নারীবিদ্বেষী ট্যাগ ভেঙে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছাত্রী ভোট বেশি পাওয়ার নেপথ্যে
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:২৯
॥ এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী ॥
ডাকসু ও জাকসুতে শিবিরের বিজয় যেন জুলাই ২৪-এর শহীদ, আহত, পঙ্গু প্রতিটি সংগ্রামী যোদ্ধার নির্যাতিত-নিপীড়িত আত্মার বিজয়। জেন-জি জেনারেশনের বিজয়। এ বিজয় প্রমাণ করে জুলাইয়ে শহীদের রক্ত বৃথা যায়নি। শত শহীদের রক্ত এ জমিনকে উর্বর থেকে উর্বরতর করেছে। বিশেষ করে এ দুটি নির্বাচনে শিবিরের প্যানেলের প্রতি ছাত্রী সমাজের অকুণ্ঠ সমর্থন প্রমাণ করে ইসলামবিরোধী গোষ্ঠীর সমস্ত মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ও মিডিয়া ট্রায়েল সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এ বিজয়ের মাধ্যমে প্রচলিত ছাত্র রাজনীতির বিষাক্ত ছোবলমুক্ত হয়ে অস্ত্রবাজি, টেন্ডারবাজি, দুর্নীতি ও সকল ধরনের লেজুড়বৃত্তির শেকলমুক্ত হয়ে একটি বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার এক সম্ভাবনাময় সুযোগ এসেছে শিক্ষার্থীদের কাছে!
শিবিরের প্যানেলের এ বিজয় প্রমাণ করেছে ২৪-এর গণআন্দোলনের পর ইনটেলেকচুয়াল লিডারশিপ তৈরির কারখানা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী আজ মিথ্যা ও পুরনো ট্যাগের সংস্কৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
সাইকোলজির অসঙ্গতি তত্ত্বের বিশ্লেষণ
সাইকোলজির অসঙ্গতি তত্ত্ব অনুসারে নিষিদ্ধ কাজের প্রতি মানুষের এক ধরনের নম্র মনোভাব গড়ে তোলে। অর্থাৎ যে বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয় সে বিষয়ে মানুষকে বেশি কৌতূহলী করে তোলে, তা নিয়ে আরও ভাবতে বাধ্য করে। বড় ব্যাপারটা কী? কোনো কিছু নিষিদ্ধ করলে তা আরও প্রলুব্ধকর হয়ে উঠতে পারে- এ ধারণাটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক নীতির ওপর ভিত্তি করে।
নিষেধাজ্ঞার প্রতি সকল মানুষই একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কিছু ব্যক্তি নিষেধাজ্ঞার প্রতি আরও বেশি অনুগত হয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, আবার অন্যরা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারে। ব্যক্তিত্ব, লালন-পালন এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, যখন মানুষ এমন কিছু করতে নিষেধ করে যা তারা করতে চায়, তখন এটি জ্ঞানীয় অসঙ্গতি তৈরি করতে পারে। এই অস্বস্তি দূর করার জন্য, তারা হয়, আচরণের প্রতি তাদের মনোভাব পরিবর্তন করতে পারে অথবা এর প্রতি তাদের আকাক্সক্ষা বাড়িয়ে তুলতে পারে। যদিও এটি সর্বজনীনভাবে সত্য নয়।
যুগে যুগে ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছে
ইসলামের দাওয়াতের প্রাথমিক সময়ে মক্কার কাফের সম্প্রদায়ের নেতারা রাসূল সা.-এর দাওয়াতে সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া লক্ষ করে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা রাসূল সা.-এর ওপর অন্যায় নিষেধাক্ষা জারি করে, মিথ্যা অপবাদে অভিষিক্ত করে। নানা ধরনের নির্যাতন ও উপহাস করার পথ বেছে নেয়। তারা তাঁকে পাগল, জাদুকর, কবি বিভিন্ন নামে মানুষকে দাওয়াত থেকে ও তাঁর সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখার কূটকৌশল অবলম্বন করেছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের সকল অপকৌশলকে নস্যাৎ করে দেন। রাসূল সা.-এর জন্য তাদের সকল অপকৌশল হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। তাগুতের সকল অপপ্রচার মিথ্যা প্রমাণ করে মানুষ তার প্রতি আরো বেশি আকৃষ্ট হয়েছে। কথা শোনার জন্য কৌতূহলী হয়ে উঠেছিল। রাতের অন্ধকারে চুপি চুপি তাঁর সাথে দেখা করে, সত্যের অনির্বাণ শিখায় আলোকিত ও তাঁর হাতে বাইয়্যাতবদ্ধ হয়েছিল। অতঃপর স্ব-স্ব গোত্রকেও আলোকিত করেছিল। এভাবেই সকল বাধা মোকাবিলা করে ইসলামের আলো দ্রুত চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। মহান আল্লাহ বলেন, আমি আমার নূরকে প্রজ্জ্বলিত করবোই, সেটা কাফেরদের কাছে যতই অসহিষ্ণু হোক না কেন।
শিক্ষার্থীদের কাছে আস্থাশীল হিসেবে ছাত্রশিবির
ফ্যাসিবাদের পতন ও ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে থাকে। অনেক ষড়যন্ত্র আর নাটকীয়তার পর অবশেষে ডাকসু ও জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। সর্বপ্রথম ডাকসু ও তার দুদিন পর জাকসুর নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের ভূমিধস বিজয় সংঘটিত হয়, যা পুরো জাতিকে একদিকে যেমন করেছে হতবাক; অপরদিকে করেছে আশান্বিত। দীর্ঘদিন পর ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের সরব অংশগ্রহণ শিক্ষাঙ্গনে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। ছাত্রশিবির-সমর্থিত এ প্যানেলকে বিজয়ী করে বর্তমান প্রজন্ম প্রমাণ করেছে তারা আর শিক্ষাঙ্গনে কোনো রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির চর্চা পছন্দ করে না। তারা নিরাপদ শিক্ষাবান্ধব একটি শিক্ষাঙ্গন, স্বচ্ছ নির্বাচন, সহিংসতামুক্ত পরিবেশ ও মেধাভিত্তিক সুস্থ রাজনীতি চর্চার অগ্রগতি চায়। ছাত্রশিবির তাদের কর্মসূচি ও নির্বাচনী আচরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এ আকাক্সক্ষাকে ধারণ করেছে। ফলে ভোটাররা অন্যদের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে ছাত্রশিবিরকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
টাইমলি প্ল্যানিং, কন্সট্রাক্টিভ এজেন্ডা এবং প্রোপার ইমপ্লিমেন্টেশন স্ট্র্যাটিজি তাদেরকে শিক্ষার্থীদের কাছে আস্থাশীল হতে সহায়তা করেছে।
ডাকসু ও জাকসুতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের জয় শুধু একটি সংগঠনের নয়
ডাকসু ও জাকসুতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের জয় শুধু একটি সংগঠনের নয়, এটি ছাত্ররাজনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত। শিক্ষার্থীরা দেখিয়ে দিয়েছেন, তারা সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব ও অপসংস্কৃতির রাজনীতির বদলে শিক্ষা এ শিক্ষার্থীবান্ধব এমন নেতৃত্ব চায়, যারা শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যারিয়ারবান্ধব হবে। তাদের ভবিষ্যৎ গড়তে সৎ, যোগ্য ও জবাবদিহিমূলক দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে।
ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভূমিধস বিজয় ছাত্রসমাজের সে আস্থারই বাস্তব প্রতিফলন। তাদের শিক্ষার্থীবান্ধব ও নারীবান্ধব কর্মসূচি, সুসংগঠিত কর্মতৎপরতা, ছাত্রদের মৌলিক সমস্যার সমাধানে তৎপর, পরিশ্রম, সময় ব্যবহারের দক্ষতা ও শিক্ষার্থীদের আকাক্সক্ষা ধারণের ফলেই এ জয় সম্ভব হয়েছে। তাদের এ সাফল্য ছাত্ররাজনীতিতে নতুন এক দিগন্তের সূচনা করবে বলে দেশবাসীর প্রত্যাশা।
প্রথম আলোর বিশ্লেষণে ছাত্রশিবিরের জয়ের ৩৬ কারণ
ডাকসুতে ছাত্রশিবির প্যানেল জয়ী হবার ক্ষেত্রে কতগুলো কারণ বিশ্লেষণ করেছে। সেগুলো হচ্ছে- ১. প্রার্থীদের ক্লিন ইমেইজ। ২. সুসংগঠিত দলীয় ব্যবস্থাপনা। ৩. শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি। ৪. আকর্ষণীয় প্রচার ও প্রচারণা। ৫. ক্যাডারভিত্তিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য। ৬. অর্গানাইজড প্রিপারেশন। ৭. জুলাই অভ্যুত্থানের নেতাদের কাজে লাগানো। ৮. জনসংযোগ। ৯. বছরব্যাপী প্রস্তুতি। ১০. ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠন। ১১. নির্যাতিতদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন। ১২. ডেডিকেটেড প্রার্থী। ১৩. সক্রিয় ক্যাম্পেইন। ১৪. ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন। ১৫. শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থান। ১৬. কর্মীদের মাঝে One to One যোগাযোগ। ১৭. দক্ষ ও কার্যকর সাংগঠনিক দক্ষতা, যোগাযোগ ও কর্মপন্থা। ১৮. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ১৯. সামাজিক আন্দোলন। ২০. Academic Career এ ঈর্ষণীয় সাফল্য। ২১. ভালো আচরণ। ২২. চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ কম। ২৩. শিক্ষার্থীদের মাঝে পজিটিভ ইমেইজ। ২৪. Career Oriented কর্মকাণ্ড। ২৫. ফাউ খাওয়া, বাকীতে খাওয়া, মারামারি, গেস্টরুম কালচার ও টর্চার সেলকে ঘৃণা করা। ২৬. Chain Up সাংগঠনিক প্রাকটিস। ২৭. শিক্ষার্থীদের আর্থিক, পড়ালেখা ও কোচিং এ সহায়তা। ২৮. দেশপ্রেম ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রচারণায় গ্রহণযোগ্যতা। ২৯. Cyber ও সোস্যাল টিমের সক্রিয়তা। ৩০. প্রত্যেক সদস্যের অনলাইন ক্যাম্পেইন। ৩১. ইসলামী আদর্শ ও সংস্কৃতিকে অনন্য উচ্চতায় উপস্থাপন। ৩২. অন্য আদর্শিক সংগঠনগুলো কার্যকর না থাকা। ৩৩. অন্য প্রার্থীদের ইশতেহার শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়া। ৩৪. অন্যদলগুলো সময় কম পাওয়া। ৩৫. নারীদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা। ৩৬. অনুকূল পরিবেশ।
বিজয়ে নারীদের ভোট ব্যাঙ্ক ছিল অন্যতম কারণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বড় বিজয়ের পেছনে নারীদের ভোটের বড় ভূমিকা ছিল। যে কেন্দ্রগুলোয় নারীরা ভোট দিয়েছেন, সেগুলোয়ও ছাত্রশিবিরের প্রার্থীরা প্রচুর ভোট পেয়েছেন। অনেকেই বলছেন, ছাত্রশিবিরের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অন্য প্রার্থীরা নেতিবাচক প্রচার চালিয়েছেন। এটিকে নারীরা সহজভাবে নেননি। নেতিবাচক প্রচারণাই তাদের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে।
গত ২৬ আগস্ট প্রচারণার প্রথম দিনেই ছাত্রশিবিরের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়। বিকৃত করা হয় প্যানেলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য প্রার্থী সাবিকুন্নাহার তামান্নার ছবি। সেদিন নিজের ফেসবুক আইডিতে ভাঙচুরের ছবি শেয়ার করে তামান্না লেখেন, ‘স্বপ্নের ক্যাম্পাস গড়ার পথযাত্রী, আমরা থামব না।’ তাঁর ছবি বিকৃত করাকে নারীর পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতার প্রতি বিদ্বেষী মনোভাবের প্রকাশ বলে মন্তব্য করেছে অনেক শিক্ষার্থী।
ছাত্রশিবির প্যানেলের প্রাপ্ত ভোটের সাথে অন্যান্য প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান
বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ভোট দেয় রোকেয়া হলের ছাত্রীরা। এই কেন্দ্রে ছাত্রশিবিরের ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম পেয়েছেন এক হাজার ২৭০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী উমামা ফাতেমা পেয়েছেন ৫৪৭ ভোট। ছাত্রদলের আবিদুল ইসলাম খান পেয়েছেন ৪২৩ ভোট। জিএস পদে ছাত্রশিবিরের প্রার্থী এস এম ফরহাদ পান ৯৬৪ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিরোধ পর্ষদ প্যানেলের মেঘমল্লার বসু পান ৫০৭ ভোট। ছাত্রদলের প্রার্থী শেখ তানভীর বারী হামিম পেয়েছেন ৪০২ ভোট। অন্য কেন্দ্রগুলোয়ও অনেকটা এমন চিত্রই দেখা যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে ছাত্রশিবির এবং ছাত্রদল প্রচার সভা করেছে। ছাত্রদলের সভায় ছাত্রশিবিরকে নারীবিদ্বেষী বলে বক্তব্য দেয়। যা নিয়ে সাধারণ ছাত্রীসমাজে বিরূপ প্রভাব পড়ে। ছাত্রীরা ছাত্রশিবিরের প্রোগ্রামে এসব বিষয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন করে, ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট জবাব দেয়া হয়। ছাত্রশিবিরের বক্তব্যে মেয়েরা সন্তুষ্ট হয়েছে। ছাত্রশিবির তার প্র্যাক্টিকেল কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের মধ্যে একটা আস্থার জায়গা তৈরি করতে পেরেছে। মেয়েদের বাকি ৪টি হলেও এভাবেই তারা আস্থা তৈরি করতে পেরেছিল।
হিজাবফোবিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ব্যালটের মাধ্যমে। সাবিকুন নাহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পর্দানশীন ছাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে হিজাব ও নিকাবের ব্যাপারে অনেক বঞ্চনার শিকার হয়েছে ছাত্রীরা। ফ্যাসিবাদী শিক্ষক, প্রশাসন সকল পর্যায়ে তাদের ভূমিকা ছিল ধর্মের বিরুদ্ধে, পর্দার বিরুদ্ধে। ইসলামবিদ্বেষী এ চিত্র আমরা দেখতে পেয়েছি সাবিকুন্নাহার তামান্নার ছবি বিকৃত করার মাধ্যমে। গত ২৬ আগস্ট প্রচারণার শুরুর দিন ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের একটি ব্যানার ভেঙে ফেলে একদল ছাত্র। ঘটনাটি ঘটে ঢাবির চারুকলা অনুষদ এলাকায়। কিছুক্ষণ পর আরেকটি ব্যানারে ছাত্রী সংস্থার সভাপতি সাবিকুন্নাহার তামান্নার হিজাব পরা ছবি বিকৃত করে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ফেলে রাখা হয়। মুহূর্তেই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নিন্দার ঝড় ওঠে। যা তাদের প্রতি সাধারণ ছাত্রীদের সহানুভূতিশীল করতে ভূমিকা রাখে।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ছাত্রশিবির ছাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এছাড়া নারীর প্রতি সম্মান, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সততা ও নৈতিকতা ছাত্রীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছে। এ কারণে তারা হয়তো অন্য প্যানেলের চাইতে ছাত্রশিবিরের প্যানেলকেই বেশি যোগ্য মনে করেছে। তাদের প্যানেলে যোগ্য এ মেধাবী নেতৃত্ব সিলেকশনও একটি বড় ফ্যাক্টর ছিল। এছাড়া ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন ফোরামে ছাত্রীদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, ক্যাম্পাস বান্ধব পরিবেশ তৈরীতে ছাত্রশিবিরের বিশেষ বিশেষ কার্যক্রমগুলোও ছাত্রীদের আকৃষ্ট করেছে।
তাছাড়া বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরসমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের চার নারী প্রার্থীকে বিভিন্ন পদে দাঁড় করানোও একটি সুন্দর কৌশল ছিল, তারা কেউ ছিল নেকাব পরিহিত, কেউ মাথায় কাপড় পরিহিত আবার কেউ সাধারণ পোশাকের, যা সকল ছাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব প্রমাণ করেছে যে, ছাত্রশিবির শুধু ইসলামপন্থী নয়, ক্যাম্পাসে সকল ছাত্র-ছাত্রীর প্রতিনিধিত্ব করে এই প্যানেল। যা তাদের বিপুল ভোটে বিজয় অর্জন নিশ্চিত করেছে। এ প্যানেলে ৪ নারীর বিজয় প্রমাণ করেছে, নারীর অগ্রগতিতে পর্দা কোনো বাধা নয়, বরং নিরাপত্তা ও মর্যাদায় সহায়ক।
কবি সুফিয়া কামাল হলের জান্নাত তিথি বলেন, ‘আমরা ছাত্রশিবির সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করতাম। কিন্তু ৫ আগস্টের পর ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে অনেকগুলো আয়োজন করছে। তাদের ব্যবহার আর আচার-আচরণ অন্য সবার থেকে আলাদা। নারীবিদ্বেষী আচরণ তারা করেনি।’
বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের শিক্ষার্থী তানজিলা বলেন, প্রচারণায় ইসলামী ছাত্রী সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সংগঠনটির সদস্যরা ধর্মীয় বৈঠকে ছাত্রীদের কাছে কৌশলে ভোট চেয়েছেন। এটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
নারী শিক্ষার্থীদের নিজেদের পক্ষে আনার কৌশল ছাত্রশিবিরের ভূমিধস জয়ে বড় ভূমিকা রাখে। নারী ভোটারদের বড় অংশ ছাত্রশিবিরপন্থি প্যানেলকে সমর্থন করেছেন। একাধিক নারী শিক্ষার্থী বলেন, ছাত্রশিবিরের রাজনীতি পছন্দ না করলেও প্যানেলের প্রার্থীদের তারা বিশ্বাস করেন। বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল ও শামসুন্নাহার হলের শিক্ষার্থীরা ছাত্রশিবিরকে ভিন্ন রকম চোখে দেখছেন। বিশেষত ছাত্রীদের মতামত হলো, মাদারপার্টির আজ্ঞাবহ দলকে তারা মোটেই গ্রাহ্য করবেন না। ছাত্রীরা অনেক বেশি প্রভাবিত হয়েছেন ২০০২ সালের শামসুন্নাহার হলে ছাত্রদলের সংঘটিত হামলার ঘটনায়।
এছাড়া প্রচারণার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় ৬৯৪ বার হত্যা, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নমূলক মন্তব্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন ফাতেমা তাসনিম জুমা। এত বাধা ও প্রতিকূলতার বিষয়টি সামনে আসলে নারী ভোটাররা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হন বলে কেউ কেউ মনে করেন।
শিক্ষার্থীদের বিরাট অংশ মনে করেন, ভিপি পদে বিজয়ী সাদিক কায়েমের গ্রহণযোগ্যতা বড় ভূমিকা রেখেছে। জুলাই আন্দোলনের পর থেকে তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে আত্মপ্রচারহীন একজন ভদ্র, নির্লিপ্ত ও বিতর্কমুক্ত চরিত্র হিসেবে পরিচিত হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে তীক্ষè এবং ব্যক্তিগত সততা থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা তাকে ‘রাজনৈতিক নেতা’ নয়, বরং ‘নিজেদের মতো একজন ছাত্র-নেতা’ হিসেবে দেখেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাদিকের হাসিখুশি ছবি ও আন্তরিক ভঙ্গি ভোটারদের বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছে।
ছাত্রশিবির তার সাংগঠনিক শক্তি কাজে লাগিয়েছে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে। ছাত্রশিবির দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসে প্রায় নিষিদ্ধ থাকার কারণে ভেতরে ভেতরে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে। তাছাড়া ছাত্রশিবির প্রতিবছর তাদের নিয়মিত শিক্ষার্থীবান্ধব কাজ যেমন- কৃতী ছাত্র-ছাত্রী সম্বর্ধনা, মেডিকেল, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বিভিন্ন কোচিং পরিচালনা করে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। এর সূত্র ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভর্তির আগে থেকেই হয়ে থাকে। এটিও ছাত্রশিবিরের সুবিধা পাওয়ার বড় একটি কারণ।
রাসূল সা.-এর অন্যতম একটি হাদীস হচ্ছে- রাসূল সা. হযরত মুয়াজ রা.-কে ইয়েমেন সফরের সময় সতর্ক করেছিলেন এই বলে যে, ‘কোনো বিষয় সহজ কর, কঠিন করো না, আশাদীপ্ত কর, বিতশ্রদ্ধ। করো না।’
ছাত্রশিবির নির্বাচনে এই পলিসি অবলম্বন করেছিল। তাদের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল।
অবাক হবার বিষয় হচ্ছে ছাত্রশিবির প্যানেল থেকে নির্বাচিত চাকমা সম্প্রদায়ের সর্ব মিত্রকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছে- আপনি তো বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের, আপনি ছাত্রশিবির প্যানেল থেকে কীভাবে দাঁড়ালেন? উত্তরে সে বলেছে, আমি ছাত্রশিবির করি না। কিন্তু আমি ওদের সম্পর্কে অনেক খারাপ কিছু শুনেছি। তাই ভেতরে থেকে দেখতে চাই, আসলেই এরা কেমন। যেটা সে বলেছে, সেটা হচ্ছে- ‘আমি এক্সপ্লোর করতে চাই।’ ওদের সাথে প্রাথমিকভাবে কথা বলে আমার ভালো লেগেছে। এবার দেখি- সত্যি সত্যিই এরা ভালো কিনা। আবার জুমা নামের যে মেয়েটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক হয়েছে। সে ছাত্রী সংস্থার মতো হিজাব পরে না, কিন্তু ছাত্রশিবির প্যানেল থেকে দাঁড়িয়েছে এবং জয়ী হয়েছে। এটা ছাত্রশিবিরের একটা বড় কৌশল ছিল সবার ভোট কাছে টানার।
সর্ব মিত্র চাকমা বলেছে- আমার সাথে সাদিক ভাই এবং ছাত্রশিবিরের ছয় ঘণ্টা বৈঠক হয়েছে। সেখানে পরিষ্কার করে বলেছি, ‘আমি কোনো রকম দলীয় প্রভাব ছাড়া কাজ করতে পারবো তো? সমালোচনা করতে পারবো তো? এর নিশ্চয়তা পেয়েই আমি এই প্যানেল থেকে নির্বাচন করেছি।’ আমরা যদি দেখি, প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোয় কেউ যদি নিজ দলের সমালোচনা করে, তাহলে দলে তাদের পরিণতি কী হতে পারে? আমাদের বুঝতে হবে যে, বর্তমান জেন-জি জেনারেশন কোনোদিন দলকানা বা কোনো দলের দাস হয়ে থাকতে চায় না। ডাকসু ও জাকসুতে ছাত্রশিবিরের ভূমিধস বিজয় শুধু নারীদের জন্য নয়, নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।
লেখক: নারী অধিকার কর্মী।