বেলফোর ঘোষণায় ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্মই জাজিরাতুল আরবে অশান্তির সূত্রপাত


১৬ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৪৬

॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
জাজিরাতুল আরব বা আরব উপদ্বীপ ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ভৌগোলিক ইত্যাদি দিক দিয়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৮ সালে বেলফোর ঘোষণায় ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অঞ্চলটি কার্যত একটি আরব-ইসরাইল যুদ্ধাঞ্চলে পরিণত হয়। পাঁচটি প্রধান আরব-ইসরাইল যুদ্ধে আরবদের পরাজয়ের জন্য আরব নেতৃত্বই দায়ী। সর্বশেষ গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গাজার প্রশাসন সাময়িকভাবে একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটির হাতে থাকবে। রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ এ কমিটি গাজার মানুষের জন্য দৈনন্দিন সেবা পরিচালনা করবে। কমিটিতে যোগ্য ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ থাকবেন। তাঁদের তত্ত্বাবধান করবে একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’, যার প্রধান থাকবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংস্থার সদস্য হিসেবে থাকবেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার।’ এমন ২০ দফা প্রস্তাব আরবদের আরেক দফা পরাজয়ের সূচনা।
আরব-ইসরাইল যুদ্ধের প্রেক্ষাপট
রোমানদের দ্বারা নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইহুদি সম্প্রদায় ধর্মীয় ভাবধারায় প্যালেস্টাইনকে মনেপ্রাণে নিজেদের ভূমি হিসেবে ভাবতো। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে অঞ্চলটি আরবদের হওয়ায় এটি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা হিসেবেই পরিচিত। ১৮৮২ সাল থেকেই মূলত শুরু হয়েছিল অভিবাসন প্রক্রিয়া; বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে প্যালেস্টাইনে ঘাঁটি জমাতে থাকে ইহুদিরা। ১৮৯৬ সালে সাংবাদিক থিওডোর হার্জলের লেখা বই The Jewish State-এ ইহুদিদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠন করার কথা বললে বিশ্বব্যাপী এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। ইহুদিরা প্যালেস্টাইনে ঘাঁটি জমিয়ে যেন এরই প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করছিল। হার্জলের উদ্যোগে ১৮৯৭ সালে ইহুদিদের জন্য ‘World Zionist Organization’ ও গঠন করা হয়। ১৯১৭ সালের ঐতিহাসিক ‘বেলফোর ঘোষণার’ পর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইহুদিরা প্যালেস্টাইনে এসে বসতি গড়তে শুরু করে। আর্থার বেলফোর ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন প্যালেস্টাইনকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ইউরোপে হিটলারের ‘ইহুদি নিধন’ কার্যক্রম শুরু হলে পরিত্রাণের আশায় লক্ষ লক্ষ ইহুদি প্যালেস্টাইনে পালিয়ে আসে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের ১১ সদস্যের কমিটির (টঘঝঈঙচ) সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্যালেস্টাইন বিভাজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্যালেস্টাইনের অপেক্ষাকৃত বৃহত্তর অংশটিতে আরবরা বসবাস করবে এবং অপর অংশটিতে স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। জেরুসালেম নগরী জাতিসংঘের অছি পরিষদের তত্ত্বাবধানে থাকবে। যদিও ভারত, ইরান এবং সাবেক যুগোস্লাভিয়া এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল।
১৯৪৮ সালের ১৪ মে রাতে ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়নের নেতৃত্বে প্যালেস্টাইনের তেলআবিবে ইসরাইলের স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে আরব-ইসরাইল সংঘাতের সূত্রপাত।
প্রথম আরব-ইসরাইল যুদ্ধ (১৫ মে, ১৯৪৮-৯ জানুয়ারি, ১৯৪৯)
সিরিয়া, লেবানন, মিশর, ইরাক ও ট্রান্স জর্ডান একত্রিত হয়ে ইসরাইল আক্রমণ করে। শুরু হয় ইতিহাসের প্রথম আরব-ইসরাইল যুদ্ধ। সেসময় আরব লীগের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘আরব লিবারেশন আর্মি’ নামে একটি গেরিলা সংস্থা গঠিত হলেও তা নবগঠিত ইসরাইলি রাষ্ট্রের বিপক্ষে দাঁড়ানোর মতো ক্ষমতাধর ছিল না যদিও আরব দেশগুলো যুদ্ধের প্রথম দিকে বেশ সফল ছিল।
প্রথম যুদ্ধের ফলাফল
আরবদের সার্বিক পরাজয়ের ভেতর দিয়ে শেষ হয় প্রথম পর্যায়ের যুদ্ধ। তবে যুদ্ধে ট্রান্স জর্ডান জর্ডান নদীর পশ্চিমতীর এবং পূর্ব জেরুসালেম দখল করে সরকারিভাবে ‘হ্যাশেমাইট কিংডম অব জর্ডান’ নামকরণ করে আর গাজা ভূখণ্ড চলে আসে মিশরের দখলে। ইসরাইলিরা দখল করে পশ্চিম জেরুসালেম।
সামগ্রিকভাবে প্রথম আরব-ইসরাইলি যুদ্ধে ইসরাইল সামরিক ও রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করে, এবং ট্রান্স জর্ডান ও মিশর সামরিকভাবে পরাজিত হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করে।
প্রথম যুদ্ধে আরবদের পরাজয়ের কারণ
অনেকগুলো কারণে প্রথম আরব-ইসরাইল যুদ্ধে আরবদের পরাজয় হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো-
প্রথমত, আরব বাহিনী সংখ্যায় এবং দক্ষতায় দুদিক থেকেই ইসরাইলি হাগানা (ব্রিটিশদের মদদে ইহুদিদের গোপন সংগঠন) বাহিনীর চেয়ে নিম্নমানের ছিল। ৭টি আরব রাষ্ট্র এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, কিন্তু যুদ্ধ চলাকালে যুদ্ধক্ষেত্রে ইসরাইলি সৈন্যসংখ্যা ছিল আরবদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এ যুদ্ধে ইসরাইল মোট ১,১৭,৫০০ সৈন্য যুদ্ধক্ষেত্রে নামিয়েছিল, কিন্তু ৭টি আরব রাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে মাত্র ৫১,১০০ থেকে ৬৩,৫০০ সৈন্যকে ফিলিস্তিনে প্রেরণ করেছিল।
শুধু তাই নয়, এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রকৃত অর্থে যুদ্ধ করেছিল মিশর, ইরাক, ট্রান্স জর্ডান এবং সিরিয়া। লেবানন, সাউদি আরাবিয়া ও ইয়েমেনের অংশগ্রহণ ছিল সম্পূর্ণভাবে প্রতীকী। যুদ্ধের সময় মিশর ফিলিস্তিনে প্রেরণ করেছিল প্রায় ২০,০০০ সৈন্য, ইরাক প্রেরণ করেছিল প্রায় ১৮,০০০ সৈন্য, ট্রান্স জর্ডান প্রেরণ করেছিল প্রায় ১০,০০০ সৈন্য এবং সিরিয়া প্রেরণ করেছিল প্রায় ৫,০০০ সৈন্য। মাত্র ১,২০০ সাউদি আরাবিয়া এবং ৩০০ ইয়েমেনি সৈন্য এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। ১৯৪৮ সালের ৫-৬ জুন সংঘটিত একটি খণ্ডযুদ্ধ ছাড়া কার্যত লেবানন এই যুদ্ধে অংশগ্রহণই করেনি।
দ্বিতীয়ত, মাত্র কয়েক বছর আগেই ইহুদিরা ইউরোপে ভয়াবহ গণহত্যার শিকার হয়েছিল এবং সেই আতঙ্কের রেশ তাদের মধ্যে তখনো স্পষ্ট বিদ্যমান ছিল। ফলে প্রাণ রক্ষার তাগিদে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের চূড়ান্ত সামর্থ্য ব্যবহার করে।
তৃতীয়ত, ইসরাইল ছিল একটি সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র এবং এজন্য তাদের কাছে এ যুদ্ধে আরব রাষ্ট্রগুলোর পরাজয়কে একটি ‘অনন্যসাধারণ’ ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু কার্যত যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আরব রাষ্ট্রগুলোও সুপ্রতিষ্ঠিত বা স্থিতিশীল ছিল না।
চতুর্থত, সিরীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সামি মুবায়েবের এবং লেবানিজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাদওয়ান আল-সাঈদের মতে, আরব রাষ্ট্রগুলোর ইসরাইলিদের প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না।
পঞ্চমত, যেসব আরব দেশ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল তাদের একটি প্রধান কার্যালয় ছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন একজন ইরাকি জেনারেল। কিন্তু অন্য দেশগুলোর সৈন্যদের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
সর্বোপরি তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই নিজ নিজ স্বার্থে ইসরাইলকে সহায়তা করে। যুদ্ধ চলাকালে জাতিসংঘ উভয় পক্ষের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, কিন্তু ইসরাইলিরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করতে সমর্থ হয়, এবং সোভিয়েত মিত্ররাষ্ট্র চেকোস্লোভাকিয়াও ইসরাইলকে অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করে।
দ্বিতীয় আরব-ইসরাইল যুদ্ধ (২৯ অক্টোবর ১৯৫৬-৭ নভেম্বর ১৯৫৬)
১৯৫৬ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের ক্ষমতায় এসেই মিশরকে বহিরাগতদের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইসরাইলের জন্য সুয়েজ খাল বন্ধ ঘোষণা করেন। শুরু হয় সুয়েজ খাল জাতীয়করণকে কেন্দ্র করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ডাইয়ান এর নেতৃত্বে ইসরাইলী বাহিনী আকাশ ও স্থল উভয় পথে মিশরে আক্রমণের মাধ্যমে দ্বিতীয় দফা আরব-ইসরাইল যুদ্ধ। ইতিহাসে এটি সুয়েজ যুদ্ধ নামেও পরিচিত।
তৃতীয় আরব-ইসরাইল যুদ্ধ (১৯৬৭ সালের ৫-১০ জুন)
আরবদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে অতর্কিত হামলা চালায় ইসরাইল। ৫ থেকে ১০ জুন পর্যন্ত ইসরাইলের সাথে মিশর, জর্ডান ও সিরিয়ার মধ্যে সংঘটিত হয় তৃতীয় আরব-ইসরাইল যুদ্ধ যার ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। ইসরাইলিরা পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটানোরও পরিকল্পনা করেছিল, যার সাংকেতিক নাম ছিল শিমশন বা স্যামসান। ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইলি বাহিনীর কাছে আরবরা লজ্জাজনকভাবে হেরে যায়।
পরাজিত হওয়ায় মিশরকে হারাতে হয় ১০-১৫ হাজার সেনা আর জর্ডানে নিহত হয় ছয় হাজারের মতো সেনাসদস্য। পক্ষান্তরে ইসরাইল হারায় ১ হাজার যোদ্ধা, ৪৬ টির মতো বিমান।
ইসরাইলি বাহিনী মিশরের কাছ থেকে গাজা উপত্যকা ও সিনাই উপদ্বীপ, জর্ডানের কাছ থেকে পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেম এবং সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমি ছিনিয়ে নেয়।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে পিএলও (প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন) নামে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে।
চতুর্থ আরব-ইসরাইল যুদ্ধ (১৯৭৩ সালের ৬-২৪ অক্টোবর)
১৯৭২ সালে ফিলিস্তিনের সংগঠন ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ মিউনিখ অলিম্পিকে অংশগ্রহণকারী ১১ জন ইসরাইলি এথলেটকে হত্যা। ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ গোপন অভিযানের অংশ হিসেবে ঘটনার দুই দিনের মধ্যে লেবানন ও সিরিয়ার ১০টির মতো পিএলওর ঘাঁটি বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়। মিশর ও সিরিয়া সংঘবদ্ধ হয়ে হারানো ভূমি সিনাই উপদ্বীপ ও গোলান মালভূমি পুনরুদ্ধার করতেই ইয়ম কিপুরের দিন অতর্কিত হামলা চালায়। অবশেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে ২৫ অক্টোবর যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
যুদ্ধে দুই পক্ষেরই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরব পক্ষে ৮ থেকে ১৮ হাজার নিহত, ১৮ থেকে ৩৫ হাজার আহত, ৮ হাজারের বেশি যুদ্ধবন্দী, হাজার দুই এর বেশি ট্যাঙ্ক এবং ৩৫০-৫০০ বিমান ধ্বংস এবং ১৯টি যুদ্ধ জাহাজ ডুবে যায়। ইসরাইলের পক্ষে আড়াই থেকে তিন হাজার নিহত, সাড়ে সাত থেকে ৯ হাজার আহত, ২৯৩ জন যুদ্ধবন্দী, ৪০৭ ট্যাঙ্ক ধ্বংস প্রাপ্ত ও ১০২ টি যুদ্ধ বিমান ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।
পঞ্চম আরব-ইসরাইল যুদ্ধ ১৯৮২
ইসরাইল লেবাননের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল। অর্থাৎ আরব-ইসরাইলি দ্বন্দ্বে প্রথম যুদ্ধটি ছাড়া বাকি প্রতিটি যুদ্ধে ইসরাইল আগ্রাসী ভূমিকায় ছিল।
ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি
১৯৭৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মধ্যস্থতায় মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিন হোয়াইট হাউসে ক্যাম্প ডেভিড শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মূল বিষয়বস্তু ছিল ইসরাইল অধিকৃত সিনাই উপদ্বীপ পুনরায় মিশরকে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ঐ এলাকায় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা। এই শান্তি চুক্তির জন্য আনোয়ার আল সাদাত ও মেনাখেম বেগিন ১৯৭৮ সালে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠায় মিশরের সাথে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর কূটনৈতিক সম্পর্ক নাজুক হয়ে পড়ে। এমনকি আরব লীগ থেকেও সদস্যপদ বাতিল হয়। পরবর্তীতে অবশ্য আবার যোগদান করে মিশর।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
মধ্যপ্রাচ্য আমেরিকান পণ্য ও পরিষেবা বিশেষ করে সামরিক হার্ডওয়্যারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই অঞ্চলটিতেই সবচেয়ে বেশি মার্কিন অস্ত্র রপ্তানি করা হয়েছে। মোট মার্কিন অস্ত্র রপ্তানির ৩৮ শতাংশই গেছে মধ্যপ্রাচ্যে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র কিনেছে সাউদি আরাবিয়া, কাতার, কুয়েত এবং ইসরাইল।
মিশরের সুয়েজ খাল এবং ইরানের অদূরে হরমুজের সরু প্রণালীর বাণিজ্য রুট, জ্বালানি সম্পদ, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বিষয়গুলোর কারণেই অঞ্চলটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ। আরব-ইসরাইল সংঘাত, শাতিল আরব যুদ্ধ, ইরাক আক্রমণ, আরব বসন্ত, ইসলামিক স্টেট বা আইএস ইস্যু, ইসরাইল ও সাউদি আরাবিয়া অস্ত্র পাঠানো- এমন নানা বিষয়ে সম্পৃক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিভিন্ন ইস্যুর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য তার উপস্থিতি নিশ্চিত করছে। আরব-ইসরাইল যুদ্ধের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র জাজিরাতুল আরবে তার উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। তবে ইসরাইলকে একপেশে সমর্থন করার জন্য অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অনেক আগেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, যা আরব-ইসরাইল যুদ্ধাঞ্চলকে শান্তি অঞ্চলে রূপান্তরের পরিপন্থী।
ইউরোপের দ্বিমুখী নীতি
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনায় প্রমাণিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইউরোপীয় অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় মুখে নিরপেক্ষ থাকার কথা বলে ইসরাইলকে অন্যায়ভাবে সমর্থন করে দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করছে।
মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর নীরবতা ও শুধু লিপ সার্ভিস
মুসলিম বিশ্বের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্ব শুধু লিপ সার্ভিস ব্যবহার করে কার্যত নীরবতার কার্যক্রম আরব-ইসরাইল যুদ্ধের ক্ষেত্রেও বজায় রাখা অঞ্চলটিতে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া এবং আরবদের পরাজিত হওয়ার অন্যতম কারণ।
আরব নেতৃত্বের সার্বিক পরাজয়
মিশর ১৯৭৮ সালে ইসরাইলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে, পরে জর্ডানও তেমন চুক্তি করে। ২০২০ সালে আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ‘আব্রাহাম চুক্তি’র মাধ্যমে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে।
কিন্তু ফিলিস্তিনিরা একে বিশ্বাসঘাতকতা মনে করে। লেবাননের বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. গ্যাব্রিয়েল খালাফ বলেন, ‘আরব বিশ্ব এখন আর আগের মতো ফিলিস্তিনের জন্য ঐক্যবদ্ধ নয়। এ বিভাজনই ইসরাইলের শক্তিকে আরও নিরঙ্কুশ করে তুলেছে।’ আরব নেতৃত্ব আরবজাতির বৃহত্তর স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে ১৯৪৮ সালের পর থেকে প্রায় প্রত্যেকটি ঘটনায় প্রথম আরব-ইসরাইল যুদ্ধের ন্যায় আরব নেতৃত্বের পরাজয় ঘটেছে। সাম্প্রতিককালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রদত্ত গাঁজা পরিচালনার জন্য ২০ দফা দাবিতে ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এ বোর্ডের প্রধান হবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে এবং অন্যতম সদস্য হবেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। এ প্রস্তাব বাস্তবায়নে আরবদের গাজা নিয়ন্ত্রণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট তথা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে যাওয়া এবং আরবদের জন্য আরেকটি পরাজয়ের সূচনা হতে চলেছে।
আরব-ইসরাইল যুদ্ধে জাজিরাতুল আরবের ভূখণ্ড উদ্ধার, আরব তথা মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বকে পরাজয়ের গ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আরব নেতৃত্বকে সংকীর্ণ স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে বৃহত্তর স্বার্থে গুরুত্বারোপ এবং মুসলিম বিশ্বের সকল নেতৃত্বকে শুধু লিপ সার্ভিস ব্যবহার না কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
alhelaljudu@gmail.com