তৎপর নিষিদ্ধ আ’লীগ, দায় কার?
২৪ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:৩৫
রাজনীতিকরা বলছেন সরকারের ব্যর্থতা
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ওই বছরের অক্টোবরে নিষিদ্ধ করা হয় আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে। এরপর ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের এক বিশেষ সভায় গত ১০ মে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় বিচার না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় মিছিল করছে। কোনো জায়গায় তারা প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। কোথাও কোথাও প্রতিরোধ করতে গেলে পাল্টা হামলা চালিয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা। আওয়ামী লীগের মিছিল যাচ্ছে, একই সময় পাশ দিয়ে পুলিশের গাড়ি যাচ্ছেÑ এমন ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। অন্যদিকে মিছিল থেকে আটকের পর অন্যরা এসে পুলিশের কাছ থেকে আটকদের ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার খবরও প্রকাশিত হচ্ছে। অর্থাৎ কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও আওয়ামী লীগ শক্তি প্রদর্শন করছে অনেকটাই প্রকাশ্যে। এ বিষয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনীতিকদের ভাষ্য হচ্ছে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতার কারণে আওয়ামী লীগ এতটা সাহস পাচ্ছে।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন সামনে রেখে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে সক্রিয় ভূমিকায় রয়েছে। এরই মধ্যে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফ্যাসিস্ট এই দলটির নেতাকর্মীরা গোপনে সংগঠিত হচ্ছে। রাজধানীর কোনো না কোনো স্থানে এরা মিছিল-মিটিং করছে। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মী সূত্রে এমনটি জানা গেছে। সূত্রগুলো জানায়, ঢাকার অনেক বাসায় ঘরোয়া সভায় মিলিত হচ্ছে আওয়ামী লীগ। দলটি চাচ্ছে, নির্বাচনের আগে দেশে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের যেসব লোক রয়েছে, তারাও সরকারকে নানাভাবে বেকায়দায় ফেলতে ষড়যন্ত্র করছে। প্রশাসনকে আওয়ামী দোসরমুক্ত করতে অনেক আগ থেকেই দাবি জানিয়ে আসছিলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে ২১ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করে বিএনপিও সচিবালয় এবং প্রশাসনের সব স্থান থেকে আওয়ামী লীগের দোসরদের অব্যাহতি দিতে অনুরোধ জানিয়েছে। এটা করতে না পারলে আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।
গত জুলাইয়ে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়েছে আওয়ামী লীগের একটি গোপন সভা, প্রায় ৪শ’ জনের ওই সভায় অংশ নিয়েছেন ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা। পুলিশ ও সংবাদমাধ্যম অনুসন্ধানে জানা গেছে, সভায় দেওয়া হয়েছে সরকারের বিরুদ্ধ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত স্লোগান এবং সাজানো হয়েছে ধ্বংসাত্মক নানা কর্মসূচি। আওয়ামী লীগের এই ‘গোপন বৈঠক’ ঘিরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের ২২ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া ওই বৈঠক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠা মেজর পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সেনাবাহিনী। এ ঘটনায় রাজধানীর ভাটারা থানায় একটি মামলা করেছে পুলিশ। তাতে বলা হয়েছে, গত ৮ জুলাই বসুন্ধরাসংলগ্ন কে বি কনভেনশন সেন্টারে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ একটি গোপন বৈঠকের আয়োজন করে। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা মিলে ৩০০-৪০০ জন অংশ নেন। তারা সেখানে সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। বৈঠকে পরিকল্পনা করা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ পাওয়ার পর সারা দেশ থেকে লোকজন এসে ঢাকায় সমবেত হবেন। তারা ঢাকার শাহবাগ মোড় দখল করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে দেশে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করবেন। তারা সেখানে এসব ষড়যন্ত্র করেছিলেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ওই বৈঠকের পর সরকারের কঠোর হওয়া দরকার ছিল, কিন্তু না, সরকার আওয়ামী লীগের বেআইনি কার্যক্রমের ব্যাপারে কঠোর হয়নি। ফলে এখনো প্রতিদিন রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে মিছিল করতে পারছে এরা। ফ্যাসিবাদবিরোধীরা আওয়ামী লীগের এসব তৎপরতাকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, মনে করছেন এটি ‘গুপ্ত মিশন’ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে গিয়েও বসে নেই তিনি। অনলাইনে ভিডিও বার্তা আর টকশো করে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় অনলাইনকেন্দ্রিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে এরা। দলটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ, টেলিগ্রাম চ্যানেলসহ অন্যান্য সামাজিকমাধ্যমে নানাবিধ পোস্ট আর ভিডিওবার্তা দিয়ে চাঙ্গা রাখতে চেষ্টা করছেন কর্মী-সমর্থকদের। এর পাশাপাশি রাজপথেও তৎপরতা দেখাতে চায় দলটি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হফিজ উদ্দিন আহমেদ (বীরবিক্রম) মনে করেন আওয়ামী লীগের এখন যেভাবে ঝটিকা মিছিল হচ্ছে, এভাবে রাজনীতিতে ফেরার কোনো সুযোগ নেই তাদের। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ হচ্ছে একটি নির্লজ্জ দল। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর খুন-গুম করেছে, স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ চালিয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে এই দলটির পতন হওয়ার পর দরকার ছিল অনুশোচনা করার, জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার, কিন্তু তারা সেটি না করে বরং বিপ্লব পরবর্তী সরকারকে নানাভবে বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্র করছে। তিনি বলেন, মাঝে মধ্যে ঝটিকা মিছিল করছে, মিছিল করছে আর পালাচ্ছে, এটা কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো পন্থা নয়। বিএনপির এই অন্যতম নীতিনির্ধারক বলেন, দলটির সব কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ, এই নিষিদ্ধ দলকে কার্যক্রম থেকে নিবৃত রাখার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় ও সচেষ্ট থাকলে আওয়ামী লীগ মিছিল করার সুযোগ পাওয়ার কথা নয়। নিষিদ্ধ এই দলের সব ধরনের তৎপরতা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই সিনিয়র রাজনীতিক।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মনে করেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বন্ধ রাখার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, একটি দল জুলাই অভ্যুত্থানে সরাসরি গণহত্যায় জড়িত। আর গণহত্যার দায়ে তাদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নিষিদ্ধ সংগঠন যদি প্রকাশ্যে তৎপরতা চালায়Ñ তাহলে এটা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, এই নির্বাচন সামনে রেখে যাতে নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন কোনো ধরনের অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সেটি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব হচ্ছে তারা (আওয়ামী লীগ) কোনো কর্মসূচি করতে চাইলে সেটি প্রতিহত করা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান জামায়াতে ইসলামীর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের এই সদস্য।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মনে করেন, আওয়ামী লীগ দু-একটা মিছিল করে ফিরতে পারবে না। এর কোনো সুযোগও নেই। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, একটি দল নিষিদ্ধ হওয়ার পর তার কার্যক্রম চলতে পারে না। তিনি বলেন, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর দলটির পক্ষ থেকে অনুশোচনা প্রকাশ করা হয়নি, এত হত্যাকাণ্ড চালানোর পর কোনো ধরনের ক্ষমা প্রার্থনাও করা হয়নি। দলটির পক্ষ থেকে নানা সময় নানা ধরনের কথা বলা হলেও দায়িত্বশীল বা ইতিবাচক কোনো বক্তব্য আসেনি দলটির পক্ষ থেকে। ফলে এই দলটির রাজনীতিতে আসার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে আওয়ামী লীগ যে মিছিল করছে এর জন্য দায়ী সরকার। তিনি বলেন, সরকারের অকার্যকারিতা ও ব্যর্থতার কারণেই আওয়ামী লীগ মিছিল করার সুযোগ পাচ্ছে, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সফলভাবে কাজ করতে পারলে তারা তো এই সাহস পেত না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, এরপর অতীতের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে, এরপর যদি জনগণ তাদের রাজনীতি গ্রহণ করে, তাহলে তারা তাদের রাজনীতি করতে পারবে। সাইফুল হক বলেন, আমাদের দলের পলিসি হচ্ছে, রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে নয়, আদর্শিক ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। ফলে তারা যা করছে, তা অবশ্যই বেআইনি। কোনো বেআইনি কাজ কেউ করলে তা নিবৃত করার দায়িত্ব সরকারের। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব এটা। তিনি আরো বলেন, যদি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা না থাকতো, তাহলে তাদের কার্যক্রম করতে কোনো বাধা ছিল না, বরং এটা তাদের অধিকার থাকতো। কিন্তু সরকারই তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। ফলে এখন তারা কোনো কার্যক্রম চালালে সেটা আইন সম্মত নয়, আর আইন সম্মত না হলে তা ঠেকানোর দায়িত্ব সরকারের। তিনি বলেন, পুলিশসহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব হচ্ছে যে কারো বেআইনি কার্যক্রম বন্ধ করা।