প্রচার, শিক্ষা ও গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। আজ কুরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ বা আরবি ভাষা শেখার জন্য আর বিশাল গ্রন্থাগার বা মাদরাসার প্রয়োজন নেই- একটি স্মার্টফোনই যথেষ্ট। হাজারো ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, ইউটিউব চ্যানেল ও অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে ইসলামী জ্ঞান পৌঁছে যাচ্ছে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে। তথ্যপ্রযুক্তি যেন দাওয়াহ ও জ্ঞানের নতুন মঞ্চ; এটি এক ধরনের ‘ডিজিটাল দাওয়াহ’ তৈরি করেছে। ইউরোপ বা আমেরিকার কোনো তরুণ ইউটিউবে যুক্তিনিষ্ঠ ইসলামী বক্তৃতা শুনে বা অনলাইন আলোচনায় অংশ নিয়ে ইসলামের বিষয়ে তার ভুল ধারণা বদলে ফেলছে- এটাই প্রযুক্তির ইতিবাচক শক্তি।
ই-লার্নিং বা অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা আজ বিশ্বব্যাপী শিক্ষায় বিপ্লব এনেছে, যা মুসলিম সমাজের নবজাগরণের সুযোগ সৃষ্টি করছে। মুসলিম বিশ্বে এর প্রয়োগ এখনো সীমিত, কিন্তু সম্ভাবনা অপরিসীম। অনলাইন কুরআন একাডেমি, ইন্টার‌্যাকটিভ হাদিস ও আরবি ব্যাকরণ অ্যাপ, রিয়েল-টাইম পাঠদান- সবই আজ বাস্তব। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি প্রযুক্তিনির্ভর পাঠক্রমে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে একটি বৈশ্বিক জ্ঞানভিত্তিক মুসলিম সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
তবে প্রযুক্তি ব্যবহারে নৈতিকতা ও সাইবার দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবহারকারীকে ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষিত রাখতে হবে। প্রযুক্তির মাধ্যমে অন্যকে ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা ইনসাফের দাবি। সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা সদাচারের অন্তর্ভুক্ত। তাই শিশু ও তরুণদের প্রাথমিক স্তর থেকেই ইসলামী নৈতিকতা-সমৃদ্ধ আইটি শিক্ষায় উৎসাহিত করতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি মুসলমানদের তাদের বাড়ি থেকে ইন্টারেক্টিভ ক্লাসের মাধ্যমে ইসলামী শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দেয়।
ইন্টারনেট যেমন ইসলামী শিক্ষার প্রসার ঘটাতে পারে, তেমনি অশ্লীলতা, বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় করণীয় হলো- প্রযুক্তি ব্যবহারে নৈতিক সংযম। ইসলামের শিক্ষা বলে, ‘যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে, তা ত্যাগ করো’- এ নীতি ডিজিটাল জগতে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। কুরআন ও হাদিসের নৈতিক শিক্ষা অনুসরণ করে তথ্যপ্রযুক্তি সচেতন, সতর্ক ও নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ মুসলিম সমাজ গড়তে হবে। বিশ্বব্যাপী ইসলামী সাহিত্যকে প্রতিটি ভাষায় অনুবাদ করার জন্য মুসলিম বিশ্বের একটি কেন্দ্রীভূত অনলাইন উন্মুক্ত ইসলামিক গ্রন্থাগার তৈরি করা উচিত।
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবীদের জন্যও নীতি স্পষ্ট- কাউকে ক্ষতি না করা, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার না করা, অপরের কৃতিত্ব নিজের নামে না নেওয়া, আল্লাহর ভয় হৃদয়ে রেখে সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে ন্যায়বিচার ও সহানুভূতি নিশ্চিত করা। মুসলিম ব্যবহারকারীরা যদি এ পেশাগত নীতিগুলোকে ইসলামী নৈতিকতার সঙ্গে একত্রিত করে, তবে একটি দৃষ্টান্তমূলক সামাজিক ও প্রযুক্তিগত সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। মনে রাখতে হবে, ইসলামে নৈতিকতা শুধু ব্যক্তিগত আচরণের নির্দেশনা নয়; এটি সমাজ ও সভ্যতার কল্যাণের জন্যও অপরিহার্য। কুরআন মানুষকে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে ন্যায়সঙ্গত ও দায়িত্বশীল আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। তাই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, আইটি পেশাজীবী বা সাধারণ ব্যবহারকারী- সবার উচিত তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর প্রতিটি কাজকে এক ধরনের ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করা।
আজ তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জ। মুসলিম সমাজকে সচেতন হতে হবে- অন্যের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার বা নজরদারি করা ইসলামী নীতির পরিপন্থী। প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারের বিষয়টি ইসলামী শিক্ষা ও পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গালিগালাজ, অপতথ্য, কুতথ্য বা ভুয়া সংবাদ যেন অনিচ্ছাকৃতভাবেও না ছড়ায়- এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার যখন সীমাহীন হয়ে যায়, তখন ব্যবহারকারীর নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বও বহুগুণে বেড়ে যায়।
তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন কেবল ব্যক্তিগত নয়, রাষ্ট্রীয় বিষয়ও। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোকে শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। উচ্চশিক্ষায় কৃত্রিম, বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আইটি অবকাঠামো নির্মাণ, ইন্টারনেট অ্যাক্সেস বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেওয়া কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, জ্ঞান-স্বাধীনতার পথও খুলে দেবে। মুসলিম বিশ্ব যদি প্রযুক্তিকে ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে একীভূত করে, তবে এটি হবে উন্নয়ন ও আধ্যাত্মিক জাগরণের যুগপৎ হাতিয়ার।
প্রযুক্তিকে হতে হবে ঐক্যের শক্তি, বিভেদের নয়। ইন্টারনেট মুসলিম বিশ্বের মতাদর্শগত ও ভৌগোলিক বিভেদ দূর করার সম্ভাবনা রাখে যদি আমরা তা সঠিকভাবে ব্যবহার করি। অনলাইন সংলাপ, জ্ঞান-আদানপ্রদান ও যৌথ গবেষণার মাধ্যমে নতুন ঐক্যের ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিম তরুণদের এমন উদ্যোগ ইতোমধ্যেই এক নতুন আশার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি একটি নেয়ামত, যদি আমরা এটিকে সঠিক নিয়তে এবং শরিয়াহর উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবহার করি। প্রযুক্তির নেয়ামতকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যেন এটি আমাদের ইমান, সম্প্রদায় এবং মানবতার কল্যাণে কাজ করে।
এ প্রেক্ষাপটে মুসলিম বিশ্বের করণীয়- প্রথমত, প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো; দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল ইসলামিক কনটেন্ট উন্নয়নে তরুণদের সম্পৃক্ত করা এবং নিজস্ব অ্যাপস তৈরিতে মুসলিম প্রকৌশলী বা পারদর্শীদের যুক্ত করা; তৃতীয়ত, নৈতিক ও জ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা; চতুর্থত, বৈশ্বিক অনলাইন ইসলামিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে কুরআন ও হাদিসের নির্ভরযোগ্য অনুবাদ সব ভাষায় সহজলভ্য হবে। সর্বোপরি প্রযুক্তিকে ইসলামী সভ্যতার ধারাবাহিক জ্ঞান-অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে মুসলিম সমাজ আবারও বিশ্বনেতৃত্বের আসনে ফিরে যেতে পারে।
ইসলাম কখনোই পরিবর্তনের বিরোধী নয়; বরং সত্য, যুক্তি ও জ্ঞানের যেকোনো উৎসকে স্বাগত জানায়। তথ্যপ্রযুক্তি সেই জ্ঞানের আধুনিক রূপ। একে যদি আমরা ইসলামী নৈতিকতা ও মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করি, তাহলে প্রযুক্তিই হয়ে উঠবে মুসলিম বিশ্বের নতুন নবজাগরণের হাতিয়ার। এখন প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, পরিকল্পনা ও ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের। কারণ আগামী বিশ্বের নেতৃত্ব সেসব জাতির হাতেই থাকবে, যারা তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে- আর ইসলামের দৃষ্টিতে, ‘সত্য তথ্যই হলো প্রকৃত জ্ঞান।’
লেখক : সাংবাদিক, গবেষক।