গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:৩২
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
দেশে নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। গত নির্বাচনগুলোয় জনগণের ভোটের দরকার হয়নি। তদানীন্তন সরকার ও নির্বাচন কমিশন মিলে ভোট ছাড়াই তাদের ইচ্ছেমতো আমরা-মামুরাই তথাকথিত নির্বাচিত সংসদ করে দেশটাকে দুর্নীতির তলানিতে পৌঁছে দিয়েছিল।
মহান আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানিতে ছাত্র-জনতার ঐক্যের মাধ্যমে জালেম সরকারকে উচ্ছেদ করতে সক্ষম হয়েছিল ৩৬ জুলাই। ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, এমপি, গ্রামের মেম্বার; এমনকি তাদের নিয়োগকৃত বায়তুল মোকাররমের ঈমামও পালিয়ে গেছে। সবই মহান আল্লাহর ইচ্ছা। জালেমের জুলুম বেশিদিন টেকে না। পালাতে না চাইলেও পালাতে বাধ্য হয়েছে দুপুরের খাবার না খেয়েই।
ছাত্র-জনতার ঐক্যের বিপ্লব আমরা ধরে রাখতে পারিনি। গোঁজামিলের অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে বিপ্লবের ফল ঘরে আনতে পারছি না। ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসররা বঙ্গভবন থেকে শুরু করে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বসে থাকলে বিপ্লবের ফল ঘরে আনা সম্ভব হবে না।
জুলাই বিপ্লবের এক বছর কেটে গেল। আমরা স্থানীয় নির্বাচন দিয়ে তৃণমূলের জনগণের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে পারিনি। পারিনি আইনশৃঙ্খলা আয়ত্তে আনতে। যখন-তখন দাবি আদায়ের নামে ফ্যাসিস্ট হাসিনার লোকেরা জনগণের যাতায়াত ব্যবস্থার বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। শক্ত হাতে এসব বিশৃঙ্খলা রুখে দিতে হবে। যার ন্যায্য দাবি দাওয়া আছে, তা আগামীর নির্বাচিত সরকারের কাছে পেশ করতে হবে। বর্তমান সরকারের মূল কাজ, ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দোসরদের বিচারের কাজ দ্রুত শেষ করা। দেশের বিভিন্ন বিভাগের ভেঙে পড়া প্রশাসনের সংস্কার দ্রুত শেষ করে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।
৩০০ আসনে একসাথে সুষ্ঠু নির্বাচনের সক্ষমতা এ সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের নেই। কারণ সব জায়গায়ই ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসররা বসে আছে। ছুঁতা-নাতায় তারা এ সরকারের নেয়া পদক্ষেপের সফলতা ব্যর্থ করে দিচ্ছে। কাজের গতি বাড়াতে অসহযোগিতা করছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসরদের লুট করা টাকা ও পাশের দেশের সহযোগিতায় আমাদের ৯২% মুসলমানের দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি রোধ করছে। দেশের পণ্য বিদেশে রফতানির পথ রুদ্ধ করছে। তবে কিছু দৃঢ় পদক্ষেপের কারণে বিকল্প পথও বের করতে সক্ষম হয়েছে দেশপ্রেমিক কর্মকর্তারা। দৃঢ়তা আরো বাড়াতে হবে।
কিছুদিন পূর্বে প্রতিবেশী ছোট দেশ মালদ্বীপ দৃঢ়তার সাথে ভারতের সৈন্য ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। তাদের অর্থনীতির অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই ৩৬ জুলাই যে ছাত্র-জনতার ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার ফল ধরে রাখার জন্য ড. ইউনূস সরকারকে দেশের স্বার্থে কোনো দলের না হয়ে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। সামরিক-বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দেশদরদির ভূমিকায় ফিরে আসতে হবে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ ভূমিকায় দেশের চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও দুর্নীতির সব পথ বন্ধ করতে হবে। ভালো কাজ করলে যেমন পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে, মন্দ কাজের জন্য সাজার ব্যবস্থাও করতে হবে।
এই যে ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল। তাদের কঠোরহস্তে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচারিত ছবি দেখে দোষীদের বের করা খুবই সহজ। ইতোমধ্যে এক কালপ্রিটকে ধরা হয়েছে। প্রকৃত দোষীদের বের করে, সাজার আওতায় আনতেই হবে।
কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুদিন পর নির্বাচনের কাজ শুরু হয়েছে। এখানেও বিভিন্ন টালবাহানা সৃষ্টি করে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষিত এবং মত দেয়ার ব্যাপারে সচেতন। তাই ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য যারা কল্যাণকর, তাদেরই তারা ভোট দিয়ে প্রতিনিধি বানাবে। আসলে সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত নেতা বাছাইয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা ভুল করবে না। কোনো বাহানাই কাজ হবে না। যারাই সহপাঠী ছাত্র-ছাত্রীদের কল্যাণ করতে পারবে, তাদের হলে থাকার ব্যবস্থা, চিকিৎসার ব্যবস্থা, লেখাপড়ার মানোন্নয়ন, গবেষণার কাজ করা, উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মোচন করতে যারা সক্ষম নেতা, তাদেরই ছাত্র-ছাত্রীরা ভোট দেবে। বিশেষ করে ছাত্রীদের যারা উত্ত্যক্ত করে না, তারাই ভোট পাওয়ার যোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে। মামলা-হামলা করে নির্বাচন বানচালের চেষ্টায় রত বাম ও পরাজিত হওয়ার ভয়ে এক গ্রুপ এ কাজে লিপ্ত। কঠোর হস্তে এ ষড়যন্ত্র উৎরাতে হবে।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসর ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ হলেও তাদের লোকজন বর্তমান যারা ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের ঘাড়ে উঠে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তো মারধরের ঘটনাও তারা ঘটিয়েছে। কারণ তারা বুঝে গেছে, বহুদিন পর ছাত্র রাজনীতির গুণগতমান বাড়ার সুযোগ এসেছে। তাই তারা তাদের আসল নেতা বাছাই করতে সচেতনভাবেই ভোট দেবে। দুর্নীতিগ্রস্ত, চাঁদাবাজ, নারীর সম্ভ্রম ভঙ্গকারীদের সচেতন ছাত্র-ছাত্রী ভোট দেবে না। তাদের ভরাডুবির সম্ভাবনা বুঝে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি করছে। কোনো লাভ হবে না। ছাত্র-ছাত্রীরা বহুদিন পর স্বাধীনভাবে তাদের নেতা বানানোর সুযোগ কাজে লাগাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে দৃঢ়তার সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার আবেদন করছি। ন্যায়ের পথে সচেতন থাকলে কোনো দুর্নীতিবাজ নির্বাচনে ব্যাঘাত ঘটাতে পারবে না। জনগণ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের আভাস পেতে চায়। ছাত্র-ছাত্রীদের নির্বাচন ভালো হলে দেশের জাতীয় নির্বাচনও ভালো হবে, ইনশাআল্লাহ। আমরা সচেতন অভিভাবকরা তাদের পরিচিত ছাত্র-ছাত্রীদের সৎ, মেধাবী, ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণে যারা কাজ করবে, তাদেরই ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করার আহ্বান জানাই।
বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, অভিজ্ঞ লোকদের সহযোগিতা নিতে হবে। ৩০০ আসনে একদিনে ভোট গ্রহণ করা কঠিন। কারণ আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতার অভাব রয়েছে। বিভাগওয়ারি নির্বাচন করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের লোকদের মোকাবিলা করতে পারবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচনের কাজ মুখ্য। তাই তাদের জনবল প্রশিক্ষণ দিয়ে কোনো দলের জন্য নয়, দেশের জন্য সুষ্ঠু নির্বাচনের কাজ করবে। কোনো দুর্নীতির প্রশ্রয় যেন দেয়া না হয়। ভোটকেন্দ্র পাহারা মজবুত করতে হবে। কোনোভাবেই বিশৃঙ্খলার সুযোগ দেয়া যাবে না। সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। সময়মতো ভোটকেন্দ্রে ভোট নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সকালেই ভোটসামগ্রী ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
ইতোমধ্যে প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বৈঠক করেছেন। তাদের মত নিয়েছেন। সুষ্ঠু ভোটের জন্য বিভিন্ন দলের মত বিবেচনায় আনতে হবে, ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করা সরকারের কাজ। সচেতন রাজনৈতিক দলগুলোকেও ভোটের পরিবেশ তৈরিতে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। কোনোভাবেই যেন ভোটকেন্দ্রে মব তৈরি না হয়, তার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।
দেশের ভিতরে এবং বাইরের ভোটারদের ভোট ডাকযোগে হাতে সময় নিয়ে ব্যালট পাঠাতে হবে। যথাযথভাবে ভোট দিয়ে ভোটের দিনের পূর্বেই নির্বাচন কমিশনের নির্দেশমতো পাঠাতে হবে। ভোটের গোপনীয়তা অবশ্যই পালন করতে হবে। নারী ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনা এবং তাদের জন্য আলাদা বুথ সংরক্ষণ করতে হবে। ভোটাররা যাতে সকাল সকাল ভোটকেন্দ্রে যায়, তার জন্য দল-মত ও প্রশাসনের মাধ্যমে প্রচার চালাতে হবে। ভোটকেন্দ্র যাতে বেশি দূরে না হয়, তার ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশনকেই করতে হবে। আমি আগেই বলেছি, ভোট ৩০০ আসনে একদিনে না করে বিভাগওয়ারি করলে ভোটকেন্দ্র বেশি হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক নিয়োগে অসুবিধা হবে না। ভোট বিভিন্ন দিনে হলেও ভোট গণনা একই সময়ে হতে হবে। ভোট বাক্সগুলো সাবধানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো দল বা গোষ্ঠী যাতে ভোট বাক্স ছিনতাই করতে না পারে, তার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
আমরা দেশের ১৮ কোটি মানুষ ভালো ভোটের অপেক্ষায়। মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৬৩ লাখ। সবার ভোট আমরা কাস্ট করার ব্যবস্থা করতে চাই। ৬০% থেকে ৭০% ভোটারের ভোটে যাতে নেতা বানানো যায়, তার জন্য পিআর পদ্ধতির বিকল্প নেই। কোনোমতে সর্বাধিক ভোট- তা যদি ৩০%ও হয়, তার আলোকে আমরা নেতা বানাতে চাই না। যদি ৩ জন প্রার্থী হয়, তবে একজন পেল ২৫%, আরেকজন ৩৫%, আরেকজন ৪০% পেল। বর্তমান পদ্ধতিতে কিন্তু ৪০% প্রাপ্ত প্রার্থীকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হবে। কিন্তু ৬০% ভোট অকার্যকর হয়ে গেল। আমরা সর্বাধিক ভোটারের মতকে প্রাধান্য দেয়ার জন্যই পিআর পদ্ধতি চাই। দুনিয়ার প্রায় ১০০টি দেশে পিআর পদ্ধতি কার্যকর আছে। তাই আমরা জনগণের প্রত্যক্ষ এবং সর্বাধিক অংশগ্রহণের ভোট চাই। সর্বাধিক প্রাপ্ত ভোটের নেতাকে আমরা সংসদে পাঠাতে চাই।
ভুলে গেলে চলবে না আমাদের ২ হাজার শহীদ, ৩০ হাজার আহত বিপ্লবী যোদ্ধাদের কথা। যারা বৈষম্যহীন দেশের জন্য তাজা রক্ত দিয়ে গেছে। এখনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। পঙ্গুত্ববরণ করেছে। চোখ হারিয়ে হাসপাতালে অসহায়ত্ববরণ করে জীবন কাটাচ্ছে। আমরা যারা নির্বাচনের ডামাডোল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছি, তাদের কয়জন আত্মীয় শহীদ হয়েছে, কয়জন পঙ্গুত্ববরণ করেছে, কয়জন আহত হয়েছে, কয়জন জেলে গেছে, কয়জন আয়নাঘরে অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেছে, কয়জন গুম-খুন হয়েছে, তা ভাবতে হবে।
দেশীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো ষড়যন্ত্রে পা দেওয়া যাবে না। প্রতিবেশী ভারত কোনোদিনই আমাদের ৯২% মুসলমানের দেশ ভালোভাবে চলুক, তা সহ্য করতে পারেনি।
পত্র-পত্রিকায় প্রতিবেদন সূত্রে প্রকাশ, বাংলাদেশের মানুষের লুট করা টাকা ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা দিয়েছে দেশ অস্থিতিশীল করার জন্য। তাছাড়া তাদের ব্যাংক লুট করা টাকা দেয়ার মানুষ আরো অনেকে আছে। কিছুই কাজে লাগবে না, যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকি। তাই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ভাবতে হবে শহীদ জিয়াউর রহমান এবং আপনার আদর্শে আপনার দল চলছে কিনা। চাঁদাবাজির জন্য প্রায় ১০ হাজার নেতাকর্মীকে আপনার দল বহিষ্কার করেছে। তার মানে হলো তারা দোষী। আপনি বেঁচে থাকতে আপনার দলকে ‘র’মুক্ত করে যান। জনগণের দল বানাতে নির্দেশ দেন।
জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান সাহেব সুস্থ হয়ে উঠছেন। তাকেও দেশের এ ক্রান্তিলগ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। ফ্যাসিস্টবিরোধী; বিশেষ করে ইসলামী দলগুলোর ঐক্য খুবই জরুরি। জামায়াতকেই এ ব্যাপারে মূল ভূমিকা রাখতে হবে। আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হলেই দেশ ভালো চলবে। দুনিয়ায় আমরা শান্তির নীড় গড়ে তুলব, আখিরাতে সীমাহীন শান্তি ভোগ করতে পারব, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : [email protected]