ব্যাংক মার্জারে আইন মানছে না অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের শেয়ার লোপাটের নয়া কারসাজি


১৬ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৪১

নেতিবাচক বার্তা যাবে বিদেশে, কমবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ

॥ উসমান ফারুক॥
একীভূত বা মার্জারের জন্য আলোচনায় থাকায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৫ ব্যাংকের মোট মূলধন বা পুঁজি হচ্ছে ১৪ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা। এ অর্থের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা বা ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ দিয়েছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা। অবশিষ্ট সিংহভাগের ১৩ হাজার ৪২৮ বা ৯০ দশমিক ৬২ শতাংশ জোগান দিয়েছেন পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা। এর মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীও রয়েছেন। ব্যাংকগুলো থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থমন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা পেয়ে ঋণ কেলেঙ্কারি ও অর্থ পাচার করেছে, পরিচালকরা। বিপদের সময়ে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে প্রতি বছর মুনাফার একটি অংশ বিতরণ না করে গড়ে তোলা হয় সব ব্যাংকে পৃথকভাবে রিজার্ভ। সেই রিজার্ভের ৭ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকাও নেই। শুধু এক গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকেরই রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা।
এভাবে একসময়ে পরিচালকরা ঠকিয়েছে, বিনিয়োগকারীদের। এবার সরকার থেকে ঠকানোর নয়া কারসাজি শুরু হয়েছে। সুশাসন না থাকায় সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকে পরিণত হওয়া এসব ব্যাংকের বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী পরিচালক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তাদের বিচার না করে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে বিনিয়োগ করা সাধারণ শেয়ারধারকদের নতুন শাস্তি দিতে চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়। অথচ এসব শেয়ারধারক কখনোই ব্যাংক পরিচালনায় অংশ নেননি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরাসরি আইন লঙ্ঘন করে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের শেয়ার লোপাট করে দেয়ার আয়োজন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়। এসব ব্যাংকে থাকা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ারও বাজেয়াপ্ত করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ে নেতিবাচক বার্তা যাবে। ভবিষ্যতে তারা বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ার শঙ্কায় বাংলাদেশ থেকে বিনিয়োগ উঠিয়ে নিতে পারেন। অন্যদিকে বিনিয়োগের সবচেয়ে নিরাপদ খাত হিসেবে পরিচিত ব্যাংকের শেয়ার যখন সরকার বাজেয়াপ্ত করতে পারে, তখন পুরো পুঁজিবাজারের ৩২ লাখ বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ নিয়ে নতুন শঙ্কার জন্ম দেবে।
সরকারের উচিত হবে এ সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার নিরাপত্তা দেয়া। এ বিনিয়োগের বদলে নতুন ব্যাংকের শেয়ার বরাদ্দ করা। জনগণের দেয়া ৩০ হাজার কোটি টাকার করের অর্থে নতুন ব্যাংকের মালিকানায় শতভাগ সরকারি না করে বেসরকারি মালিকানা অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি মালিকানায় ব্যাংক চালু করা। এতে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি বার্তা যাবে যে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করলে তার নিরাপত্তা থাকে। এমন উদ্যোগ দেশিয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
কোন ব্যাংকে কত বিনিয়োগ
পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত শরিয়াভিত্তিক এক্সিম ব্যাংকের মোট শেয়ারের পরিমাণ হচ্ছে ১৪৪ কোটি ৭৫ লাখের বেশি। এসব শেয়ারের বিপরীতে পরিশোধিত মূলধন বা ব্যাংকটিতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ হচ্ছে ১ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাধারণ বিনিয়েগাকারীদের অংশ হচ্ছে ৬৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। উদ্যোক্তাদের হাতে অর্থাৎ যারা ব্যাংক পরিচালনায় সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের কাছে শেয়ার হচ্ছে মাত্র ৩২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ মোট টাকার মধ্যে মাত্র ৪৭০ কোটি টাকার জোগান দিয়েছেন উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা। বাকি ৯৭৭ কোটি টাকার জোগান দিয়েছে, পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিকদের বিনিয়োগ রয়েছে ২৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। আর বিদেশি বিনিয়োগকারী দশমিক ৫৫ শতাংশ বা ৭৯ লাখ ৬১ হাজার ৫৬৬টি।
একইভাবে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ হচ্ছে ১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। যার মধ্যে উদ্যোক্তারা দিয়েছেন মাত্র ১১ দশমিক ৬২ শতাংশ বা ১৩২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। বাকি ৮৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ শেয়ার বা ১ হাজার ৭৬ কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা। এ ব্যাংকের বিদেশি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ।
আর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন হচ্ছে ১ হাজার ২০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তাদের অংশ ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বা ৭১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। বছর দুয়েক আগেও তাদের শেয়ার ছিল ৩০ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ থেকেই তারা শেয়ার বিক্রি করা শুরু করে। নিয়ম অনুযায়ী, পরিচালকদের কাছে মোট ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকা বাধ্যতামূলক থাকলেও তারা শেয়ার বিক্রি করে চলে গেছে আওয়ামী লীগ সরকারের সহায়তায়। এ ব্যাংকের বাকি ১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা বা ৯৪ শতাংশ শেয়ারের মালিক হচ্ছেন পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা। এ ব্যাংকে বিদেশি বিনিয়োগ আছে শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ।
অন্যদিকে ইউনিয়ন ব্যাংকের মোট শেয়ারের বিপরীতে ১ হাজার ৩৬ কোটি টাকার মূলধনের মধ্যে ৫৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ শেয়ার বা ৫৬৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা দিয়েছেন পরিচালক ও উদ্যোক্তারা। বাকি অর্থ এসেছে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। এ ব্যাংকেও বিদেশি বিনিয়োগ আছে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।
আর গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৮৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকার মধ্যে উদ্যোক্তারা দিয়েছেন মাত্র ১৫২ কোটি টাকা। মোট শেয়ারের মাত্র ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশের মালিক হচ্ছে, উদ্যোক্তারা। বাকি ৮৩৫ কোটি টাকার পুরো অর্থ পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে।
আইনি পড়াশোনা নেই কারো
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনি অধিকার রাখেন একমাত্র শেয়ারধারকরা। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসির) আইন অনুযায়ী, উত্থান-পতন বা নীতিনির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে শেয়ারধারকদের মতামত নিতে হবে। এমনকি ব্যাংক যদি তার ব্যবসায়িক কোনো পরিকল্পনায় বদল আনতে চায়, নতুন বিনিয়োগ করতে চায় বা এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায়- যেখানে প্রতিষ্ঠানের অর্থের বড় ধরনের ব্যবহার করতে হবে, সেখানেও শেয়ারধারকদের অনুমতি নিতে হবে।
শুধু তাই নয়, প্রতি বছর ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষক কে হবে, সেই প্রতিষ্ঠানকে নিরীক্ষা বাবদ কত টাকা ফি দেয়া হবে, তাও সাধারণ শেয়ারধারকরা নির্ধারণ করে দেন। এজন্য বার্ষিক সাধারণ সভার পাশাপাশি বিশেষ সাধারণ সভা ডাকতে হয়। সেখানে অনুমোদন নেয়ার পরই তা বাস্তবায়ন করার সুযোগ থাকে। এভাবেই সুশাসন নিশ্চিত করার বিধান থাকায় সারা বিশ্বেই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা বেশি থাকে। সেই সুশাসনের ধারা বজায় রাখতে সব দেশের সব ব্যাংকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া বাধ্যতামূলক।
শুধু একটি দৃষ্টান্ত দিলেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক আইনের অনুসরণ করতে গিয়ে বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানের শেষে থাকা লিমিটেড কোম্পানি শব্দের বদলে পিএলসি (পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি) লেখার জন্য সরকার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে সব ব্যাংকের শেষে লিমিটেড শব্দ বাদ দিয়ে পিএলসি লেখার বাধ্যবাধকতা মানতে হয়। আইনি এই কাজটি করতেও ব্যাংকগুলোকে বিশেষ সাধারণ সভা (এজিএম) ডাকতে হয় শেয়ারধারকদের জন্য। সেই সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়। পুঁজিবাজারের শেয়ারধারকরা তাতে অনুমোদন দেয়ার পরই আইনি বিষয়টি বাস্তবায়ন শুরু করে ব্যাংকগুলো। মাত্র নামের শেষে একটি শব্দ পরিবর্তন করতে ব্যাংকগুলোর পরিচালক পর্ষদের পাস হওয়ার পর তার চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হয় শেয়ারহোল্ডার বা শেয়ারধারকদের কাছ থেকে।
সেখানে ব্যাংকের পুরো দায় অন্য ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে, সেখানে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করা দূরের কথা, বিজ্ঞপ্তি আকারে জানানোও হচ্ছে না। দেয়া হচ্ছে না কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য বা পিএসআই। অথচ তালিকাভুক্ত ব্যাংক হওয়ায় নীতিনির্ধারণী যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বিনিয়োগকারীদের জানাতে হয়।
অবসায়ন হচ্ছে না
আইন অনুযায়ী, ব্যাংক অবসায়ন হতে হলে প্রথমে সাধারণ সভা ডেকে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে। সেখানে কারণ বলা হবে কেন ব্যাংক অবসায়নে যাচ্ছে। যদি অবসায়নের কোনো বিকল্প থাকে, তাও আলোচিত হবে। অবসায়নে হওয়ার আগে সব শেয়ার পরিচালক বা উদ্যোক্তাদের কিনে নিতে হবে। এরপর আদালতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান অবসায়নে যেতে হবে। আর যদি তারল্য সংকট, লোকসানজনিত বা অন্য কোনো কারণে অবসায়ন হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের বিপরীতে সমপরিমাণ অর্থ দেয়ার বাধ্যকবাধকতা থাকে না। সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সব সম্পদ বিক্রি করে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ ও অন্যান্য দায়শোধ দেয়ার পর অবশিষ্ট অর্থ শেয়ারধারকরা পাবেন।
সরকার জানিয়েছে, ৫ ব্যাংক অবসায়নে যাচ্ছে না। অর্থাৎ আইন অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে তালিকাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হলে নতুন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার পাবেন বিনিয়োগকারীরা। কারণ পুরনো প্রতিষ্ঠানের দায় ও সম্পদ দুটিই নিচ্ছে নতুন প্রতিষ্ঠান।
এখানেও একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাঁচ ব্যাংক মিলে একটি ব্যাংক করা হচ্ছে। সেখানে পুরনো ব্যাংকের সম্পদ, জনবল, ঋণ, আমানত, জমি, ভবন, প্রযুক্তি ও সবচেয়ে বড় সম্পদ একটি বড় ব্যবসার নেটওয়ার্ক এবং গ্রাহক যাচ্ছে নতুন ব্যাংকে। শুধু নগদ অর্থ সংকট ছাড়া সবই থাকছে। যার প্রতিটিতে শেয়ারধারকদের মালিকানা রয়েছে। কিন্তু সেই মালিকানা অস্বীকার করে কাজ করছে সরকার। সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের নিরাপত্তা না দিয়ে, আইনি পড়াশোনা না করেই মন মর্জিমতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
আদালতে আটকে যেতে পারে
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার না দিলে বিষয়টি উচ্চ আদালতে যেতে পারে। ইতোমধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারধারকদের একটি অংশ উচ্চ আদালতে রিট দাখিল করেছে। আদালত অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। তার জবাব না দিতে পারলে এই ব্যাংকের মার্জার ঝুলে যেতে পারে। এভাবে সব ব্যাংকের শেয়ারধারকরা আদালতে গেলে ঝুলে যাবে মার্জার উদ্যোগ। শুধু তাই নয়, বিষয়টিতে ইতোমধ্যে আপত্তি জানিয়ে চিঠি দিয়েছে বিএসইসি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠানো সেই চিঠিতে ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর ৭৭ ধারা অনুযায়ী, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে বলেছে। বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে পুঁজিবাজার থেকে ব্যাংকগুলো ডিলিস্টেড বা তালিকাচ্যুত না করার পক্ষে বিএসইসি কর্মকর্তারা। এতে দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে নতুন করে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে।
নজর নেই অন্য ব্যাংকে
হুট করেই দেশের ১০টি ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক মার্জ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। এসব ব্যাংক মিলিয়ে নতুন একটি ব্যাংক করা হবে। যার প্রস্তাবিত নাম হচ্ছে ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক। এ ব্যাংকের পুরো মালিক হবে সরকার।
অথচ সুদি বা প্রচলিত ধারার প্রিমিয়ার ব্যাংক, মধুমতি, মিডল্যান্ড, যমুনা, ইউসিবি, পদ্মা, মার্কেন্টাইল, এনআরবি ব্যাংক, এবি ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংক মিলিয়ে অন্তত ২০টি ব্যাংকের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। তারল্য সংকটের কারণে এবারই প্রথম প্রিমিয়ার ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি।
রাজপথে প্রকাশ্যে গুলি চালানো আওয়ামী লীগ নেতা এইচ বি এম ইকবালের কব্জায় দীর্ঘ ২০ বছর ছিল ব্যাংকটি। বিপ্লবের পরে সরকার গঠন করার এক বছর শেষে ব্যাংকটিতে পর্ষদে পরিবর্তন আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখনো পলাতক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা তাপসের মালিকানার মধুমতি ব্যাংকের পর্ষদে কোনো পরিবর্তন আনেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই ২০ ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ইসলামী ধারার পাঁচ ব্যাংকের মতোই। কিন্তু সরকার এসব ব্যাংকের দুটি ছাড়া কোনোটির পর্ষদে বদল আনেনি এখনো।
জনগণের টাকায় কেন নতুন ব্যাংক
আইন অনুযায়ী, ব্যাংক ব্যবসা করতে না পারলে বা লোকসানে পরিণত হলে ব্যাংকের পরিচালকরা দায়ী থাকেন। তারা শেয়ারধারকদের কাছে যান সমাধান চাইতে। শেয়ারধারকরা সমাধান দিতে পারেন তাহলে প্রতিষ্ঠান চলতে থাকে। নইলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়। সেখানে রাষ্ট্রের কোনো অর্থ ব্যবহার করা হয় না।
তালিকাভুক্ত পাঁচ ব্যাংকই বেসরকারি খাতের। ব্যক্তি বিনিয়োগে গড়ে উঠেছে। এখন লুটপাটের কারণে তারা তারল্য সংকটে পড়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কয়েকটি উপায় আছে ব্যাংকগুলোর কাছে। প্রথমত, হয় ব্যাংকগুলো বিক্রি হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, নতুন বিনিয়োগ আনবে। তৃতীয়ত, দেউলিয়া ঘোষণা করবে বা অবসায়ন হয়ে বন্ধ হয়ে যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের লাইসেন্স বাতিল করে দিবে। এখানে নতুন করে কোনো অর্থ অপচয় বা বিনিয়োগ হবে না।
কিন্তু বেসরকারি এই ৫ ব্যাংক বাঁচাতে সরকার নতুন করে ৩০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। এই টাকার পুরোটাই জনগণের করের টাকায়। বেসরকারি লোকসানি খাতে সরকার কেন এই টাকা বিনিয়োগ করবে। এর দায়ভার কে নেবে, তার কোনো উত্তর সরকার দেয়নি। অথচ এসব ব্যাংকের লুটপাটে আওয়ামী লীগ সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় সহযোগিতা করেছে।
অর্থনীতিবিদ, বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ হচ্ছে সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করা। সেই মোতাবেক আইন তৈরি ও বাস্তবায়ন করা। এই পাঁচ ব্যাংকে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী আছে। বর্তমান সংকটে আইন অনুযায়ী সমাধান তাদের অধিকার। আওয়ামী লীগ সরকারের মতো যদি একতরফা সিদ্ধান্ত নেয় সরকার, তাহলে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন অঙ্কুরে মিলিয়ে যাবে। বিনিয়োগকারীরা যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানান, তাহলে বহির্বিশ্বে দেশের আর্থিক খাত নিয়ে হাসি-তামাশা তৈরি হবে। ভবিষ্যতেও ব্যাংক দখল করার নজির স্থাপন হয়ে যাবে দেশে।
সাধারণ মানুষের কল্যাণে শেয়ার দেয়ার পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নতুন ব্যাংকের পুরোটা বেসরকারি খাতেই ছেড়ে দেয়া উচিত। সেখানে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যাংকার পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে। সরকার চাইলে সেখানে মালিকানায় অংশ নিতে পারে। এখানেও সরকারি-বেসরকারি মালিকানায় ব্যাংকটি চলতে পারে। কারণ হচ্ছে, সরকারের কাজ ব্যবসা করা না। এজন্য সরকারি সব প্রতিষ্ঠানই এখনো লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি অংশীদারিত্ব থাকলে তারা অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাংকটিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারবে। নয়তো নতুন করে আরো ৩০ হাজার কোটি টাকার পুরোটাই লোকসানে চলে যাওয়ার শতভাগ সম্ভাবনা রয়ে যাবে।