ডাকসু-জাকসু নির্বাচন আমাদের কী জানান দিল


১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৬:১২

একেএম রফিকুন্নবী

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
বাংলাদেশের জন্মের পর ৫৪ বছর কেটে গেল। আজ পর্যন্ত কোনো দলই জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। ফলে যারাই ক্ষমতায় গেছে, তারা সাধারণ জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। দল ও ব্যক্তিদের আবর্তে ঘুরপাক খেয়ে দেশের উন্নয়নের চেয়ে ব্যক্তি ও দলের উন্নয়ন হয়েছে। ফলে জনগণের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল।
৩৬ জুলাই আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট হাসিনা গং পালিয়ে যায়। পালিয়ে যায় তার সুবিধাভোগী সর্বস্তরের মন্ত্রী, এমপি, আমলাসহ স্থানীয় সরকারের সর্বস্তরের সদস্যবৃন্দ। শুরু হয়ে যায় মানুষের চাওয়া-পাওয়ার সর্বস্তরে ক্রাইসিস। তাই অতিসত্বর তৃনমূল জনগণের সুবিধার্থে স্থানীয় নির্বাচন দেওয়া সময়ের দাবি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার তার উপদেষ্টাদের নিয়ে ভঙ্গুর অর্থনীতি, আমদানি-রফতানিসহ সকল প্রকার উন্নয়ন কাজের অচলাবস্থা নিয়ে শুরু করে গত এক বছরে অনেক দিকে অগ্রসর হয়েছে। জমা পড়েছিল পাহাড় সমতুল্য আবর্জনা। গ্রাম থেকে শহর কোথাও শান্তি ছিল না। বর্তমানে কিছুটা হলেও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও আশানুরূপ নয়।
এর মধ্যেই সংস্কার, বিচারের কাজ অগ্রসর হচ্ছে। যারা নির্বাচন নির্বাচন করে মাথা খারাপ করছিল, তারা সবকিছু বাদ দিয়ে এ সরকারকে চাপ দিচ্ছিল। সরকার বলেছে, আগামী বছর রোজার আগে নির্বাচন হবে। ভালো কথা। যারা আওয়ামীদের ফেলে যাওয়া বাজার-ঘাট, নদীবন্দর থেকে শুরু করে সাধারণ পানের দোকানেও চাঁদাবাজি করে দেশের মানুষকে অতিষ্ঠ করে ফেলেছে। যেনতেন নির্বাচন করে আবারো হাসিনার মতো সরকার গঠন করে চাঁদাবাজির স্বীকৃতি নেয়ার পাঁয়তারা করছে।
মহান আল্লাহ জুলাই বিপ্লবে শহীদ-আহতদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে দেশের ভালো মানুষের নেতৃত্ব কায়েমের সুযোগ করার পরিকল্পনা করেছেন। গত ৫৪ বছরের সব জঞ্জাল ধুয়ে-মুছে সৎ লোকের শাসন কায়েমের অংশ হিসেবে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। অনেক দিনের আবর্জনা। বলা যেতে পারে সবদিকে অগ্রসর না হলেও মন্দ হওয়া থেকে দেশ বেঁচে গেছে।
মহান আল্লাহর মেহেরবানিতে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের ছাত্র প্রতিনিধি ঠিকমতো নির্বাচিত না হওয়ায় ছাত্রনেতা তৈরির কারখানা ডাকসু থেকে দেশ সুবিধা নিতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবারে ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ একটি সুষ্ঠু সব ছাত্রের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই একটি ভালো নির্বাচনের আয়োজন করে দেশের জন্য একটি ভালো নমুনা পেশ করেছে। সর্বমোট ২৮টি পদে ছাত্র-ছাত্রী তাদের যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচনের এক অপূর্ব সুযোগ পেয়ে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের ভোট প্রয়োগ করে সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজনে সঠিক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বড় সুখবর হলো ইসলামী ছাত্রশিবিরের সমর্থিত প্যানেল থেকে ২৮ পদে ২৪টিতে নির্বাচিত হয়েছে সহ-সভাপতি, সেক্রেটারিসহ, আলহামদুলিল্লাহ। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সার্বিক সহযোগিতায় ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের যোগ্য প্রতিনিধি বাছাই করে নিতে পেরেছে, আলহামদুলিল্লাহ।
এক্ষেত্রে দেশের একমাত্র সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত নেতা বানানোর কারখানা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ও ইসলামী ছাত্রী সংস্থা যোগ্যতার সাথে তাদের ভূমিকা পালন করে দেশের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সারা দেশ থেকে শুরু করে মক্কা-মদিনাসহ গোটা দুনিয়ায় ইসলামপ্রিয় জনতা রোজা রেখে নফল ইবাদত করে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেছে। তাদের দোয়ায় ‘ডাকসু’র জন্য একটি যোগ্য প্রতিনিধি শিক্ষার্থীদের ভোটে আল্লাহ নির্বাচিত করেছেন।
অন্যদিকে ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার অদূরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী প্রতিনিধি নির্বাচন ‘জাকসু’ সম্পন্ন হয়েছে। নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সব বাধা-বিপত্তি মোকাবিলা করে শিক্ষার্থীরা যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচিত করেছেন। ‘জাকসু’ নির্বাচনে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ফলাফল পাওয়া গেছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের দেয়া প্যানেল থেকে ২৫ জনের মধ্যে ২০ জন ছাত্র-ছাত্রী নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ ৩৩ বছর পর এ নির্বাচন হয়েছে। বড় দল দাবিকারীরা পরাজয়ের ভয়ে নির্বাচন বর্জন করেছে। তারা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ভালো প্রতিনিধিদের মনোনয়ন দিতে পারেনি। নির্বাচন কমিশনের প্রধান তো বলিষ্ঠভাবে তথা বক্তব্য তুলে ধরে বলেই ফেললেন। কেউ যদি প্রমাণ করতে পারে ভোটে কারচুপি হয়েছে, তাহলে তিনি চাকরি থেকে পদত্যাগ করবেন এবং অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধাও নেবেন না। কত বড় চ্যালেঞ্জ।
তাই ডাকসু এবং জাকসু নির্বাচনে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের ভোট উৎসবমুখর পরিবেশে দিয়ে দেশের জন্য একটি দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। দেশের জনগণ এ উৎসবমুখর নির্বাচনের ভূয়সী প্রশংসা করছে। সকল মিডিয়া মোটামুটি সঠিক তথ্য প্রচার করেছে। দেশে-বিদেশে এ ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনের সুফল দেশের জন্য কল্যাণকর হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। দেশের বুদ্ধিজীবী, কর্মজীবী, রিকশাওয়ালা, পানের দোকান থেকে বড় ব্যবসায়ীরা এ নির্বাচনের প্রশংসা করছে এবং দেশের জন্য জামায়াত ও শিবিরের ভূমিকা গ্রহণযোগ্য এবং ভবিষ্যতের সংসদীয় নির্বাচনেও জামায়াতের ব্যাপারে সঠিক ভূমিকা দেখতে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তাদের আশা, ডাকসু ও জাকসুর মতো জাতীয় নির্বাচনেও জামায়াত-শিবির বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ছলচাতুরী আর দেশের মানুষ দেখতে চায় না।
ইতোমধ্যেই দেশের জনগণ, দল-মত নির্বিশেষে অবহিত হয়েছে যে, আগামী জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াতে পক্ষের ব্যাপক জনমত তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে যে দুর্নীতিমুক্ত দায়িত্ব পালন করা যায়, তা জামায়াতের সাবেক আমীর শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ৫ বছরে ৩টি মন্ত্রণালয় চালিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তারপরও তাদের ফ্যাসিস্ট ও ভারতের তাঁবেদার হাসিনা ফাঁসি দিয়ে দুনিয়ার কাছে ফ্যাসিস্ট চরিত্রের প্রমাণ দিয়েছে। দেশের ছাত্র-জনতার রোষে দেশ থেকেও পালাতে বাধ্য হয়েছে। এটাই মহান আল্লাহর সঠিক বিচারের দৃষ্টান্ত দুনিয়াতেই। আবার আখিরাতের সীমাহীন দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে।
ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির প্যানেলের বিজয়ের মূল কারণ শহীদ আবদুল মালেক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যত লোককে ফাঁসি দেয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে, আয়নাঘরে নির্যাতন করা হয়েছে, জুলাই বিপ্লবের সময় শহীদ ও আহত হয়েছে তাদের অবদানের জন্যই হয়েছে। তাই আমরা সব নেতার ফাঁসির ত্যাগ-তিতিক্ষা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। তাদের জন্য জান্নাতের উত্তম স্থানে জায়গা দেয়ার জন্য মহান আল্লাহর কাছে কায়মনে দোয়া করছি। যারা নির্যাতন ভোগ করে বেঁচে আছে, তাদের জন্য সুস্থতা কামনা করছি। সরকারের কাছে তাদের পুনর্বাসনের জোর দাবি করছি।
বাংলাদেশকে অস্থির করার জন্য দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্রের শেষ নেই। আমাদের ছাত্র-জনতা যেভাবে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ রক্ষা করেছে, সেভাবেই ছাত্র-জনতা ঐক্যের মাধ্যমেই আগামী দিনের দেশ রক্ষার জন্য কার্যকরী ভূমিকা রাখবে, ইনশাআল্লাহ।
দেশবিরোধী যেকোনো দল বা গোষ্ঠীক কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। মহান আল্লাহর প্রতি আস্থা রেখে সাহসের সাথে জামায়াত-শিবিরকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে, দেশের ইসলামী দল ও দেশদরদি সব গোষ্ঠীকে নিয়েই। ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিজয়ের ফলে ভারতপন্থী বিএনপির নেতা ও ভারতের নেতারাও স্বস্তি পাচ্ছে না। তাদের মনে রাখা দরকার, ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধের কাছে কোনো ষড়যন্ত্রই কার্যকর হবে না এ বাংলাদেশে। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে এবং দেশদরদি দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করেই জামায়াত-শিবিরকে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে আল্লাহর ওপর ভরসা করে।
দেশের সব দল-মত বঙ্গভবন থেকে শুরু করে সাধারণ রিকশাওয়ালা, ফুটপাতর দোকানদারদের সাথে আমার যোগাযোগের সুযোগে তাদের মত-পথ জানার সুযোগ হয়েছে এবং হচ্ছে দীর্ঘ ৫৪ বছরে ঢাকা শহর থেকে গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত। দেশের মানুষ আর পুরনো ট্যাগ খায় না। জুলাই বিপ্লবের পর পুরনো খিস্তিখেউর ধুয়ে-মুছে নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে। এ দেশের মানুষ ৪৭, ৭১ এবং ২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দেখেছে। অনেকে মারা গেছে, অনেকে বেঁচে আছে। আবার যারা ডাকসু এবং জাকসুতে ভোট দিয়েছে এবং যারা শিবির প্যানেলে জিতেছে, তারা সবাই নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত এবং চাঁদাবাজমুক্ত থাকতে চায়। পুরনো ট্যাগে আর এ দেশের রাজনীতি চলবে না।
দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে কোনো আপস নেই। সব দলকেই বুঝতে হবে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করাই তাদের মূল কাজ। আমাদের নিজের দল আগে গোছাতে হবে। নিজের দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিজেরা মারামারি করে এক বছরে প্রমাণ হয়েছে ব্যক্তি স্বার্থই মূল, দেশ পরে। আমরা চাই সব দলের মধ্যে আলাপ-আলোচনার পরিবেশ তৈরি হোক। জনগণ যাদের ভোট দেবে, তারাই সরকারে গিয়ে জনগণের খেদমত করে জনগণের আস্থা অর্জন করার অথবা মন্দ কাজ করলে পরিত্যক্ত হবে। কোনো অবস্থায় যাতে দেশ থেকে পালাতে না হয়।
ডাকসু, জাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের বিজয়ে দেশে বা দেশের বাইরের কাউকেই উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। জামায়াত-শিবির নবী সা.-এর আদর্শ নিয়েই দেশ চালাবে যদি জনগণ ভোট দিয়ে তাদের ক্ষমতায় আনে। আল্লাহর নবী মদিনায় সব দল-মতের লোক নিয়েই মদিনা সনদ করেছিলেন। আমরাও অভিযোগ করে নয়, সামনে চলার জন্য মদিনা সনদের আলোকেই দেশ চালিয়ে দুনিয়ার মধ্যে আদর্শ হতে চাই। আমরা দুনিয়ার ভালো চাই, আখিরাতে সীমাহীন জান্নাত চাই। দেশের সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন, আমলা, ব্যবসায়ীদেরও দেশের প্রতি দরদ ও ভালোবাসা নিয়ে নির্বাচিত সরকারকে সহযোগিতার আহ্বান করতে চাই।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।