আলোকে তিমিরে

এদেশে জনপ্রিয়রাই কাজ করেছেন


২৯ আগস্ট ২০২৫ ১৪:৪৮

॥ মা হ বু বু ল হ ক ॥

দেশটা নিয়ে ভাবা যায়। চিন্তা করা যায়। কথা বলা যায়। তর্ক-বিতর্ক করা যায়। পক্ষের লোকের সঙ্গে কথা বলা যায়, আবার ক্ষেত্রবিশেষে বিপক্ষের লোকের সঙ্গেও কথাবার্তা বলা যায়। লেখালেখি করা যায়। সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক, সাধারণ বৈঠক, আঙিনা বৈঠক, মানববন্ধন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ কত কিছুই তো করা যায়। যাচ্ছেও। হাজারো রকম বিষয়। বিষয়ের কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই।
একসময় সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বা উপসম্পাদকীয় দূরে থাক, চিঠিপত্র কলমে ভালো একটা চিঠি এলেও আমরা ঝাঁপিয়ে পড়তাম। বন্ধু-বান্ধবের সাথে সেই চিঠি নিয়ে সমস্যা ও সম্ভাবনার রাস্তাগুলো চিহ্নিত করতাম। বুদ্ধি-পরামর্শ করতাম। আলোচনার ভিত্তিতে যারা লিখতে পারতাম, তারা লিখে ফেলতাম। অনেক সময় দেখা যেত- যারা লিখতে পারে, তাদের তুলনায় যারা ভাবতে পারে, চিন্তা করতে পারে, গবেষণা করতে পারে, তারা অনেক বেশি গবেষণা করতে পারে। অনেক ভালো পরামর্শ দিতে পারে। উপদেশ দিতে পারে। নিজেরা হয়তো লিখতে চায় না। কিন্তু লেখাতে পারে। এদের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে অনেক সম্পদ থাকে, যা তারা অবলীলাক্রমে বিতরণও করতে চায়। আমাদের সমাজে এ ধরনের মানুষের অভাব নেই। লেখার মানুষের অভাব ছিল একসময়, এখন সে অভাবও নেই। পূর্বে মেয়েরা নিজস্ব গণ্ডির বাইরে খুব বেশি লেখালেখি করত না। এখন সে অবস্থাও দূর হয়ে গেছে। পুরুষের সঙ্গে পাড়ি দিয়ে মহিলারাও কম লিখছেন না, কম পরামর্শ দিচ্ছেন না। কখনো এ কথা বলছেন না যে, একটু আমার হাজব্যান্ডকে জিজ্ঞেস করে নেই বা আমার বড় ভাই বা বড় বোনের কাছে জিজ্ঞেস করে নিই।
বলার বা লেখার সামর্থ্য আমাদের অনেক আগেই সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু দেশের তথাকথিত রাজনৈতিক কারণে সেই সামর্থ্য বা শক্তিকে আমরা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি।
২০২৪-এর ৫ আগস্টে সেই অর্গল আমাদের ভেঙে গেছে। আমরা এখন অন্তত দুটি বিষয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছি- ১. বাকস্বাধীনতা। ২. সংবাদপত্রসহ মিডিয়ার স্বাধীনতা।
এখন আমরা যা খুশি বলতে পারি। যা খুশি শুনতে পারি। কিন্তু আমরা সবকিছু ভালোভাবে শুনি না। এখানে এসে একটু বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছি আমরা। সরকারও যা খুশি বলতে পারে কিন্তু সবকিছু শুনতে পারে না। শোনার ব্যাপারে শতভাগ স্বাধীনতা থাকলেও সেই স্বাধীনতা তারা ভোগ করতে পারে না। এক্ষেত্রে তারা অনেকটা পরাধীন। নিজেদের স্বার্থেই পরাধীন। তারা জানে সবকিছু শুনলে তারা টিকতে পারবে না। এগিয়ে যেতে পারবে না। সে কারণেই ক্ষমতা গ্রহণের প্রাক্কালে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে খুব সংক্ষিপ্ত একটি ভাষণে বলেছিলেন, ‘তোমরা যদি আমার কথা শোনো, আমার কথা মানো, তাহলে তোমাদের দাবি আমি মেনে নেব। কিন্তু তোমরা যদি আমার কথা না শোনো, না মানো, তাহলে আমাকে ছেড়ে দাও। আমার অনেক কাজ আছে।’
তিনি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে একটা দামি ওয়াদা পাস করে নিয়েছিলেন।
কেউ কিন্তু সেদিন বলেনি, আপনি ২৪-এর বিপ্লবকে অগ্রাহ্য করলে, সর্বোচ্চ পর্যায়ে মূল্যায়ন না করলে, দেশবাসীকে অবজ্ঞা করলে, অবহেলা করলে, দেশ ও জাতির ক্ষতি করলে আপনার কথা আমরা শুনবো না।
উপর্যুক্ত কথাগুলো কেউ তখন বলেনি, বলার সাহসও পায়নি। কারণ ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে নেমেই তিনি সেসব কথা বলেছিলেন। একদিকে সেনাবাহিনীসহ প্রতাপশালী একটি গ্রুপ দুর্বিনীতভাবে দাবি করছিল, ঢাবির একজন শিক্ষকের ওপর দেশ ও জাতির যাবতীয় ভার অর্পণ করতে; অপরদিকে ছাত্র-জনতার বিপ্লবী গ্রুপের দাবি ছিল, নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর রাষ্ট্র ও সরকারের যাবতীয় দায়দায়িত্ব অর্পণ করতে।
ক্ষমতা গ্রহণের পূর্বেই কথা উঠেছিল আমাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের শপথ বাক্যগুলো সঠিক ও সময়োচিত নয়। শপথের বাক্যগুলো সংস্কার করা দরকার। কিন্তু কে শোনে কার কথা। বন্দুকের গুলি বেরিয়ে গেলে আমরা সবসময় কথা বলি। কথাগুলো পূর্বে ঠিকঠাক করি না। এবারের শপথবাক্যগুলো সংশোধন করা হয়েছিল কিনা, সময়োচিত করা হয়েছিল কিনা মনে পড়ছে না। মনে হয় বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের কথা শপথের কথামালার মধ্যে সংযোজন করা হয়নি।
সে যাক। পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারণে তখন যা যা ঘটেছিল এবং এখন যা প্রতিনিয়ত ঘটছে, তার ফারাক আকাশ আর জমিনের মতো ব্যবধান।
একটা কথা আছেÑ ‘আইনকানুন না থাকতে পারে, কিন্তু একজন বিচারক বা প্রশাসকের বিবেক তো আছে।’
আমাদের দেশে আইনকানুন কম নাই।
সব সরকারই দেশ ও জাতির প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করেনি। আইন প্রণয়ন করা হয়েছে যার যার দলীয় স্বার্থে। আর বড় সত্য কথা হলো, যাদের আইন প্রণয়ন করার কথা, এ দেশে তারা তো আইন প্রণয়ন করেন না। আইন রচনা করেন না। আইন রচনা করেন আইন মন্ত্রণালয়ের সরকারি কর্মচারীরা। অথবা সরকারি দলের আইন বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা। নির্দেশটা নাযিল হয় প্রথমত সরকারি দলের প্রধানের মুখ থেকে, যিনি আবার দেশের প্রধানমন্ত্রী। তারপর সেটা চলে যায় আইনমন্ত্রীর কাছে। আইনমন্ত্রী সরকারি দলের আইন বিশেষজ্ঞদের কাছে তা পাঠান এবং তার কপি দেন আইন বিভাগের বিশেষজ্ঞদের কাছে। আমাদের দেশের এমপিরা এসব কাজ পান না এবং তারাও তা চান না। তাদের প্রধান কাজ হলো নিজেদের জন্য, এলাকার জন্য এবং দলের জন্য অর্থ সম্পদ সংগ্রহ করা। গত ৫৪ বছর ধরে আমাদের দেশের আইনপ্রণেতারা এ তিনটি কাজই খুব নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে সম্পন্ন করে আসছেন। সংসদ অধিবেশনের সময় তাদের কাজ হলো সম্মিলিতভাবে হ্যাঁ বা না বলা, টেবিল থাপড়ানো এবং বিরোধীদলের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করা। সংসদে এসব কাজে যারা নেতৃত্ব প্রদান করেছেন, তারাই আরো ওপরের দিকে উঠে এসেছেন। যা হোক, এসব তথ্য আমাদের দেশের স্বল্প শিক্ষিত জনগণও জানেন। এসব হাবিজাবির কারণে আইনকানুনের ওপর দেশপ্রেমিক নাগরিকদের তেমন কোনো আস্থা নেই। এদেশের মানুষের এখনো আস্থা আছে মোটামুটিভাবে ভালো মানুষের ওপর। দলের ওপর আস্থা আছে, তাও দলের আইনকানুনের ওপর নয়, দলের প্রধান ব্যক্তির ওপর।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা ছিল। সে কারণে তিনি অন্তত ৫-৬টি বছর যা খুশি তাই করতে পেরেছেন। সর্বশেষ বাকশাল করে তিনি সব হারিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কিছু কৌশল করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। দেশপ্রেমিক হিসেবে দেশ ও জাতির জন্য কিছু কাজও করতে পেরেছিলেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন, চিন্তা ও পরিকল্পনার মধ্যে এলোমেলো অবস্থা ছিল। গন্তব্য স্থির করতে পারছিলেন না। জাতির লক্ষ্য ও আদর্শ চিহ্নিত করতে পারছিলেন না। শুরুর দিকে চিন্তা-চেতনা ও কর্ম ছিল ডানদিকে। মাঝে দৃষ্টিটা দিলেন বামদিকে। শেষে খাল কেটে দেশ ধ্বংসের কুমির আনলেন। (এ খাল সে খাল নয়) দেশ ধ্বংসের কাজটা এখানেই শুরু হয়ে গেল। অর্থাৎ একাশিতেই আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেল। জিয়াউর রহমানের জানাজার সাথে সাথে এদেশের সুস্থ ও দেশপ্রেমিক নাগরিকদের স্বপ্নেরও জানাজা হয়ে গেল। বড় কুমির আর ছোট কুমিরের (চিনেছেন তো?) প্রশিক্ষণ কিন্তু প্রায় একই সময়ে একই দেশে হয়েছে। সেটাও সবাই জানে। সেই তথাকথিত বন্ধু দেশেরই ইঙ্গিতে ছোট কুমির প্রায় ১০ বছর মূল্যবোধ ও সুনীতির কবর রচনা করে নতুন করে দুর্নীতির গাছ রোপণের মাধ্যমে এদেশ শাসন করেছেন। তিনি কি কোনো জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছিলেন? নিজের জেলা (রংপুর) ছাড়া আর কোথাও কি তিনি দল গোছাতে পেরেছিলেন?
শহীদ জিয়াউর রহমানের পর আমাদের তথাকথিত বন্ধু দেশ চাইছিল, বড় কুমিরকে ক্ষমতায় বসাতে। কিন্তু আমাদের সেনাবাহিনী সেটা চাচ্ছিল না। ফলে হঠাৎ করে মূল সিদ্ধান্ত পাল্টে যায়। আমাদের সেনাবাহিনী বন্ধু দেশের বিরুদ্ধে চলে যাক, সেটাও বন্ধু দেশ চাচ্ছিল না। ফলে মাঝখানে ক্ষমতার আসনে বসে গেল ছোট কুমির। কথা ছিল ছোট কুমির বড় কুমিরের জন্য পথ-ঘাট পরিষ্কার করবে। তাঁর দায়িত্ব ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের মতো। কিন্তু ক্ষমতার মসনদের ওপর এক ধরনের ‘এঢেসিভ’ থাকে। সহজে কেউ চলে আসতে পারে না। কারণ এঢেসিভটা অনেকটা চুম্বকের মতো। চুম্বকের আকর্ষণকে অনেকেই উপেক্ষা করতে পারে না। ছোট কুমিরও পারেনি। এখান থেকেই শুরু হয় দুই কুমিরের মনোমালিন্য। দুই এজেন্টের মধ্যে রেষারেষি। বড় কুমিরের হাজব্যান্ডের বাড়ি রংপুর, তিনিও এ বিষয়ে কোনো সহযোগিতা করতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। সংসারেও শুরু হলো মনোমালিন্যতা। হাজব্যান্ডের মৃত্যু পর্যন্ত যার কোনো সুরাহা হয়নি। আমাদের সেনাবাহিনীর ওপর বড় কুমির ১৯৭৫ সাল থেকেই ছিলেন বিদ্বেষপরায়ণ। তার ওপর সেনাবাহিনীর কারণে দীর্ঘসময় ক্ষমতায় না যেতে পারা, এসব ছিল সাংঘাতিক ক্রোধ ও হিংসা-বিদ্বেষের বিষয়।
দেশবাসী খুব ভালো করেই জানে, যার প্রতিশোধ তিনি নিয়েছেন, দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে ধ্বংস করে।
বলছিলাম, বাংলাদেশ আইনকানুন দিয়ে চলেনি। অথচ এখন প্রতি মুহূর্তে আইনকানুনের কথা বলা হচ্ছে। যারা নিজের জীবনে, পারিবারিক জীবনে, সামাজিক জীবনে, সরকারি জীবনে এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে কখনো আইনকানুনের তোয়াক্কা করেনি, তারা এখন মুখ ব্যাদাম করে সংবিধান ও রাষ্ট্রের নানারকম আইন ও বিধানের কথা অহরহ কপচাচ্ছে।
২৪-এর বিপ্লব সংবিধান ও আইনকানুনের মাধ্যমে সংঘটিত হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাও শাসনতন্ত্র ও আইন-বিধানের মাধ্যমে হয়নি। বার বার সামরিক শাসন এসেছে। আইন-বিধানের মাধ্যমে আসেনি। বার বার জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া কোন নির্বাচনটি আইনের বিধানের মাধ্যমে হয়েছে? সুতরাং আইন ও বিধানের মাধ্যমে যেহেতু এখন পর্যন্ত কিছুই হয়নি, সুতরাং একটু অপেক্ষা করে সংবিধান ও আইনকানুন ঠিক করে আমরা নতুন করে এগোতে শুরু করি। জগাখিচুড়ি করে এগোতে গেলে সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। কারণ দেশের সেক্যুলার রাজনৈতিক দলগুলো সব ভেতরে ভেতরে এক হয়ে গেছে। তার মানে দেশের অন্তত শতকরা ৩০% মানুষ একত্রিত হয়ে গেছে। এর সাথে যোগ হয়েছে বিভিন্ন পেশার বিভিন্ন রকম বাহিনী, শিল্প ও ব্যবসায়ী মহল, এনজিও, ইসরাইলের পক্ষের বৃহত্তর মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ, পাশ্চাত্য সভ্যতা তথা সেক্যুলার বিশ্ব। যখনই দেশের অভ্যন্তরে সাধারণ মুসলিম জনতা একটু নিজেদের দিকে ফিরে তাকাতে চাচ্ছে, নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, দর্শন, ধর্ম, জীবনবিধান, শিক্ষাব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে একত্রিত হচ্ছে, আলোচনা করছে, সভা, বৈঠক, মিছিল ইত্যাদি করছে, তখনই সারা বিশ্বে হইহই পড়ে যাচ্ছে এই বলে যে, বাংলাদেশ আবার পেছনের দিকে হাঁটা শুরু করেছে। মৌলবাদীরা এগিয়ে যাচ্ছে। হামাসের বন্ধুরা এগিয়ে যাচ্ছে। ইখওয়ান এগিয়ে যাচ্ছে। মওদূদীর চেলা-চামুণ্ডারা এগিয়ে যাচ্ছে। মাটির নিচ থেকে জঙ্গি দলসমূহ সব বেরিয়ে আসছে।
এখন দেশকে বাঁচাতে হবে, দেশের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে হবে, জনগণের জান ও মাল রক্ষা করতে হবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে উচ্চকিত করতে হবে, এসবের স্লোগান নেই। সেক্যুলার সমাজ গর্জে উঠছে, মৌলবাদকে উৎখাত করতে হবে। জঙ্গিবাদকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। ধর্মান্ধতাকে নির্মূল করতে হবে। এখন এসবই হলো স্লোগান, বৈঠক, আলোচনা, সেমিনার ইত্যাদি।
মোদ্দাকথা, দেশের ইসলামপন্থী, মুসলিমপন্থী দেশপ্রেমপন্থী ও স্বদেশপন্থীরা যাতে একতাবদ্ধ না হতে পারে, সেই চেষ্টাই এখন চলছে গোটা বিশ্বময়।
এর মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী দলটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করেছে। এ জনসভার বিষয়ে ইসলামপন্থীরা তেমন কিছু বলছে না। তাঁদের দলপ্রধান তাঁর মূল্যবান বক্তৃতার সময় দুবার মাথা ঘুরে স্টেজে পড়ে গেলেন এবং সে অবস্থায় তিনি সকলের বাধা অতিক্রম করে বক্তৃতা করে চললেন। এ নিয়েও নানা কটু কথা, অশ্লীল কথা, মিথ্যা কথা বলা হয়ে গেল। তবে এ সুযোগে আল্লাহর ইচ্ছায় এই প্রথমবার দেখা গেল সেক্যুলাররাও বাধ্য হলো কিছু সত্য কথা বলতে। যেমন তারা সার্টিফাই করল : ঢাকার বুকে এর পূর্বে আর এত প্রকাণ্ড জনসভা কোনোদিন হয়নি। এটাই এ যাবৎকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্ববৃহৎ জনসমাবেশ। মনে রাখতে হবে এটা তারা আনন্দ বা উৎসাহে বলেননি। তারা হতভম্ব হয়েছেন। আতঙ্কিত হয়েছেন। দুঃস্বপ্ন দেখছেন, হায় হায় একী হলো!
বাস্তবে দেখা গেল, এ মহাসমাবেশের পর সেক্যুলারদের তৎপরতা কয়েকশতগুণ বেড়ে গেছে।
মহাসমাবেশের আগে বেশ কয়েকটি ইসলামী দলকে দেখা গেছে, তারা বড় ইসলামী দলের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা করছে। এখন দেখা যাচ্ছে, সবকিছু যেন উল্টে গেছে বা যাচ্ছে- ‘উল্টা সমঝিলারে রাম।’
প্রতিষ্ঠিত ইসলামী দল মুসলিম দল- এসব কিছু ভাবছে না। তারা নিজেদের দিকে তাকাতে শুরু করেছে। সংগঠনকে মজবুত করার চেষ্টা করছে। দেশে-বিদেশে নিজেদের অবস্থা স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
শুরুতে বলেছিলাম, এদেশে ব্যক্তিই বড়। জনপ্রিয় ব্যক্তিকেই মানুষ খুব পছন্দ করে। এখনো ব্যক্তি জিয়াউর রহমান অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু গোটা দেশবাসী প্রকাশ্যেই বলছে, বিএনপি তো জিয়ার দল নয়। এখানে জিয়ার আদর্শ নেই। জিয়ার শাহাদাতের পর বিএনপি বামপন্থা অবলম্বন করে আসছে। কখনো চীনপন্থি হচ্ছে, কখনো রুশপন্থি হচ্ছে, কখনো ভারতপন্থি হচ্ছে। কখনো আওয়ামীপন্থি হচ্ছে। এদের কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। এরা কখন কী করবে, এরা নিজেরাও জানে না।
এখন পর্যন্ত দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশের সবচেয়ে নন্দিত ও প্রশংসিত জনপ্রিয় ব্যক্তি হচ্ছেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর অভূতপূর্ব ও অচিন্তনীয় জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তিনি দেশ ও জাতির জন্য অনেক কিছু করে যেতে পারতেন। অন্তত সংবিধান, আইনকানুন, বিচার ও সংসদ, তিনি সংস্কার করে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি খুব দুর্বলতা দেখাচ্ছেন। কার কাছে তিনি কী কারণে দুর্বল, সেটা আমরা জানি না। মানুষকে তো দুর্বল থাকতে হবে সৃষ্টিকর্তা ও লালন-পালনকর্তা মহান আল্লাহর কাছে। বাহ্যিক অবস্থা পর্যালোচনা করে দুনিয়ার মানুষ বলছে, ‘বর্তমান বিশ্বে এখন তিনি এক নম্বর ব্যক্তি।’
আমরা কুরআন থেকে তাঁর জন্য দুটি আয়াত পেশ করছি। যে আয়াত তাঁর শ্রদ্ধেয় মিতা ইউনুস (আ.)-এর জন্য মহান আল্লাহ প্রেরণ করেছিলেন। আমাদের বিনীত ধারণা, এ আয়াতটি তাঁর জন্য বিপুলভাবে প্রণিধানযোগ্য।
‘স্মরণ করো (মাছওয়ালার) ইউনুসের কথা, যখন সে রেগে চলে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল আমি তার ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করব না। তারপর সে অন্ধকার থেকে ডেকে বলেছিল, তুমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তুমি পবিত্র মহান। নিশ্চয়ই আমি ছিলাম জালিম। ‘আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম, তাকে দুশ্চিন্তামুক্ত করেছিলাম। মুমিনদের আমি এভাবেই উদ্ধার করি।’ (সূরা আম্বিয়া : ৮৭-৮৮)।