ডাকসু নির্বাচনে উচ্ছ্বসিত ক্যাম্পাস
২১ আগস্ট ২০২৫ ১৪:৩৯
স্টাফ রিপোর্টার : জমে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে সক্রিয় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ছাত্র অধিকার পরিষদ, বামজোটসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উচ্ছ্বসিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ৩৭ সহস্রাধিক শিক্ষার্থী। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে বহুকাক্সিক্ষত এ ছাত্র সংসদ নির্বাচন। আলোচিত এ নির্বাচন ঘিরে পুরো ক্যাম্পাস এখন উৎসবমুখর। ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বিরাজ করছে নির্বাচনী আমেজ। নির্বাচনী তৎপরতার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্রদল ও ছাত্র ইউনিয়ন নিজস্ব প্যানেল ঘোষণা দিয়েছে। অবশ্য গত ২০ আগস্ট বুধবার বেলা ১টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত অনেক সংগঠন প্যানেল ঘোষণা দেয়নি। তবে সংগঠনের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে বসে নেই কেউই। সব সংগঠনই অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছে প্রচার, করছে জনসংযোগ।
তফসিল অনুযায়ী (১৮ আগস্ট) মনোনয়নপত্র সংগ্রহের শেষ দিন থাকলেও একদিন বাড়িয়ে (১৯ আগস্ট) দেয় কমিশন। ছাত্রদল ছাড়া একাধিক ছাত্র সংগঠনের অভিযোগ, একটি বিশেষ দলের ছাত্র সংগঠনের সুবিধার জন্য কোনো কারণ ছাড়াই সময় একদিন বাড়ানো হয়েছে। একদিন বাড়ানোয় ১৯ আগস্ট শেষ হয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময়। শেষ দিনে কেন্দ্রীয় সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে অন্তত ৯৩ জন বিভিন্ন পদে ফরম সংগ্রহ করেন। ডাকসু নির্বাচনের ২৮টি পদের বিপরীতে গত ১৮ আগস্ট পর্যন্ত ফরম সংগ্রহ করেছিলেন ৫৬৫ জন শিক্ষার্থী। শেষ দিন ১৯ আগস্টে ৯৩ জন ফরম সংগ্রহ করেন। সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ফরম নিলেন মোট ৬৫৮ জন শিক্ষার্থী।
ডাকসু নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন গত ১৯ আগস্ট মঙ্গলবার তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সামনে মনোনয়ন ফরম বিক্রির তথ্য তুলে ধরেন। এ সময় তিনি জানান, মঙ্গলবার পর্যন্ত সর্বমোট ৬৫৮টি ফরম বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে জমা পড়েছে ১০৬টি। গত ১৮ আগস্ট সোমবার পর্যন্ত হল সংসদ নির্বাচনের জন্য মোট ১২২৬ জন ফরম নিয়েছিলেন।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ২০ আগস্ট বুধবার, তবে দুপুরে এ রিপোর্ট তৈরি করায় শেষ পর্যন্ত কতজন ফরম জমা দিয়েছেন, তার পরিসংখ্যান জানানো সম্ভব হয়নি। অবশ্য বৈধ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২৫ আগস্ট। আর ২৬ আগস্ট প্রকাশিত হবে প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা। অর্থাৎ ২৬ আগস্ট বিকেলে জানা যাবে ডাকসু নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কতজন থাকছেন।
শিবিরের ভিপি প্রার্থী সাদিক, জিএস ফরহাদ
ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে ২৮ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। ঘোষিত প্যানেলে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে রয়েছেন শিবিরের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক সাদিক কায়েম। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রার্থী হয়েছেন শিবিরের ঢাবি শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদ এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন ঢাবি শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন খান। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন পদে ইনকিলাব মঞ্চ থেকে যুক্ত হয়েছেন ফাতিমা তাসনীম জুমা।
গত ১৮ আগস্ট ঢাবির নওয়াব নবাব আলী সিনেট ভবনের তৃতীয় তলায় চিফ রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে মনোনয়ন ফরম তুলে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন শিবিরের নেতাকর্মীরা।
এ সময় ভিপি, জিএস, এজিএস পদের প্রার্থী ঘোষণা করেন শিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম। প্রার্থী ঘোষণার পর তিনি আশা ব্যক্ত করে বলেন, প্রশাসনের দেওয়া নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরাপদ পরিবেশে হবে বলে আমরা আশা করি। ঢাবি শিবিরের সভাপতি এস এম ফরহাদ প্যানেলের বাকি সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, প্যানেলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে রয়েছেন ইকবাল হায়দার, কমনরুম, রিডিংরুম ও কাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে উম্মে সালমা, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে রয়েছেন খান জসীম, যিনি জুলাইয়ে চোখ হারান। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে রয়েছেন নুরুল ইসলাম সাব্বির, যিনি বর্তমানে ঢাবি শিবিরের অর্থ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ক্রীড়া সম্পাদক পদে আছেন আরমান হোসেন, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক পদে আসিফ আব্দুল্লাহ, আর সমাজসেবা সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছেন শরিফুল ইসলাম মুয়াজ। এছাড়া গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে রয়েছেন ঢাবি শিবিরের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসাইন খান, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক পদে মাজহারুল ইসলাম, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে আব্দুল্লাহ আল মিনহাজ এবং মানবাধিকার ও আইনবিষয়ক সম্পাদক পদে রয়েছেন সাখাওয়াত জাকারিয়া। ঘোষিত প্যানেলে ১৩টি সদস্য প্রার্থীরা হচ্ছেন- সর্ব মিত্র চাকমা, ইমরান হোসাইন, বেলাল হোসেন অপু, জয়েন উদ্দিন সরকার তন্ময়, মিফতাহুল হোসাইন আল মারুফ, মাজহারুল ইসলাম মুজাহিদ, রাইসুল ইসলাম, সাবিকুন নাহার তামান্না, শাহিউর রহমান, আফসানা আক্তার, আবদুল্লাহ আল মাহমুদ, রায়হান উদ্দিন, আনাস বিন মনিরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল, জিএস তানভীর বারি
ভিপি পদে মো. আবিদুল ইসলাম, জিএস পদে শেখ তানভীর বারি হামিম এবং এজিএস পদে তানভীর আল হাদীকে নিয়ে ডাকসু পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ২০ আগস্ট বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পূর্ণাঙ্গ প্যানেলের ঘোষণা দেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। এ সময় তিনি বলেন, সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক নিয়মে ছাত্রদল ডাকসুর প্যানেল নির্বাচন করেছে। কারণ ছাত্রদল সবসময় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। আশা করি, ছাত্রদলের এ পূর্ণাঙ্গ প্যানেল আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ছাত্রদের অধিকার আদায়ের সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখবে।
‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ নামে লড়বে ৭ বাম সংগঠন
ডাকসু নির্বাচনে ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ নামে প্যানেলে ঘোষণা করেছে বাম ধারার সাত ছাত্র সংগঠন। এ প্যানেল থেকে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে প্রার্থী হয়েছেন শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি। তিনি আগের সংসদে শামসুন্নাহার হলের ভিপি ছিলেন। আর সাধারণ সম্পাদক বা জিএস পদে লড়বেন ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসু। এজিএস পদে প্রার্থী হয়েছেন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মো. জাবির আহমেদ জুবেল। ১৯ আগস্ট মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে ২৮ সদস্যের ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ প্যানেলের পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকা তুলে ধরেন জুবেল।
তিনি বলেন, ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র কাউন্সিল, ছাত্র যুব আন্দোলন, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও গণতান্ত্রিক ছাত্র মঞ্চ নিয়ে তাদের প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’। আগের দিন ১৮ আগস্ট সোমবার এ সাত সংগঠন এক প্যানেলে ডাকসু নির্বাচন করার বিষয়টি জানানোর পাশাপাশি ভিপি-জিএস ও এজিএসসহ চারটি পদে প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করেছিলেন জুবেল। এই চার প্রার্থীর অপরজন হলেন- মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক পদে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক। প্রতিরোধ পর্ষদের প্রার্থী তালিকার রয়েছেন- কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে নূজিয়া হাসিন (রাশা), মানবাধিকার ও আইন বিষয়ক সম্পাদক পদে আকাশ আলী, ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক পদে লিটন ত্রিপুরা, সমাজসেবা সম্পাদক পদে আবু মুজাহিদ, পরিবহন সম্পাদক পদে নিনাদ খান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সম্পাদক পদে নাঈম উদ্দীন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক পদে ফারিয়া মতিন (ইলা), ক্রীড়া সম্পাদক পদে মালিহা তাবাসসুম, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক পদে শেখ তাসনুভা সৃষ্টি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক পদে ফাতিন ইশরাক এবং গবেষণা ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক পদে আমানত ইমরান।
আর ১৩টি সদস্য পদে লড়বেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মো. তফসিরুল্লাহ, টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগের রাজেকুজ্জামান জুয়েল, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজের ওয়াকার রহমান সৌরভ, অর্থনীতি বিভাগের মোহাম্মদ মুস্তাকিম, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারিবিলিটি স্টাডিজের মিশকাতুল মাশিয়াত (তানিশা), কারুশিল্প বিভাগের আতিকা আনজুম অর্থী, অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের পৃথিং মারমা, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমসের ইসরাত জাহান ইমু, নৃবিজ্ঞান বিভাগের আনিয়া ফাহমিন, পদার্থ বিজ্ঞানের রাহনুমা আহমেদ নিরেট, প্রাচ্যকলা বিভাগের সাজিদ উল ইসলাম, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি বিভাগ হেমা চাকমা এবং তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের আলমগীর হোসেন।
প্রসঙ্গত, ডাকসুর বর্ধিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ২০ আগস্ট বিকাল ৩টা। যাচাই-বাছাই শেষে ২১ আগস্ট দুপুর ১টার সময় চূড়ান্ত প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করা হবে। তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন ২৫ আগস্ট। প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে ২৬ অগাস্ট। এর মধ্যে ডাকসু এবং হল সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। খসড়া ভোটার তালিকা থেকে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় বাদ পড়েছেন ১৫৭ জন। চূড়ান্ত তালিকায় মোট ভোটার সংখ্যা ৩৯ হাজার ৭৭৫ জন। এর মধ্যে ছাত্র ভোটার ২০ হাজার ৮৭১ জন ও ছাত্রী ভোটার ১৮ হাজার ৯০২ জন।