আলোকে তিমিরে

‘বিকল্প’ দাবিদাররা সন্তর্পণে এগোচ্ছে


২১ আগস্ট ২০২৫ ১৫:১৭

॥ মাহবুবুল হক ॥
দেশের ফ্যাসিবাদী দলটি গত ৫৪ বছর ধরে বহু রকম চেষ্টা করেও দেশের সব মানুষকে তাদের দলে ভেড়াতে পারেনি। তার মানে এই নয় যে, যারা ভেড়েনি, তারা ফ্যাসিবাদবিরোধী। দুনিয়ার সব ফ্যাসিবাদী এক নয়। দুনিয়ার সব সমাজতন্ত্রী এক নয়। দুনিয়ার সব সাম্যবাদী এক নয়। দুনিয়ার সব ক্যাপিটালিস্ট এক নয়। দুনিয়ার সব ইসলামিস্ট এক নয়। দুনিয়ার কোনো আদর্শ বা মতবাদ কখনো এক ছিল না। যদিও সবসময় স্লোগান হিসেবে এক থাকার বা এক হওয়ার কথা সারা জীবন আমরা শুনে আসছি।
দুনিয়ার মুসলিম এক হও। দুনিয়ার মজদুর এক হও। এ ধরনের শ্রেণিবদ্ধ স্লোগান আমরা সবসময় শুনি। আমাদের রাজনীতিতেও এসব ছিল। ছিল বলেই টু নেশনস থিউরির জন্ম হয়েছিল।
ভারত দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। যদিও ভারতে মুসলিমের সংখ্যা এখন অন্যান্য মুসলিম দেশের তুলনায় অনেক বেশি। একটু অন্যদিকে চলে গেলাম। বলতে চেয়েছিলাম, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলকে যারা পছন্দ করত না, তারা একই আদর্শে বিশ্বাস করেও বিকল্প একটা দল গড়ে তুলেছিল। শুরুতে এ দলের নাম যাই থাক, লোকেরা বলতো বিকল্প রাজনৈতিক দল। অর্থাৎ প্রথম দল ফেল করলে দ্বিতীয় দল বিকল্প দল হিসেবে ক্ষমতায় এসে যাবে। এখনো অনেকের মনে- এ ধরনের ধারণা বসবাস করছে। শুধু ধারণা নয়, এ ধরনের ধারণা যে বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের পরপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি- এমনও তো না। যারা বিকল্প দল হিসেবে দেশের সব কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের জায়গায় সাময়িকভাবে বসেছিল, তারা এখন আর সেখান থেকে উঠতে চায় না। তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই বলে, আমরাই তো দ্বিতীয়। আমরাই তো বিকল্প। আমরা ছাড়া শূন্য জায়গাগুলোয় অন্য আর কে বসবে? অন্য কেউ তো আর এখন বসার মতো নেই। আমরা যদি কাউকে এনে বসাই, সেটা তো আমাদের ব্যাপার। আমাদের নিজেদের ব্যাপার। আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। অভ্যুত্থানের পর সত্যি সত্যি এ ধরনের ঘটনা ঘটে গেল। গত বছরের আগস্টের পর বহুদিন বহু জায়গায় থানা-পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো লোকজন ছিল না। আমরাই তো দেশ রক্ষা করেছি। আমরাই জনগণের জান-মাল রক্ষা করেছি। আমরাই তো দুর্ভিক্ষ ঠেকিয়েছি। দেশে সে সময় ঝড়-বন্যা, অসুখ-বিসুখ যা কিছু হলো, সব তো আমরা নিজেরাই সামলিয়েছি। এসব তো আমাদের দায়িত্ব ছিল। সাধারণ প্রতিবাদী মানুষ এসবের প্রতিবাদ করেছে। বলেছে, ভোট হোক তারপর আপনারা বসেন। কেউ তো আপনাদের নিষেধ করবে না। আপনারাই তো এখন বড় দল, কেউ তো অস্বীকার করছে না। কিন্তু এখনই আপনারা দেশের সব জায়গায় বসে যাচ্ছেন কেন? তাছাড়া দেশে তো আরো কত দল রয়েছে, যারা বিপ্লব বা অভ্যুত্থান ঘটালো, তারাও বা বিষয়টিকে কীভাবে নেবে? তারা নিশ্চয়ই এখনই কোথাও বসবে না বা বসতে চাইবে না। কিন্তু বিষয়টাকে অন্যায় ধরে নিয়ে যদি আবার নতুন তোলপাড় শুরু করে, তাহলে কী অবস্থা হবে? কে শুনে কার কথা। বিকল্প দলের একটাই কথা। আমরাই বিকল্প। আমাদের বিকল্প কেউ নেই। তারা সারা দেশে সুড়সুড় করে বসে গেল। মনে হলো সব ব্যবস্থা যেন পূর্ব থেকেই ঠিক করা ছিল। কে যেন ওদের কানে পূর্বেই বলে গিয়েছিল, ‘আমরা চলে গেলে আমাদের জায়গায় তোরা বসে যাবি। কেউ তোদের বাধা দেবে না।’ ঘটনা ছিল ঠিক এমন যেন।
এদিকে সরকার কী হবে? প্রতিবেশী দেশ একের পর এক বন্যা সৃষ্টি করে চলেছে। দেশবাসীর একটা বিরাট অংশ হাবুডুবু খাচ্ছে। সহায়-সম্পদ, গরু-ছাগল, মাঠের শস্য সবকিছু ভেসে যাচ্ছে- এসব নিয়ে বিকল্প দলের কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা প্রতিটি জায়গায় বসে যাওয়ার কাজটা, দখল নেওয়ার কাজটা বেশ সন্তর্পণে করে যেতে লাগলো।
বাংলাদেশ তো আর ঢাকা-চট্টগ্রাম ও রাজশাহী আর সিলেট নয়। হাজার হাজার গ্রামের দেশ। মিডিয়া এখন সবখানে। সব মিডিয়ার মুখ তো আর বন্ধ করা যায় না। কোনো না কোনোভাবে কারো না কারো উদ্যোগে, কারো না কারো দেশপ্রেমের সংকল্পে সব সত্য এবং সব মিথ্যা কোনো না কোনোভাবে চাউর হয়ে যায়। কোনো কথা এখন আর মাটিতে চাপা দিয়ে রাখা যায় না। সব বাতাসে বাতাসে ঘুরে বেড়ায়।
আর এদেশের মানুষ প্রতিবেশীদের কথায় কখনো বিশ্বাস করে না। তারা পজিটিভ কথা বললে দেশের মানুষ সেটাকে নেগেটিভ হিসেবে গ্রহণ করে আবার নেগেটিভ কথা বললে পজিটিভ বলে গ্রহণ করে। তাদেরও হাজার হাজার মিডিয়া বিষয়গুলোকে এমনভাবে প্রচার করতে থাকলো যে, সবকিছু তাদের বিরুদ্ধে চলে এলো। দেশবাসীর বুঝে নিতে একটুও অসুবিধা হলো না যে, এখানে তিনের স্পর্শ রয়েছে বা ত্রিভুজের ব্যবস্থা রয়েছে।
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দোসররা ছাড়া কমবেশি অন্যসব দলই তো অংশগ্রহণ করেছিল, কেউ পূর্বে, কেউ মাঝে এবং কেউ শেষে। পূর্বে এবং মাঝে যারা অংশগ্রহণ করেছিল, তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, এমন হিসাব তো ছিল না। এদেশে বরাবর বলা হয়ে থাকে, ‘শেষ ভালো যার, সব ভালো তার।’ যাদের নিয়ে এ বক্ষ্যমাণ আলোচনা দীর্ঘ হচ্ছে, তারা কিন্তু শেষ পর্বে এসে খুব একটা মাথা ঘামায়নি।
বিপ্লব বা অভ্যুত্থানে তারা ছিল না, তা বলছি না। তারা ছিল এবং তারা ছিল না- এমন একটি অবস্থার মধ্যেই শেষ পর্বটা আল্লাহর রহমতে শেষ হয়ে গেছে। আখের গোছানোর চিন্তায় কখনো তারা বলেছেন, আমরা আছি। আবার কখনো বলেছেন, আমরা নেই। এর কারণ অনেক। সেসব কাহিনী বলতে গেলে এ রচনা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। ‘আকেলমান্দকে লিয়ে ইশারাই কাফি।’
পূর্বেই বলেছি, বিপ্লবের শেষ প্রান্তে এসে দেশের সব পুলিশ স্টেশনে পুলিশ ছিল না। কারণ সবার জানা। তারা পালিয়ে গিয়েছিল। তারা অনুধাবন করেছিল, তারা অনেক অন্যায় করেছে। চাকরির জন্য এত নির্মম বা নিষ্ঠুর হওয়া তাদের উচিত হয়নি। রাইফেলের গুলি তারা মাথায় বা বুকে না মেরে পায়ের দিকে মারতে পারতো। উপনিবেশ আমলে বা পাকিস্তান আমলে পুলিশ এভাবে কখনো গুলি করেনি। ছাত্র-জনতাসহ প্রায় দুই হাজার বনি আদম শাহাদাতবরণ করেছে। ফ্যাসিবাদের প্রধান দেশ ছাড়ার পরও তারা ঢাকার চানখাঁরপুলে ও যাত্রাবাড়ীতে গুলি করে ছাত্র-জনতাকে শহীদ করেছে। এসবের প্রয়োজন ছিল না। আধুনিক যুগে গুলির প্রয়োজন হয় না। মবকে ছিন্নবিছিন্ন করার বহু রকম ব্যবস্থা রয়েছে। এ ব্যাপক খুনাখুনি কেন হলো তার বড় কারণ সবাই জানে। শুধু পুলিশ ছিল না। প্রতিবেশী দেশের নিয়োজিত খুনি ও ফ্যাসিবাদের নানারকম দোসর, পুলিশ, বর্ডার গার্ড ও সেনাবাহিনীর পোশাক পরে পুলিশের সাথে মিশে গিয়েছিল। বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এসব কারণেই। এখন তো এসব ধীরে ধীরে প্রকাশ হয়ে পড়ছে। জানি না, এসবের বিচার কীভাবে হবে? কেউ না করলেও সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ একমাত্র বিচারক, অবশ্যই বিচারের ব্যবস্থা করবেন।
যে কথা বলছিলাম, যেসব থানায় পুলিশ ছিল। পুলিশ কর্মকর্তা ছিল, সেসব কর্মকর্তাকে এ বিকল্প দলের নেতাকর্মীরা গিয়ে হুমকি দিল- দেখো, এখন আমরা ক্ষমতায়, জিডি বা কেস নিতে হলে আগে আমাদের অনুমতি নিতে হবে। আমাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জিডি বা কেস গ্রহণ করা যাবে না। ব্যাস কাম ফতে। থানা-পুলিশকে দলীয়করণ করে ফ্যাসিবাদীরা যা করেছে, অতটা না হলেও বিকল্প দলটিও তাই অনুসরণ ও অনুকরণ করছে। ফ্যাসিবাদীদের নেতাকর্মী দোসর, চেলা-চামুণ্ডা সবাই তো আর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। তারা প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে এ ব্যবস্থাকে সহযোগিতা করছে। এখন তো মোটামুটিভাবে দেশের সব থানায় পুলিশ বসে গেছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা একজন যোগ্য ও সৎ মানুষ বলে সমাধিক পরিচিত। তিনি খুব চেষ্টা করছেন, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি কি স্থানীয় মাতব্বরদের উপেক্ষা করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন? তাঁর পক্ষে কি প্রতিটি থানায় গিয়ে এলাকার লোকজন জড়ো করে কথা বলা সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব নয়।
আমরা সবাই জানি, রাজনীতি এখন একটা বড় পেশা। এ পেশার সাথে জড়িত অধিকাংশ মানুষ টাকার জন্য রাজনীতি করে। স্থানীয়ভাবে যারা রাজনীতি করে, তাদের তেমন কোনো মূল্যবোধ নেই। তাদের প্রয়োজন অর্থ-বিত্ত। ফ্যাসিবাদীরাই যে শুধু গত ১৬ বছর অর্থ-বিত্ত কামাই করেছে এ-কথা সর্বাংশে ঠিক নয়। তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী অর্থ-বিত্ত কামাই করেছে, সেসব কথা তো এখনো আসতে শুরু করেনি। যারা বলছে, ১৬ বছর আমরা কিছুই খেতে পারিনি। এখন আমাদের খেতে দিতে হবে। আমরা এখন খাব। আমাদের ঋণ শোধ করব। আমাদের বিক্রি করা জমিজমাগুলো হয় ফেরত নেব, না হয় জোর করে কম দামে জমিজমা ক্রয় করব। আমাদের বাঁচতে হবে। আমাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে হবে। প্রয়োজনে তাদের বিদেশে পাঠাতে হবে। আমরা তো অনেক ত্যাগ করেছি। এখন আর ত্যাগের সময় নেই। হারানো মান-ইজ্জত, অর্থ-বিত্ত সব আমাদের ফিরে পেতে হবে। কথা সব সত্য নয়। নট দ্য হোল ট্রুথ অথবা হাফ ট্রুথ। মনে হয় তাও নয়। হতে পারে কোয়ার্টার ট্রুথ। যারা অর্থবিত্তের ধান্দায় থাকে, তারা যে দলের হোক না কেন, তারা কোনো না কোনোভাবে অর্থ-বিত্ত পেয়ে যায়। সুতরাং রাজধানী হোক, শহর-বন্দর, উপজেলা হোক, ইউনিয়ন হোক, টাকা-পয়সা বা অর্থ-বিত্ত ফ্যাসিবাদীরা একাই খেয়েছে বা একাই লুট করেছে, এমন কথা সত্য নয়। যাদের জীবনের মূল লক্ষ্য কোনোভাবে অর্থ-বিত্ত অর্জন করা, তারা তো অর্জন করেছে। সে সুযোগ ধূর্ত ফ্যাসিবাদীরা সেসব অর্থলোভীদের দিয়েছে। এভাবেই গত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদের দলভুক্ত না হয়েও লাখ লাখ অন্য দলের মানুষ অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছে। তাদের মধ্যে হয়তো বেশিরভাগই হবে বিকল্প দলের চেলা-চামুণ্ডা। এজন্যই রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা কথা চালু আছে, ‘ফ্যাসিবাদীরা দিয়ে থুয়ে খায়, একা খায় না।’ এদেশের ফ্যাসিবাদীরা ইতালির মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী নয় বা জার্মানির হিটলারের ফ্যাসিবাদী নয় যে, শুধু হত্যা, অত্যাচার-নির্যাতন-জুলুম, করবে। এরা বাঙালি ও বাংলাদেশি। এদের মধ্যে দ্বৈততা বেশি। চতুরতা বেশি। মুনাফিকি বেশি। ভণ্ডামি বেশি। প্রয়োজনে বাঙালি ফ্যাসিবাদী হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়ে লাখ লাখ টাকা তাদের সহযোগীদের মধ্যে বিলি-বণ্টন করেছে। এ কারণেই সহযোগীরা এখনো নানা স্বপ্ন দেখে। ফ্যাসিবাদীরা বছরের নানা দিবসে নোঙরখানা ও জিয়াফত ইত্যাদিতে প্রচুর খরচ করত। গ্রাম ও শহরের পাড়ার লোকজন এতে কিছু না কিছু লাভবান হতো। কুরবানির ঈদে বড় বড় গরু জবাই করত। এতে দরিদ্রজন বছরে দুই-পাঁচ সের গরুর গোশত পেত। এতেই তারা মনে করত এই সাহেব বা বিবি দানশীল ও ভালো মানুষ। সেই ভালো মানুষগুলো নাই দেখে গরিবরা এখন দুঃখ ও কষ্ট পাচ্ছে। তারা তো অন্য কিছু দেখে না। অন্য কিছু বুঝতে চায় না। যাদের কাছ থেকে পায়, তাদের জন্য তারা দোয়া করে। তারা তাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চায়।
এখানেই একটা বড় সমস্যা। ফকির-ভিক্ষুক ও হতদরিদ্র মানুষ এবং মহিলা গৃহকর্মীরা ওদের জন্য দোয়া করে। ওরা ফ্যাসিবাদ বোঝে না। স্বৈরাচারী বুঝে না। বুঝে নিজেদের জন্য সামান্য কিছু অর্থ। যে অর্থ দিয়ে ওরা ছেলেমেয়েকে পড়াবে। তাদের বিয়ে-শাদী দেবে। অসুখ-বিসুখে চিকিৎসা করবে, এই তো। তারা এখন বলতে গেলে অনেকটা বঞ্চিত। সমাজের কাছ থেকে পূর্বে যা পেতো, এখন তা পায় না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে একটি ইসলামী দল কিছু দিচ্ছে। আর কিছু দিচ্ছে সামনের নির্বাচনের জন্য বিকল্প দলটি।
এসব সত্য এবং গোটা দেশের খণ্ড খণ্ড চিত্র। সবাই জানে। কিন্তু খুব বেশি আলোচনা করে না। রাজধানীতে আমরা যারা আছি, আমরা হয়তো মন খুলে, প্রাণ খুলে কথা বলছি। আমাদের মিডিয়া সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে যার যার মতো প্রাণ খুলে কথা বলতে পারছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা কথা বলার যে সুযোগ-সুবিধা এখন পাচ্ছে, গত ৭৮ বছরে তা পায়নি। এটা একটা আল্লাহর বড় রহমত। কিন্তু অধিকাংশ মিডিয়া, লেখক, বক্তা, রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী যদি হরহামেশা মিথ্যা কথা বলে, অসত্য কথা বলে, তাহলে কি মহান আল্লাহ এ রহমত উঠিয়ে নেবেন না? এ নেয়ামত আগের মতো বন্ধ হয়ে যাবে না?
শুরুতেই যদি বিপ্লবী সরকার হতো এবং ছাত্ররা যদি রাজনৈতিক দল গঠন না করতো, ছাত্রত্ব বজায় রেখে বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতো, তাহলে বর্তমানে যে পরিস্থিতির মধ্যে আমরা আছি, সেটা হয়তো হতো না। নির্বাচন ছাড়াই একটি দল বলতে গেলে ক্ষমতায় বসে আছে, তা হয়তো সম্ভব হতো না। শুরুতেই বিপ্লব ছিনতাই হয়ে গেল। অভ্যুত্থানের ফলাফল ভিন্ন দিকে গড়ালো। যাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হলো, তারা শতকরা শতভাগ সেক্যুলার। তারা চলবে সেক্যুলার বিশ্বের উপদেশ ও পরামর্শমতোÑ এটাই তো স্বাভাবিক। সে বিষয়টা যারা বিপ্লব ঘটালো, তারা বুঝতে পারল না। রাজনৈতিক দল না করে ছাত্রদের উচিত ছিল বিপ্লবের গার্ড হয়ে অবস্থান করা। সে পরামর্শ তারা পায়নি, তা কিন্তু নয়।
যারা ক্ষমতা পেল অর্থাৎ ছাত্ররা যাদের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখল, তারাই ছাত্রদের পরামর্শ দিয়েছে রাজনৈতিক দল গঠন করার। কারণ সেক্যুলার বিশ্ব জানে, রাজনৈতিক দল করতে গেলে ছাত্ররা আপসের মধ্যে চলে যাবে। ক্ষমতায় চলে যাবে। ক্ষমতায় গেলে টাকা-পয়সা পেলে বিপ্লবী চেতনা সেভাবে আর থাকবে না। পার্থিব জগতে দুই আর এক যোগ হলে তিন হয়। ঘটনাটা তাই হলো।
ছাত্ররা এখন নিজেরাই দ্বন্দ্ব-কলহে লিপ্ত। নিজেদের দলই তারা ঠিকমতো গড়তে পারছে না। নিজেদের নিয়েই তারা এখন দারুণভাবে ব্যস্ত। দল করার জন্য, দলকে শক্তিশালী করার জন্য তাদের এখন অনেক টাকা-পয়সা দরকার।
সুতরাং তাদের আপসকামী হতেই হচ্ছে। ক্ষমতায় যাওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। শেষমেশ এমনও হতে পারে, হয় তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। অথবা বিএনপির সাথে সমঝোতা করে কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে এগিয়ে যেতে পারে। তবে যাই করুক, তাদের মধ্যে আর বিপ্লবী চেতনা বিদ্যমান থাকছে বলে মনে হয় না। যতদূর অনুমান করা যায়, তাদের একটি অংশ বিএনপি জোটে অংশগ্রহণ করবে এবং অপর একটি অংশ ইসলামী জোটে অংশগ্রহণ করবে। কারণ ছাত্রদের মধ্যে যারা সেক্যুলার তারা চাক্ষুষ করছে নির্বাচন ছাড়াই বিএনপি ক্ষমতায় বসে আছে। সুতরাং তাদের সাথে সমঝোতা করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।