একটি আইসক্রিমের হাসি


৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:৫৪

॥ আব্দুস সালাম ॥
তুলি আর মলি- দুই ছোট্ট বান্ধবী। ওরা দুজনই একসঙ্গে থাকে, একসঙ্গে ঘুমায়, আর একসঙ্গে সারা দিন কাজ করে। সবাই ওদের টোকাই মেয়ে বলে ডাকে। ওদের এই নামে কেউ ভালোবেসে ডাকে না, বরং উপহাস করে।
তুলির বয়স ৯, মলির ৮ বছর। তাদের বাবারা অনেক আগেই মারা গেছে। মায়েরা গৃহকর্মী- অন্যের বাড়িতে ঝাড়ু দেয়, বাসন মাজে, কাপড় ধোয়। তবুও তাদের সংসার চালানো খুব কঠিন।
সকালে সূর্য ওঠার আগেই তুলি আর মলি জেগে যায়। কাঁধে পুরনো ছেড়া এক একটা চটের বস্তা ফেলে ওরা বেরিয়ে পড়ে। কারো বাড়ির পাশে ফেলে রাখা পুরনো বোতল, টিনের কৌটা কিংবা প্লাস্টিক খুঁজে খুঁজে ওরা ভরে বস্তায়। সেসব জিনিস বিক্রি করে ওদের মা চাল-ডাল কেনে।
ভাত কখনো জোটে, কখনো জোটে না। দোকানের পেছনের এঁটো খাবার- যেটা অন্যরা ফেলে দেয়, তুলি-মলি কুড়িয়ে নেয়। অনেক সময় লোকজনকে বলেও খায়’- একটু দিন, খেতে খুব ইচ্ছে করছে!’
এভাবেই দিন কাটে ওদের। না আছে খেলনা, না আছে রঙিন জামা। স্কুলের কথা ওদের কখনো কল্পনায়ও আসে না।
একদিন বিকেলে রোহান নামের একটা ছেলেকে তার বাবার সঙ্গে স্কুল থেকে ফিরতে দেখা গেলো। রোহান খুব ছটফটে আর দুষ্টু স্বভাবের। সে বাবার হাত ধরে হাঁটছিল।
রাস্তার পাশে এক আইসক্রিমওয়ালা দাঁড়িয়ে আইসক্রিম বিক্রি করছে। রোহান খুশি হয়ে বলল,
‘বাবা, আমি একটা কোন আইসক্রিম খাব!’
বাবা হেসে বললেন,
‘আচ্ছা খোকা, চলেন কিনে দিই।’
বাবা তাকে একটা চকলেট মোড়ানো কোন আইসক্রিম কিনে দিলেন। রোহান খেতে খেতে আনন্দে লাফিয়ে উঠল,
‘ওয়াও! এটা তো অনেক মজা!’
তুলি আর মলি ঠিক তখন রাস্তার পাশেই কুড়িয়ে পাওয়া বোতল গোনার চেষ্টা করছিল। রোহানকে আইসক্রিম খেতে দেখে ওরা চুপ করে তাকিয়ে থাকল। চোখে ছিল ইচ্ছার ঝিলিক, আর মুখে কোনো কথা নেই।
তুলির পেটের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
রোহানের বাবা খেয়াল করলেন- দুই কাঁধে বস্তা চাপানো মেয়েটি তাঁকিয়ে আছে।
তিনি মৃদু হাসলেন। তারপর হাত ইশারায় ডেকে বললেন,
‘এই যে মেয়ে, এসো। তোমরা কি আইসক্রিম খাবে?’
তুলি-মলি চুপ। ওরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ভয়, সংকোচ, লজ্জা- সবকিছু মিলেমিশে একাকার।
তিনি আবার বললেন,
‘আয় রে মা, ভয় নেই। খাবে আইসক্রিম?’
তুলি একটু সাহস নিয়ে বলল,
‘খাব।’
মলি কিছু বলে না, শুধু মাথা নিচু করে থাকে।
রোহানের বাবা দুই বান্ধবীকে একটা করে চকলেট কোন আইসক্রিম কিনে দিলেন।
তারা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না- এই মজার আইসক্রিম তারা খাবে? কোনো টাকা না দিয়ে?
দুজন হাত ধরাধরি করে একটু দূরে চলে গেল। একটা বড় গাছের নিচে বসে খুব যত্ন করে আইসক্রিমের মোড়ক খুলল। তারপর এক কামড় খেয়েই মুখে তাদের হাসি ফুটল।
মলি বলল,
‘তুলি, এত মজা জিনিস কখনো খাইনি গো!’
তুলি হেসে বলল,
‘হ্যাঁ রে, মনে হচ্ছে আমি স্বপ্ন দেখছি!’
ওরা হাসতে হাসতে, আনন্দে চোখে জল ফেলে আইসক্রিমটা খেতে থাকে।
রোহান সব দেখছিল। ছোট হলেও ওর মনে একটা প্রশ্ন জাগল।
সে বাবাকে বলল,
‘বাবা, তুমি ওদের কোন আইসক্রিম কিনে দিলে কেন? ওদের তো ললি আইসক্রিম দিলেই হতো।’
বাবা রোহানের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
‘খোকা, তোমার যেমন মজা করে আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করে, ওদেরও করে। কিন্তু ওদের মা-বাবা তো তোমার মতো কিনে দিতে পারে না। ওরা দিনভর বস্তা কাঁধে করে ঘুরে বেড়ায়, পেট ভরে খেতে পারে না।’
রোহান কান খাড়া করে শুনছিল।
বাবা আবার বললেন,
‘খোকা, মনে রেখো- গরিবদের কিছু দিলে কমে না। যারা দেয়, সৃষ্টিকর্তা তাদের ওপর খুশি থাকেন। ওদের ছোট্ট একটা ইচ্ছে পূরণ করলেই ওরা খুশি হয়ে যায়।’
‘তুমি কখনো গরিব কাউকে দেখে হাসবে না, ঈর্ষা করবে না, বরং তুমি চেষ্টা করবে যতটুকু পারো তাদের পাশে দাঁড়াতে।’
‘আর যদি দেখো কেউ তোমার খাওয়া জিনিসের দিকে তাকিয়ে আছে, তাহলে ওদের সামনে কিছু খেও না। না পারো ওদের একটু দাও।’
সেই দিনটা ছিল তুলির জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। একটি সাধারণ আইসক্রিমই তার মুখে এমন হাসি এনে দিয়েছিল, যা হয়তো হাজার রঙিন জামাও আনতে পারত না। সেদিন তুলি বুঝেছিল, ভালোবাসা মানে শুধু বড় বড় কথা নয়। ভালোবাসা মানে, কারো ছোট্ট একটি ইচ্ছেকে সম্মান জানানো, তাকে গুরুত্ব দেওয়া।
অন্যদিকে রোহান সেই মুহূর্তে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছিল- ‘দেওয়ার আনন্দ’। কোনো কিছুর বিনিময়ে নয়, নিঃস্বার্থভাবে কাউকে খুশি করার আনন্দ সবচেয়ে বড় আনন্দ।
লেখক : সহকারী সচিব, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।