খরচ কমাতে থার্ড ক্যারিয়ার যুক্ত করার দাবি

হজের খরচ বেশি বাংলাদেশে


৬ নভেম্বর ২০২৫ ২০:৩৩

॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
ভারত, পাকিস্তানসহ সমসাময়িক অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে হজের খরচের লাগাম টানা যাচ্ছে না। মাত্রাতিরিক্ত খরচের চাপে বহু ধর্মপ্রাণ মুসলমান হজ সম্পাদন করতে পারছেন না বছরের পর বছর। বিগত কয়েক বছরের তুলনায়; বিশেষ করে এবার হজে গমনেচ্ছুদের পরিমাণ সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বিরাজমান। দফায় দফায় অনুরোধ আর বার্তা দেয়ার পরও এখনো খালি রয়েছে হজের ৫৩ হাজার ৭৮২টি কোটা। ফলে উড়োজাহাজ পরিবহনে বিমান, সৌদি এয়ারলাইন্সের সিন্ডিকেট ভেঙে বিষয়টি উন্মুক্ত করে দেয়ার দাবি সংশ্লিষ্টদের। মুসলমানদের অন্যতম ফরজ এ ধর্মীয় উৎসব হজ সহজ ও নির্বিঘ্ন করতে খরচ কমাতে এয়ারলাইন্স সিন্ডিকেট বাতিল ও থার্ড ক্যারিয়ার যুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যতম মুসলিমপ্রধান দেশ বাংলাদেশ। নামাজ-রোজার মতোই হজও একটি ফরজ ইবাদত। আর্থিক সঙ্গতি থাকা সাপেক্ষে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য হজ ফরজ। আমাদের দেশে দেখা যায়, সাধারণ মুসলিমদের একটি বিরাট অংশের চির আকাক্সক্ষা থাকে জীবনে অন্তত একবার হলেও হজ সম্পাদনের। যার ফলে দেখা যায়, কেউবা সরকারি-বেসরকারি চাকরি থেকে অবসরে গেলে কিংবা জীবন সায়াহ্নে কিছু টাকা কষ্ট করে জমিয়ে হলেও হজ সম্পাদনের চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রতিবেশী সমসাময়িক বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের হজ পালনে বিপুল খরচের ধাক্কায় মনের এ আকুতি নিয়েই বহু ধর্মপ্রাণ মুসলিম মারা যান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আনুষঙ্গিক জীবনমানের পাশাপাশি হজের মাত্রাতিরিক্ত খরচ বৃদ্ধি বহু সাধারণ মানুষের জন্য হজ সম্পাদন না করতে পারা মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবারের হজ প্যাকেজ
গত ২৮ সেপ্টেম্বর সরকারিভাবে তিনটি হজ প্যাকেজ ঘোষণা করে ধর্ম মন্ত্রণালয়। ঘোষিত হজ প্যাকেজ-১ (বিশেষ) এর খরচ ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯০ হাজার ৫৯৭ টাকা। হজ প্যাকেজ-২ এ খরচ ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮১ টাকা এবং হজ প্যাকেজ-৩ এ খরচ ধরা হয়েছে চার লাখ ৬৭ হাজার ১৬৭ টাকা। এ প্যাকেজের বাইরে রয়েছে খাবার, অভ্যন্তরীণ যাতায়াত, হাত খরচ, কেনাকাটা ইত্যাদি। একইভাবে একদিন পর বেসরকারিভাবে তিনটি হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা হবে। এর মধ্যে সাশ্রয়ী হজ প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ১০ হাজার টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘোষিত হজ প্যাকেজ অনুযায়ী একেবারে সাশ্রয়ী প্যাকেজ অনুসারেও একজন হাজীর খরচ কুরবানিসহ প্রায় সাত লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে। কেউ যদি স্বামী-স্ত্রী হজ সম্পাদন করার মানসিকতা পোষণ করেন, তাহলে তাদের প্রায় পনে-ষোলো লাখ টাকার খরচ যা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য আকাশকুসুম ব্যাপার।
কোন দেশে কেমন খরচ
সংশ্লিষ্টরা জানান, সারা বিশ্ব থেকে প্রতি বছর ২০ লক্ষাধিক মুসলমান হজ করার সুযোগ পায়। ইন্দোনেশিয়া থেকে হজে যেতে হলে খরচ করতে হয় ৩ থেকে ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৩৪৭ টাকা পর্যন্ত। বাকিটা সরকারি ‘হজ ফান্ড ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি’ তহবিল থেকে ভর্তুকি দেওয়া হয়। অপরদিকে মালয়েশিয়ায় যেসব পরিবারের মাসিক আয় ৯৬ হাজার টাকার কম, সেসব পরিবারের সদস্যদের জন্য হজের খরচ ধরা হয়েছে মাত্র প্রায় দুই লাখ ১৮ হাজার ৭৫৪ টাকা। মাসিক আয় এর বেশি হলে দিতে হয় দুই লাখ ৫৮ হাজার ৬০০ টাকা। দেশটিতে হজের জন্য সরকার বড় অংকের ভর্তুকি দিয়ে থাকে। পাকিস্তানে গত বছরের তুলনায় হজের খরচ একটু বাড়লেও তা বাংলাদেশের অনেক কম। প্রায় ১১ লাখ পাকিস্তানি রুপি বা বাংলাদেশি টাকায় ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৬১৮ টাকা। সিঙ্গাপুরের মতো ব্যয়বহুল উন্নত দেশে হজের খরচ মাত্র ৬ লাখ ৬০ হাজার ৯২০ টাকা। ভারতে হজের জন্য আবেদন গ্রহণ শুরু হলেও চূড়ান্ত খরচের হিসাব এখনো জানানো হয়নি। তবে ইতোপূর্বে এ খরচ ছিল বাংলাদেশি মুদ্রায় মাত্র চার লাখ ২৩ হাজার টাকা। তবে সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, হজ প্যাকেজের খরচ এ বছর ৫০ হাজার টাকা কমানো হবে। অর্থাৎ সে দেশে হজ কমিটি অব ইন্ডিয়ার মাধ্যমে যারা যাবেন, তাদের খরচ হবে চার লাখ টাকার কম। ভারতে বিভিন্নভাবে হজযাত্রীদের সরকারিভাবে ভর্তুকি দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। উপরোক্ত দেশগুলোর হজ খরচের হিসাব দেখলে দেখা যায়, একমাত্র বাংলাদেশেই হজের সরকারি কোনো সাহায্য-সহায়তা নেই। বরং উপরোক্ত সবগুলো দেশের তুলনায় খরচ অত্যন্ত বেশি। আর হজের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইবাদত বাংলাদেশে একটি জমজমাট ব্যবসা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের কোটি কোটি মুসলমানদের মাঝে এক লক্ষাধিক লোকের হজ পালন কোনো বিষয় না। কিন্তু এখানে কয়েকটি কারণে খরচ বেড়ে যায়। সরকারি উদ্যোগের অভাব এবং বেসরকারি পর্যায়ে মুনাফাখুরী অনেকাংশে দায়ী। যেমন ওমরাহয় বিমান ভাড়া যেখানে মাত্র সর্বোচ্চ ৬৫-৭০ হাজার টাকা, সেখানে হজে কেন ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা করা হয়, যা বিগত আওয়ামী লীগের সময় দুই লাখ টাকা ছিল। এভাবে শুধু এয়ারলাইন্সের টিকিটের দামের কারণেই খরচ অনেক বেড়ে যায়।
এদিকে এয়ারলাইন্স সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশ থেকে এক লাখ ২৭ হাজার জন হজযাত্রী সৌদি আরবে পবিত্র হজ পালনের অনুমতি পেয়ে আসছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স হজযাত্রীদের ৫০ শতাংশ এবং বাকিদের বেশিরভাগই সৌদি এয়ারলাইন্স বহন করে থাকে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি এবং বিমান বাংলাদেশের এ সিন্ডিকেট ভেঙে যদি থার্ড ক্যারিয়ার কিংবা উন্মুক্ত করে দেয়া যায়, তাহলে প্রায় হাজীপ্রতি অন্তত এক লাখ টাকা খরচ কমে যাবে।
এছাড়া সমুদ্র পরিবহনে হাজী পরিবহনের সম্ভাবতা নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা হলেও এ ব্যাপারে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া হলে খরচ অর্ধেকের বেশি কমে আসবে বলে অনেকের ধারণা।
এবার নিবন্ধন কম কেন
সংশ্লিষ্টরা জানান, এবারও হজ প্যাকেজের মূল্য প্রত্যাশিতভাবে কমানো হয়নি। স্বাভাবিক বিমান ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি খরচ ধরা হয়েছে। প্রাথমিক নিবন্ধনের জন্য যে টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া অর্থনৈতিক কারণে অনেকে বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা জমা রাখলেও সেটি নিজেদের ইচ্ছেমতো তুলতে পারছেন না। পাশাপাশি চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক ধরনের প্রভাব রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আবাবিল হজ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। গ্রামের সাধারণ মানুষ কৃষি তথা ধাননির্ভর। কিন্তু এ বছর এখনো এ সিজনের ধান কৃষকের হাতে আসেনি। সার্বিক বিচারে তাই আমরা বলেছিলাম প্রাথমিক নিবন্ধন এক লাখ টাকা করে রাখার আবেদন জানিয়েছিলাম। বেশিরভাগ মানুষেরই এক সাথে সরকার নির্দেশিত তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা জমা দেয়া সামর্থ্যরে মধ্যে নেই। আর হজ আগামী বছর মে মাসে এখনই এত টাকা নেয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। অনেক হজ এজেন্সি তাই নিজ উদ্যোগে নিবন্ধন সম্পন্ন করে রেখেছে। তাই বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিলে আমি মনে করি, কমপক্ষে এক লক্ষাধিক হাজি নিবন্ধন করতে পারতেন।
তিনি বলেন, ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সম্প্রতি ওমরাহ পালন করার প্রবণতা বাড়ছে। অনেকের ধারণা, ওমরাহ পালন করলে আর হজ করার প্রয়োজন নেই। এই ভুল ধারণার কারণেও সাড়া কম।
জিয়ারতে কাবা ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী মো. আলাউদ্দিন সরকার সোনার বাংলাকে জানান, এবার হজযাত্রীর বিমানের ভাড়ার টাকাও অগ্রিম নেওয়া হয়েছে। প্রাক ও প্রাথমিক নিবন্ধনসহ প্রতি হজযাত্রীর জন্য একসাথে এত টাকা নির্ধারণ করায় বহু হাজীর পক্ষেই তা জমা দিতে কষ্ট হয়েছে। এতে প্রাথমিক হজযাত্রী নিবন্ধন হ্রাস পেয়েছে। হাব এবং এজেন্সি মালিকরা এ অর্থ কমানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে অনুরোধ করা হলেও সাড়া মেলেনি।
এদিকে হজ নিবন্ধনের সময় আর বাড়ানো হবে কি না- জানতে চাইলে ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা আমরা বলতে পারি না। কারণ এ সময় বাড়ানোর এখতিয়ার সৌদি আরবের। তাদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ রাখছি। তারা বাড়ালেই আমরা সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দেব।’ আর হজ নিবন্ধন কেন কম হচ্ছে- জানতে চাইলে এজেন্সি মালিকদের সংগঠন হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘সৌদি সরকার হজ ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাইজেশন এনেছে। বেশকিছু খাতে খরচ বাড়িয়েছে। এছাড়া সৌদি রিয়ালের দাম বাড়ায় হজের খরচ বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশের মানুষ হজের বদলে ওমরাহ করছেন। অথচ ওমরাহ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা (তাৎপর্যপূর্ণ সুন্নত) এবং এটি হজের ফরজ হওয়ার শর্ত পূরণ করে না। কিন্তু খরচ কম বলে অনেকে ওমরাহর দিকে ঝুঁকছেন। তিনি বলেন, অনেকে সম্প্রতি ওমরাহ পালন করায় হজে আগ্রহ কম দেখাচ্ছেন। অনেকের ধারণা, ওমরাহ করলে আর হজ করার প্রয়োজন নেই- এ ভুল ধারণার কারণেও সাড়া কম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শেষ মুহূর্তে নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়বে। তাছাড়া এবার প্রক্রিয়াটি আগেভাগে শুরু হওয়ায় অনেকেই বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেননি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, হজ প্যাকেজের অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করায় সাধারণ হজযাত্রীদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এ কারণে নিবন্ধনে সাড়া মিলছে না বলে মনে করছেন অনেকে। ওমরাহয় এয়ারলাইন্স খরচ যাওয়া আসা যদি ৭০-৮৫ হাজার টাকায় হয়ে যায়, সেখানে হজে কেন তা দেড় লাখ টাকা নিতে হবে। মূলত বাংলাদেশ বিমান এবং সৌদি এয়ার লাইন্সের একচেটিয়া ব্যবসা করার সরকারি সিদ্ধান্তেই বিশাল খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
হাব ও আটাব নেতারা জানান, হজ প্যাকেজের উচ্চমূল্যের কারণে অনেকেই এ বছর নিবন্ধনে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। চলতি বছর একজন বাংলাদেশিকে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ পালনে সর্বনিম্ন প্রায় ৬ লাখ টাকা খরচ করতে হবে।
এদিকে বিদ্যমান অবস্থায় আটাবের কর্মকর্তারা জানান, কাক্সিক্ষত সাড়া না পাওয়ায় অনেক ট্রাভেল এজেন্সি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার আকাক্সক্ষা রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে মানুষ ওমরাহর প্রতি ঝুঁকছে।
খরচের বেড়াজালে ওমরাহয় আগ্রহ, হজে কম
হজ প্যাকেজের উচ্চমূল্যের কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে ওমরা সম্পাদনের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। যদিও ওমরাহ বহুবার সম্পাদন করলেও হজের হক আদায় হয় না।
বিশ্লেষকরা জানান, এবারও হজ প্যাকেজের মূল্য প্রত্যাশিতভাবে কমানো হয়নি। স্বাভাবিক বিমান ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি খরচ ধরা হয়েছে। প্রাথমিক নিবন্ধনের জন্য যে টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া অর্থনৈতিক কারণে অনেকে বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা জমা রাখলেও সেটি নিজেদের ইচ্ছেমতো তুলতে পারছেন না। পাশাপাশি চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক ধরনের প্রভাব রয়েছে।
কী বলছেন ধর্ম উপদেষ্টা
ধর্ম উপদেষ্টা ড আ ফ ম খালিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ইচ্ছা করলেই সরকারের পক্ষে হজের খরচ কমানো সম্ভব নয়। গত বছর প্রায় ২৭ হাজার টাকা বিমানভাড়া কমানো হয়েছিলো। এবারও বিমানভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সরকার হজ নিয়ে কোনো ব্যবসা করে না, বরং সরকারি মাধ্যমে হজ প্যাকেজের অব্যয়িত অর্থ হাজীদের ফেরত দিয়ে থাকে। এবছর আমরা সরকারি মাধ্যমের হাজীদের ৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছি।
ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, হজের খরচ কমানোর বিষয়ে জনসাধারণের জোরালো দাবি আছে। কিন্তু সৌদি আরব প্রান্তে সেদেশের সরকার নির্ধারিত খরচ আমরা কমাতে পারি না। আমরা শুধু বিমানভাড়া ও বাড়িভাড়া নিয়ে কিছুটা দর কষাকষি করতে পারি। বিমানভাড়া যৌক্তিকভাবে নিরূপণের লক্ষ্যে আমাদের তৎপর আছি। ধর্ম উপদেষ্টা আরো বলেন, সরকারি মাধ্যমে হজযাত্রী যত বৃদ্ধি পাবে, হজ ব্যবস্থাপনা তত সহজ ও নিরাপদ হবে। এ দেশ থেকে একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হজযাত্রী যদি সরকারি মাধ্যমে হজে যায়, তাহলে আমরা তাদের উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে পারবো।
এখনো খালি ৫৩ সহস্রাধিক হজ কোটা
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হজের খরচ কুলিয়ে না ওঠায় নিবন্ধনে এবার বিগত কয়েক বছরের তুলনায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বিরাজমান। দফায় দফায় নিবন্ধনের সময় বৃদ্ধি করেও হজযাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। চলতি বছর ২৭ জুলাই থেকে হজযাত্রীদের নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর প্রায় তিন মাসে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজের প্রাথমিক নিবন্ধন করেছে মাত্র ৭৩ হাজার ৪১৬ জন হজযাত্রী, যা শতকরা হিসাবে মাত্র প্রায় ৫৭ শতাংশ। এর মাঝে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রাথমিক নিবন্ধন করেছেন মোট চার হাজার ১০২ জন। আর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নিবন্ধন করেছেন মাত্র ৬৯ হাজার ৩১৪ জন। সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, আগামী বছর হজে এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন যাওয়ার কথা। এবার হজে যেতে আগ্রহী ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নিবন্ধনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল ধর্ম মন্ত্রণালয়। আর গত ১৬ অক্টোবর ছিল সরকারি ও বেসরকারি- এ দুই ব্যবস্থাপনায় নিবন্ধনের শেষ সময়। কিন্তু সময় শেষ হয়ে গেলেও এবার কাক্সিক্ষত সাড়া মেলেনি। অনেক মুসলমানের ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত বিমান ভাড়া ও নিবন্ধনের বাড়তি আর্থিক চাপ সামলাতে না পেরে নিয়ত করেও হজে যেতে পারছেন না। হজের নিবন্ধনের সময়ও আর বৃদ্ধি করা হবে না বলে জানিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। অর্থাৎ এখনো হজের কোটা খালি রয়েছে ৫৩ হাজার ৭৮২ জনের, শতকরা হিসাবে যা প্রায় ৪৩ শতাংশ।
এদিকে বিগত পাঁচ বছরে হজের পরিসংখ্যানে দেখা যায় এবারের অবস্থা শোচনীয়। গত বছর ২০২৪ সালে হজে গিয়েছিলেন ৮৫ হাজার ২৫৭ হজযাত্রী। যার মধ্যে পুরুষ ৬৩ আর মহিলা ৩৭ শতাংশ। আর ৬০ বছরের ওপরে হজযাত্রী ছিলেন ৩২ শতাংশ। ২০২৩ সালে এক লাখ ২২ হাজার ৫৫৮ জন। তার মধ্যে ৬৩ পুরুষ আর ৩৭ শতাংশ মহিলা। ৬০ বছরের ওপরে হজযাত্রী ছিলেন ৪০ শতাংশ। একইভাবে ২০২২ সালে ৬০ হাজার ১৪৬ জন। পুরুষ ৬৫ আর মহিলা ৩৫ শতাংশ। ৬০ বছরের ওপরে হজযাত্রী ছিলেন ৩২ শতাংশ। এর মধ্যে করোনা ভাইরাসের কারণে হজ অনুষ্ঠিত হয়নি। এর আগে ২০১৯ সালে এক লাখ ২৭ হাজার ১৫২ জন। পুরুষ ৬৪ আর মহিলা ৩৬ শতাংশ। আর ৬০ বছরের ওপরে ৫১ শতাংশ। ২০১৮ সালে এক লাখ ২৭ হাজার ২৯৮ জন। এতে ৬৫ পুরুষ আর মহিলা ৩৫ শতাংশ। আর ৬০ বছরের ওপরে হজযাত্রী ছিলেন ৫৪ শতাংশ। এ সময়গুলোয় সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনের কোটা ছিল।
হজ গমনেচ্ছুকদের কথা
রাজধানীর কাকরাইলে একটি হজ এজেন্সিতে আগত হজে আগ্রহী মো. ইমতিয়াজের সাথে কথা হয়। গাজীপুর কাপাসিয়ায় তার বাড়ি। তিনি আফসোস করে বলেন, আমার বড় ভাইসহ কিছু নিকট আত্মীয় করোনার আগে এখনকার চেয়ে চার ভাগের প্রায় এক ভাগ খরচ দিয়ে হজে যেতে পেরেছেন। কিন্তু আমরা এত বেশি খরচ হয়ে যাওয়ায় মনে চাইলেও কুলাতে পারছি না। বিগত কয়েক বছরে বরং আমাদের সঞ্চয়ের চেয়ে খরচই বেড়েছে। নিবন্ধনে আগ্রহী হজ গমনেচ্ছু অনেকে জানান, সরকার কত কত সেক্টরে বছরের পর বছর ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে, প্রয়োজন হলে সরকার হজযাত্রীদের কিছু ভর্তুকি দিতে পারে। আর না হয় এয়ারলাইন্স খরচ কমিয়ে আনতে ভূমিকা পালন করতে পারে।