সম্পাদকীয়

একসাথে পথচলাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য ও সাফল্য


৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:১৪

২০২৪-এর ৫ আগস্ট দেশের তরুণ জেন-জি শিক্ষার্থীরা একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা জাগিয়েছে। জাতির প্রত্যাশা, হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এবং তাদের দোসর ১৪ দল ও জাতীয় পার্টির ঠেকা দিয়ে টিকিয়ে রাখা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ধারা ফিরে আসবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে প্রতিহিংসা, সন্ত্রাস, হানাহানি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি বিদায় নেবে। প্রত্যাশা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জুলাই ঘোষণা এবং সনদে স্বাক্ষর চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতা, কর্মী, সমর্থক ও নাগরিক সমাজের কিছু সদস্য এখনো পুরোনো ধারা থেকে বের হতে পারেননি। তারা নিজেদের রাজনৈতিক দর্শন, কর্মসূচি ও ইতিবাচক ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং কাজের প্রচারের চেয়ে প্রতিপক্ষকে নিয়ে বেশি ব্যস্ত। কথায় আছে পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ অন্যের সমালোচনা করা এবং সবচেয়ে কঠিন নিজের ভুলগুলোর আত্মপর্যালোচনা করে তার সংশোধন। যারা এ কঠিন কাজটি করতে পারেন তাদের হাতে আসে সাফল্যের স্বর্ণদুয়ার খোলার আসল চাবি। এ সত্য অবশ্যই দেশের বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং আলেম ও ধর্মগুরু সবাই জানেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের অপকালচারের চর্চা, ফ্যাসিবাদের উসকানি ও প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে তারা অনেকে ভুলে গেছেন- অবস্থা দেখে আমাদের এমনটাই মনে হচ্ছে।
গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য ভিন্নমতের প্রতি সম্মান। ফ্যাসিস্ট ও নাৎসিরা এ কাজটি পারে না বলেই গণতান্ত্রিক সমাজে তারা নিষিদ্ধ। তারা গণতান্ত্রিক উদারতার অপব্যবহার করে। তাদের বিরোধিতা গঠনমূলক সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কুরুচিপূর্ণ বাক্যবাণ, মিথ্যা-অপপ্রচার প্রোপাগান্ডার সাথে সাথে আক্ষরিক অর্থেই তারা প্রতিপক্ষের গলাটিপে ধরে, নির্মূল করতে অন্যের মিছিল, মিটিংয়ে হামলা এবং হত্যা, খুন-গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ রাজনীতিতে আমদানি করে। বিরোধীদলে থাকলে সরকার ও রাষ্ট্রকে সহযোগিতার বদলে অস্থিতিশীল করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। সরকারে গেলে কায়েম করে মাফিয়াতন্ত্র। তাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হত্যাকারী এ ঘাতক কিটের স্থান পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে নেই। যারা ফ্যাসিস্ট ও নাৎসিদের মতো আচরণ করেন এবং তাদের পক্ষে সাফাই গান, তারাও নির্বাসিত হন। কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও জীবন রক্ষায় এর বিকল্প নেই।
দেশে জাতীয় নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। জুলাই-আগস্ট চেতনার পক্ষের সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের সম্ভাব্য নমিনির নাম ঘোষণা করে মাঠে জোর কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোও প্রার্থী বাছাই শুরু করেছে। কেন্দ্রের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তারা যার যার শক্তিমত্তা দেখাতে ব্যস্ত। তাদের অনেকে প্রতিপক্ষ দল; এমনকি নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধেও তৎপর। এ তৎপরতা শুধু বাক্যবাণে সীমাবদ্ধ থাকলে কথা ছিলো না, কোনো কোনো জায়গায় সত্যিকারের বাণে প্রতিপক্ষকে বিদ্ধ করা হচ্ছে। এ বছরের ৭ জুলাই মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যানুসারে, ‘২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে কমপক্ষে ৫২৯টি ‘রাজনৈতিক সহিংসতার’ ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৪ হাজার ১২৪ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণতা, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থাপনা দখলকেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সহিংসতার ৫২৯ ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৩০২ ঘটনায় আহত হয়েছেন ২ হাজার ৮৩৪ জন ও নিহত ৪৬ জন। এ সময়ের মধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ১০১টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫০২ জন ও নিহত ১৬ জন। এছাড়া বিএনপি-এনসিপির মধ্যে ১১ সংঘর্ষের ঘটনা আহত হয়েছেন ৭৯ জন এবং আওয়ামী লীগ-এনসিপির মধ্যে ১৮টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৫৪ জন ও নিহত ১ জন। আওয়ামী লীগ-জামায়াতের মধ্যে ৭টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৯ জন ও নিহত ১ জন, আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দলে ১৩টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৫৩ জন ও নিহত ৭ জন, এনসিপির অন্তর্কোন্দলে ১২টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৭ জন এবং ৪২টি ঘটনা ঘটেছে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে। নিহত ৭৯ জনের মধ্যে বিএনপির ৫৪ জন, আওয়ামী লীগের ১৭ জন, জামায়াতের ২ জন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ১ জন এবং ইউপিডিএফের ৩ জন। অপর ২ জনের রাজনৈতিক পরিচয় মেলেনি, যার মধ্যে ১ জন নারী রয়েছেন। ৫২৯ সহিংসতার ঘটনার ৪৪৫টিই ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ও বিএনপির সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের। এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ৭৬টি ঘটনায় ৫৭ জন নিহত হয়েছেন এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। এসকল হামলায় আওয়ামী লীগের ২০ জন, বিএনপির ২৯ জন, জামায়াতের ১ জন নারী সদস্যসহ ২ জন ও চরমপন্থী দলের ৪ জনসহ ৫৭ জন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ রিপোর্ট প্রকাশের পর চলে গেছে প্রায় চার মাস। এ সম্পাদকীয় নিবন্ধ যেদিন লেখা হচ্ছে, তার আগের দিনও বাগেরহাটে বিএনপির একজন কর্মী দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশ ঘটনাই ঘটছে আধিপত্য বিস্তারের কারণে, যা আসলে ফ্যাসিবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। এ অবস্থা থেকে মুক্তি ছাড়া আমরা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব না।
ভুলে গেলে চলবে না, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টেকসই করতেই হবে। কেন্দ্র থেকে নিয়ে তৃণমূল সর্বত্র রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্রের চর্চা বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী তিনি নিজ দলের হোক কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের, তাকে শত্রু বা প্রতিপক্ষ মনে করা যাবে না। প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে তার সাথে হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হবে। মনে রাখতে হবে- দুজনেরই লক্ষ্য দেশের উন্নয়ন ও জনসেবা, যা সরকার ও বিরোধীদল দুই পক্ষে থেকেই করা যায়। হার-জিত চিরদিন ছিলো এবং থাকবেই। একসাথে পথচলাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য ও সাফল্য। পরাজিত হওয়া মানে হারিয়ে যাওয়া নয়, বন্ধুকে এগিয়ে দিয়ে তার সাথে পথচলা। গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য ও সাফল্য এ সূত্রের মাঝেই লুকিয়ে আছে।