কলকাতায় পার্টি অফিস, দেশে গোপন বৈঠক
১৪ আগস্ট ২০২৫ ১৪:৫২
স্টাফ রিপোর্টার : গত বছরের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর গা-ঢাকা দিয়ে আছে দেড় দশকেরও বেশি সময় স্বৈরাচারী কায়দায় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে নিষিদ্ধ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধেও আন্দোলনে নামেন ছাত্র-জনতা। পরে আন্দোলনের মুখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ না করে দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকলেও বসে নেই আওয়ামী লীগ। দলটির নেতাকর্মীরা প্রতিদিনই গোপন বৈঠক করে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। আসছে ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে কর্মসূচি পালনের চিন্তাভাবনায় রয়েছে দলটি। যদিও সরকারের তরফ থেকে ইতোমধ্যে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, নিষিদ্ধ সংগঠন কোনো কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করলেই নেওয়া হবে ব্যবস্থা।
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে ঢাকায় শোক ও শ্রদ্ধা জানানোর কর্মসূচি নিয়েছিল আওয়ামী লীগ। সেই সময় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের কর্মসূচি পালন ও কর্মসূচিতে নিরাপত্তা দিতে নতুন সরকারকে চিঠিও দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। তখন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ আন্তর্জাতিক একটি সংবাদমাধ্যমকে এমন তথ্যের কথা জানিয়েছিলেন। গত বছরের মতো এবার সরকারকে চিঠি দেওয়ার কোনো ঘটনা না ঘটলেও ১৫ আগস্টের আবেগকে পুঁজি করে আওয়ামী লীগ মাঠে নেমে অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করতে পারে এমন আভাস রয়েছে। নিজেদের সংগঠিত করতে এবং দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করতে ভারতের কলকাতা লাগোয়া উপনগরীতে বাণিজ্যিক এলাকায় আওয়ামী লীগের পার্টি অফিস খুলেছে। এ পার্টি অফিসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কলকাতায় পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিয়মিত যাতায়াত করছেন ও দলীয় বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছেন। সম্প্রতি গণমাধ্যমে এমন খবরও পাওয়া গেছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বেশ সক্রিয় ছিল মাঠের রাজনীতিতে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধে ওইদিন দুপুর পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন জায়গায় সশস্ত্র অবস্থানেও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হঠাৎই আত্মগোপনে চলে যান দলটির নেতাকর্মীরা। অবশ্য এর আগে থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় ভাঙচুরসহ, নেতাকর্মীদের বাড়িঘরেও হামলা চালানোর অভিযোগ পাওয়া যায় বিভিন্ন জায়গায়। সেই থেকে গোপালগঞ্জ ও হাতেগোনা দুয়েকটি জায়গায় ছাড়া সারা দেশের কোথাও আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এমনকি শীর্ষনেতারাও রয়েছেন আত্মগোপনে। কিন্তু হোয়াটর্সঅ্যাপসহ বিভিন্ন গ্রুপ খুলে নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংযোগ সম্পর্ক রাখছে আওয়ামী লীগ। গত মাসে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার খবর আসে গণমাধ্যমে। রাজধানীর বসুন্ধরার একটি কনভেনশন হলে ওই প্রশিক্ষণের আয়োজন হয়। যেখানে একজন সেনা অফিসার ও তার স্ত্রীর উপস্থিতি নিশ্চিত করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই সেনা অফিসারের স্ত্রীকে রিমান্ডে নেওয়া হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন।
গত ১৩ জুলাই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাটি দায়ের করা হয়, ওই মামলায় সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী সুমাইয়াসহ ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলায় বলা হয়, গত ৮ জুলাই বসুন্ধরা সংলগ্ন কে বি কনভেনশন সেন্টারে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ‘গোপন বৈঠকের’ আয়োজন করে। দিনভর বৈঠকে ৩০০-৪০০ জন ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা অংশ নেন। সেখানে তারা ‘সরকারবিরোধী স্লোগান’ দেন। ‘ষড়যন্ত্রমূলক গোপন বৈঠকের’ মামলায় গ্রেপ্তার সেনাবাহিনীর মেজর সাদিকুল হকের স্ত্রী সুমাইয়া জাফরিন আদালতে ‘দোষ স্বীকার করে’ জবানবন্দি দিয়েছেন। পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে ১২ আগস্ট মঙ্গলবার আদালতে ‘স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক’ জবানবন্দি দিতে চাইলে ঢাকার মহানগর হাকিম সারাহ ফারজানা হক তা রেকর্ড করেন। এরপর সুমাইয়াকে কারাগারে পাঠানো হয় বলে ভাটারা থানার আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই জাকির হোসেন জানিয়েছেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ পেলে সারা দেশ থেকে ঢাকায় লোক জড়ো করা, শাহবাগ মোড় দখল করে ‘অস্থিতিশীল পরিস্থিতি’ সৃষ্টি করা, মানুষের মধ্যে ‘আতঙ্ক সৃষ্টি করে’ শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিশ্চিত করার মতো পরিকল্পনা করা হয় সেখানে। মেজর সাদিকুল হক নামে এক কর্মকর্তা ওই বৈঠকে ছিলেন এবং তিনি ‘আওয়ামী লীগ কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন’- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন আলোচনার বিষয়ে ৩১ জুলাই সেনা সদরের প্রেস ব্রিফিংয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সাংবাদিকরা। জবাবে সেনাসদরের মিলিটারি অপারেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজিম-উদ-দৌলা বলেন, ‘মেজর সাদিকের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। যদিও বিষয়টি তদন্তাধীন আছে। তারপরেও আমি বলব, যে এরকম একটা ঘটনার কথা জানার পরে সে সেনাবাহিনীর হেফাজতে আছে এবং তদন্ত চলমান আছে। তদন্তে তার দোষ প্রমাণিত হলে নিঃসন্দেহে সেনাবাহিনীর প্রচলিত নিয়মে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যেহেতু বিষয়টি তদন্তাধীন আছে এর বেশি এ মুহূর্তে বলা আমার মনে হয় সমীচীন হবে না।’ এ ঘটনায় গত ৬ আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয় সুমাইয়াকে। পরদিন তার পাঁচ দিন রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
গত বছরের ১৫ আগস্ট দলীয় নেতাকর্মীদের ঢাকা এসে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিতে আসতে নির্দেশ দেন পলাতক শেখ হাসিনা। তার ও এমন একটি অডিও কলের কথোপকথন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন অনেকে। ওই অডিও কলের সূত্র ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবরও প্রকাশ করেছে। টেলিফোন কলে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা গেছে, “সবাইকে ঢাকা আসতে হবে। মৌন মিছিল করে বঙ্গবন্ধু ভবনে ফুল দিতে হবে। এক আওয়ামী লীগ নেতাকে মোবাইল ফোনে এই নির্দেশনা দেন তিনি। এখনো প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে ফোন করে দলীয় কর্মসূচি পালনের নিদের্শনা দিচ্ছেন হাসিনা।
মুক্তিযুদ্ধের ‘ইতিহাস বিকৃতি’ রোধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষার দাবিতে ‘মঞ্চ ৭১’ নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম আত্মপ্রকাশ করেছে। আওয়ামী সমর্থক কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা, নতুন প্রজন্ম ও ছাত্র-জনতার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এ মঞ্চ গঠিত হয়েছে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ (বীরপ্রতীক) ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না এ প্ল্যাটফর্মের সমন্বয় করছেন। এই মঞ্চ মূলত আওয়ামী লীগেরই বিকল্প ‘প্ল্যাটফর্ম’ মন্তব্য করেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী অনেকে। সম্প্রতি সামাজিকমাধ্যম টেলিগ্রামে ‘জেড আই খান পান্নার একটি ইন্টারন্যাল ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তাকে নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। জেড আই খান পান্নার নেতৃত্বে ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যাওয়ার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি নিজের ফেসবুক পোস্টে বিষয়টি নাকচ করে দেন। অনেকে বলছেন, গোপন ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর পিছু হটেন এই আওয়ামী আইনজীবী।
এদিকে গত ১০ আগস্ট রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড হয়েছে, এটি দুঃখজনক। তবে এ দিনটি আগস্টের অন্য ৩১ দিনের মতোই। কেউ ধানমন্ডিতে বা কোথাও কর্মসূচি করতে গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শফিকুল আলম বলেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম চালাতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেটি দেখবে। কলকাতায় আওয়ামী লীগের অফিস খোলার প্রশ্নে প্রেস সচিব বলেন, দেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সব ধরনের কাজে নজরদারি চলছে। তারা যদি দেশের ভেতরে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করে, সে বিষয়েও আমরা সতর্ক রয়েছি, নজর রাখা হচ্ছে।