জামায়াতে ইসলামী ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক দেশ গড়তে চায়-মাওলানা আবদুল হালিম
২৯ আগস্ট ২০২৫ ১৪:০২
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেছেন, অতীতের সরকারগুলো স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের কথা বলে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে বিভাজন তৈরির অপচেষ্টা চালিয়ে গেছে। তাদের মতের বিরুদ্ধে দেশ ও জাতির স্বার্থে কেউ কথা বললেই রাজাকার, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ আখ্যায়িত করার প্রবণতা দেখা গেছে। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের পতনের পর এখন আরেক দলের শীর্ষনেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের কর্মীরাও আলেম-ওলামাদের রাজাকার-মৌলবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করছে। আবার তারা দেশ ছাড়তেও স্লোগান দেয়। অথচ তাদের নেতারাই দেশছাড়া। কেউ দুর্নীতি করে, কেউ জনগণের সম্পদ লুট করে, আবার কেউ মুচলেকা দিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতা-কর্মী আজ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর দোসর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, জীবন ও রক্ত দিয়েছে। রাজাকার-মৌলবাদী হিসেবে যেই আলেমদের আখ্যায়িত করা হয়েছে, তাদের কেউ কিন্তু এই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। বরং প্রত্যেকেই দেশ ও জাতির স্বার্থে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রেখেছে। যাদের নিজেদের ভাষায় এত এত দেশপ্রেম, তারাই কিন্তু দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। কেউ বিদেশে আত্মগোপনে থেকে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, কেউ বিদেশের মাটিতে বসে আলেম-ওলামার বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে।
গত শুক্রবার (২২ আগস্ট) ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আয়োজনে জেলা শহরের পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে অনুষ্ঠিত যুব সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি আরো বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের পর চব্বিশে দেশের ছাত্র-জনতা, নারী-পুরুষ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দল-মত নির্বিশেষে আন্দোলনের ফলে ফ্যাসিবাদ ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। আমরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকব। সামনে নির্বাচন, এই নির্বাচনে আমরা প্রতিযোগিতা করব। কিন্তু আমরা হিংসা করবো না এবং ফ্যাসিবাদ সুযোগ পায় এ ধরনের কোনো কাজে আমরা লিপ্ত হবো না। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের স্লোগান ছিল আমরা ন্যায় বিচার চাই। আপনাদের কাছে প্রশ্ন, চাঁদাবাজি কি ন্যায়বিচার? মানুষের বাড়ি দখল করা কি ন্যায়বিচার? চাকরির জন্য টাকা চাওয়া কি ন্যায়বিচার? যদি না হয়, তাহলে আমাদের স্লোগান হচ্ছে, জামায়াতে ইসলামী নির্বাচিত হলে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই, চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে লড়াই, যারা সংখ্যালঘুদের জমি দখল করেছে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই। কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজ-দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধেই জামায়াতে ইসলামীর লড়াই। এই লড়াই জাতির চূড়ান্ত বিজয়ের লড়াই।
জামায়াতে ইসলামী ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি বাংলাদেশ গড়তে চায় উল্লেখ করে মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, সৎ, যোগ্য, দক্ষ, আল্লাহভীরু, নৈতিক ও আদর্শিক নেতৃত্ব ব্যতীত সমাজে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা হয় না। যার দৃষ্টান্ত বিগত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ। অতীতে যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বে ছিল, তাদের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, লুটপাটের কারণে সমাজে ন্যায় ও ইসনাফ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বৈষম্যহীন, একটি কল্যাণ ও মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে এগিয়ে আসতে তিনি উপস্থিত যুবসমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক দিয়ে যাকে মনোনয়ন দিয়েছে। তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসনের যুবসমাজের আস্থার প্রতীক। তাকে বিজয়ের মাধ্যমে আগামী ঠাকুরগাঁও হবে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজমুক্ত এক আলোকিত ইসলামী সমাজ। আপনারা তার জন্য কাজ করবেন এবং তাকে নির্বাচিত করে বাংলাদেশে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সহকারী সেক্রেটারি ও ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন পরিচালক অধ্যক্ষ কফিল উদ্দিন আহাম্মদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্রধান বক্তা কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন বলেন, জুলাই ২৪-এ আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার নেতৃত্ব ছিল তরুণ-যুবকদের হাতে। দীর্ঘ ১৬ বছর ঐ খুনি হাসিনার বিরুদ্ধে লড়াই করে, কর্মসূচির পর কর্মসূচি দিয়ে রাজনীতিবিদরা ব্যর্থ হয়েছিল, খুনি হাসিনার পতন ঠেকাতে পারে নাই। তখনই ত্রাণকর্তা হিসেবে এদেশের তরুণ-যুবকরা রাজপথে নেমে এলো। তাদের নেতৃত্বে সারা বাংলাদেশের আপামর জনতা একত্রিত হলো এবং এমন এক অভ্যুত্থান সংঘটিত হলো, যে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট খুনি হাসিনা শুধু নিজেই পালিয়ে যায়নি, তার মন্ত্রী এমপিরা সব পালিয়েছে। এমনকি বায়তুল মোকারমের খতিব পর্যন্ত পালিয়েছে। এভাবেই তরুণরা যুগে যুগে আমাদের পথ দেখিয়েছে। আমাদের পরিবর্তনের বড় সূতিকাগার হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। আগামী দিনে নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন তরুণ-যুবকরা আমাদের দেখিয়েছে, তা বাস্তবায়নের মূল কারিগরের ভূমিকা তরুণ যুবক ভাইদেরই পালন করতে হবে। আগামী নির্বাচনে প্রায় ১২ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় চার কোটি ভোটারই হলো তরুণ-যুবক। যারা বিগত ১৬ বছরে একটিবারের জন্য ভোট দিতে পারেনি। সুতরাং আগামী দিনে রাষ্ট্রক্ষমতা কাদের হাতে যাবে, তা এই তরুণ যুবকরাই নির্ধারণ করবেন।
তিনি আরো বলেন, আমরা বিগত ১৬ বছরের ইতিহাসে ফিরে যেতে চাই না। আমরা দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, শোষনমুক্ত নতুন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই। ন্যায় এবং ইনসাফভিত্তিক একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি থাকবে না। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং টেন্ডারবাজি থাকবে না, এ ধরনের শান্তিময় নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চাই। সেজন্য আপনাদেরকে মূল ভূমিকা পালন করতে হবে। আগামী সংসদ নির্বাচনে যদি সাহসী ভূমিকা পালন করতে পারেন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে আমাকে নির্বাচিত করতে পারেন, তাহলে আগামীতে ঠাকুরগাঁওকে ঘিরে আমার অনেক পরিকল্পনা রয়েছে তা বাস্তবায়ন করবো, ইনশাআল্লাহ। যেখানে বেকারত্ব দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুবকদের বিশেষ অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেয়া হবে। যুবকদের জন্য ঠাকুরগাঁওয়ে সমৃদ্ধ ইয়ুথ ইনোভেশন সেন্টার স্থাপন করা হবে। সরকারি ও বেসরকারী চাকরির প্রিপারেশনের জন্য ফ্রি কোচিং সেন্টার ও মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম প্রতিষ্ঠা করা হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে ফ্রি ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ ও ইন্টারনেট সুবিধাসহ ডিজিটাল ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হবে। কৃষি ও হস্তশিল্পকে কেন্দ্র করে যুব উদ্যোক্তা গড়ে তোলার জন্য ঋণ সুবিধা দেয়া হবে। তরুণ যুবকদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে ইয়ুথক্লাব ও খেলার মাঠ তৈরি করা হবে। মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা হবে। ঠাকুরগাঁওয়ে একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে, বন্ধ হয়ে যাওয়া বিমান বন্দর চালু করা হবে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে, একটি কৃষি কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এভাবেই আপনাদের সাথে নিয়ে সমৃদ্ধ, উন্নত, নিরাপদ ঠাকুরগাঁও গড়ে তোলা সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ। এজন্য আগামী সংসদ নির্বাচনে যুবকদের সাহসী ভূমিকা পালন করতে তিনি আহ্বান জানান।
শহর জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা শামসুজ্জামান শাহ শামীম এবং সদর উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এস. এম আদিউল ইসলামের যৌথ পরিচালনায় সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য, ঠাকুরগাঁও জেলার সাবেক আমীর ও ঠাকুরগাঁও-২ আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল হাকিম, ঠাকুরগাঁও জেলা আমীর অধ্যাপক বেলাল উদ্দিন প্রধান, জেলা সেক্রেটারি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলমগীর। বক্তব্য রাখেন শহর ছাত্রশিবির সভাপতি আমজাদ আলী, সদর উপজেলা আমীর মাওলানা মিজানুর রহমান, ভুল্লি থানা আমীর মাওলানা আব্দুর রহমান, রুহিয়া থানা আমীর আব্দুল রশিদসহ নেতৃবৃন্দ। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।