কর্মের প্রভায় প্রদীপ্ত মহান ব্যক্তিত্ব শহীদ মীর কাসেম আলী


২৯ আগস্ট ২০২৫ ১২:৫৩

সোনার বাংলা রিপোর্ট : মীর কাসেম আলী একটি নাম, একটি ইতিহাস। বাংলাদেশকে হযরত মুহাম্মদ সা.-এর দেখানো পথে একটি কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে গড়া ছিল যার আজীবনের স্বপ্ন। আকাশে লাখকোটি তারকার মাঝেও ধ্রুবতারার মতো কিছু তারকাকে চিনতে মানুষ ভুল করে না। আঁধার রাতে নাবিকরা পথ হারিয়ে ফেললে আকাশের দিকে তাকিয়ে খুঁজে নেয় সেই চির পরিচিত তারকাগুলো দেখে। এ পৃথিবীতে প্রতিদিন চলছে মানুষের আসা-যাওয়া। এ আসা-যাওয়ার পরিক্রমায় কিছু মানুষ ধ্রুবতারার মতোই দীপ্তিমান। তাঁরা পৃথিবী থেকে চলে গেলেও তাঁদের কর্মের প্রভাব দীপ্তিময় থাকবে চিরদিন। কর্মবীর শহীদ মীর কাসেম আলী ছিলেন এমনই একজন প্রদীপ্ত মহান ব্যক্তিত্ব।
ইসলামী ব্যাংকসহ শত শত প্রতিষ্ঠান মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে মীর কাসেম আলীর সদকায়ে জারিয়ার কীর্তি ঘোষণা করছে নীরবে। সুদি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মোকাবিলায় ইসলামী অর্থনীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া শুধু নয়, সারা দুনিয়া আজ তাঁর এ মডেল গ্রহণ করে ধন্য। তিনি এ সমাজ, এ দেশের আর দশজন মানুষের মতোই ছিলেন একজন অতি সাধারণ মানুষ। কিন্তু তার মনটা ছিল একটু অন্যরকম সত্যসন্ধানী এবং মানবদরদি। মানুষের কল্যাণচিন্তায় সেই কিশোর বয়সেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি কল্যাণময় চিরশান্তির আদর্শ ইসলামী জীবনদর্শনের আলোয় মানবজীবনের সমস্যা সমাধানের শপথে ছিলেন প্রত্যয়দীপ্ত। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবেÑ এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সবাই এ মতপার্থক্যকে কি স্বাভাবিক ভাবতে পারেন? না, পারেন না। আর পারেন না বলেই যুগে যুগে অনেক বীরকে সেই মূল্য দিতে হয়েছে জীবন দিয়ে। মীর কাসেম আলীও সেই বীরদের একজন। তিনি গত ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ফাঁসির মঞ্চে সেই ঋণ শোধ করেছেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রীয় সভাপতি। মীর কাসেম আলীকে রাষ্ট্রের নির্বাহী আদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলেও দেশের মানুষের হৃদয় থেকে তাকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তিনি যে অবদান রেখেছেন, তা দেশবাসী চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবেন। ইসলামী আন্দোলনের এ নেতা দেশের অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি শাখায় বিচরণ করেছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। সেই স্বপ্নের আলোকে তিনি সাধ্যমতো চেষ্টাও করেছেন। তার উদ্যোগে গড়ে ওঠা বিভিন্ন আর্থিক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সুফল এখনো ভোগ করছেন দেশবাসী। দেশের এ শিল্পোদ্যোক্তার চলে যাওয়ায় দেশবাসী তাঁর সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রায় এক মাস আগে ৯ আগস্ট রাতে মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার মীর আহমাদ আরমান বিন কাসেমকে হাসিনার ফ্যাসিস্ট বাহিনীর একদল সাদা পোশাকধারী জোরপূর্বক বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে কুখ্যাত বন্দিশালা আয়নাঘরে আটকে রেখেছিল। গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনার পতনের পর তিনি মুক্তি পেয়েছেন। এ দীর্ঘসময় তিনি গুম ছিলেন হাসিনার আয়নাঘরে। ব্যারিস্টার আরমান তার পিতার আইনজীবী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।
একনজরে মীর কাসেম আলী : জননেতা মীর কাসেম আলী মিন্টু ক্ষণজন্মা একজন প্রতিভাবান উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে পরিচিত। তিনি প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকে মেধা, যোগ্যতা দিয়ে সাধ্যমতো সাজানোর কারিগর হিসেবেও নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদই নন, দেশে-বিদেশে তিনি একজন উদ্যোক্তা, সফল ব্যবসায়ী হিসেবে সুপরিচিত। বিশেষ করে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি একটি স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে দিনরাত পরিশ্রম করে গেছেন। কিন্তু একজন দেশপ্রেমিক ও উন্নয়নবান্ধব লোক যদি শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন, তবে তা ইতিহাসের এক অপদৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। অসংখ্য গুণের অধিকারী এ ক্ষণজন্মা ব্যক্তি ১৯৫২ সালের ৩১ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর থানার সূতালরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৃত মীর তৈয়ব আলী ও মাতা মৃত রাবেয়া আখতার (ডলি বেগম)। পারিবারিকভাবে আদর করে তাঁকে পেয়ারু নামে ডাকতেন। এই ক্ষণজন্মা ব্যক্তির ছিল ৪ ভাই ও ১ বোন। কাসেম আলী ১৯৭৯ সালে খন্দকার আয়েশা খাতুনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ২ ছেলে, ৩ মেয়ে। প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত। মীর কাসেম আলীর বাবা সরকারি চাকরি করতেন, বিধায় বরিশাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি তাঁর। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন লাভ করেন। ১৯৬৬ সালে যোগদান করেন মেধাবীদের প্রিয় সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘে। ১৯৭১ সালের নভেম্বরে প্রাদেশিক জেনারেল সেক্রেটারি, ১৯৭৭ সালে শিবিরের প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। এরপর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা, কর্মপরিষদ ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মীর কাসেম আলী আল কুরআনের একজন নিবেদিত খাদেম ছিলেন। বাংলাদেশে ব্যাংকিংজগতের আলোড়ন সৃষ্টিকারী ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের অন্যতম তিনি। শুধু ইসলামী আন্দোলন করার অপরাধেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে তার দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু এ কারণে যে, তারা সেই পরাক্রমশালী আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল।’ (সূরা বুরূজ : ৮)।
কর্মজীবনে মীর কাসেম আলী ১৯৭৮ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা রাবেতা আলম আল ইসলামীর কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে যোগদান করেন। তিনি মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান ঐক্য ও সম্প্রীতি স্থাপনে ভূমিকা পালন ও দেশে-বিদেশে মানবিক উন্নয়নে কাজ করেছেন। ইসলামী আন্দোলনের এ সিপাহসালার দীনের দাওয়াত ও জনসেবার কাজে পৃথিবীর সমস্ত ইসলামী দেশ, এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ভ্রমণ করেন।
মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করতে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও আইন বিশেষজ্ঞদের আহ্বান অব্যাহত ছিল। দেশে-বিদেশে এ অন্যায় দণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ হয়েছিল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কার্যক্রম স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছিল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। অ্যামনেস্টি অভিযোগ করে বলে, অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ কার্যক্রমের মাধ্যমে মীর কাসেমকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলেন ইউরোপীয়ান পার্লামেন্টের ৩৫ এমপি। কিন্তু এসবের কোনো তোয়াক্কা না করে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।