আতিথেয়তার মাঝে রয়েছে অকল্পনীয় বারাকাহ্


৭ আগস্ট ২০২৫ ১৪:১৯

॥ এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী ॥
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ঘরে বেশি অতিথি আসে, আল্লাহ সেই ঘরকে ভালোবাসেন। এর চেয়ে উত্তম ঘর আর কিছুই হতে পারে না, যেখানে তরুণ ও বৃদ্ধ সবার জন্য দরজা খোলা থাকে। এমন ঘরে আল্লাহর রহমত ও বরকত নেমে আসে।’ (আল হাদীস)।
রাসূল (সা.) মেহমানের সম্মানকে মুমিনের অন্যতম গুণ বলে উল্লেখ করেছেন। মেহমানের যথাযথ আপ্যায়ন ও কদর করা একজন মুসলমানের ঈমানী কর্তব্য। রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন মেহমানের সমাদর করে।’ (বুখারি)। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ‘যে মেহমানদারি করে না, তার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই।’ (মুসনাদে আহমাদ)।
শিব খেরা নামক বিখ্যাত মোটিভেশনাল লেখক বলেছেন, ‘যারা নেয় তারা খায় ভালো, আর যারা দেয় তারা ঘুমায় ভালো।’
‘আসসাদাকাতু কারুদ্দুল বালা।’
দান-সদাকা বিপদাপদ দূর করে।
▪ মেহমানদারি প্রথার শুরু কখন
হযরত ইবরাহিম (আ.) সর্বপ্রথম পৃথিবীতে মেহমানদারির প্রথা চালু করেন। আতিয়্যা আওফি (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আমি রাসূল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম (আ.)-কে এ কারণে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন যে, তিনি মানুষকে খানা খাওয়াতেন, বেশি বেশি সালাম দিতেন আর মানুষ রাতে ঘুমিয়ে পড়লে তিনি নামাজ আদায় করতেন। (তাম্বিহুল গাফিলিন)।
একবার বনু গিফার গোত্রের এক লোক রাসূল (সা.)-এর মেহমান হলেন। মহানবী (সা.) আগের দিন অভুক্ত ছিলেন। যেদিন মেহমান এলেন, সেদিন ঘরে ছাগলের দুধ ছাড়া আর কিছু ছিল না। নিজে অনাহারি হয়েও আমাদের রাসূল (সা.) সেই মেহমানকে ছাগলের দুধের সবটুকু খাওয়ালেন। কিন্তু অতিথিকেও বুঝতে দিলেন না যে, তিনি ক্ষুধার্ত। এজন্য মেহমান এলে খুশি হওয়া উচিত। অন্তরে সংকীর্ণতা রাখা অশোভনীয়। মেহমান আল্লাহর রহমত ও বরকত নিয়ে আসে। আল্লাহ যাকে মেহমান হিসেবে পাঠান, তার রিজিকও পাঠিয়ে দেন। তাদের ভাগ্যে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির আগেই এ রিজিক লিখে রেখেছেন।
পবিত্র কুরআনে মেহমানদারি সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। যদিও নিজেরা ক্ষুধার্ত থাকে। আর যারা স্বভাবজাত লোভ-লালসা এবং কামনা থেকে মুক্তি লাভ করে, তারাই সফলকাম।’ (সূরা হাশর : ৯)। নবীজি (সা.) বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত খাবারের দস্তরখান মেহমানের সামনে বিছানো থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত ফেরেশতারা মেজবানের জন্য রহমতের দোয়া করতে থাকেন।’ (আল মুজামুল আওসাত)।
▪ রাসূল (সা.)-এর যুগের আতিথেয়তা
নবী-সাহাবাদের যুগে প্রতি বেলায় মেহমান উপস্থিত থাকত। প্রতি বেলায় যদি নবী-সাহাবাদের নিজেদের খাবারের ব্যবস্থা না হতো, তবে যে বেলায় খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হতো, সে বেলাতেই মেহমান তারা নিজের সাথে করে এনে হলেও তাদের সাথে শরিক করতেন খাদ্য গ্রহণের জন্য। যে বেলায় মেহমান থাকত না, তারা মনে করতেন আল্লাহ মনে হয় তাদের ওপর নারাজ এ কারণে মেহমান আসছে না। সুবহানাল্লাহ!
হযরত জাবের (রা.) বলেন, “খন্দকের যুদ্ধের প্রাক্কালে আমরা পরিখা খনন করছিলাম। এমন সময় একটা শক্ত পাথর দেখা দিল। তখন লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললে তিনি বলেন, ‘আচ্ছা আমি নিজেই খন্দকের মধ্যে নামব। অতঃপর তিনি দাঁড়ালেন, সে সময় তাঁর পেটে পাথর বাঁধা ছিল। আর আমরাও তখন তিন দিন পর্যন্ত কিছু খেতে পাইনি। রাসূলুল্লাহ (সা.) কোদাল হাতে নিয়ে পাথরটির ওপর আঘাত করলে তা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে বালুকণায় পরিণত হলো।’
তখন হযরত জাবের (রা.) বলেন, “আমি আমার স্ত্রীর কাছে এসে বললাম, বাসায় খাবার কিছু আছে কি? রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ভীষণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখলাম! আমার স্ত্রী তখন একটি চামড়ার পাত্র থেকে এক সা পরিমাণ যব বের করল। আমাদের একটি মোটাতাজা বকরির বাচ্চা ছিল। তা আমি জবেহ করলাম আর আমার স্ত্রী যব পিষে আমরা হাঁড়িতে গোশত চড়ালাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে চুপে চুপে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আমরা একটি বকরির বাচ্চা জবেহ করেছি, আর এক সা যব ছিল, আমার স্ত্রী তা পিষেছে। আপনি আরো কয়েকজন সাথে নিয়ে চলে আসুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) উচ্চৈঃস্বরে সবাইকে ডেকে বললেন, ‘হে পরিখা খননকারীরা! তোমরা তাড়াতাড়ি চলে এসো, জাবের তোমাদের জন্য খাবার তৈরি করেছে’।”
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেন, ‘তুমি বাড়ি ফিরে যাও। আমি না আসা পর্যন্ত গোশতের ডেকচি নামাবে না এবং খামির থেকে রুটিও বানাবে না।’ এরপর তিনি লোকজনসহ উপস্থিত হলেন। তখন আমার স্ত্রী খামিরগুলো রাসূল (সা.)-এর সম্মুখে দিলে তিনি তাতে লালা মিশিয়ে দিয়ে বরকতের জন্য দোয়া করলেন। অতঃপর ডেকচির কাছে অগ্রসর হয়ে তাতেও লালা মিশিয়ে বরকতের জন্য দোয়া করলেন। এরপর বললেন, ‘তুমি আরো রুটি প্রস্তুতকারিণীদের ডাক, যারা তোমার সঙ্গে রুটি বানাবে। আর চুলার ওপর থেকে ডেকচি না নামিয়ে তুমি তা থেকে তরকারি নিয়ে পরিবেশন করো।
জাবের (রা.) বলেন, ‘সাহাবীর সংখ্যা ছিল এক হাজার। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, সবাই তৃপ্তিসহকারে খেয়ে চলে যাওয়ার পরও ডেকচি ভর্তি তরকারি ফুটছিল এবং প্রথম অবস্থার মতো আটার খামির থেকে রুটি প্রস্তুত হচ্ছিল।’ (বুখারি, মুসলিম)।
এ হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, মেহমানদারির নিয়ত থাকলে খাদ্য কমবেশি কোনো ফ্যাক্টর হয় না, মহান আল্লাহই তাতে বারাকাহ ঢেলে দেন।
▪ আতিথেয়তার শরয়ী সময়সীমা
এ ব্যাপারে রাসূল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ ও পরকালের প্রতি যে ইমান রাখে, সে যেন মেহমানের সমাদর করে এবং তার হক আদায় করে। নবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, মেহমানের হক কী?
তিনি বললেন, এক দিন এক রাত, সর্বোচ্চ মেহমানদারি তিন দিন তিন রাত পর্যন্ত, এর অতিরিক্ত হলো সাদাকা।’ (বুখারি)। মুসলিম শরিফের একটি বর্ণনায় এসেছে, ‘কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ হবে না যে, সে তার ভাইয়ের কাছে এত বেশি অবস্থান করা, যা তাকে গুনাহগার বানিয়ে ফেলে।’
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাকে গুনাহগার কীভাবে বানিয়ে ফেলে। রাসূল (সা.) বলেন, ‘তার নিকট অবস্থান করতে থাকল, আর তার কাছে কিছুই থাকল না, যা দ্বারা তাদের মেহমানদারি করবে।’ এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, মেহমানের হক তিনটিÑ ১. এক দিন এক রাত মেহমানদারি করা ওয়াজিব। ২. দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন মুস্তাহাব। ৩. তৃতীয় দিনের পর মেহমানদারি করা সাদাকা বা অনুগ্রহ।
▪ বর্তমান সময়ের আতিথেয়তা
কর্মজীবনের ব্যস্তায় বা সীমিত আয়ের সংসারে আমরা হয়তো অনেক সময় অতিথি দেখে মনে মনে বিরক্ত হই বা বাড়তি চাপ মনে করি। এর কারণও রয়েছে। কোনো মেহমান বাসায় আসার কথা থাকলে আমরা কয়টা আইটেম করি খাবারের জন্য? এমনভাবে রান্নার আয়োজন চলে, যা কোনো কোনো পরিবারের পুরো মাসের বাজার হয়ে যেত। পোলাও, কোর্মা, মুরগির রোস্ট, গরুর গোশত, খাসির গোশত, মাছ ভুনা, ডিম ভুনা, ভাত, ডাল, কাবাব। নাশতার জন্য নুডুলস, সেমাই, ফিরনী, কয়েক পদ ফল, আইসক্রিম কত কত খাবার নাম বলে শেষ করা যাবে না।
এসবের আয়োজন করার জন্য একটা পরিবারের কত খরচ হতে পারে? এমন মেহমানদারি সেজন্য বছরে একবার বা দুবারের বেশি করাও সম্ভব হয় না। আবার খাবার পরিবেশন করার জন্যও চাই বাহারি থালা বাসন! মেহমান চলে যাওয়ার পর সেসব গুছানো হয়ে ওঠে আরেক হয়রানির কাজ। অথচ এ ধরনের আয়োজনকে মেহমানদারি বলা যায় না, এগুলোর নাম হচ্ছে রসনাবিলাস।
মেহমানরাও যেন কম প্রত্যাশা করেন না। দু-এক আইটেমে যেন তাদের মন ভরে না, প্রেসটিজেও লাগে। যার কারণে আমাদের সমাজে আতিথেয়তার রেওয়াজ দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। আমরা এখন আত্মীয়-স্বজনের বাসা ভুলে হোটেল-রেস্তোরাঁর দিকে ছুটছি। আবহমানকাল থেকে চলে আসা ঐতিহ্য-সংস্কৃতি আত্মীয়তার মধুর সম্পর্ক আজ হারাতে বসেছি।
▪ আতিথেয়তার অনন্য বারাকাহ
অন্য একটি হাদীসে এসেছে, একবার এক নারী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে তার স্বামীর বিষয়ে অভিযোগ করলেন। তিনি বললেন যে, তার স্বামী অনেক অতিথিকে আমন্ত্রণ জানান এবং তাদের জন্য বারবার খাবার প্রস্তুত ও তাদের আপ্যায়ন করাতে করাতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সেই নারীর কথা শুনলেন, কিন্তু কোনো তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর দিলেন না। সেই নারী চলে গেলেন।
কিছুক্ষণ পরে রাসূলুল্লাহ (সা.) সেই নারীর স্বামীকে ডেকে বললেন, ‘আজ আমি তোমার অতিথি হবো।’
সেই ব্যক্তি অত্যন্ত খুশি হয়ে বাড়ি গিয়ে তার স্ত্রীকে বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল (সা.) আজ আমাদের অতিথি হবেন।’
তার স্ত্রী খুব আনন্দিত হলেন এবং অনেক চেষ্টা ও যত্ন নিয়ে যা কিছু খাবার ছিল, তা দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য খাবার প্রস্তুত করলেন।
যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের ঘরে এসে তাদের আতিথেয়তার সম্মান গ্রহণ করলেন, তখন তিনি বললেন, ‘তোমার স্ত্রীকে বলো, যেখান দিয়ে আমি এই ঘর ত্যাগ করব, সে যেন সেই দরজায় চোখ রাখে।’
রাসূল (সা.) বের হবার সময় সে মহিলা সেখানে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পেছনে ঘর থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী, বিচ্ছু এবং ক্ষতিকর জীবজন্তু বের হয়ে যাচ্ছে। তিনি এ দৃশ্য দেখে এতটাই বিস্মিত হলেন এবং মহান রবের কুদরত উপলব্ধি করে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।
যখন জ্ঞান ফিরে পেলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, ‘এমনটাই ঘটে, যখন একজন অতিথি তোমার ঘর থেকে বিদায় নেয়। তার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ক্ষতি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিপদাপদ তোমার ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। অতিথির প্রতি সম্মান দেখিয়ে এবং আপ্যায়নের কষ্ট স্বীকার করার পেছনে এটাই হেকমত ও বারাকাহ রয়েছে।’
▪ আতিথেয়তা গুনাহ মাফের উসিলা
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন আল্লাহ কোনো জাতির জন্য কল্যাণ চান, তখন তিনি তাদের জন্য একটি উপহার পাঠান।’ সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী ধরনের উপহার, হে আল্লাহর রাসূল?’ তিনি বললেন, ‘অতিথি তার নিজের রিজিক নিয়ে আসে এবং গৃহের লোকদের পাপ সঙ্গে নিয়ে যায়।’
এজন্য বলা যায়, অতিথি হলো জান্নাতে যাওয়ার একটি বড় মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, তাকে অবশ্যই তার অতিথির প্রতি উদার হতে হবে।’ বুখারি।
আতিথেয়তার এমন বারাকাহ জানা থাকলে আমরা হয়তো সেই সাহাবীদের মতো খুঁজে খুঁজে, ডেকে ডেকে অতিথি বা কোনো মুসাফিরকে ঘরে নিয়ে আসতে চাইবো,’ যারা ঘরে পর্যাপ্ত খাবার না থাকলেও নিজেদের খাবারটা অতিথিদের মুখে তুলে দিতেন! এর বিনিময়ে মহান আল্লাহ তাদের প্রতি এতটাই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে- তাদের এ কাজের প্রশংসাস্বরূপ আল-কুরআনের সূরা হাশরের ৯নং আয়াত নাযিল হয়েছিল।
মহান আল্লাহ মেহমানদারির মাধ্যমে আমাদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধকে মজবুত করুন, দুনিয়া ও আখিরাতে সফল করুন।