বিবর্ণ গোলাপের ঘ্রাণ


১৪ আগস্ট ২০২৫ ১৫:১৪

॥ রফিক মুহাম্মদ ॥
ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টিভেজা বাতাসে ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে আসছে। দোতলার বারান্দায় বসে ফুলের মন আকুল করা মিষ্টি ঘ্রাণ টের পাছে মাহাবুব। বাসার গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাসনাহেনা গাছ থেকে যে ঘ্রাণটা আসছে, সেটাও তার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। কিন্তু তারপরও মন পাগল করা এ ফুলের ঘ্রাণকে সে মন ভরে উপভোগ করতে পারছে না। আজ কয়েক মাস ধরে মাহাবুবের পৃথিবী ধীরে ধীরে অন্ধকার গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে তার সবকিছু। অথচ ফুল মাহাবুবের খুবই প্রিয়। বিশেষ করে টকটকে লাল গোলাপ তার খুব পছন্দের। গত বছরও শীতকালে সে বন্ধুদের সাথে শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে গিয়েছিল। সেখানে চা-বাগানের সৌন্দর্যে সবাই বিমোহিত হয়েছে এটা ঠিক, তবে মাহাবুব সবচেয়ে বেশি বিমোহিত হয়েছে চা-বাগানের ম্যানেজারের বাংলোর সামনে ফুলের বাগান দেখে। সে বাগানের টকটকে লাল গোলাপের সাথে কত ভঙ্গিতে ছবি তুলেছে। এসব ছবিও আজ বিবর্ণ, কালো অন্ধকার।
গত বর্ষায়ও শেষ বিকেলে এই বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে হাসনাহেনার মিষ্টি ঘ্রাণ প্রাণ ভরে উপভোগ করতো মাহাবুব। এটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্তগুলোর একটি। হাসনাহেনা ফুল দেখলেই তার মনে কেমন যেন একটা পবিত্রতার ছোঁয়া অনুভূত হতো। কী সুন্দর ধবধবে সাদা এবং কী মোলায়েম ফুলগুলো। এ ফুলের সাথে কেমন যেন একটা পবিত্রার সম্পর্ক রয়েছে। মাহাবুবদের বাসার গেটের পাশে যে হাসনাহেনার গাছটা, তার ফুল অবশ্য সাদা নয়। এ গাছের ফুলগুলো মিষ্টি গোলাপি। মাহাবুবের কাছে আসলে উজ্জ্বল রঙের ফুলই বেশি প্রিয়। তাই সে মিষ্টি গোলাপি রঙের হাসনাহেনার থোকায় হাত বুলিয়ে এক স্নিগ্ধ পবিত্রতম পরশ অনুভব করতো। বর্ষায় প্রায়ই সে এ গাছ থেকে ফুলের থোকা নিয়ে রাইমাকে উপহার দিত। রাইমাও তার হাতের ফুল পেয়ে খুব খুশি হতো। কিন্তু সবই আজ বিবর্ণ-মলিন হয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে এক অতল অন্ধকারে সে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে এ অন্ধকারও আলোর অধিক স্বচ্ছ। তার চোখের আলো ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে, কিন্তু তার সাথে সাথে উজ্জ্বল হচ্ছে হৃদয়ের স্মৃতি। সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তার সামনে আরও বেশি স্বচ্ছ ও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চাইলেও সে তা ভুলতে পারছে না। বার বার ভেসে ওঠে সে দিনের সেই রক্ত মাখা লাশ, আর কানে প্রতিধ্বনিত হয় চেতনা জাগানিয়া হাজার কণ্ঠের সেই বিপ্লবী স্লোগান… আপস না সংগ্রাম/সংগ্রাম সংগ্রাম। আবু সঈদ মুগ্ধ/শেষ হয়নি যুদ্ধ।’ সত্যি তো মাহাবুবের এই যুদ্ধ তো আর থামবে না, চলবেই। চোখের আলো হয়তো নিভে যাচ্ছে, কিন্তু স্মৃতিরা তো ঘিরে ধরছে তাকে। এত রক্ত, এত মৃত্যু, সে তো সবকিছু ভুলতে চায়। সবকিছুই তো সে মুছে ফেলতে চায়। কিন্তু চাইলেও তো সবকিছু মুছে ফেলা যায় না। এ তো কেবল মাত্র কিছু দৃশ্য নয়, এ যে তার বোধের গভীরে মিশে যাওয়া বিশ্বাসের নকশা। এটা তো কেবলমাত্র কোনো কাগজের ওপর পেন্সিলের দাগ নয় যে ইরেজার দিয়ে ঘষে মুছে ফেলা যাবে। এটা কলমের লেখাও নয় যে ফ্লুইড দিয়ে ঢেকে দেওয়া সম্ভব। এই দৃশ্য তো তার অন্তরাত্মার গভীরে প্রোথিত অমোচনীয় দাগ।
মাহাবুব ভাবতে পারে না, ভাবতে চায় না। তারপরও ভাবনারা তার পিছু সারাক্ষণ ঘুর ঘুর করে ঘুরে বেড়ায়। এ এখন সে বৃষ্টির শব্দ শুনছে। হালকা, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। হাসনাহেনা গাছের পাতা ছুঁয়ে টুপটাপ ফোঁটা পড়ছে কার্নিশে। কী অপরূপ এই বৃষ্টির দৃশ্য, কিন্তু তা অবলোকনে মন নেই মাহাবুবের। তার ভাবনাকে ঘিরে ধরছে সেদিনের সেই ঘটনা। সেদিন কত তারিখ যেন ছিল? হ্যাঁ, সেদিন ছিল জুলাইয়ে ২৪ তারিখ। রাতে বন্ধুদের সাথে কথা বলে কে কোথায় থাকবে, তা চূড়ান্ত করে ঘুমাতে একটু দেরি হয়েছিল। কিন্তু মোবাইলে এলার্ম দেওয়া ছিল, বাজার সাথে সাথে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করে রেডি হয়ে যায় মাহাবুব। মা তখন এসে বলেন, কীরে এত সকালে কোথায় যাচ্ছিস? নাশতা খেয়ে যাবি না?
মাহাবুব বলে, মা আজকে উত্তরায় আমরা বড় সমাবেশ করবো। একটু সকাল সকাল যেতে হবে।
একটু কিছু মুখে দিয়ে যা। ওই যে মটিসেফে বয়ামের মধ্যে বিস্কিট রাখা আছে, দুটি বিস্কিট খা, আমি একটু আদা চা করে দিচ্ছি।
মায়ের কথা ফেলতে পারে না মাহাবুব। বয়াম থেকে চকলেট ফ্লেবারের দুটি বিস্কিট বের করে খেয়ে নেয়। তার পর মায়ের হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে চুমুক দেয় আর মায়ের মুখের দিকে তাকায় সে। মা ততক্ষণে তার সামনে চেয়ার টেনে বসেছেন। ফজরের নামাজ শেষে মাথায় হিজাব পরা মায়ের মুখটা কী সুন্দর পবিত্র আর মায়াময়। মায়ের দিকে তাকিয়ে থেকেই চায়ের কাপে শেষ চুমুক দেয় মাহাবুব। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে মায়ের কপালে আলতো চুমো খেয়ে বলে, আম্মা আসি…।
মাও তার গালে আলতো আদর করে মুচকি হেসে শুধু বলেছেন পাগল…।
এরপর, নাÑ মাহাবুব আর কিছু ভাবতে চায় না। কী ভয়াবহ সেই দৃশ্য, পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে রাজপথে লুটিয়ে পড়েছে কয়েকজন। লুটিয়ে পড়া একজনকে টেনে আনতে গিয়ে তার ডান চোখে এসে লাগে একটা গুলি। এরপর সেও লুটিয়ে পড়ে। রক্তে ভেসে যায় রাজপথ, তারপরও হাজার হাজার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, ‘বুকের ভিতর বইছে ঝড়/বুক পেতেছি গুলি কর…।’ স্লোগান শুনতে শুনতেই ধীরে ধীরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে মাহাবুব। এরপর আর কী মনে নেই। জ্ঞান ফিরে দেখে সে আগারগাঁয়ের চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের এক বেডে। তার পাশে তার মমতাময়ী মা বসে আছে। চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা। মাকে সে দখতে পাচ্ছে না। কিন্তু মায়ের কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছে। মাহাবুব তার মায়ের মুখটা হাতড়ে দেখে। চোখে তার প্রচণ্ড ব্যথা। মাথাটা নাড়াতে পারছে না। তারপরও ফিস ফিস করে মাকে জিজ্ঞেস করে… আম্মা আমি কি আর তোমাকে দেখতে পারব না? মা তার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শক্ত করে ধরে বলেন, এসব অলক্ষুণে কথা বলে না বাবা। ডাক্তার তো বলেছে, সব ঠিক হয়ে যাবে।
এরপর দিন যায়, মাস যায়, চিকিৎসা চলতে থাকে। প্রথম প্রথম অনেকে আসে। তার মতো আরও আহত অনেককে দেখতে আসেন। চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। তাদের জাতীয় বীর বলেও আখ্যায়িত করেন। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের চিকিৎসা করার কথাও বলা হয়। এসব শুনে প্রথম দিকে সে নিজেকে নিয়ে ভিতরে ভিতরে খুব গর্ব অনুভব করতো। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই সব দৃশ্য পাল্টে যেতে থাকে। তিন মাস চিকিৎসার পর মাহাবুবকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেওয়া হয়। বলা হয় তার ডান চোখের কর্ণিয়া আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, তাই এ চোখের দৃষ্টি ফেরাতে সময় লাগবে। আরও কিছুদিন দেখে তারপর প্রয়োজনে চোখে কর্ণিয়া প্রতিস্থপান করতে হবে। এটা আমাদের দেশে সম্ভব না হলে দেশের বাইরে পাঠানো হবে।
আজ ছয় মাসের বেশি হয়েছে মাহাবুব বাসায় এসেছে। পনেরো দিন পরপর হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আসে। কিন্তু তাতে তার চোখের কোনো উন্নতি হচ্ছে না। ডান চোখের পাশাপাশি এখন বাম চোখেও ঝাপসা দেখছে। চিকিৎসক বলেছে, চোখে কর্ণিয়া প্রতিস্থাপন ছাড়া দৃষ্টি ফিরবে না। এমনকি কর্ণিয়া প্রতিস্থাপনেও কতটুকু ভালো ফলাফল আসবে, সেটাও নিশ্চিত করে বলা যায় না বলেই ডাক্তার জানিয়ে দিয়েছে। এখন আর আগের মতো কেউ খোঁজ নিতে আসে না। বিদেশে গিয়ে চোখের চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ্য তাদের নেই। সরকারের সহযোগিতার আশায়ই তার এখন দিন কাটছে।
বেশ কিছুদিন হলো মাহাবুব এখন আর মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে না। আগে বাসায় বসে ফেসবুকে সবার সাথে যোগাযোগ করতো, সময়টা কেটে যেতো। কিন্তু এখন চোখের যা অবস্থা, তাতে দুটিতেই বেশ ঝাপসা দেখে। কোনো কিছু পরিষ্কার দেখতে পায় না। এ অবস্থায় ফেসবুক চালানো খুব কষ্ট। এছাড়া মাসখানেক হবে রাইমা তাকে আনফ্রেন্ড করে দিয়েছে। ফোন দিলেও রাইমা এখন আর তার ফোন ধরছে না। যার দু’চোখই অন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তার সাথে জীবনকে জড়াতে কে চায়? রাইমাও দূরে সরে গেছে। মাহাবুবও তাই নিজেকে এখন একদম গুটিয়ে নিয়েছে। সে এখন একা একা ভাবে, এই শহর, এই দেশ সবাই নিজের মতো করে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। তাহলে সে কেন পারবে না নিজের মতো চলতে। কোনো কিছুই তো থেমে নেই। সবকিছুই তো নিজের নিয়মে চলছে। এই যে বহমানতা তার মধ্যে সে কেন থেমে যাবে? নিজেই নিজের সাথে সারাক্ষণ কথা বলে, তর্ক করে-যুক্তি দেয়। নিজেই নিজের ভেতরে ডুব দেয়। সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর আস্থাশীল হয়ে ওঠে। মনে মনে বলে, আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন।