গাজা জ্বলছে, মিয়ানমারে কাঁদছে মানবতা: কী করছে বিশ্ব


৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:১২

সোনার বাংলা আন্তর্জাতিক ডেস্ক : গাজা জ¦লছে। প্রতিদিন নিহত হচ্ছে নারী-শিশুসহ শত শত বনি আদম। মিয়ানমারে কাঁদছে মানবতা। বিশ্বনেতারা কী করছেন? রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিশ্বনেতারা নীরব থেকে যদি ভাবেন এর উত্তাপ তাদের লাগবে না, তবে তারা ভুল করছেন। এখনই তাদের এগিয়ে আসতে হবে। জাতিসংঘ, ওআইসির নীরবতা গোটা বিশ্বকেই এক দিন গ্রাস করবে, সেদিন আর কেউ কোনো পথ খুঁজে পাবে না। তাই আর বসে থাকা নয়, মানবতাবাদী প্রত্যেক মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। ধর্ম-বর্ণ গোত্র বিচারের সময় নেই। আদম আ.-এর সব সন্তানদেরই দায়িত্ব তাদের ভাইদের পাশে দাঁড়ানো। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো দানবদের এখনই থামাতে হবে।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘সিদ্ধান্তমূলক পর্যায়ে’ পৌঁছানোর ঘোষণার পর গাজায় হামলা আরও জোরদার হয়েছে। দখলদার বাহিনীর আগ্রাসনে গত মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) সারাদিনে অন্তত ১০৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। খবর আল-জাজিরার। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, ইসরাইল গাজার সবচেয়ে বড় নগরকেন্দ্রটির (গাজা সিটি) নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। যেখানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বসবাস করেন। এ কারণে আরও বর্বর হয়ে উঠেছে জায়নিস্ট বাহিনী। মঙ্গলবার একদিনেই গাজাজুড়ে অন্তত ১০৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। বিশেষ করে আল-সাবরা এলাকায় ইসরাইলি হামলা ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল ধ্বংস করে দিয়েছে। নিহতদের মধ্যে অন্তত ৩২ জন ত্রাণ সহায়তার খোঁজে গিয়ে প্রাণ হারান। যার মধ্যে সাতজন শিশু। তারা সবাই দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের নিকটবর্তী আল-মাওয়াসি এলাকায় পানির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ইসরাইলি ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান।
আল-জাজিরার সাংবাদিক হিন্দ খুদারি বলেন, ‘ফিলিস্তিনিরা এখন গাজা সিটিতে যেন খাঁচার ভেতরে বন্দি। তারা যতটা সম্ভব বিমান হামলা থেকে বাঁচতে চেষ্টা করছে। কিন্তু যেখানে যাচ্ছে, হামলা তাদের অনুসরণ করছে। খাদ্য ও সাহায্যের অবরোধে তারাও মারা যাচ্ছে। কারণ তারা ন্যূনতম বেঁচে থাকার উপকরণও পাচ্ছে না।’ এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ১৩ জন অনাহারে মারা গেছেন। এতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ক্ষুধাজনিত মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৬১ জনে। এর মধ্যে ৮৩ জন মারা গেছেন ২২ আগস্ট গাজায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত এক মাসে গাজায় প্রবেশ করা মানবিক সহায়তার ট্রাক সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ১৫ শতাংশ। তবু ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আগস্টে জাতিসংঘ সমর্থিত খাদ্য নিরাপত্তা মূল্যায়ন সংস্থার (আইপিসি) দুর্ভিক্ষ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের সত্যতা অস্বীকার করে একে ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ বলে দাবি করেন।
এরদোগানের আহ্বান
চলতি মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগদানের জন্য ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের সদস্যদের মার্কিন ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত ‘পুনর্বিবেচনা’র ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান। ইস্তাম্বুল থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে। গত গত ৩০ আগস্ট শনিবার একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগদানের জন্য ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের ৮০ জন সদস্যেরই ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হবে। ওই প্রতিনিধিদলে রয়েছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত ইসরাইল সরকারের চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে মিলে যায়। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ঘোর বিরোধিতা করে আসছে ইসরাইল। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার বৈঠকে যোগদানের পর চীন থেকে ফেরার পথে বিমানে তুর্কি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এরদোগান বলেন, ‘ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের মূলনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, (যুক্তরাষ্ট্রের) সিদ্ধান্তটি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সংশোধন করা প্রয়োজন।’
ফিলিস্তিনের পক্ষে বরাবরই সরব এরদোগান। ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসনের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ‘ফিলিস্তিনে গণহত্যা’র অভিযোগও করেছেন তিনি।
মিয়ানমারে নতুন করে নৃশংসতার সতর্কবার্তা
মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক মিয়ানমারের রাখাইন অঙ্গরাজ্যে বেড়ে চলা নৃশংসতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির বর্তমান পরিস্থিতি ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের সাথে ‘দুঃখজনকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ’। ওই অভিযানের কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন।
গত মঙ্গলবার জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার সেনারা প্রায় ৭ হাজার ১০০ জনকে হত্যা করেছে, যাদের এক-তৃতীয়াংশ নারী ও শিশু। অন্তত ২৯ হাজার ৫৬০ জনকে রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ২২ হাজারের বেশি এখনো সামরিক নিয়ন্ত্রিত আদালতে বিনা বিচারে আটক রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইনে সহিংসতা বিস্তারে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। শুধু ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। আগে থেকে শরণার্থী শিবিরে থাকা প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে তারাও যুক্ত হয়েছেন।
টুর্ক বলেন, রোহিঙ্গা ও জাতিগত রাখাইন উভয় সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। সেনারা বেসামরিক নাগরিক ও সুরক্ষিত স্থাপনায় নির্বিচারে হামলা চালাচ্ছে। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, গুম, ইচ্ছামতো গ্রেপ্তার, অগ্নিসংযোগ, সম্পদ ধ্বংস, মানবিক সহায়তা বন্ধ এবং ভীতি সঞ্চারের জন্য বারবার নৃশংসতা চালানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মি প্রায় সম্পূর্ণ দায়মুক্তির সঙ্গে কাজ করছে। এতে বেসামরিক জনগণের ওপর ভয়াবহ নিপীড়নের চক্র চলছেই। ভিডিও ও ছবিতে যে মৃত্যু, ধ্বংস ও বেপরোয়া ভাব দেখা যাচ্ছে, তা ২০১৭ সালে সেনাদের রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নৃশংসতার ছবির সঙ্গে দুঃখজনকভাবে মিলে যাচ্ছে। একই ঘটনা আবার ঘটছে দেখে আমি গভীরভাবে ব্যথিত।
জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান মিয়ানমারের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে সম্পূর্ণভাবে প্রেরণের জন্য পুনরায় আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন অব্যাহত থাকার পাশাপাশি দায়মুক্তি বিদ্যমান থাকায় এ উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
২০২৫ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বিগত ১৪ মাসের তথ্যের আলোকে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মিয়ানমারের বেসামরিক লোকদের প্রাণহানির প্রায় অর্ধেকই বিমান হামলায় ঘটেছে। এতে আরও নতুন প্রবণতার কথা বলা হয়- যেমন বিস্ফোরকে রাসায়নিক ব্যবহার এবং ‘প্যারামোটর’ দিয়ে বেসামরিক এলাকায় বোমা নিক্ষেপ।
টুর্ক জরুরি মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, এ বছর মিয়ানমারের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে।
তিনি বলেন, এমন ভয়াবহ সহিংসতা বন্ধে এবং বছরের পর বছর সহিংসতা, অনাহার ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়ে মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত জনগণের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার সময়।
তিনি আরও বলেন, এজন্য জরুরি ভিত্তিতে অর্থায়ন প্রয়োজন। আমি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি অনুরোধ জানাই, তারা যাতে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর দায়িত্ব পালনে সব পক্ষকে বাধ্য করে এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত বিশ্বের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দাতা বাংলাদেশ মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক চাপ জোরদারের আহ্বান জানিয়ে আসছে বলে পর্যবেক্ষকরা জানান।