পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সংসদ ও নতুন ইতিহাস সৃষ্টি


২১ আগস্ট ২০২৫ ১৬:১৩

॥ মুহাম্মদ ওয়াছিয়ার রহমান ॥
প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের এক বছর কেটে গেল। এর মধ্যে প্রফেসর ইউনূস অনেক ক্ষেত্রে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। গত ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকার ‘জয় বাংলা’ হওয়ার পর দেশে অনেক নতুন নতুন ইতিহাসের জন্ম। অনেক আশা-ভরসা নিয়ে দেশবাসী আকুণ্ঠভাবে ড. ইউনূসকে দেশের দায়িত্বভার দেয়। কিন্তু প্রফেসর ইউনূস যে চেয়ারে বসে আছেন, সেটি রাজনৈতিক চেয়ার। এ চেয়ারে রাজনৈতিক ব্যক্তি ছাড়া বসা কত বড় ভুল, তা প্রফেসর ইউনূস হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন এবং জাতি যদি ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যায় পড়ে, তবে কোনো ভদ্রলোক এ দায়িত্ব গ্রহণে রাজি হবে না। শুধু ঐ চেয়ার নয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতো চেয়ারেও কেউ আসতে রাজি হবে না। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে চরম একটা নৈরাজ্য চলছে। এত কিছুর পরও ইউনূস সরকার দেশের জন্য কিছু একটা করে ইতিহাস সৃষ্টি করতে চাচ্ছে এবং করেছেও বটে।
ব্যাংক খাতে ইতিহাস সৃষ্টি : প্রফেসর ইউনূস বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় শক্ত হাত দেয়ায় ব্যাংক খাতের ছিদ্র বন্ধ হয়ে এ এক বছরে চার বিলিয়ন ডলার দেনা পরিশোধ করার পরও ১০ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভে যোগ হয়েছে। ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় অনেক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাংকগুলোও তাদের ব্যবস্থাপনায় যুগোপযোগী করতে পরেছে। দুর্নীতিবাজ ব্যাংকারদের তাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ব্যাংকখেকোদের আতঙ্কের মধ্যে রাখতে পেরেছে। রেমিট্যান্স আহরণে নতুন উঁচুতে গেছে দেশ।
পৃথিবীর বড় সবচেয়ে সংসদ গঠন : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে ইউনূস সরকার রাষ্ট্র মেরামত করার জন্য বেশ কয়েকটা সংস্কার কমিশন ও ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে ঐকমত্য কমিশন গঠন করেন। সংস্কার কমিশনগুলো তাদের কাজ অনেক এগিয়ে নিয়েছে। বাকিগুলোর কাজ চলছিল, এখন তা থমকে গেছে। যাই হোক, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন অন্যতম একটি ঐতিহাসিক সূচনা। এ কমিশনের কার্যক্রম নিঃসন্দেহে বড় ঘটনা। এটাকে যদি আমরা সংসদ ধরি, তবে এ সংসদে ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব ছিল। প্রফেসর ড. ইউনূসকে যদি ঐ সংসদের স্পিকার ধরি এবং প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ ঐ সংসদের ডেপুটি স্পিকার। ৩০টি দলের সমন্বয়ে গঠিত সংসদ পরিচালনা করা যে কত কঠিন কাজ, তা প্রফেসর ইউনূস ও আলী রীয়াজ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। এত দল দ্বারা গঠিত সংসদ পৃথিবীত কোনো নজির নেই। এ দলগুলো যত বড় হোক আর ছোট হোক। ভয়েজ সকলের সমান ছিল। পৃথিবীর অন্য দেশের সংসদের অবস্থা হলো যে দলের সংসদ সদস্য বেশি তাদের কণ্ঠের জোরও বেশি কিন্তু এখানে তার ব্যতিক্রম। সবাই প্রাণ খুলে কথা বলেছে। ছোট বড় ভেদাভেদ ছিল না।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু : ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে বাংলাদেশে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে, তার অনেকগুলোর তদন্ত শেষ হয়ে বিচারে গেছে। সাক্ষ্য শুরু হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হবে বলে আশা করা যায়। মামলার অন্যতম প্রধান আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন আদালতে রাজসাক্ষী হয়েছেন। ঐ বিচার দুটি আদালতে চলছে।
অনির্বাচিত হয়েও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেয়া : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক শাসনের সময় অরাজনৈতিক লোকদের ক্ষমতায় দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ ও ৮ আগস্ট ২০২৪ সালে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস অনির্বাচিত অথচ স্বৈরাচার ছাড়া সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য। তবে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ ছিল অসাংবিধানিক পরে তার শর্তানুসারে তাকে সংবিধান সশোধন করে প্রধান বিচারপতির চেয়ারে ফিরিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সংবিধানের ১০৬ ধারা অনুসারে নিয়োগপ্রাপ্ত।
দেশ-প্রেমিক সকল দলকে এক মঞ্চে ওঠানো : প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারে আসার পর তিনি ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য একটি ঐকমত্য কমিশন গঠন করেন। এ কমিশন দেশপ্রেমিক সকল রাজনৈতিক দলকে একটি ছাতার নিচে আনতে সক্ষম হয়। যেটা বিরল ঘটনা। অতীতে জামায়াতকে বামপন্থীদের এক মঞ্চে কেউ আনতে পারেনি। কিন্তু ইউনূস তা পেরেছেন।
বিচারের চিরাচরিত রীতি উপেক্ষিত : পৃথিবীর সব আদালত ও সালিশ বিচারের ক্ষেত্রে একটা রীতি আছে রায়ের ক্ষেত্রে অধিকাংশের মত অনুসারে রায় ঘোষণা হয়। কিন্তু ঐকমত্য কমিশনের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হলেও বিএনপিসহ দু-চারটি দল কোনো কোনো ইস্যুতে নোট অব ডিসেন্ট দেয় এবং তারা ক্ষমতায় গেলে ঐ নোট অব ডিসেন্ট দেয়া ইস্যুগুলো তারা বাস্তবায়ন করবে না। যেহেতু তাদের নোট অব ডিসেন্ট দেয়া সত্ত্বেও বিষয়গুলো পাস হয়েছে, তাই বিচারের চিরাচরিত রীতি অনুসারে বিষয়গুলো অনুমোদিত বলে গণ্য ও তা বাস্তবায়নে পরবর্তী সংসদকে কার্যকর করা উচিত। কিন্তু বিএনপি তাতে রাজি নয়। তারা বিচার মানে কিন্তু তালগাছ তাদের। বিচার সালিশের ক্ষেত্রে চিরাচরিত যে রীতি আজ উপেক্ষিত হয়ে বিচারের নতুন ইতিহাস রচনা হচ্ছে।
ঘটনাচক্রে অবস্থাদৃষ্টে আশঙ্কা হচ্ছে বিএনপি বড় দল হিসেবে সরকারি প্রশাসন তার ব্যাপারে শক্ত হতে পারবে না। সেজন্য অধিকাংশ দল নির্বাচন বর্জনের মতো ঘটনা ঘটাতে পারে। আরো আশঙ্কা হচ্ছে এ নির্বাচন কমিশন নিরোপেক্ষ নির্বাচন করতে সক্ষম হবে বলে মনে হচ্ছে না। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস পৃথিবীর ১৯৩টি রাষ্ট্র এবং ফিলিস্তিন ও ভ্যাটিক্যান সিটিসহ ছোট বড় ২২৮টি দেশের ভিভিআইপি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও জাতিসংঘ মহাসচিব বাদে প্রায় ৮০০ কোটির মানুষের মধ্যে তিনি সবচেয়ে সম্মানপ্রাপ্ত ব্যক্তি। এমন সম্মানপ্রাপ্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা কালে যদি বেইজ্জতি মার্কা নির্বাচন হয়, তবে সেটা তার জন্য চরম কলঙ্কের। এজন্য তিনি এরকম আশঙ্কা থাকলে পদত্যাগও করতে পারেন। তাছাড়া বিএনপি চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও খুনোখুনির কোনো প্রতিকার না পেয়ে অপরাপর রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জনের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে কিছু বাম ও মৌলভী মার্কা দল- যারা নিজেরা কোনো সিটে জামানত নিয়ে ঘরে ফিরতে পারবে না- এ সুযোগে দু-একটা সিট খয়রাত নিয়ে বিএনপির সাথে নির্বাচনে আসতেও পারে।