থেমে নেই ষড়যন্ত্র, ভার্চুয়ালি বৈঠক করছেন হাসিনা

১৪ দলের কাঁধে ভর করে ফিরতে চাচ্ছে আ’লীগ


২১ আগস্ট ২০২৫ ১৫:০১

॥ সৈয়দ সাইফুল ইসলাম ॥
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা কর্তৃক গুলির নির্দেশে দেশে হাজার হাজার নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ। রাষ্ট্রীয় অর্থে নাগরিকদের ওপর গুলি চালিয়ে ক্ষমতায় থাকতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী হাসিনা। পালিয়ে গিয়ে বসে নেই হাসিনা ও তার দোসররা। তারা দেশে এবং বিদেশে বসে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও অনেকেই এখনো দেশে রয়েছে। যারা দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার এবং সন্ত্রাসে জড়িত ছিল তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো গ্রেফতার হয়নি। অনেকে দেশে থেকেই অপকৌশলের অংশ হিসেবে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বলছেন, তিনি বিদেশে আছেন, কিন্তু প্রকৃত এমন হাজার হাজার নেতাকর্মী দেশে অবস্থান করছেন। এদের কেউ দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে আবার কেউ আওয়ামী লীগ সক্রিয় করতে নানা কৌশলে এগোচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের মধ্যে যারা এখন সক্রিয় রয়েছে, তারা নানা কৌশলে আওয়ামী লীগকে বাঁচিয়ে রাখার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মহাজোটের শরিক এবং বার বার ফ্যাসিস্ট সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতাকারী জাতীয় পার্টির একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগকে কৌশলে সক্রিয় করার মিশন নিয়ে মাঠে সক্রিয় রয়েছে। এ অংশটি দেশে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতার সঙ্গেও সখ্য রাখছে।
নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হাসিনা
বিশ্লেষকরা বলছেন, এক বেসামাল ও অদ্ভুত আচরণ করছে আওয়ামী লীগ। প্রশাসনে থাকা আওয়ামী লীগের লোকেরাও সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সক্রিয়। গণধিকৃত এ আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর এক বছর পার হলেও নিজের শাসনের পতনকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে জনমতের সমর্থন ফেরাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। দলটির শীর্ষনেতারা বার বারই দাবি করছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ক্ষমতা হারিয়েছে। এ অবস্থান ধরে রেখেই দলটি ফের ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশল সাজাচ্ছে। তাদের আশা, অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সাধারণ মানুষের মাঝে অসন্তোষ তাদের জন্য রাজনৈতিক ময়দানে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করবে। তবে গত জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলন দমন, হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়া নিয়েও দলটির পক্ষ থেকে কোনো অনুশোচনার আভাস মেলেনি। বরং এসব নিয়ে সমালোচনাকে উড়িয়ে দিতেই ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’কে সামনে এনেছে তারা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে বিরোধীদল, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছে। সেই বিচ্ছিন্ন অবস্থায় একা হয়ে পড়েছিল দলটি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের দমননীতির কারণে ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রতি মানুষের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল, যা পতনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। দলটির অনেক শীর্ষনেতা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়ে আছেন। অনেকেই মানবতাবিরোধী অপরাধ ও বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বিচারের মুখোমুখি। আর যারা দেশে রয়ে গেছেন, তারা আত্মগোপনে রয়েছেন, কেউ প্রকাশ্যে রাজনীতিতে সক্রিয় না হলেও লিপ্ত রয়েছে নানা ষড়যন্ত্রে।
গত বছরের জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলন দমনে যেভাবে শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে এবং তাতে যত প্রাণহানি হয়েছে, সেটির দায় স্বীকার করে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করতে দেখা যায়নি দলটিকে। কোনো অনুশোচনা বা ভুল স্বীকার না করে, শুধু ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে, আর ভারতে বসে হাসিনা পলাতক নেতাকর্মীদের উসকানি দিচ্ছেন। এখনো শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্বে একক নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন। ভারতে অবস্থান করেই তিনি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি বৈঠক করে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। পাশাপাশি তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ও এখন দলীয় কার্যক্রমে আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় হয়েছেন।
এদিকে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। আওয়ামী লীগের এ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ কম, আর এটাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দলের পক্ষে জনমত গড়তে সক্রিয় হচ্ছে দলটি। আওয়ামী লীগ মনে করছে, তারা দেশের বৃহৎ একটি ভোটব্যাংকের প্রতিনিধি, ফলে নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ না থাকলে তা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠাবে। যদিও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাইরে থাকা নেতারা যতই সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় হোন না কেন, মাঠের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের এখন কোনো অবস্থান নেই। তবে দলটির জোট শরিকদের কাঁধে ভর করে রাজনীতি সক্রিয় হতে নানা অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে।
ভার্চুয়ালি বৈঠক করছে, হাসিনা
ভারতে দলীয় অফিস খুলে সব পলাতক নেতারা একত্রিত হচ্ছেন সেখানে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি বৈঠকের মাধ্যমে সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং সজীব ওয়াজেদ জয়কে সামনে এনে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন। জয় এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা ও দলকে সংগঠিত করার দায়িত্ব পালন করছেন। দেশে থাকা নেতাকর্মীরা কে কোন দায়িত্ব পালন করছেন, তা ঠিক করছেন হাসিনা। তার টেলিফোনালাপ ফাঁস হওয়ায় এখন অন্যদের ফোন নম্বর ব্যবহার করে নির্দেশনা দিচ্ছেন তিনি। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন দফতর ও প্রশাসনে থাকা নেতাকর্মীরাও শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে নির্দেশনা পাচ্ছেন।
পরিকল্পনা ছিল আগস্টেই হাসিনাকে ফেরানোর
অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাত করে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ‘আগস্ট রিটার্ন হিট প্ল্যান’ ভেস্তে গেছে। যদিও এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে ছিল ভয়াবহ সব নাশকতার ছক। দেশবিরোধী এসব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একদল দেশপ্রেমিক পেশাদার কর্মকর্তা। এই টিমে সেনা ও পুলিশ বাহিনীসহ গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত টিম নানাভাবে রাত-দিন কাজ করেছে। এর ফলে এখন বলা যায়, ষড়যন্ত্রকারীদের প্রথম দফার অপতৎপরতার ছক একে একে ব্যর্থ হয়েছে। তবে তারা বসেও নেই। ফেব্রুয়ারিতে হতে যাওয়া আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করতে দ্বিতীয় ধাপের ষড়যন্ত্রের ছক হাতে নিয়েছে, যা অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে চায়। পুলিশের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বশীল সূত্রের বরাত দিয়ে একটি প্রভাবশালী গণমাধ্যম এমন প্রতিবেদন করেছে। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, যেভাবে সক্রিয় হচ্ছে প্ল্যান-২ : নির্ভরযোগ্য সূত্রের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারকে ফেলে দিতে আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা-২ সক্রিয় করা হচ্ছে। যার প্রধান টার্গেট অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর। ৩ মাসজুড়ে সক্রিয় থাকবে। এর আগে সরকারকে অচল করে দিতে দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে বিশেষ কিছু কার্যক্রম শুরু হবে। এসব গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম, মাহবুব-উল আলম হানিফ, সাবেক মন্ত্রী ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ বেশ কয়েকজন। অফিসিয়ালি বসে কাজের সমন্বয় করতে ইতোমধ্যে কলকাতা ও দিল্লিতে আওয়ামী লীগের পৃথক গোপন অফিসও খোলা হয়েছে। সেখানে তারা ৫ আগস্ট থেকে কাজ শুরু করেছেন। এ চক্রের কাজে সহায়তা দিতে বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নেপথ্যে থেকে সক্রিয়ভাবে রসদ জোগাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের পলাতক নীতিনির্ধারক মহলের বদ্ধমূল ধারণা, টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে তারা ভয়াবহ যেসব অপরাধ করেছেন, তার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে মাঠের রাজনীতিতে পাকাপোক্তভাবে ফিরে আসা সহজ হবে না। ফের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরে আসতে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। এজন্য তারা উল্টো পথে শেখ হাসিনাকে ফের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই ক্ষমতায় বসাতে মরিয়া। এজন্য যা যা করার, তারা সেটিই করতে চান।
মামলা পরিচালনায় সম্পৃক্তদের হাসিনার হুমকি
মামলা পরিচালনায় সম্পৃক্ত প্রসিকিউটর, তদন্ত কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও আদালতের কর্মচারীদের ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তাঁর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার দায়ে করা মামলায় পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ বিষয়টি এসেছে। এ মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনাকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গত ২ জুলাই এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। শেখ হাসিনার পাশাপাশি এ মামলায় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা শাকিল আকন্দ বুলবুলকেও দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা ও বুলবুলের কথোপকথন একটি অডিও গত বছরের অক্টোবরে ভার্চুয়াল জগতে ছড়িয়ে পড়ে। এ অডিও সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায় দুজনের কথোপকথন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি নয়। পূর্ণাঙ্গ রায়ে শেখ হাসিনা ও বুলবুলের কথোপকথন (ফাঁস হওয়া অডিও) তুলে ধরা হয়েছে। এর এক জায়গায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘ওইসব তালিকা করো আর অফিসারদের বলো আমরা তালিকা পাঠাচ্ছি নেত্রীর কাছে। উনি চাইছেন, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।’ শেখ হাসিনার এ কথার পর বুলবুল বলেন, ‘জি নেত্রী, জি আসসালামু আলাইকুম।’ এরপর শেখ হাসিনা বলেন, ‘চাকরি সামনেও করতে হবে, এটা ভুলে যায় না যেন। এক মাঘে শীত যায় না।’
ওসিদেরও হুমকি
উত্তরা পশ্চিম থানার সাবেক ওসি হাফিজুর রহমানকে মোবাইল ফোনে প্রাণনাশের হুমকির এমন এক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। এ বিষয়ে ওসি হাফিজ বলেন, এ ঘটনায় তিনি গত ২৫ জুন থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। তিনি আরো বলেন, তাকে মোবাইলে আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে এবং তার পরিবারকে দেখে নিবে এমন হুমকি দেওয়া ব্যক্তি উত্তরখানের বাসিন্দা। বর্তমানে সে ইন্ডিয়ার কলকাতায় অবস্থান করছে। এর আগে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল কালাম আজাদকে বঙ্গবন্ধু গেরিলা বাহিনীর প্রধান পরিচয় দিয়ে মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমন একটি কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।