আদর্শ মানুষ গড়তে চাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্ম শিক্ষক
১৩ নভেম্বর ২০২৫ ১৪:৫৩
॥ প্রফেসর ডক্টর মুহাম্মদ আবু হানিফ খান ॥
মানবশিশুর শরীর, মন ও আত্মার সমন্বিত উন্নতি সাধন করে শিক্ষা। প্রকৃত শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে, জানতে ও মানতে পারে এবং নিজের জীবনকে মহান আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত বান্দা হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। শিক্ষার উৎস ও মৌলনীতি হতে হবে নবী-রাসূলদের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত আসমানী কিতাব। যে শিক্ষা মানবসন্তানকে সৃষ্টিকর্তার সাথে পরিচয় করাতে পারে না বা যে শিক্ষা অর্জনের ফলে নিজের জীবনকে মহান আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত বান্দা হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না, তা প্রকৃত অর্থে শিক্ষা নয়। বড় জোর একে কুশিক্ষা বলা চলে।
সর্বশেষ রাসূল হজরত মুহাম্মদ সা.-এর আগমনের প্রাক্কালকে আরববাসী সমকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানে কম উন্নত ছিলেন না। আবু জাহলের পূর্ব নাম ছিল আবুল হাকাম, অর্থাৎ বিজ্ঞানের পিতা। তৎকালীন আরববাসীরা ধর্ম-কর্মও কম পালন করতেন না। কেবল হজরত মুহাম্মদ সা.-এর নেতৃত্ব না মানা এবং সবশেষ আসমানী কিতাব আল কুরআনের পূর্ণ অনুসরণ না করায় ইতিহাসবেত্তাগণ ওই যুগকে আইয়্যামে জাহেলিয়ার যুগ বা অন্ধকার যুগ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
আলোকিত বিশ্বে আলোকিত মানুষ গড়তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষায়। শিশুমন একটি স্বচ্ছ ক্যানভ্যাস। শিশু মনে অঙ্কিত শিক্ষাকে ভিত্তি করেই সে তার পরবর্তী জীবনকালকে গড়ে তোলে এবং পরিচালিত করে।
আত্মবিশ্বাস ও জাতীয় প্রতিষ্ঠা লাভ করতে ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত সত্য। ধর্ম শিক্ষা শিশুদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি গড়ে তোলে, যা তাদের সঠিক মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলি অর্জনে সাহায্য করে। ধর্মীয় শিক্ষা শিশুকে আত্মপরিচয় জানাতে ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে। সমাজে ন্যায়বিচার ও সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে, অন্যায় হতে বিরত থাকতে এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে।
ধর্মীয় শিক্ষা শিক্ষার্থীর নৈতিকতার মান উন্নত করে। মৌলিক মানবিক চরিত্র ও ইসলামী নৈতিকতার গুণে গুণান্বিত নাগরিক সৃষ্টি করে। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসবাদী, দখলদারি, ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করা, হত্যা, গুম, আয়নাঘর সৃষ্টি, নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার হরণ, দিনের ভোট রাতে, আমি-ডামি নির্বাচন, পিয়ন চারশো কোটি টাকার মালিক হওয়া, বিদেশের মাটিতে বেগমপাড়া তৈরি করা, ব্যাংক লুট, ভিন্ন মতের লোকদের দেখামাত্র গুলি, ধর্মীয় নেতা ও দেশ ও বিশ্ববরেণ্য ওলামাদের ডান্ডাবেড়ি পরানো, জুডিশিয়াল কিলিং এবং সবশেষে সকল এমপি-মন্ত্রী ও জাতীয় মসজিদের খতিবসহ গোষ্ঠীসুদ্ধ পলায়ন করার কাজে জড়িত হওয়ার মতো কর্মকাণ্ড ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত নৈতিকতার মানসম্পন্ন নাগরিক দ্বারা করা সম্ভব নয়; এমনকি এসব কল্পনাযোগ্যও নয়।
পীর-মাশায়েখ, আউলিয়ায়ে কিরাম, সুফী, দীনের দাঈ, কুরআনের মুফাসসির ও ইসলামী রাজনৈতিক বরেণ্য নেতৃত্বের পুণ্যভূমি ৯২ ভাগ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশ। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৩ হাজার ৬০১। মোট শিক্ষকের সংখ্যা ৩ লাখ ২২ হাজার ৭৬৬ জন। মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ২ কোটি ১৯ লাখ ৩২ হাজার ৬৩৮। এছাড়া শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের আওতায় শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৫০টি, এতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৮ হাজার। সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই কোটি শিক্ষার্থী কেবল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিধি আরও বাড়াতে শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সারা দেশে পর্যায়ক্রমে ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি চালু করা হচ্ছে। ২০১৩ সালে ৪৯১টি, ২০১৪ সালে ১৯২টি, ২০১৫ সালে ৭৭টি এবং ২০১৬ সালে ৪টি, সর্বমোট ৭৬৪টি বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি চালু করা হয়েছে। বর্তমানে চাহিদার আলোকে আরও বিদ্যালয় ৬ষ্ঠ শ্রেণি চালুর বিষয়টি চলমান রয়েছে।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন বাংলাদেশ গড়তে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল ধর্মপ্রাণ বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মকে উপেক্ষা করা হবে না। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা বিভাগ ফ্যাসিবাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা কারিকুলামে ধর্ম বই থাকার পরও ধর্মশিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে গানের শিক্ষক ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বলছে, একেকটি জেলা-উপজেলায় ২০ থেকে ২৫টি বিদ্যালয় মিলে একটি করে ক্লাস্টার হয়। এ হিসাবে সারা দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট ক্লাস্টার রয়েছে ২ হাজার ৫৮৩টি। একটি ক্লাস্টারের জন্য একজন করে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষক নেওয়া হবে। ২০ থেকে ২৫টি বিদ্যালয়ের জন্য একজন করে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে।
ক্লাস্টারের হিসাবে দুটি পদ মিলে মোট ৫ হাজার ১৬৬ সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে সংগীত বিষয়ে ২ হাজার ৫৮৩ ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে ২ হাজার ৫৮৩ জন। এ দুই বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য ইতোমধ্যে সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে পদ সৃজন করা হয়েছে। জনপ্রশাসন ও অর্থ বিভাগে শর্তানুসারে পদ দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা ২০১৯-এ অন্তর্ভুক্ত করে নিয়োগ কার্যক্রম গৃহীত হবে মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পদে নিয়োগের জন্য বিধি সংশোধনের প্রস্তাব ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অথচ ২০১৯ সালের শেখ হাসিনার ধর্মহীনতার শিক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইসলাম শিক্ষা বা ধর্ম শিক্ষা পাঠদানের জন্য শিক্ষকের কোনো পদই সৃষ্টি করা হয়নি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা-২০২৫ এ সংগীত শিক্ষক ও শারীরিক শিক্ষার শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে; ধর্ম শিক্ষকের পদ বর্তমান বিধিমালায় নেই, যা সুস্পষ্টভাবে শিক্ষা বিভাগে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসরদের ষড়যন্ত্রের অংশ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্ম শিক্ষক না থাকায় অনভিজ্ঞ শিক্ষক দিয়ে ধর্ম বিষয় পড়ানোর ফলে ভুল ও ধর্মবিদ্বেষ ছড়ানোর মতো পাঠদান করার প্রমাণ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে খোদ রাজধানী ঢাকার ফায়দাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। ইসলামের সঠিক শিক্ষা আদর্শ দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরি করে; অপরদিকে ইসলামের ভুল বার্তা ও শিক্ষার ফলে উগ্রবাদ, ধর্মান্ধ সৃষ্টি হতে পারে, যা অভিজ্ঞ ধর্ম শিক্ষক পাঠদান করলে এ ব্যাপারে শঙ্কামুক্ত থাকা যেত।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ছয়টি করে বিষয় পড়ানো হয়। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে পাঠ্যবই নেই, কিন্তু সঙ্গীত, শিল্পকলা এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা বিষয়ে ক্লাস নেওয়া হয়। পাঠ্যবইবিহীন প্রত্যেকটি বিষয়ে সপ্তাহে একটি ক্লাস নেওয়া হয় এবং শিক্ষক নিয়োগের জন্য নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। অথচ ইসলাম শিক্ষা বই থাকলেও ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য কোনো পদ সৃষ্টি করা হয়নি, যা ধর্মপ্রাণ ও মুসলিমপ্রধান দেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বিষয়। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশকে একটি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আদর্শ নাগরিক তৈরি করতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্ম শিক্ষক নিয়োগ এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে। আশা করি, গণমানুষের ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষা উপলব্ধি করে সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। ২৫ শে অক্টোবর ২০২৫। ইসলামী শিক্ষা উন্নয়ন বাংলাদেশ আয়োজিত জাতীয় সেমিনার থেকে আমরা সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাই গানের শিক্ষক নয়; সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা-২০২৫ সংশোধন করে ধর্ম শিক্ষক নিয়োগের পদ সৃষ্টি করুন। অন্যথায় ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক ও তৌহিদী জনতা আন্দোলনে মাঠে নামলে তার ফল মোটেই সুখকর হবে না। মহান আল্লাহ তায়ালা সরকারকে উপলব্ধি করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
[নিবন্ধটি জাতীয় প্রেস ক্লাবে ইসলামী শিক্ষা উন্নয়ন বাংলাদেশ আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে পঠিত]
লেখক: মহাসচিব, ইসলামী শিক্ষা উন্নয়ন বাংলাদেশ ও সভাপতি, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি টিচার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ।