সম্পাদকীয়

জাতীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করুন


৩০ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:২৩

আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জোর প্রস্তুতির দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এখনো পরিবেশ তৈরি হয়নি। বিশেষ করে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা এখনো ফ্যাসিবাদী পতিত আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী ১৪ দলের মতো সন্ত্রাসী আচরণ করছে। ফ্যাসিবাদের আরেক সহযোগী জাতীয় পার্টি এখনো মাঠে আছে এবং পরিবেশ ঘোলা করছে। ফ্যাসিস্টদের রাজনীতিতে পুনর্বাসনের ষড়যন্ত্র করছে। অস্ত্র উদ্ধারের কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। পতিত স্বৈরাচার অনুতাপ দূরে থাক, ক্ষমতায় এসে জুলাইযোদ্ধাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করার হুমকি দিচ্ছে।
সহযোগী একাধিক জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে প্রকাশ, গত ২৪ অক্টোবর শুক্রবার বিকেলে শেরপুর সদরের চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের ডাকপাড়ায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামী মনোনীত এমপি প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলামের গণসংযোগে বিএনপি নামধারী সন্ত্রাসীরা হামলা করেছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের আরেক সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামীর মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দও অভিযোগ করেছেন, তার নির্বাচনী এলাকা ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায়ও নির্বাচনী প্রচারে বাধা দেয়া হচ্ছে। নোয়াখালীর একটি মসজিদে ইসলামী ছাত্রশিবিরের পবিত্র কুরআন প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠান ও অফিসে হামলা করেছে বিএনপি নামধারী সন্ত্রাসীরা। গণঅধিকার পরিষদের শীর্ষনেতা ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূরের ওপর তার নির্বাচনী এলাকা পটুয়াখালী এবং রাজধানীর কাকরাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও রহস্যজনক আগুন লাগার ঘটনার কোনো কিনারা হয়নি। চলমান এ পরিবেশের উন্নতি ছাড়া জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করলে ভোটাধিকার রক্ষা করা কঠিন হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই গত ২৭ অক্টোবর সোমবার দুপুরে পুলিশ সদর দপ্তরের হল অব প্রাইডে বিশেষ অপরাধ পর্যালোচনা সভায় সভাপতির বক্তৃতায় তিনি বলেন, অতীতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুলিশ সম্পর্কে জনমনে যে নেতিবাচক ইমেজ তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার একটা বড় সুযোগ আগামী নির্বাচন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জনগণের আস্থা অর্জনে সকলকে সচেষ্ট থাকতে হবে।
এ সময় পুলিশপ্রধান নির্বাচন সামনে রেখে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশনা দেন। এক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। অস্ত্র উদ্ধারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষিত পুরস্কার সম্পর্কে প্রচার বাড়ানোর ওপরও জোর দেন আইজিপি। পুলিশের চলমান নির্বাচনী প্রশিক্ষণ নিবিড়ভাবে পরিচালনার জন্য ইউনিটপ্রধানদের নির্দেশ দিয়েছেন বাহারুল আলম।
আমরা মনে করি, নির্দেশ দিয়ে তিনি একটি ভালো কাজ করেছেন। কিন্তু যারা মাঠে আছেন, তাদের অবস্থা কী, তা কারও জানা নয়। পুলিশ বাহিনীর ট্রমা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। যারা জুলাই আন্দোলনের সময় এবং এর আগে হাসিনার নির্দেশে অপকর্ম করেছেন, তাদের নাম অপরাধীর তালিকায় না থাকলেও ভয় কাটেনি। পুলিশ সদস্যদের অনেকেই বিপ্লবের পক্ষে ভূমিকা পালন করেছেন, তারা আছেন উভয় সংকটে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক দল; এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মধ্যে সন্দেহ আছে। জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিয়ে জুলাই বিপ্লবের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি বাস্তবায়ন নিয়েও সরকার স্পষ্ট করে কিছু বলছে না। রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় অংশ সনদের আইনি ভিত্তি এবং আওয়ামী লীগ ও তার দোসরদের নিষিদ্ধের দাবিতে অনড়। কারণ তাদের সামনে জার্মানি, ইতালিসহ ইউরোপে ফ্যাসিস্টদের সাথে কেমন আচরণ করা হয়, তা পরিষ্কার।
আমরা মনে করি, উল্লেখিত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর মীমাংসা জাতীয় নির্বাচনের আগেই করতে হবে। তা না হলে সন্দেহ, সংকট ও শঙ্কা কাটবে না। আর শঙ্কা কাটার আগে নির্বাচন দিলে নতুন ফ্যাসিবাদের আগমন ঘটবে, যা আমাদের কারো কাম্য নয়। আশা করি, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা উল্লেখিত বিষয়গুলোর সমাধান জাতীয় নির্বাচনের আগেই করবেন, সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারা তৈরিতে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হবেন।