সুজন-ব্র্যাকের জনমত জরিপ

৭১% মানুষ পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন চায়


১৪ আগস্ট ২০২৫ ১৪:২২

সোনার বাংলা রিপোর্ট: দেশের রাজনীতিতে নতুন ঝড় তুলেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপ। সুজনের জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে গত ১২ আগস্ট মঙ্গলবার। অন্যদিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার পরের মাস অর্থাৎ গত বছরের সেপ্টেম্বরের প্রাদদীপের আলোয় আসে। বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ‘দেশের ৮১ শতাংশ মানুষ চায় সংস্কার সম্পন্ন করার জন্য যতদিন প্রয়োজন, ততদিন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকুক। আর মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ মনে করে, অতিদ্রুত নির্বাচন দিয়ে এ সরকারের ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া উচিত। ‘পালস সার্ভে ২০২৪: জনগণের মতামত অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক এ জরিপ করা হয় গত বছর ২২ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে বিআইজিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মির্জা এম হাসান জরিপের ফল তুলে ধরেন। পরে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সামিনা লুৎফা ও উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক আসিফ মোহাম্মদ শাহান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য মামুন আবদুল্লাহিল ও ভূঁইয়া আসাদুজ্জামান, জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র সামান্তা শারমীন এবং বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন।
জরিপে দেশের ৬৪ জেলার ৪ হাজার ৭৭৩ জনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৬৩ জনের ওপর জরিপ করা হয়, যা মোট নমুনার ৪৯ শতাংশ। এতে নারী-পুরুষের অনুপাত ৪৩:৫৭। উত্তরদাতাদের ৬৭ শতাংশ গ্রামের এবং ৩৩ শতাংশ শহরের বাসিন্দা। বিআইজিডির আগের চারটি গবেষণা থেকে নমুনা নেওয়া হয়। সেগুলো হলো এশিয়া ফাউন্ডেশন ও বিআইজিডি সার্ভে ২০২৪, ইয়ুথ সার্ভে ২০২১, মাদরাসা সার্ভে ২০২০ এবং ছাত্র পোল ২০২৪।
গত মঙ্গলবার প্রকাশিত সুজনের জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, এক ব্যক্তিকে দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী চান না ৮৯% মানুষ, পিআর পদ্ধতি চান ৭১%। সুজনের জরিপে একই ব্যক্তির একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান না হতে পারার বিধানের পক্ষে ৮৭ শতাংশ মানুষ মত দিয়েছেন। প্রস্তাবিত জাতীয় সনদ চূড়ান্তকরণে জনমত যাচাইয়ের তথ্য উপস্থাপন করে এসব তথ্য জানিয়েছে নাগরিক সংগঠন ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ (সুজন)। গত ১২ আগস্ট মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়। সারা দেশে ১৫টি সংলাপের মাধ্যমে এক হাজার ৩৭৩ জন নাগরিকের মতামতের ভিত্তিতে এ জরিপ করা হয়।
জরিপে আইনসভা সংস্কারের প্রস্তাবের বিষয়ে বলা হয়, নিম্নকক্ষে নারীদের জন্য ১০০টি সংরক্ষিত আসনে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছেন ৬৩ শতাংশ মানুষ। নিম্নকক্ষে বিরোধীদল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের পক্ষে ৮৬ শতাংশ মানুষ। এছাড়া সুজন প্রস্তাবিত সিনেটে নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসনের পক্ষে ৬৯ শতাংশ, বিরোধীদল থেকে উচ্চকক্ষে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের পক্ষে ৮২ শতাংশ এবং একই ব্যক্তির একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান না হতে পারার বিধানের পক্ষে ৮৭ শতাংশ মানুষ মত দিয়েছেন।
এতে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ (নিম্নকক্ষ) ও সিনেট (উচ্চকক্ষ) নিয়ে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার পক্ষে মত দিয়েছেন জরিপে অংশ নেওয়া ৬৯ শতাংশ মানুষ। আনুপাতিক পদ্ধতিতে (পিআর) উচ্চকক্ষের আসন বণ্টনের পক্ষে ৭১ শতাংশ মানুষ। এছাড়া একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকার বিধানের পক্ষে ৮৯ শতাংশ।
সুজনের কেন্দ্রীয় সদস্য জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস। জনমতের ফল উপস্থাপন সুজনের জাতীয় কমিটির সদস্য মো. একরাম হোসেন।
শাসন পদ্ধতির পরিবর্তনের বিষয়ে জরিপে বলা হয়, মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারের পক্ষে মত দিয়েছেন ৮৭ শতাংশ মানুষ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচকমণ্ডলীর (ইলেক্টরাল কলেজ) পক্ষে মত দিয়েছেন ৮৬ শতাংশ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির পক্ষে ৮৮ শতাংশ, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধনের পক্ষে ৮৭ শতাংশ এবং রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ‘সাম্য’, ‘মানবিক মর্যাদা’, ‘সামাজিক সুবিচার’, ‘গণতন্ত্র’ এবং ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সম্প্রীতি’-এর পক্ষে ৯০ শতাংশ মানুষ।
জরিপে আরও বলা হয়, মৌলিক অধিকারের পরিধি বৃদ্ধির পক্ষে ৮৮ শতাংশ, মৌলিক অধিকার শর্তহীন করার পক্ষে ৮৪ শতাংশ এবং সকল সাংবিধানিক পদ ও তিন বাহিনীর প্রধানদের নিয়োগের জন্য একটি সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের পক্ষে ৮০ শতাংশ মানুষ মত দিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন ও প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকার কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতির পক্ষে ৯০ শতাংশ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে ৮৩ শতাংশ মানুষ মত দিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন হলো নির্বাচন পদ্ধতি কী হবে এবং জনগণ কোন পদ্ধতি চায়, তা ঠিক না করে আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা কতটুকু বাস্তবসম্মত? রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই জনমত জরিপের ফলাফল অবশ্যই মূল্যায়ন করতে হবে।