ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে রাজনীতি
৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৪২
জুলাই সনদ, গণভোট ও সংসদ নির্বাচন নিয়ে ঐকমত্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ও নানামুখী চ্যালেঞ্জ
॥ ফারাহ মাসুম ॥
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছিল, তার ঢেউ এখনো দেশের রাষ্ট্রকাঠামো, নীতি-অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে যাচ্ছে। সেই বিপ্লবের ধারাবাহিকতায়ই ২০২৫ সালে প্রণীত হয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’, যা নতুন প্রজাতন্ত্র গঠনের নীতিপত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আর এ সনদের বাস্তবায়ন, গণভোটের আয়োজন ও সংসদ নির্বাচন- সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
জুলাই সনদের অন্তর্নিহিত দর্শন : জুলাই সনদ মূলত একটি পুনর্গঠনের রূপরেখা- যার লক্ষ্য হলো স্বাধীন প্রশাসন, জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা। এতে তিনটি মূলনীতি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে- জনগণের সার্বভৌমত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন ও দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন এবং জাতীয় সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা করেছেন, ‘জুলাই সনদ কেবল একটি রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, এটি বাংলাদেশের নতুন সামাজিক চুক্তি।’
গণভোট: জনসমর্থনের পরীক্ষার ক্ষণ : জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং নির্বাচন কমিশনের আলোচনার পর ২০২৫ সালের শেষ ভাগে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। গণভোটের প্রশ্নটি হবে- ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এ উল্লিখিত নীতিমালা বাস্তবায়নের পক্ষে মত দিচ্ছেন?’ এই গণভোটকে দেখা হচ্ছে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাইলফলক হিসেবে। এর মাধ্যমে শুধু একটি নীতিপত্র নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো এককেন্দ্রিক দলীয় আধিপত্য থেকে মুক্ত এক প্রজাতান্ত্রিক ভারসাম্য জনমতের ভিত্তিতে বৈধতা পাবে।
সংসদ নির্বাচন ও সাংবিধানিক রূপান্তর : ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে দেশের প্রথম ‘পরিবর্তিত কাঠামোর নির্বাচন’ যেখানে জুলাই সনদের সংস্কারকল্পে প্রণীত নতুন নির্বাচন আইন, দলনিরপেক্ষ প্রশাসনিক কমিশন ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক জবাবদিহির বিধান কার্যকর থাকবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের লক্ষ্য হলো এমন একটি নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকেও নাগরিক, পেশাজীবী ও তরুণ নেতৃত্ব রাষ্ট্রনীতিতে অংশ নিতে পারে।
রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া : পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগপন্থী মহল এটিকে ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব ও জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর ‘অস্থিতিশীল পরীক্ষামূলক উদ্যোগ’ হিসেবে দেখছে। বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যধারার দলগুলো গণভোটকে জনগণের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ হিসেবে সমর্থন দিচ্ছে, তবে তারা সনদের কিছু ধারা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলো এটিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোর গুণগত পরিবর্তন হিসেবে পেতে চাইছে। বাম ও প্রগতিশীল সংগঠনগুলো মনে করে, সনদের বাস্তবায়ন নির্ভর করবে অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ ও করপোরেট আধিপত্য ভাঙার ওপর।
ভারত ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ : ভারতের কূটনৈতিক মহল জুলাই সনদ ও গণভোট প্রক্রিয়াকে ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রূপান্তর’ হিসেবে স্বীকার করলেও, তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সীমান্ত নিরাপত্তা প্রসঙ্গে উদ্বেগ জানিয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক সুশাসন ও গণতন্ত্রায়নের নতুন দিগন্ত হিসেবে বাংলাদেশের এ প্রক্রিয়াকে সমর্থন জানিয়েছে।
মূলত বাংলাদেশ এখন এক নতুন রাষ্ট্রদর্শনের পথে অগ্রসরমান, যেখানে জনগণের হাতে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি শুধু রাজনৈতিক ভাষণ নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক পরীক্ষার বাস্তব রূপ নিচ্ছে। জুলাই সনদ, গণভোট ও সংসদ নির্বাচন- এ ত্রিমাত্রিক প্রক্রিয়া সফল হলে, তা বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সূচনা হতে পারে।
স্বল্পমেয়াদি চ্যালেঞ্জ
জুলাই সনদ, গণভোট ও ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচন- এ তিনটি রাজনৈতিক উপাদান দেশে নানা ধরনের উত্তাপ সৃষ্টি করছে। আগামী ৬ থেকে ১২ মাসকে যদি ‘স্বল্পমেয়াদ’ ধরা হয়, তাহলে বাংলাদেশের সামনে বেশকিছু রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি জোরালোভাবে সামনে আছে।
স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিকাশ লাভ করতে পারে যদি গণভোট ও নির্বাচনী প্রণালীর স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক চাপ ও আঞ্চলিক সীমান্তঝুঁকি একসাথে জটিলতার মধ্যে পড়ে। সাইবার প্রোপাগান্ডা, তথ্যযুদ্ধ এবং স্থানীয় সংঘর্ষ-উদ্রেক- এ তিনটি নতুন ও দ্রুতগতির হুমকি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
ভোটগ্রহণ ও রাজনৈতিক মেরুকরণ
গণভোট ও পরে সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলের অবস্থান শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে ঝুঁকছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এবং বিভিন্ন নাগরিক মঞ্চ নিজ নিজ দলে জনগণের শক্তি মনোগ্রহণে উত্তেজনাপূর্ণ জনসভা ও কর্মসূচি বাড়াতে পারে। নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রতি প্রশ্ন ওঠা, নির্বাচন প্রস্তুতিতে অংশগ্রহণ না করা বা অংশগ্রহণে দ্বিধা- এসবই রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র করতে পারে। ফলাফল হিসেবে নির্বাচনী পরিবেশে বিক্ষোভ, বিরোধী মিছিল এবং কখনো কখনো কারফিউ-ঘোষণাসদৃশ পরিস্থিতি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্থিতিশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতা
অন্তর্বর্তী প্রশাসনের ওপর আর্থ-রাজনৈতিক চাপ ও জনগণের প্রত্যাশার ভার চাপলে সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে অভ্যন্তরীণ ফাটল সৃষ্টি হতে পারে। ক্ষমতার হস্তান্তরের রূপরেখা এবং সনদের নির্দিষ্ট ধারার বাস্তবায়ন যদি মাস্টারপ্ল্যান হিসেবে না দেখায়, তখন রাজনৈতিক জোটে বিভাজন, খণ্ডকালীন কর্মসংকোচ বা প্রশাসনিক পরিবর্তন ঘটে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমন ভয় আছে যে রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভেতরের স্থিতিশীলতা নড়বড়ে হবে, যা আবার বহিরাগত কূটনৈতিক চাপও বাড়াতে পারে।
সীমান্ত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি
মিয়ানমার; বিশেষত রাখাইন ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অস্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা ইস্যু ও পার্শ্ববর্তী সশস্ত্র সংঘাত সীমান্তে চাপ বাড়ায়। যদি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে, সে পরিস্থিতিতে সীমান্ত-নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে অনুপ্রবেশ, অস্ত্র পাচার বা সংঘাত ছড়াতে পারে। একই সঙ্গে ভারত, চীন ও মিয়ানমারের কূটনৈতিক-সামরিক গতি বাংলাদেশকে আঞ্চলিক কৌশলগত সংকটে ফেলতে পারে; অপ্রত্যাশিত সংকটপ্রবণ পরিস্থিতি এসে জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কঠোর পরীক্ষা নিতে বাধ্য করবে।
সাইবার, তথ্য এবং জনমত যুদ্ধ
সমসাময়িক সময়ে তথ্যচক্র বেশ দ্রুতগামী। গণভোট ও নির্বাচন কালখণ্ডে ভুয়া খবর, মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডা দ্রুত ছড়িয়ে জনমত প্রভাবিত করতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা (সাইবার-ইন্টেলিজেন্স, ডিজিটাল মিডিয়া-মনিটরিং) যদি প্রয়োজনীয়ভাবে শক্ত না করা যায়, রাজনৈতিক সহিংসতার সূচক থেকে অনলাইনে মশগুল বিভক্তিকরণ দ্রুত রিয়েল-ওয়ার্ল্ড সংঘাতে রূপ নিতে পারে। দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত তথ্যমূলক অপারেশনও রাজনৈতিক উত্তেজনাকে বাড়ায়; বিশেষত যখন নির্বাচন ফলাফল বা গণভোট ফল নিয়ে সন্দেহ ছড়ানো হয়।
আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর চাপ
গণআন্দোলন, বড় মিছিল বা ধীরে ধীরে সৃষ্ট গেরিলা-ধরনের স্থানীয় সংঘাত পুলিশ ও অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপ বাড়ায়। বাহিনীর পক্ষ থেকে অনিয়মিত বা অতিরিক্ত কড়াকড়ি নিলে তা জনগণের প্রতিক্রিয়া বাড়াতে পারে; অন্যদিকে অনুন্নত প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম পরিস্থিতিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঠেলে দিতে পারে। স্থানীয় প্রশাসনের দুর্বলতা থাকলে অপপ্রচারের সময়ে পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে।
অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ক্রস-ইফেক্ট
দ্রুতগতির মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা ঊর্ধ্বগতি বা বিদেশি বিনিয়োগ সংকোচ- এ অর্থনৈতিক ব্যাঘাত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াকে উৎসাহ দেয়। জনগণের জীবনযাত্রা খারাপ হলে রাজনৈতিক অসন্তোষ দ্রুত সড়ক, বাজার ও কর্মস্থলে আর্থসামাজিক প্রতিবাদে রূপ নেবে। অর্থনৈতিক চাপ সরকারকে কঠোর নীতির দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা রাজনৈতিক অংশীদার ও জনগণের মধ্যে বিভাজন বাড়াবে।
করণীয় কী হতে পারে
স্বচ্ছতা ও সমন্বয়: জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো মিলিত প্ল্যাটফর্মে পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে নির্বাচনী পরিকল্পনা ঘোষণা করুক। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার : বিজিবি-সেনা-পুলিশের সমন্বয় বৃদ্ধি, সীমান্ত স্থাপনা আধুনিকীকরণ ও ভিত্তি-তথ্য বিনিময় ত্বরান্বিত করা। মিয়ানমার সীমান্ত ইস্যুতে কূটনৈতিক প্রস্তুতি রাখুন।
সাইবার ও তথ্য নিরাপত্তা: একটি কেন্দ্রীয় সাইবার-বাস্তবতা টাস্কফোর্স গঠন করে ডিসইনফরমেশন মনিটরিং ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া সিস্টেম চালু করতে হবে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আমদানি-চাহিদা ম্যানেজমেন্ট জোরদার করে জনজীবনে আঘাত কমাতে হবে। বিশেষ প্যাকেজ দরিদ্র ও মাঝারি শ্রেণির জন্য রাখা জরুরি।
শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক উপায়: প্রধান রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজকে নিয়ে ‘পলিটিক্যাল রিকনসিলিয়েশন’ ফরম্যাট চালু করে সংলাপ অব্যাহত রাখা, যা সমস্যা দেখলে সেগুলো দ্রুত সমাধানের পথ বের করতে সাহায্য করবে।
স্বল্পমেয়াদে ঝুঁকি বাস্তব ও বহুমাত্রিক; কিন্তু সুসংহত পরিকল্পনা, সীমান্ত-সাইবার প্রস্তুতি, আর্থিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে এগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে এ মুহূর্তে নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের মাস্টারিতে।
কূটনৈতিক অংশীদারদের অবস্থান
নবগঠিত বা অন্তর্বর্তী সরকার ও চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে বাংলাদেশ এখন বর্ধিত কূটনৈতিক চাপ- যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ও মানবাধিকার- লেভারেজ ব্যবহার করে অর্থনৈতিক ও নীতিগত শর্ত রাখতে চায়; চীন ব্যাপক অবকাঠামো ও বিনিয়োগ দিয়ে ব্যাপক আর্থিক প্রভাব বাড়াচ্ছে; আর ভারত (ঐতিহ্যগত কাষ্ঠপেয়ারা) নিকটতা, নিরাপত্তা ও নদী-বাণিজ্যের ইস্যুতে সরাসরি কৌশলগত আগ্রহ নিচ্ছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুসারে এই তিন দিকেই ঢাকা ‘হেজিং’ করে; অর্থাৎ সুযোগ নিয়ে কিন্তু সার্বভৌম স্বার্থ বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র: কৌশল ও প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও বাণিজ্য-লেভারেজ সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে রফতানিতে ট্যারিফ, বাজারে প্রবেশ সুবিধা এবং সরকারি ক্রয়ের (যেমন বিমানের কেনা) মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক নিয়মকানুন নির্ধারণে গুরুত্ব দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য আলোচনা ও গম আমদানি চুক্তি ইন্টার-অ্যাকশন এই কৌশলের অংশ বলে রয়টার্সের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডেমোক্রেসি ও মানবাধিকার-শর্ত যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার সামনে থাকে। বিজনেস স্টান্ডার্ডের বিশ্লেষণ অনুসারে মার্কিন কূটনীতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সুশাসন, মানবাধিকার ও নির্বাচন-স্বচ্ছতার ওপর জোর দেয়, যা অন্তর্ভুক্তির আশ্বাস না থাকলে পরিচালনাগত বা কৌশলগত ফলাফল এনে দিতে পারে (ভিসা, সাহায্য, নিরাপত্তা অংশীদারিত্বে শর্ত)।
এর মধ্যে নতুন এক ধরন হলো – অর্থনৈতিক পুনর্নির্বাচন। মার্কিন চাপ ভারতের মতো নিরপেক্ষ নয়; এর বদলে যুক্তরাষ্ট্র উন্নত প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব অফার করে তাকে একটি গ্লোবাল বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশের মতো দেশে বেশ প্রবলভাবে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে ভালো সম্পর্ক শ্রমিক-রপ্তানিকারক খাতে রাজধানীর বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়; কিন্তু মার্কিন শর্তগুলো পদক্ষেপগুলোকে স্বদেশীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিতর্ক উৎপন্ন করে; বিশেষ করে যখন সেগুলো ভোট-প্রক্রিয়া বা বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার সাথে জড়ায়।
চীন: কৌশল ও প্রভাব
ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও বিনিয়োগ চীনা সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীন বিআরআই এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বন্দর বা পোর্ট উন্নয়ন (চট্টগ্রাম, মংলা ইত্যাদি) ও সরাসরি সরকারি-প্রকল্প অনুদানে জোর দিচ্ছে, যা বাংলাদেশে দ্রুত দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখায় এবং ‘দ্রুত ফল’ দিতে সক্ষম।
অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তা চীনা সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নেয়। ঋণ, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি-সহায়তার মাধ্যমে চীন দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নির্ভরতা তৈরি করতে পারে- কখনো কখনো এতেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত-খাতে চীনা ইন্টারেস্টের প্রতিফলন দেখা যায়।
চীনের রয়েছে বহুমাত্রিক কূটনীতি। চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষণ অনুসারে দেশটি সাধারণত ‘অন্তর্লঙ্ঘন নীতিতে’ (Non-interference) জোর দিয়ে থাকে। এ কারণে স্থানীয় সরকারগুলোর জন্য তা রাজনৈতিকভাবে কম সংবেদনশীল বিকল্প হিসেবে কাজ করে।
চীনের দ্রুত অবকাঠামো-ডেলিভারি রাজনৈতিক খাতে জনপ্রিয় কিন্তু লং-টার্ম ঋণ বা শর্ত নিয়ে অনেক সময় বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে; একই সাথে চীনের নিকটতা পরিমিতভাবে ভারতের উদ্বেগ বাড়ায় এবং রাজনীতিতে ‘বহুপাক্ষিক’ কৌশল জাগ্রত করে।
ভারত: কৌশল ও প্রভাব
টাইমস অব ইন্ডিয়ার বিশ্লেষণ অনুসারে, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘকালীন (বাণিজ্য, সীমান্ত, নদী) পানিবণ্টন (তিস্তা ব্রহ্মপূত্র) ও সীমান্ত (ভাইপাস, ট্রেড রুট) ইস্যু আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে ভারতকে সক্রিয় করে রাখে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বার্তা ও ভারতের আঞ্চলিক উদ্বেগ এ ব্যাকরণেই পড়ছে।
ভারত নিরাপত্তা ও সমাজগত ইস্যুকে সবসময় সামনে নিয়ে আসে। রোহিঙ্গা, পারস্পরিক অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা- এসব ইস্যুতে ভারত সরাসরি নজর রাখে এবং বাংলাদেশে যে কোনো বড় নীতিগত পরিবর্তন ভারতের কৌশলগত হুড জানার কারণ হতে পারে।
নরম শক্তি ও কৌশলগত সংযোগকে ভারত বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে সব সময় গুরুত্ব দেয়। দি একডেমিক এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারত উপকূলীয় প্রথা, বিদ্যুৎ ও বাণিজ্যিক সংযোগে লগ্নি বাড়াচ্ছে; একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্তরে ‘প্রভাবশালী’ ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা চালায়।
ভারতের রাজনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশে গত ২ দশকে বেশ প্রবল ছিল। ভারতের ঘনিষ্ঠতা কিছু ঘরানার রাজনীতিবিদ ও দলকে শক্তির সূত্র দেয়; একই সময়, ঢাকায় যে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে, তার প্রতি ভারতের সতর্ক দৃষ্টিপাত সিদ্ধান্তগুলোকে তাৎক্ষণিক কৌশলগত প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তিন শক্তির মাত্রিক সমন্বয়: ঢাকার কৌশল
চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষণ অনুসারে, বাংলাদেশ সফলভাবে তিনটি শক্তির সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে- চীনের সাথে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও ঋণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি, ভারতের সাথে ঐতিহাসিক ও আঞ্চলিক সংযোগ। চাথাম হাউসের বিশ্লেষণ আরও ইঙ্গিত করে যে ইদানীং ঢাকার বহিরাগত কৌশলগুলো আরও বহুমুখী হচ্ছে।
রাজনৈতিক নির্বাচন ও বৈদেশিক ফ্যাক্টর এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নির্বাচন-পরিকল্পনা ও মানবাধিকার ইস্যু প্রত্যেকেই বিদেশি কৌশলগত প্রতিক্রিয়া ড্রাইভ করে আর বিদেশি প্রভাব আবার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সহায়ক বা প্রতিবন্ধক দুভাবেই কাজ করে।
সম্ভাব্য ঝুঁকি ও করণীয়
বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো- ঋণনির্ভরতা (দীর্ঘমেয়াদি চীনা ঋণ), বাণিজ্য-শর্ত (মার্কিন ট্যারিফ/বাণিজ্য-শর্ত), আঞ্চলিক কোরস্পর্শ (ভারতীয় উদ্বেগ)। এগুলো বাংলাদেশের জাতীয় নীতিতে সীমাবদ্ধতা বা চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এক্ষেত্রে প্রথমত, বাংলাদেশ বৈচিত্র্যকর বহুমুখী কূটনীতি বজায় রাখতে পারে যাতে কোনো এক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়ানো সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, স্বচ্ছতা ও প্রকল্প-দায়িত্ব নিশ্চিত করা বিশেষ করে বড় অবকাঠামো-চুক্তিতে। তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আর্থিক ও কৌশলগত রিজার্ভ বাড়ানো; চতুর্থত, নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায়ে স্বদেশীয় আইন ও নির্বাচনী স্বচ্ছতা উন্নত করা- যাতে বৈদেশিক অংশীদারিত্বে রাজনৈতিক ব্যয় কমে।