অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনা
২৯ আগস্ট ২০২৫ ১৪:১২
॥ উসমান ফারুক॥
শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক দরকষাকষিতে বিজয়ী হওয়ার পর রপ্তানি, বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অমিত সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রতিযোগী ভারত ও চীনের ওপর শুল্ক বেশি হওয়ায় ক্রেতাগোষ্ঠী তাদের আমদানি কমিয়ে দিতে শুরু করেছে। কারখানা সরিয়ে বাংলাদেশে স্থাপনের জন্য চাপ দিতে শুরু করেছে। এভাবে বাংলাদেশের সামনে ধরা দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে হাতে পেতে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা শুরু করছেন ব্যবসায়ীরা। কারখানা সম্প্রসারণ ও রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন অনেক ব্যবসায়ী। দফায় দফায় বৈঠক করছেন ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে। ইতোমধ্যে চীনের বিনিয়োগকারীরা রপ্তানির নতুন বাজার ধরতে এসএমই ও ইপিজেড এলাকায় থাকা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করেছেন।
বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে। সৃষ্টি হবে লাখো ব্যক্তির কর্মসংস্থান। ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার হবে দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগে। অমিত এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সড়ক, রেল, বন্দর ও পানিপথ নিয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান করা লাগবে অতি দ্রুত। বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি সরবরাহ বাড়াতে আলাদা ছক তৈরি করতে হবে। শিল্প খাতে ব্যবসায়ী পরিচয়ে লুকিয়ে থাকা সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর পরিচয় উন্মোচন করতে পারলে নতুন যুগের অর্থনীতিতে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবে যে নতুন বাংলাদেশের পথচলা শুরু হয়, তাতে দেড় দশক ধরে ক্ষমতা ধরে রাখা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। শেখ হাসিনা একা পালিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে। পরবর্তীতে দলটির নেতা-কর্মীরাও গোপনে বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যায় অবৈধ পথে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম কূটনৈতিক সফলতা আসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে দরকষাকষিতে। এছাড়া ভারতনির্ভরতা কূটনৈতিক সম্পর্ক বদলে সব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে শুরু করে। তাতেই নতুন করে বাংলাদেশের কাছে আসতে শুরু করে সৌদি আরব, চীন, মালয়েশিয়া, কাতার, তুরস্ক, ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ।
যেভাবে এলো সুযোগ : গত এপ্রিলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৩৫ শতাংশ শুল্কারোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। কূটনৈতিক উদ্যোগ ও বাংলাদেশের নতুন পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে অনেক দরকষাকষি করার পর তা নামিয়ে ২০ শতাংশ করতে পারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ; পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া ১৯ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ওপর ২০ শতাংশ শুল্কারোপ করা হয়।
এর ফলে ভারতের চেয়েও কম মূল্যে বাংলাদেশের পোশাকসহ সব ধরনের মালামাল নিতে পারবে মার্কিন ক্রেতারা। এতে আগের ১৫ শতাংশের সঙ্গে নতুন ২০ শতাংশ মিলিয়ে মোট ৩৫ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি হবে বাংলাদেশি পণ্য। সেখানে ভারতের পণ্য প্রবেশে শুল্ক গুনতে হবে ৫০ শতাংশের বেশি। চীনের ওপর প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ শুল্ক নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়নি ট্রাম্প। আগামী অক্টোবরে শিন জিন পিং ও ট্রাম্পের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে গত অর্থবছরে বাংলাদেশ সাড়ে ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮৩ শতাংশই পোশাক হওয়ায় দেশের সবার মনোযোগ এখন এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে শীর্ষ পাঁচ প্রতিযোগী দেশের মধ্যে তৃতীয়। এরপরই আছে কম্বোডিয়া ও ভারত। আর উপরের সারিতে রয়েছে চীন ও ভিয়েতনাম।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রপ্তানি বাড়বে বাংলাদেশের। কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশি পণ্যের চেয়ে ভারত ও চীনের ওপর অতিরিক্ত শুল্কহার অনেক বেশি। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের সামনে যে বিপদ দেখা দিয়েছিল, তা তো এখন একটি সুযোগে পরিণত হতে যাচ্ছে। চীনের ওপর থেকে শুল্কহার কমতেও পারে। কিন্তু তা তো অর্ধেক হবে না। কিছুটা কমবে হয়তো। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশের সম পর্যায়ের বা কম হবে না।
মাথায় হাত ভারতের
অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ করায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতের বার্ষিক পোশাক রপ্তানির ৮ শতাংশের বেশি বাজার কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখছেন ব্যবসায়ীরা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, ভারতের কয়েকটি পোশাক কারখানাকে ইতোমধ্যে সেই কারখানা অন্য দেশে স্থানান্তরের কথা বলেছে রপ্তানি ধরে রাখতে। নইলে নতুন করে পোশাকের ক্রয়াদেশ দেবে না যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা।
ভারতের ব্যবসায়ীরাও ক্রেতাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কারখানা সরিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসার। ভারতের হারানো বাজারের বড় একটি অংশ বাংলাদেশের কাছে চলে আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি চীনের রপ্তানি বাজারের একটি অংশ দেশে চলে আসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ইতোমধ্যে রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) এ থাকা চীনের বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিনিয়োগ বাড়ানো নিয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন অনেক উদ্যোক্তা।
যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকে কার কত দখল
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দেশ থেকে বছরে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক পণ্য আমদানি করে। ২০২৪ সালে পোশাক কেনায় দেশটির প্রবৃদ্ধি ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতিষ্ঠান ওটেক্সার তথ্যানুযায়ী, গত ২০২৪ সালে বিশ্ববাজার থেকে পোশাক কেনে ৭৯ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার।
এর মধ্যে চীন রপ্তানি করে ১৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বা ২০ দশমিক ৮ শতাংশ, ভিয়েতনাম ১৪.৯৮ বিলিয়ন ডলার বা ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি করে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮৩ শতাংশই তৈরি পোশাক।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাকের মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে ৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন দেশের পোশাক রপ্তানির ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। প্রতিযোগী দেশ ইন্দোনেশিয়া রপ্তানি করে ৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার, ভারত ৪.৭ বিলিয়ন বা প্রায় ৬ শতাংশ ও কম্বোডিয়া ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার পোশাক রপ্তানি করে।
একক দেশ হিসেবে মোট পোশাকের সর্বোচ্চ বা প্রায় ২০ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। এখন সেই বাজার আরো বৃদ্ধির স্বপ্ন বুনছেন উদ্যোক্তরা। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলা একাধিক ব্যবসায়ী বলেছেন, ভারত ও চীনের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ক্রেতারাও বাংলাদেশের প্রতি আকর্ষণ দেখাচ্ছে, আমরাও সুযোগটি নিতে চাই। আমাদের সেই সক্ষমতা আছে রপ্তানি বাড়ানোর।
সুরমা গার্মেন্টসের উদ্যোক্তা ও বিজিএমইএ সদস্য ফয়সাল সামাদ বলেন, তারা খুবই আগ্রহ দেখাচ্ছে। কারণ বেশি দামে কেনো তারা পোশাক কিনবে। তারাও পরিস্থিতি বুঝতে শুরু করেছেন, বিশ্লেষণ করছেন।
নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে দেশের শ্রম অধিকার ও নির্দিষ্ট সময়ে বেতন নিশ্চিত করার দাবি করেছেন জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, কিছুদিন পরপরই পোশাক খাতের বকেয়া বেতন নিয়ে আন্দোলনের খবরটি বিশ্ব মিডিয়ায় নেতিবাচক হিসেবে চলে আসে।
কমাতে হবে লিড টাইম
শুধু পোশাকের ওপর নির্ভর না করে রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণে জোর দিতে পারলে ভবিষ্যতে অর্থনীতির আকার আরো বাড়বে। এজন্য অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গুরুত্ব দিতে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে জাহিদ হোসেন বলেন, তৈরি পোশাকসহ সব রপ্তানিতেই প্রধান বিষয় হচ্ছে লিড টাইম (রপ্তানি আদেশ দেয়ার পর কতোদিনে পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছাবে)। সেই লিড টাইম প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অনেক বেশি।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, লিড টাইম কমিয়ে আনা আমাদের সামনে আসা চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম। লিড টাইম কমিয়ে আনতে সড়কে যানজট কমাতে হবে। গভীর সমুদ্রবন্দর লাগবে আমাদের।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আরো চওড়া করে শুধুমাত্র রপ্তানি পণ্য চলাচলে পৃথক লেন করার দাবি করেন তিনি।
ডিপ সি পোর্ট লাগবে দ্রুত
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে রপ্তানি বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা প্রয়োজন এখনই। এ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের রপ্তানি খাত সম্প্রসারণ নিয়ে কাজ করবে। বাজার বাড়াতে হলে আগে উদ্যোক্তাদেরও একটি শৃঙ্খলায় আনতে হবে। তারা তো ব্যবসা করবেন, সেই ব্যবসায় কর্পোরেট সুশাসন ও আচরণের পরিবেশটি তৈরি হয়নি। ভালো মানের ও দামি পণ্য রপ্তানির অর্ডার দেয়ার আগে ক্রেতারা কিন্তু এ বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে।
বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রশস্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি রেলওয়ে লাইনকে পণ্য পরিবহনে যুক্ত করে মাস্টার প্ল্যান করার করার পরামর্শ এসেছে সকলের কাছ থেকে। বাস্তবায়নাধীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পাশাপাশি কনটেইনার খালাস দ্রুত করতে চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দিতে যাচ্ছে সরকার।
রেলে পণ্য পাঠালে খরচ কম
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার যাতায়াতের ৭০ শতাংশ হয় সড়ক পথে। রেল পথে হয় ১০ শতাংশ। এছাড়া ঢাকার অদূরে গাজীপুরের ধীরাশ্রমে কনটেইনার ডিপো নির্মাণে একনেকে একটি প্রকল্প পাশ হয় ২০২৩ সালে। রেলপথে কনটেইনার পরিবহন ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে ৩ হাজার ৪০২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ধীরাশ্রম ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) প্রকল্প পাশ হয়। সেই প্রকল্প নতুন মূল্যায়ন করে অতি দ্রত কাজ করার পরামর্শ দেন অনেকেই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৪ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে। এটি যদি অর্ধেকেও কমে আসে, তাহলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়বে এক লাফে আড়াই বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি চীনের বিনিয়োগও বাড়বে। গত দেড় দশকে উচ্চ বেকারত্বে ঘোরা যুব সমাজের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে। এজন্য প্রথমেই সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বহন করে না এমন ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা দিতে হবে বিনিয়োগে। নানা কারণে বন্ধ থাকা মিলগুলো সচল করতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সুবিধা দিতে পারলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে তারাও ভূমিকা রাখতে পারবে।