তালাক কী : ইসলামে তালাক দেয়ার পদ্ধতি


১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:৪২

॥ ওবায়েদ ইবনে গনি ॥
তালাক শব্দের আভিধানিক অর্থ বিচ্ছিন্ন হওয়া, ত্যাগ করা, পৃথক হওয়া ইত্যাদি। তালাক হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্কচ্ছেদের একটি আইনি প্রক্রিয়া। এটি সাধারণত স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত হয়ে থাকে, তবে কিছু ক্ষেত্রে স্ত্রীও তালাক চাইতে পারেন। তালাক মূলত দাম্পত্য কলহ, পারস্পরিক সন্দেহ, ভরণপোষণ প্রদানে ব্যর্থতা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, পরকীয়া, সামাজিক, অর্থনৈতিক সমস্যা ইত্যাদি কারণে হয়ে থাকে। ইসলামে আনুষ্ঠানিক বিবাহবিচ্ছেদকে তালাক বলা হয়। তালাকের পারিভাষিক অর্থ ‘বিবাহের বাঁধন তুলিয়া ও খুলিয়া দেয়া বা বিবাহের শক্ত বাঁধন খুলিয়া দেয়া; স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়া।
জীবনে চূড়ান্ত বিপর্যয় থেকে স্বামী-স্ত্রী উভয়কে রক্ষার জন্য ইসলামে তালাকের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যখন চরমভাবে বিরোধ দেখা দেয়, পরস্পর মিলেমিশে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে শান্তিপূর্ণ ও মাধুর্যমণ্ডিত জীবনযাপন যখন একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, পারস্পরিক সম্পর্ক যখন হয়ে পড়ে ত্যক্তবিরক্ত, একজনের মন যখন অপরজন থেকে এমনভাবে বিমুখ হয়ে যায়Ñ তাদের শুভ মিলনের আর কোনো সম্ভাবনা থাকে না; ঠিক তখনই তালাকের এ চূড়ান্ত পন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ইসলামে। তালাক হচ্ছে নিরুপায়ের উপায়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়ার অভাব, যা ধীরে ধীরে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক তালাকের একটি প্রধান কারণ। স্ত্রীর উচ্চাকাক্সক্ষা বা স্বামীর অর্থনৈতিক সঙ্গতির অভাবও তালাকের কারণ হতে পারে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বিবাহবিচ্ছেদের দিকে ঠেলে দেয়।
মুসলিম পারিবারিক আইনে বলা হয়, ‘কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইলে তাকে মুসলিম আইনে অনুমোদিত যেকোনো পদ্ধতিতে ঘোষণার পরই তিনি তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেনÑ এ মর্মে চেয়ারম্যানকে লিখিতভাবে নোটিশ প্রদান করবেন এবং স্ত্রীকেও এর নকল দেবেন।’ অর্থাৎ তালাক প্রদান বা ঘোষণার ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়তের প্রবর্তিত পদ্ধতিই হচ্ছে মুসলিম পারিবারিক আইনের পদ্ধতি। তাই শরীয়ত প্রবর্তিত তালাক সংক্রান্ত বিধানাবলি ভালোভাবে জানা ও বোঝা খুবই জরুরি। বিশেষ করে নিকাহ রেজিস্ট্রারদের এ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামে তালাকের পদ্ধতি : ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে তালাক একটি বৈধ প্রক্রিয়া হলেও এটিকে ‘সবচেয়ে ঘৃণিত হালাল কাজ’ হিসেবে ধরা হয়। যেমন হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহর কাছে বৈধ কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত কাজ হলো তালাক।’ (আবু দাউদ)। তাই তালাকের আগে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই ভেবে দেখা উচিত। একান্তই বাধ্য না হলে তালাকের পথে পা না বাড়ানোয় উত্তম। যদি কোনো স্ত্রী স্বামীর অধিকার আদায় না করে বরং উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হন, তাহলে স্বামীর দায়িত্ব হলো তাকে সংশোধনের সর্বাত্মক চেষ্টা করা। আর যদি সংশোধনের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুযায়ী তালাকের ব্যবস্থা করা।
পবিত্র কুরআন ও হাদিস শরীফের বর্ণনা অনুযায়ী, তালাক দেওয়ার সর্বোত্তম ও সুন্দর পদ্ধতি হলোÑ স্ত্রী যখন হায়েজ (মাসিক) থেকে পবিত্র হবেন, তখন স্বামী তার সঙ্গে সহবাস না করে সুস্পষ্ট শব্দে এক তালাক দেবে। যেমনÑ ‘আমি তোমাকে তালাক দিলাম’। এরপর স্বামী যদি স্ত্রীকে ইদ্দত চলাকালীন ফিরিয়ে নিতে চান, তাহলে তা পারবেন। কিন্তু সম্পর্ক কায়েম করতে না চাইলে স্ত্রীর ইদ্দত শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যাবেন। তখন স্ত্রী ইচ্ছা করলে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবেন।
দেশে বিয়ের হার যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদও। আর তালাকের সবচেয়ে বড় কারণ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক এবং দাম্পত্যজীবন পালনে অক্ষমতা বা বনিবনার অভাব। যদি কোনো স্ত্রী স্বামীর অধিকার আদায় না করে বরং উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হন, তাহলে স্বামীর দায়িত্ব হলো তাকে সংশোধনের সর্বাত্মক চেষ্টা করা। তালাক দেওয়ার আগে ইসলামে কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। স্বামী সেগুলো অনুসরণ করবে। তারপরও যদি স্ত্রীর মধ্যে কোনো পরিবর্তন না আসে, তাহলে চূড়ান্ত ফয়সালা তালাক দেওয়ার পথ বেছে নিতে পারবে। যেমন-
প্রথম পদক্ষেপ : স্ত্রীর অবাধ্যতা দেখেই উত্তেজিত হবে না; বরং নিজেকে সংযত রাখবে ও তাকে মিষ্টি ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করবে। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে তার মন গলানোর চেষ্টা করবে। স্ত্রী কোনো ভুল ধারণায় থাকলে যথাসম্ভব তা দূর করার চেষ্টা করবে। স্বামী নিজেকে সংযত রেখে সবকিছু ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবে। ছাড় দেওয়া ও মায়া-মমতার মাধ্যমে যত দূর সম্ভব দাম্পত্যজীবন স্থায়ী করার আপ্রাণ চেষ্টা করবে।
দ্বিতীয় পদক্ষেপ : প্রথম পদক্ষেপের মাধ্যমে কাজ না হলে স্ত্রীর ব্যবহারে রাগ-অনুরাগ, অভিমান প্রকাশ করার জন্য স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে একত্রে রাতযাপন থেকে বিরত থাকবে। স্ত্রীর ঘুমানোর জায়গা পৃথক করে দেবে। স্ত্রী যদি এতে সতর্ক হয়ে যায় এবং নিজেকে সংশোধন করে নেয়, তাহলে দাম্পত্যজীবন সুখের হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘স্ত্রীদের মধ্যে যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা করো, তাদের সদুপদেশ দাও। তারপর তাদের শয্যা বর্জন করো। অতঃপর তাদের সামান্য প্রহার করো। যদি তারা তোমাদের অনুগত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পথ অন্বেষণ করো না।’ (সূরা নিসা : ৩৪)।
তৃতীয় পদক্ষেপ : উল্লিখিত দুটি পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরও কোনো কাজ না হলে তৃতীয় পদক্ষেপ হিসেবে ইসলামের নির্দেশ হলো উভয়পক্ষ থেকে এক বা একাধিক সালিশের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সমস্যা নিরসনের চেষ্টা করবে। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছে, ‘তোমরা যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ সৃষ্টির আশঙ্কা করো, তবে মীমাংসার জন্য পুরুষের পরিবার থেকে একজন সালিশ ও নারীর পরিবার থেকে একজন সালিশ পাঠিয়ে দেবে। তারা দুজন যদি মীমাংসা করতে চায়, তবে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞাত ও সর্ববিষয়ে অবহিত।’ (সূরা নিসা : ৩৫)।
তালাক হলো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত : যদি পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছে যায় যে মীমাংসার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখন ইসলামী শরীয়ত স্বামীকে তালাক দেওয়ার এখতিয়ার দিয়েছে। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে তালাক দেওয়া অত্যন্ত অপছন্দনীয় ও ঘৃণিত কাজ। হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহর কাছে বৈধ কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত কাজ হলো তালাক।’ (আবু দাউদ)। এরপরও তালাক দেয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা না থাকলে ইসলামী শরীয়ত সমর্থিত পদ্ধতি অনুসরণ করে তালাক দেবে। এ পদ্ধতি অনুসরণ করার অনেক সুফল রয়েছে। তালাকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইদ্দত।
কীভাবে ইদ্দত পালন করতে হয় : স্বামীর মৃত্যু কিংবা বিবাহবিচ্ছেদে নারীকে কতদিন ইদ্দত পালন করতে হবে? ইদ্দত পালনকালে তাকে কি স্বামীর বাড়িতেই অবস্থান করতে হবে? এ সময়ে সে কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যেতে পারবে কি? ইদ্দত পালনকালে সে কি তার পরিহিত অলঙ্কার খুলে রাখবে? ইদ্দতের সময় হলো গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত আর গর্ভবতী না হলে তিন হায়েজ (মাসিক) অতিক্রম হওয়া পর্যন্ত। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তালাকপ্রাপ্ত নারী তিন ঋতুস্রাব পর্যন্ত নিজেদের বিরত রাখবে।’ (সূরা বাকারা : ২২৮)। আর ‘গর্ভবতীদের সময়কাল হলো সন্তান প্রসব করা।’ (সূরা তালাক: ৪)।
ইদ্দত কী? : ইদ্দত শব্দের আভিধানিক অর্থ গণনা করা। ইদ্দতের পারিভাষিক অর্থ নারীদের ওইসময় পর্যন্ত অন্যত্র বিয়ে করা থেকে বিরত থাকা, যা তার আগের বিয়ের প্রভাব প্রকাশ করে। যেমন সে অন্তঃসত্ত্বা কি না, তা প্রকাশের সম্ভাবনা শেষ হওয়ার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ইদ্দত সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বললে, স্বামী যদি নারীকে তালাক দেয় বা কোনোভাবে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে অথবা স্বামী মারা যায়, তাহলে এসব সুরতে কিছুদিনের জন্য নিজেকে ঘরে আবদ্ধ রাখা। সেই সময়ের মধ্যে ওই ঘর থেকে জরুরি কোনো কারণ ছাড়া বের না হওয়া এবং অন্যত্র বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ না হওয়াকে ইদ্দত বলা হয়।
তালাক কিংবা স্বামীর মৃত্যু যে কারণেই নারীর বিবাহবিচ্ছেদ হলেই নারীর ওপর ইদ্দত পালন করা আবশ্যক। তালাকের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ হলে নারীকে তিন হায়েজ পরিমাণ পালন করতে হবে। যদি হায়েজ (অপবিত্রতা ও পবিত্রতার ধারা অব্যাহত) থাকে। আর যদি হায়েজ না থাকে, তাহলে তিন মাস পর্যন্ত ইদ্দত পালন করতে হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তালাকপ্রাপ্ত নারীরা তিন মাসিক পর্যন্ত প্রতীক্ষা করবে এবং তাদের পক্ষে জায়েজ নয় সে বস্তু গোপন করা, যা তাদের পেটে আল্লাহ সৃজন করেছেন, যদি তারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে। তাদের স্বামীরা তাদের উক্ত সময়ের মধ্যে পুনঃগ্রহণে অধিক হকদার, যদি তারা আপস-নিষ্পত্তি করতে চায় এবং পুরুষদের ওপর নারীদেরও হক আছে, যেমন নিয়ম অনুযায়ী পুরুষদের নারীদের ওপরও হক আছে, অবশ্য নারীদের ওপর পুরুষদের বিশেষ মর্যাদা আছে এবং আল্লাহ মহাপরাক্রশালী, প্রজ্ঞাশীল।’ (সূরা বাকারা : ২২৮)।
বিধবা নারীর ইদ্দত : কোনো নারীর স্বামী মারা গেলে ইদ্দতের সময়কাল চার মাস দশ দিন। তবে গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত। বিবাহবিচ্ছেদের পর থেকে বা স্বামী ইন্তেকালের পর থেকেই ইদ্দতের সময়কাল গণনা শুরু হয়। কুরআনে এসেছে, ‘আর তোমাদের মধ্য থেকে যারা মারা যাবে এবং স্ত্রীদের রেখে যাবে, তাদের স্ত্রীরা চার মাস দশ দিন অপেক্ষায় থাকবে। অতঃপর যখন তারা ইদ্দতকাল পূর্ণ করবে, তখন তারা নিজেদের ব্যাপারে বিধি মোতাবেক যা করবে, সে ব্যাপারে তোমাদের কোনো পাপ নেই। আর তোমরা যা কর, সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক অবগত।’ (সূরা বাকারা : ২৩৪)। স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা নারী স্বামীর বাড়িতে অবস্থান করবে। একান্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হবে না। অধিক সৌন্দর্য প্রকাশক কোনো পোশাক বা গহনা পরবে না। অলঙ্কার ব্যবহার করবে না।
সর্বোপরি আমরা যদি পরিপূর্ণভাবে ইসলামী শরীয়া অনুযায়ী সংসারজীবন, পারিবারিকজীবন ও রাষ্ট্রীয়জীবন পরিচালনা করতে পারি, তাহলে আমাদের একেকটি পরিবার-সংসার হবে একেকটি জান্নাতের টুকরো। কুরআন-সুন্নাহর আইন মানলে পরিবার হবে সুন্দর-সুশীল ও সুষমামণ্ডিত। সমাজ হবে আলোকিত। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের তালাকের মতো সবচেয়ে ‘ঘৃণিত’ কাজ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : সাংবাদিক।