ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:৩০
॥ মাহমুদুল হক আনসারী ॥
বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতসহ অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে। একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই লুটপাট চালায়। অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের নির্দিষ্ট নিয়মনীতিতে চলেনি। বিশেষ গোষ্ঠী তাদের স্বার্থের জন্য ব্যাংক খাতকে ব্যবহার করেছে। ধ্বংস করেছে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক খাতকে। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অথবা কাউকে নাজেহাল করার উদ্দেশ্যে এই লেখা নয়। বাস্তবতা হচ্ছে ব্যাংক লুটকারী কয়েকজন ব্যক্তির জন্য আজ লাখ লাখ আমানতকারী তাদের কষ্টার্জিত আমানতের টাকা ফেরত পাচ্ছে না। খালি হাতে ওই ব্যাংকগুলো থেকে ফেরত আসতে হচ্ছে।
কারো মেয়ের বিয়ে, কারো চিকিৎসার প্রয়োজন, কেউ সন্তানকে বিদেশ পাঠাবে, সাংসারিক নিয়মিতভাবে খরচ করার জন্য ব্যাংক গ্রাহকের জমাকৃত অর্থ দিতে পারছে না। দুঃখজনক ও পরিতাপের বিষয় হলোÑ কী পরিমাণে গ্রাহকের ভোগান্তি, সেটি পরিষ্কার করে বলতে পারবো না। গ্রাহকগণ কার কাছে যাবেন, সমাধান কী, কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না। বর্তমান সরকারের বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর অনেকগুলো বক্তব্য দিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহক গভীর আশা নিয়ে একটি বছর অপেক্ষার প্রহর গুনছে। কিন্তু বাস্তবে আজ পর্যন্ত বিরাট আকারের এই মানুষগুলো সমাধানের কোনো রাস্তা খুঁজে পাচ্ছে না। ফলে ওইসব ব্যাংকের সাথে সম্পৃক্তদের হতাশা-দুশ্চিন্তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আসলে এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কী ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে, সেটি দেখার অপেক্ষায় জনগণ। বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক ও আমানতকারীদের পূর্ণ অভিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো লোন কোনো অর্থ ব্যাংক থেকে ছাড় হয় না। বড় আকারের হাজার হাজার কোটি টাকার ছাড় পাওয়া এটি কোনো শাখা ম্যানেজারের কাজ নয়। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের এমডি-ডিরেক্টর সকলের সম্পৃক্ততা থাকে। ফলে বড় বড় অংকের অর্থ পাচার করা সম্ভব হয়েছে। সুতরাং রাষ্ট্র, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এ দুর্নীতির সাথে সবাই জড়িত। তাদের আইনের আওতায় না এনে ব্যাংকের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদচ্যুতি করে এ দুর্নীতির লাগাম টানা সম্ভব হবে না। আগামীতে আর কেউ যেন অর্থ খাতকে নিয়ে জঘন্য জালিয়াতি-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ পাচার করতে না পারে। কঠোরভাবে এ খাতকে সংস্কার করতে হবে। দুর্নীতির রাঘব-বোয়ালদের ফেরত এনে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে হবে। সরকারকে পাচারকৃত আমানতের টাকা ফেরত আনতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে শুনছি। যার মধ্যে রয়েছে মার্জার (একীভূতকরণ) প্রক্রিয়া, বিশেষ তহবিল গঠন এবং ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর মতো নতুন আইন প্রণয়ন। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা ও আর্থিক লেনদেনে নতুনত্ব আনার মাধ্যমে আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে কাজ করছে বলে গণমাধ্যমে জানা যায়, যা আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।
গ্রাহকদের আমানতের টাকা ফেরত দিতে এবং তারল্য সংকট রোধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ তহবিল গঠন করার কথা বলছে। তবে এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। আর্থিক লেনদেনে নতুনত্ব এনে সার্বিকভাবে আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কর্মসূচির কথা শুনতে পাচ্ছি। দীর্ঘসময় পেরিয়ে যাওয়া খেলাপি ঋণগুলো ফেরত আনা ব্যাংকের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে ব্যাংক সংশ্লিষ্টগণ, যা মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। ব্যাংকারদের মনোবল ফিরিয়ে এনে তাদের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি, যা ব্যাংক খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাংক খাতকে দুর্নীতিমুক্ত না করলে বিনিয়োগকারী ও আমনতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই কালবিলম্ব না করে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনুন। আমানতকারীদের লেনদেনের বৈধ পথ দুর্নীতিমুক্ত করুন।
লেখক: সংগঠক, গবেষক, কলামিস্ট
ইমেইল: [email protected]