আলোকে তিমিরে

হে আল্লাহ! আমরা এখন কোথায় আছি?


১৪ আগস্ট ২০২৫ ১৫:০৭

॥ মাহবুবুল হক ॥
আমরা যখন লেখালেখি করি, তখন একটি কথা বার বার বলি না। বলার সময়ও একই আচরণ করি। কিন্তু মহান আল্লাহ কুরআনে একই কথা বার বার বলেছেন। আজ আমি চেষ্টা করব মহান আল্লাহর সুন্নতকে ফলো করতে।
আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার মনে হয় কানে শক্ত তুলা দিয়ে রেখেছেন। তারা জনগণের বা দেশবাসীর কোনো কথা শুনছেন না। শোনার চেষ্টাও করছেন না। মনে হয় তাদের নিজস্ব একটা টার্গেট ছিল। একটা ডেসটিনি ছিল। একটা লক্ষ্য, উদ্দেশ্য বা গন্তব্য ছিল। সেই টার্গেটে পৌঁছার জন্য তারা দিনরাত কাজ করছেন। সরকারের সবাইকে যখনই দেখি, তখনই মনে হয় তারা খুব টায়ার্ড হয়ে গেছেন। মনে হয় তারা (অবশ্যই কয়েকজন ছাড়া) দিনে যেনতেনভাবে সময় কাটাচ্ছেন। রাতে তারা না ঘুমিয়ে তাদের টার্গেট অনুযায়ী অবিরাম কাজ করছেন। এখন কথা হলোÑ তাদের আবার কী টার্গেট? তাদের কি পূর্ব থেকেই জানা ছিল যে, তারা এই সময় ক্ষমতায় আসীন হবেন এবং অসীন হলে তারা এই এই কাজ করবেন? আমরা সাধারণ মানুষ, আমরা এসব কিছুই জানি না। ঘটনা যা ঘটে, তাই শুধু আমরা দেখতে পাই, শুনতে পাই অথবা জানতে পারি। এরপর যা ঘটে, তার ওপর আমরা হয়তো চিন্তাভাবনা করি, কথা বলি, লেখালেখি করি। উঠান বৈঠক থেকে শুরু করে গোলটেবিল বৈঠক করি, মানববন্ধন করি, কিছু আন্দোলন করি, কিছু মারামারি করি, কিছু গোলমাল করি, কিছু লোকদেখানো কাজ করি, কিছু মিছিল করি, কিছু টকশো করি। এর বাইরে তো আমরা যেতে পারি না। এখন তো কেউ কেউ বলছেন, অভ্যুত্থান বা বিপ্লব এসব কিছু না। এসব পূর্ব থেকেই পরিকল্পনার মধ্যে ছিল। এমন কথাও উড়ছে, আরে যারা ২০৪১ সাল পর্যন্ত নির্বিবাদে ক্ষমতায় আসীন থাকার কথা বুক উদাম করে বলেছে, তারাই এ মহাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এটা হলো সেই নাটকের একটা বড় এপিসড।
অন্তর্বর্তী সরকার এদিক-সেদিক করে চার বছর কাটাবে, তারপর পূর্বে যারা ছিল, তারাই তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী পুনরায় ফিরে আসবে। একটি নাটকের বহুমুখী কাজ থাকে। যারা নাটকের সঙ্গে জড়িত বা যারা নিত্য নাটক দেখেন, তারা ভালো করে জানেন, স্ক্রিপ্ট যেভাবে তৈরি করা হয়, যেভাবে মঞ্চস্থ করার পরিকল্পনা থাকে, কথা-বার্তা বা ডায়ালগ যেভাবে করার কথা থাকে, স্থান-কাল-পাত্রভেদে শুধু যে পরিচালক প্রয়োজনবোধে ঠিকঠাক করেন বা পরিবর্তন করেন, তা কিন্তু নয়, যেকোনো বিশ্বস্ত বোদ্ধা নাট্যশিল্পী প্রয়োজনবোধে চেঞ্জ করতে পারেন। করেনও।
একবার বিটিভির একটি ঈদ নাটকে আমার লেখা নাটক এমনভাবে পরিবেশিত হয় যে, আমি একেবারেই হতভম্ব ও বিড়ম্বিত হয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে বিটিভির মহাপরিচালক মাহবুবুল আলম গোরা ও প্রখ্যাত নাট্যগুরু মতিন ভাইকে আমি অভিনন্দন ও শ্রদ্ধা জানিয়েছিলাম। এসব কথা এখন বেশ মনে পড়ছে।
‘অজেয় বসনিয়া’ নাটক সৃষ্টির সময় প্রখ্যাত চলচ্চিত্র-নাটক ও ইতিহাস-সংস্কৃতিজন আরিফুল হক ভাই কতভাবে কত কিছু পরিবর্তন করলেন, তা তো আমাদের চোখে দেখা। সে নাটক দেখে ইন্ডিয়ার দিলীপ কুমারসহ (তিনি তখন ঢাকায় অবস্থান করছিলেন) এদেশের প্রখ্যাত কয়েকজন রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। এদেশের রাজনীতিও অনেকটা আজকালকার তথাকথিত নাটকের মতো। উত্তম নাটক তো বহু পূর্ব থেকেই নির্বাসনে।
এক বছর পর কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমরা তো দেখছি সবকিছু পূর্বের মতোই বহাল আছে। ব্যতিক্রমটা কী? সবাই জানে ব্যতিক্রমটা হলো বিরোধী রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার নেতা ও কর্মীÑ যারা জেলখানায় অনিশ্চিত জীবনযাপন করছিলেন, অকারণে হাজার হাজার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী মামলায় নিমজ্জিত হয়ে দেশ-বিদেশে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, শত শত নিরীহ সাধারণ মানুষ আয়নাঘরসহ নানারকম কষ্টের জায়গায় লাঞ্ছিত ও অত্যাচারিত হয়ে মানবেতরভাবে জীবনযাপন করছিলেন, যারা গুম হয়েছিলেন, যাদের সহায়-সম্পত্তি বেদখল হয়ে গিয়েছিল, তাদের অনেকাংশ জীবনের সবকিছু হারিয়ে অসহায়ের মতো এখন মহান আল্লাহর দেওয়া স্বাধীনতা ভোগ করার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন।
এর পূর্বে ঠিক প্রথম দিকে যখন ছাত্র-জনতার বিপ্লব বিজয় লাভ করল, তখন মনে হয়েছিল একটা গৃহযুদ্ধ বুঝি লেগেই যায়। কারণ ফ্যাসিবাদীরা বহু পূর্ব থেকেই প্রকাশ্যেই বলে আসছিল যে, নির্বাচন হোক, আন্দোলন হোক, বিদ্রোহ-বিপ্লব যাই হোক না কেন, আমরা যদি হেরেই যাই বা পরাজিত হই, তাহলে আমাদের অস্তিত্ব থাকবে না। বিরোধীরা আমাদের কচুকাটা করবে। সুতরাং আমাদের জিততেই হবে এবং সেটা যেকোনোভাবেই হোক। ফ্যাসিবাদের নীতিনির্ধারকরাই এসব কথা দেশে-বিদেশে সব জায়গায় বলেছেন। শুধু তাই নয়, প্রথম পাঁচ বছরের পর থেকেই ফ্যাসিবাদীদের বিরাট একটি অংশÑ যারা অনুধাবন করতে পেরেছিল, তাদের সরকার বেনেভলেন্ট ডিক্টেটরশিপ চালাতে পারবে না। সুতরাং চিরস্থায়ী হওয়া তো দূরের কথা, যেকোনো সময় এ ধরনের সরকার ধসে পড়তে পারে। সেই ক্যালকুলেশন থেকে ব্যাপক লুটপাট শুরু হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় ব্যাংক ডাকাতি। সাথে সাথে বিদেশে অর্থ ও সম্পদ পাচার নিত্য-নৈমিত্তিক বিষয়ে দাঁড়িয়ে যায়। পরিবারের একটা অংশ থাকে দেশে। আরেকটা অংশ থাকে বিদেশে। বিভিন্ন অজুহাতে বিদেশে অর্থ পাচার চলতে থাকে। একটা ভয় ও ভীতি থেকে এই অবৈধ ও অন্যায় প্রক্রিয়ার জন্ম। যেসব দেশে এসব কালো টাকা গিয়েছে, সেসব উন্নত দেশ তথা সেকুলার দেশ এসব অন্যায় ও অবৈধ কার্যকলাপকে নিজেদের স্বার্থে সহযোগিতা করেছে। এখনো তারা সেসব সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে।
ফ্যাসিবাদের কর্ণধাররা পরাজয় বা পরাভূত হওয়াকে এই নির্মম ন্যারেটিভে নিয়ে আসায় দলের সারা দেশের নেতাকর্মীরা জান-মাল রক্ষা ও বৃদ্ধিতে প্রভূতভাবে মনোযোগ দেয়। যারা মাতৃভূমি ছেড়ে বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করার সুযোগ নিতে চেয়েছে, তাদের অধিকাংশই সেটা অর্জন করার সুযোগ পেয়েছে। যারা যেতে পারেনি অথবা যারা অন্তত দুদেশে বসবাস করার পরিকল্পনা করেছে, তারা মোটামুটি গত নির্বাচনের পূর্বেই তাদের তথাকথিত শত্রু ও তথাকথিত রাজনৈতিক বিরোধীদের সাথে হাত মিলিয়ে জান ও মালের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে নিয়েছে। অরাজনৈতিক ব্যক্তিগণ এসব দেখেও না দেখার ভান করে জীবনযাপন করার নানা অলিগলি খুঁজে নিয়েছে। একটা দেশের সরকারি লোকজনের সাথে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় বিরাজমান থাকলে সেখানে তো কার্যত বিরোধের কিছু থাকে না। সুতরাং তথাকথিত গৃহযুদ্ধ তো হয়নি, বরং সবাই মিলে নিরাপত্তার নিশ্বাসে অবগাহন করেছে।
ফ্যাসিবাদের নীতিনির্ধারকরা বহু পূর্ব থেকে তাদের নির্মম বয়ান বজায় রাখায় সবদিক থেকে ভালো হয়েছে। সবাই বেঁচে গেছে। দেশ ও জাতির কোনো কলঙ্কময় অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়নি।
সরকারের শুরুটা ভালো না হলেও একেবারে খারাপ ছিল না। ফ্যাসিবাদের হোমড়া-চোমড়া ছাড়া দেশবাসীর মধ্যে দারুণ ঐকমত্য ছিল। এমন একতা সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া কখনো আর দেশবাসীর মধ্যে পরিদৃষ্ট হয়নি। সরকারের প্রতি বিশেষ চাপ ছিল বিচারের ব্যবস্থা করা। কিন্তু দেখা গেল সরকার এ বিষয়ে যথেষ্ট নমনীয়। প্রশ্ন উঠল তাহলে সরকারে কারা আছেন। দেখা গেল এনজিও এবং অন্যসব দলের ব্যক্তিরা আছেন। নেই শুধু ইসলামপন্থী কেউ। সুখের বিষয় ইসলামপন্থীরা এ নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি করেনি। প্রফেসর ইউনূস সাহেবকে এ দেশের ইসলামপন্থীরা কখনো তেমন ভালোবাসেনি। কিন্তু দেশ ও জাতির স্বার্থে ইসলামপন্থীরা এই একটি বিষয়ে এবার দারুণ সহনশীল ছিল। শুধু এ বিষয়ে নয়, অধিকাংশ বিষয়ে তারা মিনিমাম ম্যাচিংয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। তাদের আশা ছিল, যারা অপরাধী এবং ফ্যাসিবাদী সরকারকে অন্যায়ভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে এসেছে, যারা ব্যাংক ও বীমাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করেছে, সেসব রাঘব-বোয়ালদের খুব তাড়াতাড়ি আইনের আওতায় আনতে। আবার এ কোথাও ইসলামপন্থীরা বলেছে, শুধু দল করার কারণে কাউকে যেন গ্রেফতার করা না হয় বা হয়রানি করা না হয়। অর্থাৎ সর্ববিষয়ে তারা ঔচিত্তকে প্রাধান্য দিয়েছে। বাস্তব অবস্থাকে চিহ্নিত করে বিষয়গুলোকে সহজতর করার পরামর্শ দিয়েছে। প্রথমে তারা চেয়েছিল একটা বিপ্লবী সরকার হোক। কিন্তু দেশি ও বিদেশি চাপে সেটা হতে দেয়া হয়নি। পাশ্চাত্যসহ প্রতিবেশীদেরও ভয় দেশটা তাদের হাতছাড়া হয়ে যায় কিনা। দেশটা আবার জঙ্গি দেশে পরিণত হয় কিনা। এছাড়া দেশের সেনাবাহিনী, প্রশাসক বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাজনীতি ক্ষেত্রে যারা ফ্যাসিবাদীদের বিকল্প প্রধান দল, তারা কেউ চায়নি বিপ্লবী সরকার গঠিত হোক। এই শ্রেণির স্বার্থের কারণে বিরাট একটা সম্ভাবনা দেশবাসীর হাত থেকে ছুটে যায়। বিশেষ করে দেশপ্রেমী জনগণ একান্তভাবে আশা করেছিল একটা শুভ পরিবর্তনের। শুরুতেই সে আশা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। তারপরও তারাসহ দেশবাসী হতাশ না হয়ে অতি দ্রুত সংস্কারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারকে চাপ দিতে থাকে। চাপ ছিল মোটামুটি চারটা। জুলাই সনদ, বিচার, প্রশাসনের ভূত তাড়ানো এবং দ্রুত সংস্কার। এর মধ্যে হঠাৎ করে ঢুকে গেল নির্বাচন। সরকারও বিষয়টা কেন যেন লুফে নিল। হয়তো ঐ সময়টায় সরকারের দেশি ও বিদেশি বন্ধুরা উপদেশ ও পরামর্শ দিয়েছে এত কিছু করার দরকার কী তোমাদের! তোমরা নির্বাচন দিয়ে কেটে পড়ো। তোমরা তোমাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ো। আমরা তো তোমাদের পেছনেই আছি। সরকারে যেহেতু এনজিওসহ বিভিন্ন দলের লোকেরা আছেন, তারা বিষয়টাকে উচ্চকিত করে তুললো। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সরলভাবে বলে বসলেন, ঠিক আছে আপনারা যখন নির্বাচন চান, তখন নির্বাচন দিয়েই আমরা চলে যাব। অথচ নির্বাচনের দাবি কিন্তু বিপ্লবী ছাত্র-জনতা চায়নি। তারা দাবি করেছিল উপরে বর্ণিত চারটি বিষয়।
বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল স্কুলের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে। তারপর যোগ হলো উঁচু শ্রেণির ছাত্রদের কোটা। যোগ হলো বৈষম্য। সব শেষে এক জায়গায় এসে দাঁড়ালো ‘ফ্যাসিবাদের ধ্বংস।’ ফ্যাসিবাদের প্রধান প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিল। বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের মাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার সরকারের নীতিনির্ধারক ও চেলা-চামুণ্ডা দেশ থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলো।
এসব নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে, কিন্তু সরকারের ওপর বিপ্লবী বা দেশবাসী কেউ তেমন চাপ সৃষ্টি করেনি। নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করেছে ফ্যাসিবাদের সঙ্গী প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার সংগঠন এবং ফ্যাসিবাদীর সহযোগী বিকল্প রাজনৈতিক দলসমূহ। তারা আন্দোলন করেছে, মিছিল করেছে, সভা করেছে, ধর্মঘট করেছে এবং করেছে অনশন ধর্মঘটও। সরকারকে তারা খুব একটা ছাড় দেয়নি। চাপের মুখে কিছু কিছু দাবি তারা আদায় করে নিয়েছে। এক্ষেত্রেও দেশবাসী পরখ করেছে যে সরকার যথেষ্ট নমনীয় ভূমিকা পালন করেছে।
এর মধ্যে সরকার বিপ্লবী ছাত্র-জনতা ও ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রবল চাপে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে ব্যান্ড করেছে। এ কাজটি ছিল একটি বড় ধরনের সাহসী কাজ। পাশ্চাত্য এ বিষয়ে সরকারকে সাহস জুগিয়েছে। কিন্তু প্রতিবেশী এ বিষয়ে দারুণ বিরোধিতা করেও পাশ্চাত্যকে টোপ গেলাতে পারেনি।
রমজান মাসে জিনিসের দাম কমিয়ে সরকার একটি উন্নত দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া সরকার আরো কিছু কল্যাণধর্মী কাজ করতে সক্ষমও হয়েছে, যা দেশবাসীর সম্মুখ নজরে রয়েছে।
এ সরকারের ব্যর্থতার তালিকা অনেক বড়। বড় বড় বিচারের যেমন বিডিআর বিদ্রোহ, শাপলা চত্বরের হত্যাসহ অনেক বিচারের এখনো কিছুই করা হয়নি। জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার বিশাল সুযোগ ছিল, সেই সুযোগ এ সরকার গ্রহণ করেনি। মুসলিম বিশ্বের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার দারুণ স্কোপ ছিল, সেদিকেও সরকার পা বাড়ায়নি। সেকুলার বিশ্ব সহযোগিতার বিষয়ে যে ধরনের আশ্বাস দিয়েছিল, তা সফল হয়নি, প্রশাসনকে নিজের হাতের মুঠায় আনতে পারেনি, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের দিকে সর্বান্তকরণে মুখ ফিরিয়েছে, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি বিধানে তৎপর হয়নি, এক বছর হয়ে গেল উপদেষ্টা পরিষদ এখনো ঢেলে সাজানো হয়নি, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত দেশবাসী জানতে পারেনি, পরিবেশ উন্নত করার বিষয়ে যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল, তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে, এছাড়া সংস্কারের কাজ তো ঢিলেঢালাভাবে চলছে।
ছাত্র-জনতা, ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল ও দেশবাসী এই মুহূর্তে নির্বাচন চায়নি। দ্রুত নির্বাচন চেয়েছে এবং এ বিষয় নিয়ে প্রচণ্ডভাবে চাপ সৃষ্টি করেছে পাশ্চাত্যজগৎ, প্রতিবেশী রাষ্ট্র, পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তি এবং তার দোসররা। চাপের মুখে অন্তর্বর্তী সরকার এ নিয়ে নানা ছলচাতুরী করেও সফল হতে পারেনি। অবশেষে নির্বাচনের ক্ষণ ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে দেশবাসী নির্বাচনের জন্য এখনো মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারেনি। তারা দ্বিধাদ্বন্দের মধ্যে আছে। তারা ভাবছে, নির্বাচনে যারাই আসুক, সংস্কার বন্ধ হয়ে যাবে। বিচারের কাজ সুষ্ঠুভাবে হবে না। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি তো হলোই না এবং জুলাই সনদ যেভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে, তা যে একটা বড় ভাঁওতাবাজি, দেশবাসী বুঝে গেছে।
জুলাই সনদ তৈরি করা উচিত ছিল গত বছর জুলাই মাসে। তা গড়াতে গড়াতে এসে গেল ২০২৫ সালের ৫ আগস্টে। এটা একদম ঠিক হয়নি। যা হয়েছে, তা হলো পর্বতের মুসিক প্রসব। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে ছাত্র-জনতা এত বড় বিপ্লবের জন্ম দিল, তার কিছুই নেই এ জুলাই সনদে। আছে কিছু ফাঁকা বুলি। আছে কিছু অন্তঃসারশূন্যতা। যাকে কেন্দ্র করে ছাত্র-জনতার বিপ্লব সফল হতে পারবে না। আবারও আমরা ব্যর্থ বিপ্লব নিয়ে টানাটানি করব? যে সনদে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী, শাহজালালসহ দীনি শিক্ষকদের শুভ আগমন, সুলতানি আমল, নবাবী আমল, ব্রিটিশ আমল, বক্সারের যুদ্ধ, নীল বিদ্রোহ, ১৮৫৮ সালের মহাজাগরণ, ফকির বিদ্রোহ, তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ, মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলী, নবাব সলিমুল্লাহ, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ১৯৪৭, ১৯৪৮, ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১সহ ২০২৪-এর জুলাইতে স্বাধীনতার নামজারির উল্লেখ নেই, সেই জুলাই সনদ দেশবাসী কখনো মেনে নেবে না।
এ বিষয়ে একটা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত না হলে দেশবাসীর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা বোধ হয় ঠিক হবে না। সবসময় আমরা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিই। সে ধরনের ব্যর্থ সফরের আয়োজন করা আমাদের আর ঠিক হবে না।