একমাত্র আল্লাহর জন্যই হোক ইবাদত


২১ আগস্ট ২০২৫ ১৬:২৪

॥ ওবায়েদ ইবনে গনি ॥
প্রতিটি মুমিনই চায় তার ইবাদতগুলো মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে কবুল হোক এবং সর্বোৎকৃষ্ট মানের হোক। ইবাদতের অনেক শাখা আছে। একেক শাখায় একেক জিনিসকে সর্বোত্তম বিবেচনা করা হয়। উত্তম ইবাদত হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আন্তরিকভাবে তাঁর আদেশ পালন করা এবং নিষেধ থেকে বিরত থাকা। এর মধ্যে অন্যতম হলো সময়মতো নামাজ আদায় করা, পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করা এবং কুরআন তেলাওয়াত করা।
উত্তম ইবাদত বলতে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও ভক্তি রাখা। ইসলামের স্তম্ভসমূহ; যেমন নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি পালন করা। ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল ইবাদত করা; যেমন কুরআন তেলাওয়াত, জিকির, দোয়া ইত্যাদি। এছাড়া মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, ন্যায় ও ইনসাফের পথে চলা এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করা এবং তাঁর দেওয়া আদেশ ও নিষেধ মেনে চলা।
হাদিসে উল্লেখ আছে, ‘সঠিক সময়ে নামাজ আদায় করা এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করা সর্বোত্তম আমল।’ এছাড়া কুরআন তেলাওয়াতকে নফল ইবাদতের মধ্যে সর্বোত্তম বলা হয়েছে। মোটকথা, উত্তম ইবাদত হলো আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, ভক্তি ও আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আন্তরিকভাবে তাঁর আদেশ পালন করা এবং নিষেধ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলা।
বিশ্বজাহানে মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলে দিয়েছেন ‘ইবাদত’ শব্দে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এরশাদ করেন, ‘আমি মানুষ এবং জিনজাতিকে একমাত্র আমার দাসত্বের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা যারিয়াত : ৫৬)। এজন্যই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত-বন্দেগি করা মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাব। প্রতিটি ক্ষণে মানুষ কারো না কারোর পূজা-অর্চনা তো করেই থাকে। এটি আলাদা বিষয় যে, সে কখনো জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে লাকড়ি-পাথরে নির্মিত খোদার সামনে মাথা নুয়ে দেয়। কখনো বৃক্ষ এবং প্রাণিকুলকে খোদা ভেবে তাদের পূজা দিতে থাকে। কখনো চাঁদ-সূর্য কিংবা সর্পপূজায় ইবাদতের তৃষ্ণা মেটায়।
মানুষের ভ্রষ্টতা এবং অজ্ঞতাকে দূর করার জন্য, তাদের সত্য-সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যুগে যুগে বিভিন্ন নবী-রাসূল (সা.) এবং আসমানি গ্রন্থাদি প্রেরণ করে তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার ধারা অব্যাহত রেখেছেন। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি প্রত্যেক জাতি-গোত্রে রাসূল পাঠিয়েছি এ পয়গাম দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুতকে প্রত্যাহার করো।’ সব শেষে তিনি এ ধারার পূর্ণতাস্বরূপ সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে এ ধরার বুকে প্রেরণ করেন। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আজ (বিদায় হজের দিন) আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করে দিলাম। পাশাপাশি আমার নেয়ামতকেও তোমাদের ওপর পরিপূর্ণ করে দিলাম।’
আমাদের মনে প্রশ্ন হতে পারেÑ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যদি তাঁর ইবাদতের জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করে থাকেন, তাহলে ইবাদতের উদ্দেশ্য কিংবা তার চাহিদাই-বা কী? এর উদ্দেশ্য, চাহিদা না জেনে তো আর ইবাদত করা যাবে না! তো ইবাদতের তিনটি ধরন রয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একত্ববাদ ও নবী (সা.)-এর রিসালাত অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করা, মুখে তার স্বীকারোক্তি দেয়া এবং কাজেকর্মে তার বাস্তব নমুনা দেখানো।
ইবাদতের উদ্দেশ্য
ইবাদত আরবি ধাতু ‘আবদ’ থেকে এসেছে। এর আভিধানিক অর্থ দাস, অধীন, গোলাম। সুতরাং ইবাদতের অর্থ দাঁড়ায় দাসত্ব করা, গোলামি করা। এখন চিন্তা করার বিষয় হচ্ছেÑ দাস এবং মনিবের মধ্যকার সম্পর্কটা কেমন হয়ে থাকে?
গোলামের প্রথম কাজই তো হলো মনিবের কাছে আস্থাশীল হওয়া। নিজ মনিব ছাড়া অন্য কেউ এর যোগ্য নয়। গোলামের দ্বিতীয় কাজ হলো মনিবের আনুগত্যে হরহামেশা নতশির থাকা। তার পুরো সময় মনিবের আনুগত্যে ব্যয় হওয়া আবশ্যক। মনিবের হুকুম বাস্তবায়নের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা চাই। গোলামের তো এটা বলার কোনো অধিকার নেই যে, আমি এত এত সময় মালিকের ইবাদত করব, বাকিটা সময় আমি তার আনুগত্য থেকে মুক্ত, স্বাধীন। মনে যা ধরবে, তাই করব।
তার এ-ও বলার অধিকার নেই যে, আমি মালিকের অমুক অমুক কথা মানব এবং অমুক কথা মানব না। তার তো সব বিষয়ে খেয়াল করা চাই যে, এক্ষেত্রে আমার মালিকের নির্দেশনা কী? এটা নয় যে, তার অন্তর কী বলছে, তার আকল কী বলছে, বাপ-দাদা, পূর্বপরুষ কোন পথে চলে গত হয়েছেন, বংশীয় লোক এবং স্বজনদের মর্জি কোন কাজে, পীরসাহেব কী বলছেন ইত্যাদি।
যদি সে মালিকের হুকুম অমান্য করে অন্য কারো কথা মেনে চলে, তাহলে সে মালিকের সঙ্গে অন্যকে অংশীদার সাব্যস্ত করল। অন্যকে সেই আসনে বসাল, যেটি শুধু মালিকের জন্যই রক্ষিত ছিল। হুকুম দেয়ার মালিক তো একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই। এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘হুকুমদাতা তো শুধু আল্লাহ তায়ালাই।’ (সূরা আন’আম : ৭৫)।
ইবাদত-বন্দেগির পূর্ণ হকদার তো একমাত্র সেই পবিত্র সত্তারই, যিনি তোমাকেসহ পুরো জগৎ সৃষ্টি করেছেন। তোমাকে আহার্য দিচ্ছেন। আসমান-জমিনের সব সৃষ্টি তাঁর আনুগত্যে নতশির। কোনো পাথর অন্য পাথরের পূজা করে না, কোনো বৃক্ষ অন্য বৃক্ষের সামনে মাথা নোয়ায় না, কোনো জন্তু অন্য জন্তুর পূজা করে না। তাহলে মানুষ কি এসব সৃষ্টি, পাথর, বৃক্ষ এবং জীবজন্তু থেকেও নিচুতে নেমে গেল? অন্যান্য সৃষ্টি তো শুধু আল্লাহর সামনে মাথা নোয়ায়। আর মানুষ একমাত্র হুকুমদাতা আল্লাহকে ছেড়ে মানুষের সামনে ঝুঁকে পড়ে মাথা ঠুকে! হাই আফসোস কী দুর্ভাগা আমরা!
গোলামের তৃতীয় কাজ হলো মনিবকে পরিপূর্ণ সম্মান-ইজ্জত দিয়ে চলা। সাক্ষাতের জন্য মনিব যে সময়কে ধার্য করেন, নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হওয়া। মুয়াজ্জিনের আহ্বান শুনে যদি তুমি নামাজের দিকে না ছোটো, তাহলে তো তুমি অহংকারী সাব্যস্ত হলে। কেননা যে নিজেকে ছোট ভাবে, সে বড়দের আহ্বানের আগেই তার কাছে গিয়ে হাজির হয়।
উল্লিখিত তিনটি বিষয়ের মেলবন্ধনেই ইবাদত পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। এক. মনিবের আস্থাশীল হওয়া। দুই. মনিবের আনুগত্যে শির নুয়ে দেয়া। তিন. মনিবের ইজ্জত-সম্মানের খেয়াল রাখা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষ এবং জিনজাতিকে একমাত্র তারই ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। এজন্য নয় যে, সে অন্যের সামনে মাথা ঠুকবে। আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং পূর্ববর্তী সব নবী-রাসূলের প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবজাতিকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহ্বান করা। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা একমাত্র তাঁরই (আল্লাহর) ইবাদত করো।’ (সূরা ইউসুফ : ৪১)।
এমনিভাবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইবাদতের উদ্দেশ্য হলো, সর্বক্ষেত্রে তাঁর প্রণীত জীবনবিধান মেনে চলা। সর্বদা তাঁর আনুগত্যের জন্য প্রস্তুত থাকা। যেসব বিষয় থেকে তিনি নিষেধ করেছেন, সেগুলোর ধারেকাছেও না যাওয়া। আর যেসব বিষয়ের আদেশ করেছেন, সর্বশক্তি ব্যয় করে হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন করা।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সিদ্ধান্তে খুশি থাকা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনার্থে সব ধরনের কষ্ট স্বীকারে অভ্যস্ত হওয়া। এসব বিষয় আল্লাহর ইবাদত এবং তাঁর আনুগত্যের অন্তর্ভুক্ত। দুই হাত বেঁধে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ানো, রুকু-সিজদা করা, কিছু সূরা, দোয়া-দরুদ মুখে আওড়ানো, রমজানের রোজা রাখা কিংবা কুরআনের কয়েক রুকু পরিমাণ পাঠ করাই ইবাদত। কিংবা মক্কা মুয়াজ্জমায় গিয়ে বায়তুল্লাহর আশপাশে তওয়াফ করাই ইবাদত! হ্যাঁ, অবশ্যই এগুলো ইবাদত।
কিন্তু বোঝার বিষয়, এসব ইবাদতের দ্বারা উদ্দেশ্য হলোÑ নিজেকে ওই বড় বড় ইবাদতের জন্য যোগ্য করে তোলা, যেগুলো তোমার জীবনভর পালন করতে হবে। নামাজ প্রতিদিন পাঁচবার স্মরণ করিয়ে দেয়, আপনি একমাত্র আল্লাহরই বান্দা; একমাত্র তারই ইবাদত-বন্দেগি করা চাই। পূর্ণ এক মাস রমজানের রোজা আপনাকে আল্লাহর ইবাদতের জন্যই প্রস্তুত করে তোলে।
জাকাত আপনার দৃষ্টিদানকে এদিকে ফেরাতে চায়, যেসব সম্পদ আপনি নিজের করে পেয়েছেন, কষ্ট সহ্য করে অর্জন করেছেন, এ তো একমাত্র আল্লাহরই দান। এগুলোকে শুধুই নিজ চাহিদা মোতাবেক ব্যয় করবেন না, বরং স্বীয় মনিবের হক আদায় করতে হবে এ সম্পদ থেকে। অর্থাৎ দরিদ্র, অসহায়দেরও নিজ সম্পদ থেকে অংশ দিতে হবে। হজ অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা এবং তাঁর প্রতি আজমতের এমন এক বীজ বপন করে দেয়, যা সমগ্র জীবনেও এর ছায়া দিল থেকে দূর হয় না!
সর্বোপরি আমাদের পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখিল হতে হবে এবং ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়জীবনে ধারণ করতে হবে। পার্থিবজীবনে আমাদের সমস্ত ইবাদত-বন্দেগি একমাত্র মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্যই হওয়া চাই। মহান মনিব আল্লাহ তায়ালা তাঁর সমীপে আমাদের একনিষ্ঠভাবে ইবাদত-বন্দেগি করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেকখ : সাংবাদিক।