জীবন গড়তে পড়তে হবে


২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:২৪

॥ মুহাম্মদ ইমরান সোহেল ॥
সিরাত কী? সিরাত বলতে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর জীবনীকে বোঝায়। সিরাত হলো প্রিয়নবীর জীবন বা জীবনী, তাঁর জন্ম, তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবনের বিভিন্ন ঘটনা, আচার-আচরণ, বৈশিষ্ট্য; এককথায় তাঁর যাপিত জীবনের আদর্শ। আধুনিক ব্যবহারে যাকে জীবনবৃত্তান্ত বলা হয়।
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব হযরত মুহাম্মদ সা.। তিনিই আমাদের আদর্শ। প্রতিটি মুমিনের ব্যক্তি জীবনে, পারিবারিক জীবনে, সামাজিক জীবনে; সর্বোপরি জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সিরাতে-নবী করিম সা. এক আলোকিত, সমুজ্জ্বল, পথনির্দেশক। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র আলোকিত করতে সিরাতে নবী করিম সা.-এর অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। সব দেশের সকল ভাষার সর্বস্তরের মুমিনের এই সিরাত অধ্যয়ন করা অপরিহার্য। কারণ সিরাতে নববীতে প্রত্যেক মুমিনের জীবন ব্যবস্থার সম্পূর্ণ এক রূপরেখা ও প্রয়োজনীয় সকল দিকনির্দেশনা এবং সকল সমস্যার সঠিক ও বাস্তবমুখী সমাধান রয়েছে। আর সিরাতের পাতায় পাতায় এর জীবন্ত উদাহরণও রয়েছে। আর কোনো সন্দেহ নেই যে, সিরাতে নবী সা. আমাদের আখলাক, আফকারে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি কাজে, মানুষের সঙ্গে প্রতিটি আচরণে-উচ্চারণে মহত্ত অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জ¦লজ্যান্ত উদাহরণ ও আমাদের জীবনে বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় সহযোগী। কারণ কুরআনের পর সিরাতুন্নবী সা.-ই মানবতা, সভ্যতা, সুস্থ সংস্কৃতির বাস্তব নমুনা ও চিত্র রয়েছে, যা থেকে আমাদের ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে জাতীয় জীবনের সকল বিষয়ে দিকনির্দেশনা রয়েছে। সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্র ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থা; এককথায় মুমিনের জীবনে দুনিয়াবি যত বিষয় ও জটিলতা রয়েছে, তার সবকিছুরই সর্বোত্তম সমাধান এবং সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কুরআনের পর রয়েছে সিরাতুন্নবী সা.। কিন্তু দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা এই যে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ও পাঠ্যসূচিতে সিরাতুন্নবী সা.সহ আরো সকল ইসলামী শিক্ষার বিষয়বস্তুগুলো অত্যন্ত অবহেলা ও গুরুত্বহীনতার শিকার। অথচ সায়েন্স-কমার্স-আর্টস্ নিয়ে পড়তে পড়তে রীতিমতো মুখে ফেনা উঠে যায় আর মস্তিষ্কে বলক উঠতে শুরু করে। কোনো সন্দেহ নেই যে, এ অবহেলা যা এক পর্যায়ে গিয়ে অবজ্ঞায় পরিণত হয়, তার সৃষ্টি হয় প্রয়োজনীয়তার অনুভূতির অভাবের কারণে। সুতরাং এ অনুভূতির উৎসটা খুঁজে বের করে সেটাকে নির্মূল করে সুস্থ চিন্তা এবং ধর্মীয় সঠিক অনুভূতিগুলো এমনভাবে গেঁথে ফেলা- যেন কখনো ঐসব চিন্তা-চেতনার আড়ালে এগুলো প্রচ্ছন্ন-ঝাপসা না হয়ে যায়। আর একটু চিন্তা করলেই কিন্তু আমরা বুঝতে পারবো যে, আমাদের মুমিন-মুসলমানদের শিষ্টাচার শিক্ষা ও ধর্মীয় জীবন ব্যবস্থার প্রধান উৎস কিন্তু কুরআন। এরপর বিরাট একটা অংশ জুড়ে রয়েছে হাদীস ও সুন্নাহ তথা সিরাতে নববীর ভূমিকা। আর একজন প্রকৃত মুমিনের জীবনে সিরাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
আর সিরাত অধ্যয়ন তো প্রত্যেক মুমিনের ঈমানী ও নৈতিক দায়িত্ব। অথচ এ বিষয়ে আমাদের গুরুত্বহীনতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আমরা এ শিক্ষাগুলোর প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করছি না। যার ফলে আমাদের মুসলিম সমাজের জীবনাচার, সভ্যতা-সংস্কৃতি পশ্চিমাদের থেকে ধার করে নিতে হচ্ছে আর আমরা ঐ সভ্যতাকেই সবচেয়ে উন্নত সভ্যতা মনে করি। আর সিরাত অধ্যয়নের ক্ষেত্রে এ মর্মান্তিক অবহেলার কুফল আমাদের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রকাশ পাচ্ছে।আর বর্তমানে মুসলমানদের দুনিয়াবি যত সমস্যা, তার পেছনে অনেক বড় একটা কারণ হচ্ছে সিরাতে নববী অধ্যয়ন এবং তা বাস্তব জীবনে অনুকরণের চেষ্টা পরিহার করা। এ কারণেই আমরা ধীরে ধীরে আমাদের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আমাদের অর্থাৎ মুমিন-মুসলমানদের কুরআন-হাদীসে যেভাবে জীবনযাপন করতে বলা হয়েছে এবং যে নীতির ওপর সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পরিচালনা করতে আদেশ করা হয়েছে, তার ধারেকাছেও আমাদের উপস্থিতি না থাকায় বর্তমানে মুসলমানদের দীনী ও দুনিয়াবি সকল ইস্যুতে যারপরনাই দুর্গতি (আল্লাহ হেফাজত করুন) পোহাতে হচ্ছে। আমাদের এ অবস্থার উন্নতি করার জন্য এবং জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আমাদের পূর্ববর্তীদের অনুসরণ করার জন্য এবং ন্যায়-সততা, সত্যবাদিতার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে চাইলে অবশ্যই সিরাতে নববীর শিক্ষাগুলো আমাদের বাস্তব জীবনে বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। কারণ কুরআন-হাদীসের অনুসরণ-অনুকরণ ছাড়া একজন মুমিনের ধর্মীয় জীবন পূর্ণাঙ্গ ও আল্লাহ-রাসূলের সন্তুষ্ট অনুযায়ী হতে পারে না। আর যতদিন আমরা কুরআন-হাদীস থেকে দূরে থাকবো, ততদিন আমরা উন্নতির পরিবর্তে অবনতি ও গোমরাহি এবং ভ্রষ্টতার পথে অগ্রসর হতে থাকবো। আর আমাদের তথাকথিত ‘ধর্মীয় অনুভূতির ও চিন্তার’ মাঝে যে বিষয়টি বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, সিরাতের তথারীতি গুরুত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে শুধু রবিউল আউয়াল মাসই নির্ধারিত। কারণ এগুলো হলো আমাদের ধর্মীয় জ্ঞানের সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতার প্রতিনিধিত্ব করে। কারণ বাঙালি মুসলমানদের ধর্ম হচ্ছে মসজিদ-মাদরাসাকেন্দ্রিক। তাই ধর্মীয় অনুভূতিগুলো হচ্ছে দিবসকেন্দ্রিক।
সিরাত পাঠের উপকারিতা : হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদুল মিল্লত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. সিরাত পাঠের উপকারিতা বর্ণনা করে লেখেন, সিরাত অধ্যয়নের দ্বারা নিজের নবী সা.-এর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পরিচিতি লাভ হয়। আর এ পরিচিতির মাধ্যমে অনিবার্যভাবে সৃষ্টি হয় প্রিয়নবীর প্রতি ভালোবাসা। যার সত্য প্রতিশ্রুতিতে লাভ হবে জান্নাতে তাঁর সঙ্গ ও সান্নিধ্য। আর এটা যে এক মহা নিয়ামত তাতে কি কারো দ্বিমত আছে? (ভূমিকা, বাণী অংশ, সিরাতে মুস্তফা হযরত মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী)।
সিরাত কেন পড়ব? : আমাদের জন্য রাসূল সা. সিরাত অধ্যয়ন শুধু জ্ঞান-বৃদ্ধির বিষয়ই নয়, এটা আমাদের দীনি প্রয়োজন। কেননা মানবজীবনের এমন কোনো দিক নেই, যা প্রিয়নবী সা.-কে স্পর্শ করেনি। ব্যবহারিক, আধ্যাত্মিক, ইহকালীন, পরকালীন সবকিছুই তাঁর জীবন ও সাধনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। ফলে তাঁর জীবনাদর্শ মানবজাতির জন্য অনুপম আদর্শ। জীবনপথে আলোর মশাল ও চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অবশ্যই রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে অনুপম আদর্শ (এমন ব্যক্তির জন্য) যে আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে।’ (সূরা আহযাব : ২১)।
মানবতার শিক্ষা : মানুষের জীবনে মানবতা একটি গুরুত্তপূর্ণ বিষয়। যার মাঝে মানবতা নেই, সে কারো উপকারে আসে না। প্রিয়নবী সা.-এর জীবন থেকে আমরা মৌলিকভাবে মানবতার শিক্ষাই পাই। জাহেলিয়াতের নিকষ অন্ধকার যখন পৃথিবীকে গ্রাস করতে বসেছিল, সেই চরম দুর্দিনে হিদায়াত ও সংস্কারের এক আলোকবর্তিকা নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন তিনি। হেরার আলোকরশ্মি দিয়ে মহান এক সভ্যতা বিশ্বের মানুষকে শিখিয়েছেন। মানবতাকে বাঁচিয়ে রাখতে সমাজের সকল পর্যায়ে মানবাধিকারের এমন এক নমুনা পেশ করেন, যা আজও জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে গোটা বিশ্বের কাছে অনন্য হিসেবে স্বীকৃত। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘নিঃসন্দেহে নবী সা. সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। তাঁর মধ্যে মানবিক সকল বৈশিষ্ট্য পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান। মহান আল্লাহ তাঁকে নিজ অসীম জ্ঞানের ভাণ্ডার থেকে দান করেছেন জ্ঞানের আধার।’ (সূরা নামল : ৬)।
রাসূল সা.-এর নির্দেশগুলোও কুরআনের নির্দেশের ন্যায় অবশ্য পালনীয়। সুতরাং আমাদের উচিত, চিন্তা-চেতনার অগভীরতাগুলো দূর করে সুস্থ চিন্তার ধারক ও বাহক হওয়া। এবং ধর্মীয় অনুভূতির শিরোনামে সুস্থ অনুভূতি লালন করা। আর আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব হচ্ছে নিজেদের এবং নিজেদের সন্তানদের তৃণমূল পর্যায় থেকে সিরাতের ধারাবাহিক অধ্যয়ন করানোÑ যাতে করে আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সিরাতের দিকনির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করতে পারি এবং তার মাধ্যমে আমাদের জীবনের অধ্যায়ের প্রতিটি পাতা আলোকিত করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। আর যেন সিরাতকে কোনো নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে না রাখি। আল্লাহ আমাদের সকলকে পরিপূর্ণ মুমিন হিসেবে কবুল করুন এবং তার পাক কালাম এবং নবীর সিরাত সঠিকভাবে বোঝার ও অনুধাবন করার এবং সে অনুযায়ী আমল করার এবং নিজেদের জীবনে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : সাংবাদকর্মী ও সংগঠক।