অস্থির নিত্যপণ্যের বাজার
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:০৯
স্টাফ রিপোর্টার : নিত্যপণ্যের বাজার ওঠানামার মধ্যে রয়েছে। সবজির মূল্য না কমলেও ব্রয়লার মুরগির ডিমের দাম কমেছে। এক ডজন ডিমের মূল্য গত ৩১ আগস্ট রোববার পর্যন্তও ১৪৫ টাকা ছিল, এখন তা কমে ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকার মধ্যে ক্রয় করা যাচ্ছে। রাজধানীর মহল্লার দোকানে খুচরা ক্রেতারা এই দামে ডিম কিনতে পারছেন। অন্যদিকে আলুর বাজার নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত ২৭ আগস্ট ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে নিয়ে হিমাগারের গেটে আলুর দাম কেজিপ্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। ফলে দেশের খুচরা বাজারে আলুর মূল্য কত দাঁড়ায়, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে ভোক্তারা। অন্যদিকে পেঁয়াজ বাড়তি দামেই কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। আর মাছের মূল্যও কমছে না।
ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে নিয়ে হিমাগারের গেটে আলুর দাম কেজিপ্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। গত ২৭ আগস্ট সরকারি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে আলুর বিক্রয়মূল্য উৎপাদন খরচের সঙ্গে ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায়’ কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। “কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষায় এবং উৎপাদিত আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনায় একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সভাপতি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের সচিবদের সদস্য করে এই চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনার পর সরকার তিনটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেগুলো হলো- হিমাগারের গেটে আলুর ন্যূনতম মূল্য কেজিপ্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ; সরকারি উদ্যোগে ৫০ হাজার মেট্রিক টন আলু ক্রয় ও হিমাগারে সংরক্ষণ করে ২০২৫ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বাজারে বিক্রি; আগামী মৌসুমে আলু চাষিদের প্রণোদনা প্রদান।” সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নেবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। নতুন আলু বাজারে আসে শীতের শেষ দিকে। মোটামুটি ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আলুর দাম কম থাকে। মার্চ-এপ্রিল মাস থেকে হিমাগারে আলু মজুদ করেন কৃষক ও আড়তদাররা। এরপর সারা বছর হিমাগার গেট থেকে পাইকারি দরে আলু বিক্রি হয়। সেই দরই ২২টাকা নির্ধারণ করা হলো। অর্থাৎ হিমাগার থেকে পাইকারের হাত ঘুরে খুচরো দোকানে আসতে আসতে সেই আলুর দাম বেশ খানিকটা বাড়বে।
রাজধানীর বাজারগুলোয় খবর নিয়ে দেখা গেছে, এক মাসের বেশি সময় ধরে ঢাকায় পেঁয়াজ, রসুন ও আদার দাম চড়া। দেশি ও ভারতীয় পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ৮০ টাকায় ঠেকেছে। তবে দেশি রসুন কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও বিদেশি রসুনের দাম দ্বিগুণের কাছাকাছি। দেশি পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭৮ থেকে ৮০ টাকায়। আবার মান ও আকারভেদে ৮৫ টাকাও চাইছেন কিছু বিক্রেতা। একই দামে পাওয়া যাচ্ছে ভারতীয় পেঁয়াজও। আবার রসুনের বাজারেও রয়েছে বড় ফারাক। দেশি রসুন বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়, কিন্তু বিদেশি রসুনের দাম ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। আর দেশি আদা ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় মিললেও চীনা আদা ২০০ থেকে ২২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতাদের মতে, এ বছর দেশি পেঁয়াজের উৎপাদন ভালো হলেও কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে দাম কমছে না। অন্যদিকে ভারতীয় পেঁয়াজের ক্ষেত্রে আমদানি নিয়মিত না হওয়ায় বাজারে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এতে দাম স্থিতিশীল না থেকে উল্টো বেড়েই চলেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রসুন ও আদার বাজার অনেকটাই আমদানিনির্ভর। চীনা আদা বা ভারতীয় রসুন সীমান্তে আটকে গেলে বা পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে খুচরা দামে। তাদের ভাষ্য, পাইকারি বাজার থেকেই যখন বেশি দামে কিনতে হয়, তখন খুচরা বাজারে তা কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হয় না।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক মাসে মুরগি ও মাছের দামে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি হয়েছে, অথচ গরু-খাসির দাম স্থিতিশীল থাকলেও সেটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। বাজারে বিক্রেতারা যেখানে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন, সেখানে ক্রেতারা বলছেন, যতদিন পর্যন্ত কার্যকর বাজার তদারকি না হবে, ততদিন সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে। জানা গেছে, এক মাসের ব্যবধানে মুরগি ও মাছের দাম ক্রমবর্ধমান। ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে ১৮০-২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সোনালি মুরগি কেজিতে এখন ২৯০ থেকে ৩২০ টাকা, দেশি মুরগি ৬৫০ টাকার ওপরে। এছাড়া বাজারে গরুর গোশত কেজি ৭৫০ থেকে ৭৬০ টাকায় এবং খাসির গোশত কেজি ১,১০০ থেকে ১,১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজারেও বাড়তি। বাইলা মাছ কেজি ৮৫০ টাকা, ট্যাংরা ৮০০, চিংড়ি ১,০০০, পাবদা ৪০০, তেলাপিয়া ২৫০ এবং পাঙাশ ২০০ থেকে ২৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত মাসে বাইলা ছিল ৭৫০, টেংরা ৭৫০, পাবদা ৩৫০, চিংড়ি ৯০০, তেলাপিয়া ২১০ থেকে ২২০, আর পাঙাশ ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা। অর্থাৎ এক মাসে অধিকাংশ মাছের দাম কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
প্রসঙ্গত, বাজারে নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি চলছে, কিন্তু কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ নেই। ক্রেতাদের অভিযোগ ভাষ্য, প্রায় প্রতিদিনই বাজারে এসে নতুন দামের মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে পেঁয়াজ-রসুন ও আদার মতো রান্নার অপরিহার্য উপকরণগুলো হঠাৎ চড়া দামে কিনতে হচ্ছে। মাছ ও গোশতের চিন্তাও করতে পারছেন না অনেক ক্রেতা। তাদের মতে, সরকারি সংস্থার তদারকি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ, বাস্তবে এর কোনো প্রভাব বাজারে দেখা যায় না। ফলে আগের অবস্থায় ফিরছে নিত্যপণ্যের বাজার।