পিআর পদ্ধতি : অন্তর্ভুক্তিমূলক ন্যায্য ও কার্যকর মাধ্যম


২ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৪৮

॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক বিষয়গুলোর একটি পিআর (PR) বা প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন সিস্টেম। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকে এই পদ্ধতিটি নিয়ে রাজনৈতিক, একাডেমিক ও সিভিল সোসাইটি মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই এটিকে গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির নতুন পথ হিসেবে দেখছেন। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণের মতামতের সঠিক প্রতিফলন অপরিহার্য। দেশে বর্তমানে প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতিতে অনেক সময় ভোটের পরিসংখ্যান এবং সংসদীয় আসনের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা যায়। সামান্য কিছু বেশি ভোট পেয়ে কোনো দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, আবার কাছাকাছি ভোট পেয়েও অন্য দল নামমাত্র আসন পায়। এই ব্যবস্থার একটি কার্যকর বিকল্প সমাধান হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি।
পিআর পদ্ধতি
প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন ধারণাটি ১৮৩০-এর দশকে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সমাজে ছোট দল ও সংখ্যালঘুদের পর্যাপ্ত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব না থাকায় তৎকালীন চলমান পদ্ধতির বিরুদ্ধে এক ধরনের আন্দোলনের মাধ্যমে উদ্ভব হয়। তবে ১৮৯৯ সালে প্রথমবারের মতো চজ পদ্ধতি চালু করে বেলজিয়াম। পরে এটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে যখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা ছিল জরুরি। উইকিপিডিয়ার সংজ্ঞা অনুযায়ী, “আনুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থা হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে ভোটারদের রায় প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক দলগুলোর ভোট প্রাপ্তির হার অনুযায়ী।” এর মূল উদ্দেশ্য হলো ভোটের অপচয় রোধ করা এবং সংসদে সবমতের মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
পিআর পদ্ধতির প্রধান বৈশিষ্ট্য: ভোটের হার অনুযায়ী আসন বণ্টন হয়, মাল্টি-মেম্বার কনস্টিটুয়েন্সি থাকে, দলভিত্তিক তালিকা ভোটাররা বেছে নেয়, ছোট দলগুলোও সুযোগ পায় সংসদে প্রবেশের, ভোটার ও প্রার্থীর সরাসরি সম্পর্ক তৈরির সুযোগ অনুপস্থিত, ফলে পেশিশক্তি প্রদর্শনের সুযোগও অনুপস্থিত।
পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া: পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রসিদ্ধ ৩টি প্রক্রিয়া রয়েছে-
১. বদ্ধ তালিকা পদ্ধতি (Closed List PR):  ভোটাররা শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। দলগুলো নির্বাচনের আগে তাদের প্রার্থীদের একটি তালিকা জমা দেয়। প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে তালিকার ক্রম অনুযায়ী প্রার্থীরা নির্বাচিত হন।
২. মুক্ত তালিকা পদ্ধতি (Open List PR) : ভোটাররা দলকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি পছন্দের প্রার্থীকেও বেছে নিতে পারেন। দলের প্রাপ্ত আসনের সাথে প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা বিবেচনা করে চূড়ান্ত বিজয়ী নির্ধারণ করা হয়।
৩. মিশ্র সদস্য আনুপাতিক পদ্ধতি (Mixed-Member Proportional – MMP): এই পদ্ধতিতে কিছু আসনে সরাসরি ঋচঞচ পদ্ধতিতে এবং বাকি আসনগুলো পিআর পদ্ধতির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। জার্মানি ও নিউজিল্যান্ডে এই মিশ্র ব্যবস্থা বেশ সফলভাবে কার্যকর রয়েছে। কোনো কোনো দেশে দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের প্রচলন রয়েছে। এক্ষেত্রে কোথাও এক কক্ষে সমানুপাতিক আবার অন্য কক্ষে আসনভিত্তিক নির্বাচন হয়।
পিআর পদ্ধতির বিশ্বজুড়ে প্রয়োগ ও ইতিহাস: তথ্যমতে ১৮৩০-এর দশকে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সমাজে আন্দোলনের মাধ্যমে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি ধারণার উদ্ভব হলেও ১৮৯৯ সালে বেলজিয়ামে সর্বপ্রথম সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিটি প্রবর্তিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের ১৭০টি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থার অর্ধেকের মতো রাষ্ট্রে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়। এর মধ্যে অন্যতম নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, ইসরাইল, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, নেপাল প্রভৃতি।
পিআর পদ্ধতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত:
পিআর পদ্ধতি বিষয়ে নির্বাচন বিশ্লেষক অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, বর্তমান পদ্ধতিতে ভোট হলে নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক কাজে লাগিয়ে জিতে সরকার গঠন করতে পারে। সেক্ষেত্রে অনেক সময় মেজরিটি ভোটারের মতের প্রতিফলন হয় না। আর আনুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতিতে ভোটের আগে প্রতিটি দল ক্রম ভিত্তিতে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল তার প্রাপ্ত ভোটের হার অনুসারে আসন সংখ্যা পাবে। তিনি আরো বলেন, এই ধরনের নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করতে যদি বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল ও জনমতের চাপ থাকে, তাহলে দুই একটি রাজনৈতিক দল না চাইলেও এই ব্যবস্থায় ভোট করা সম্ভব। (বিবিসি নিউজ বাংলা, ১৯ অক্টোবর ২০২৪)।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল সারা দেশে গড়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ভোট পেলেও সংসদে তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকে না আসনভিত্তিক একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না হওয়ার কারণে। পিআর পদ্ধতিতে ভোট হলে সে সব দলের সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে স্বৈরাচারী হওয়ার পথ ঠেকানোর একমাত্র রাস্তা হলো সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি। কারণ এই পদ্ধতিতে ভোট হলে কোনো দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম তার মতামত দিতে গিয়ে বলেন, বাংলাদেশে নতুন হলেও বিশ্বের ১৭০টি দেশের মধ্যে ৯১টি দেশে আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রচলিত। উন্নত দেশগুলোর সংস্থা অর্গানাইজেশন অব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশনভুক্ত(OEDC) ৩৬টি দেশের মধ্যে ২৫টি, অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ দেশই আনুপাতিক নির্বাচনব্যবস্থা অনুসরণ করে। নজরুল ইসলাম বলেন, দেশের বিদ্যমান নির্বাচন পদ্ধতি স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেয়। এক্ষেত্রে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর ও সর্বোত্তম পন্থা। (প্রথম আলো; অক্টোবর ১৫, ২০২৪)।
পিআর পদ্ধতি বিষয়ে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমাকে নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান করা হয়েছে। দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি। পিআর পদ্ধতি দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়ক হবে বলেই অনেকের ধারণা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার মতামতের ভিত্তিতে কমিশন থেকে সুপারিশ করা হবে।’ (কালের কণ্ঠ; সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৪)।
সম্প্রতি দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে একটি সেমিনার আয়োজন করে রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন এন্ড ডেমোক্রেসি। সেই সেমিনারে বিএনপি, জামায়াত, কমিউনিস্ট পার্টিসহ দেশের অনেকগুলো রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা উপস্থিত ছিলেন। এই সেমিনারে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় অংশ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে মত দেয়। ওই দলগুলোর মধ্যে অনেক দলই প্রধান উপদেষ্টার সাথে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সংলাপে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন ব্যবস্থা চালুরও দাবি জানিয়ে আসছিল। (বিবিসি নিউজ বাংলা, ১৯ অক্টোবর ২০২৪)।
প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ (FPTP) বা ‘সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠের’ পদ্ধতি প্রচলিত। এই পদ্ধতিতে একটি নির্বাচনী এলাকায় যে প্রার্থী সর্বাধিক ভোট পান, তিনিই নির্বাচিত হন, তিনি মোট ভোটের একটি ক্ষুদ্র অংশই পান। এর ফলে তৈরি হয় নানা অসামঞ্জস্য।
বাংলাদেশের নির্বাচনের উদাহরণ
২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন: বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ৪০.৮৬% ভোট পেয়ে ১৯৩টি আসন লাভ করে। অন্যদিকে প্রায় সমান ভোট (৪০.২২%) পেয়েও আওয়ামী লীগ মাত্র ৬২টি আসনে জয়ী হয়। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন: আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ৪৮.০৪% ভোট পেয়ে ২৩০টি আসন অর্জন করে। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ৩২.৫০% ভোট পেয়ে মাত্র ৩০টি আসন পায়। (আমাদের সময়; জুলাই ০১, ২০২৫)।
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, ঋচঞচ পদ্ধতিতে প্রাপ্ত ভোট এবং আসনের মধ্যে কোনো আনুপাতিক সামঞ্জস্য নেই। পিআর পদ্ধতি চালু থাকলে ভোটের এই বিশাল ব্যবধান দূর হয় এবং সংসদ আরও প্রতিনিধিত্বমূলক হয়।
পিআর পদ্ধতির সুবিধা
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নির্বাচন ব্যবস্থা একটি অংশগ্রহণমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করার অন্যতম উপায়। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ ইতোমধ্যে এই পদ্ধতি গ্রহণ করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশসহ অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোয়ও এ বিষয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে, যাতে সকল শ্রেণি, মত ও দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় এবং গণতন্ত্র হয় সত্যিকার অর্থেই জনগণের।
১. ভোটের প্রতিফলন নিশ্চিত হয় কোনো ভোট “নষ্ট” হয় না।
২. সংখ্যালঘু, ধর্মীয় বা আঞ্চলিক দলগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ে।
৩. ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমে, আলোচনা ও সমঝোতা ভিত্তিক শাসন হয়।
৪. রাজনৈতিক বৈচিত্র্য উঠে আসে, একক দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ কমে যায়।
৫. নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি নির্বাচন সহজ হয়।
পিআর পদ্ধতির চ্যালেঞ্জ
১. দুর্বল ও জটিল কোয়ালিশন সরকার গঠন হতে পারে।
২. নির্ণায়ক সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়।
৩. নেতা ও জনতার সরাসরি সম্পর্ক থাকে না, দলই সব সিদ্ধান্ত নেয়।
৪. রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
পিআর পদ্ধতি গ্রহণকারী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা
জার্মানিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জার্মানি “মিশ্র নির্বাচন পদ্ধতি” (মিশ্র চজ ও সরাসরি নির্বাচন) গ্রহণ করে। এই পদ্ধতির ফলে দেশটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করে এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ বা চরমপন্থার উত্থান কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়। এতে করে গণতন্ত্রের ভিত আরও মজবুত হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকায় আপারথেইড পরবর্তী যুগে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক কাঠামো গঠনের লক্ষ্যে পিআর পদ্ধতি গ্রহণ করে। এর ফলে বিভিন্ন বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মানুষ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব লাভ করে।
নেদারল্যান্ডস ও সুইডেন এই দুটি দেশেই পিআর পদ্ধতি বহুদিন ধরে কার্যকরভাবে চালু আছে। এর ফলে বহুদলীয় সরকার গঠন হয়, যারা সাধারণত সমাজকল্যাণমূলক নীতির দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। ফলে নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার উন্নত মান বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
ইসরাইলে পিআর পদ্ধতির ফলে প্রায়ই ছোট ছোট দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, ফলে সরকার গঠনে জোট নির্ভরতা বাড়ায়। এর ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইসরায়েলে পাঁচবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নেপালে পিআর ব্যবস্থা চালুর পর জাতিগত ও আঞ্চলিক ভিত্তিক ছোট ছোট দলগুলোর উত্থান ঘটে। যদিও এটি বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে, তবে এর ফলে প্রায়ই কোয়ালিশন জটিলতা, সরকার গঠনে দীর্ঘসূত্রতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। জাতিগত বিভাজন ও দলীয় পারস্পরিক দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বার বার বাধাগ্রস্ত করেছে।
প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থার সাথে পার্থক্য
বর্তমান বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচন ব্যবস্থায় ৩০০টি আসনে আলাদা আলাদা প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে রাজনৈতিক দলগুলো। ধরা যাক, বর্তমান পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচনে একটি আসনে মোট চারজন প্রার্থী চারটি দল থেকে নির্বাচন করছে। এই নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৮৫ শতাংশ। এর মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তিনজন প্রার্থীই ২০ শতাংশ করে ভোট পেল। আর চতুর্থ প্রার্থী পেল ২৫ শতাংশ ভোট।
বর্তমান পদ্ধতি অনুযায়ী চতুর্থ প্রার্থীই এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। আর ওই তিনটি দলের ৬০ শতাংশ ভোট তেমন কোনো কাজে আসছে না। একইভাবে সারা দেশের অন্তত ২৯০ আসনে যদি একই হারে ভোট পেয়ে চতুর্থ দলটির প্রার্থীরা জয়লাভ করে, তাহলে মাত্র ২৫ শতাংশ ভোট নিয়ে তারা সরকার গঠনসহ সংসদে একচ্ছত্রভাবে আধিপত্য করবে। অথচ বাকি তিন দল মিলে ৬০ শতাংশ ভোট পেলেও তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকলো না সংসদে। এতে সংসদে প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ থাকে না।
বাংলাদেশে পিআর পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আনুপাতিক পদ্ধতি চালু করার দাবি নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে পিআর পদ্ধতি চালুর দাবি উঠেছে। তথ্যমতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৭ সালে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করে নির্বাচন কমিশন।
সেই আলোচনায় জাতীয় পার্টি, সিপিবি, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলসহ (বাসদ) কিছু দল এই পদ্ধতিতে নির্বাচন করার প্রস্তাব দিয়েছিল। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে হাবিবুল আউয়াল কমিশনের ডাকা সংলাপেও জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল আনুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছিল। (প্রথম আলো; অক্টোবর ১৫, ২০২৪)।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নির্বাচন পদ্ধতি পরিবর্তন নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় অংশ অর্থাৎ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ইসলামী দল এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল আনুপাতিক হারে বা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচনের পক্ষে।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতি কেবল একটি বিকল্প নির্বাচন ব্যবস্থা নয়, এটি গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য এবং কার্যকর করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এর মাধ্যমে আইনসভায় জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়ে এবং উগ্রপন্থা হ্রাস পায়। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বিগত নির্বাচন গুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে আরও অর্থবহ করতে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন করার সময় এসেছে।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।