গণতন্ত্রকে গতি দিয়েছিল ১৯৯১ সালের নির্বাচন


১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৬:০৮

সরদার আবদুর রহমান : বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রধান যে লক্ষ্য ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা এবং তার স্থিতিশীলতা, স্বাধীনতার পর থেকেই তা এক অনিশ্চয়তার আবর্তে নিপতিত হয়। এ গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে স্বাধীনতা লাভ করলেও দীর্ঘসময় যাবত জাতি প্রকৃত গণতন্ত্রের স্বাদ পায়নি। পরবর্তীকালে স্বৈরাচারবিরোধী এক দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম করে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি সাধিত হয়। অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচন। এর ধারাবাহিকতায় কিছুকাল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বেশ খানিকটা স্বচ্ছতা ফিরে আসে।
১৯৭২-৭৫ সময়কালের গ্লানি যেমন ১৯৭৯ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দূর করতে সহায়ক হয়, তেমনি ১৯৮২-৯০ দীর্ঘ প্রায় এক দশকের অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরশাসকের সময়কালের অবসান ঘটে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। শুধু তাই নয়, একটি স্থিতিশীল সরকার গঠনে এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে যে রাজনৈতিক সমঝোতার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়, তাও ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
সংসদের এ মেয়াদকালে ইসলামী রাজনীতি বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। একজন গবেষক উল্লেখ করেন, ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী দলগুলো সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। জামায়াতে ইসলামী শতকরা ১২.১৩ ভাগ ভোটসহ মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২২২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৮টি আসন লাভ করে দেশের চতুর্থ বৃহত্তম এবং ইসলামী দলগুলোর মধ্যে প্রধান দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নির্বাচনের পর দলটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে সমর্থন দান করে সরকার গঠনে সহযোগিতা করে। জামায়াতের এ উত্থানের জন্য রাজনীতির বিশেষজ্ঞগণ জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনীতির ‘কিং-মেকার’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
একটি বিবরণে জানা যায়, ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ তারিখে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পঞ্চম জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টার মধ্যে ২৯৪টি আসনের ফলাফল বেসরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়। তার মধ্যে বিএনপি ১৩৭টি, আওয়ামী লীগ ৮৫টি, জাতীয় পার্টি ৩৫টি, জামায়াতে ইসলামী ১৮টি, সিপিবি ৫টি, বাকশাল ৫টি, ন্যাপ (মোজাফফর) ১টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ১টি, গণতন্ত্রী পার্টি ১টি, ইসলামী ঐক্যজোট ১টি, জাসদ (সিরাজ) ১টি, এনডিপি ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ৩টি আসন পায়। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ উভয়ই পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পাঁচটিতেই বিজয়ী হন। অপরদিকে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র একটিতে বিজয়ী হন। ঐদিন সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা অভিযোগ করে বলেন, ‘কতিপয় অদৃশ্য শক্তির গোপন আঁতাতের মাধ্যমে নির্বাচনে অতি সূক্ষ্ম ও সুকৌশলে কারচুপি করা হয়েছে।’ অন্যদিকে ১ মার্চ ১৯৯১ এক সংবাদ সম্মেলনে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘নির্বাচন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে ভোটার তালিকা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। ভোটার তালিকায় ত্রুটি না থাকলে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেতো।’
এই নির্বাচনের মাধ্যমে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো প্রতিফলিত হয়:
১. এ নির্বাচনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রভাব লক্ষ করা যায়। এ নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনের বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে প্রমাণ হয়।
২. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এ নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা কঠোরভাবে পালন করা হয়।
৩. ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে অধিকসংখ্যক রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৭৬টি রাজনৈতিক দল ও বহু স্বতন্ত্র প্রার্থী এ নির্বাচনে অংশ নেন।
৪. এ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে পুনরায় গণতন্ত্র চালু হয় এবং স্বৈরতন্ত্র বিদায় নেয়। এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার পূর্বে বহু বিদেশি পর্যবেক্ষকের আগমন ঘটে। তারা সকলেই ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করেন।
৫. এ নির্বাচনের ফলে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারি দলের সরকারের নিরপেক্ষ মনোভাবই এ সংসদ নির্বাচনকে সার্থকতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। বিদেশি পর্যবেক্ষকরা এ নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বলে মন্তব্য করেন। তাঁদের মতে, শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাম্প্রতিকতম সময়ে এরূপ অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সচরাচর অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায় না।
সরকার গঠনে জামায়াতের সমর্থন
এ নির্বাচনে বিএনপি অধিকসংখ্যক আসন পেলেও তা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যথেষ্ট ছিল না। এ নিয়ে ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। বিএনপির সরকার গঠনের নেপথ্যের যোগাযোগের বিষয়ে একজন লেখক উল্লেখ করেন, পঞ্চম জাতীয় সংসদ ছিল একটি ঝুলন্ত সংসদ। সরকার গঠনের জন্য কমপক্ষে ১৫১টি আসন প্রয়োজন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ১৪০টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হলেও সরকার গঠনের জন্য এর কমপক্ষে আরো ১১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন ছিল। আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসনের সাথে জাতীয় পার্টির (এরশাদ)-এর ৩৫টি আসন এবং অন্যান্য ১৯টি আসন মিলে জোটবদ্ধ হলে আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪২টি। তার মানে, আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল আরো ৯ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ছাড়া না বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, না আওয়ামী লীগের পক্ষে সরকার গঠন সম্ভব হচ্ছিল। এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তাঁর দলের অন্যতম শীর্ষনেতা আমির হোসেন আমুকে জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম শীর্ষনেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের নিকট প্রেরণ করেন এবং বেশ কয়েকটি মন্ত্রিত্ব নিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে আওয়ামী লীগের সাথে কোয়ালিশন সরকারে যোগদানের আহ্বান জানান।
এদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে দলটির তৎকালীন মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদার জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খান বরাবর সরকার গঠনে তাঁদের দলকে সমর্থন করার জন্য অনুরোধপত্র পাঠান। ১১ মার্চ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও এডভোকেট শেখ আনছার আলী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের নিকট সমর্থনপত্রটি হস্তান্তর করেন। ১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করে ১০ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২১ জন প্রতিমন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির সরকার গঠনের নেপথ্যের একটি ‘চমকপ্রদ’ চিত্র দিয়েছেন রাজনীতিক ও লেখক মওদুদ আহমদ। তিনি তাঁর একটি গ্রন্থের টিকায় বিষয়টি উল্লেখ করেন। এটি নিম্নরূপ: “কোনো রাজনৈতিক দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় কোনো দল সংবিধান অনুযায়ী সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রদর্শনের মতো সমর্থন অর্জন করে সরকার গঠন করতে পারে, তা নির্ণয়ের জন্য বিচারপতি শাহাবুদ্দিনকে কিছুকাল সময় অপেক্ষা করতে হয়। ফলাফলে দেখা যাবে যে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে উভয়েই অন্যদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের উপযোগী ১৫১ জন সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে সক্ষম ছিল। তবে ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে বিএনপি ছিল তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক স্থানে। কারণ সরকার গঠনের জন্য দলটির প্রয়োজন ছিল মাত্র ১১টি আসনের সমর্থন। কিন্তু আওয়ামী লীগের জন্য প্রয়োজন ছিল নির্বাচনে জোটবদ্ধ সকল বামপন্থী ও অন্যান্য দল, গোটা জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন। অনেক কারণে শেষোক্ত দুই দলের সঙ্গে সমঝোতা করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ১৩টি আসন অর্জনকারী বামপন্থী দলগুলো বিএনপিকে সমর্থনদানে প্রস্তুত থাকলেও শেষাবধি তা কাজ করেনি। জেনারেল এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে আবার এত তাড়াতাড়ি তাকে জোটের শরিকভুক্ত করে সরকারে নিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ নেয়া ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ের জন্যই বিব্রতকর কাজ। এ সময় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল নুরুদ্দীন খান এ অচলাবস্থা নিরসনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। জামায়াত ও বিএনপিকে এক ঘরে নিয়ে আসার ব্যাপারে তিনি মধ্যস্থতা করেন। একজন সাবেক মন্ত্রী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জি. ডব্লিউ. চৌধুরীর বাসভবনে এ নিয়ে চূড়ান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জেনারেল নুরুদ্দীন, বেগম খালেদা জিয়া, অধ্যাপক গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামী উপস্থিত ছিলেন। এ বৈঠকের পরে জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠনে বিএনপিকে সমর্থনদানের ব্যাপারে সম্মতি প্রদান করে এবং এ মর্মে রাষ্ট্রপতিকে লিখিতভাবে অবহিত করে নিশ্চয়তা প্রদান করে।”
মওদুদ আহমদের মতে, প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত কেয়ারটেকার সরকারের তত্ত্বাবধানে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় সংসদের ১৪০টি আসনে জয়ী হয়ে নিজেরাই বিস্মিত হয়। ১৮টি আসনে বিজয়ী জামায়াতে ইসলামীর কাছ থেকে লিখিত আশ্বাসের ভিত্তিতে দলটি জাতীয় সংসদে সরকার গঠনের মতো প্রয়োজনীয় সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচিত হন বিএনপি সংসদীয় দলের নেতা এবং অভিষিক্ত হন প্রজাতন্ত্রের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। সংবিধানের অধীনে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতি এবং দেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদে বহাল থেকে যান।
পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এ নির্বাচন বিভিন্ন দিক থেকেই ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থার জন্য বিপুলভাবে ইতিবাচক। একদিকে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার নজির স্থাপনের পাশাপাশি স্থিতিশীল সরকার গঠনের জন্যও একটি দৃষ্টান্ত। ফলে একে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি নজির হিসেবে মনে করা যায়।
কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, এ নির্বাচনের ইতিবাচক প্রভাব-প্রতিক্রিয়াগুলো খুব বেশিদিন স্থিতি পায়নি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীন হওয়া এবং ২০০৮ সালের সেনাসমর্থিত সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশা-দুরাশার মরুভূমিতে পথ হারিয়ে ফেলে। একটি দুঃসহ সময়কাল অতিক্রম করতে হয় পুরো জাতিকে। দেড় দশকের রক্ত ও প্রাণঝরা অধ্যায় অতিক্রম করে অতঃপর ২০২৪-এর গণবিপ্লব নতুন করে পথযাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ।