বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলিম নারীদের আবদান
৭ আগস্ট ২০২৫ ১৪:১১
॥ ওবায়েদ ইবনে গনি ॥
মানবসভ্যতার ইতিহাসে ইসলামই সর্বপ্রথম নির্যাতিত নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে বিতর্কের সুযোগ খুবই সীমিত। সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন একজন নারী- যার নাম হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.)। সর্বপ্রথম ইসলামের জন্য শহীদ হয়েছেন একজন নারী- যার নাম হযরত সুমাইয়া (রা.)। এগুলো প্রসিদ্ধ ঘটনা। কিন্তু এর বাইরেও আমরা দেখতে পাই- পরিপূর্ণ ইসলাম মোতাবেক জীবনযাপন করে মুসলিম নারীরা পেশাদারিত্বের জগতেও অনুপম কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে হযরত আয়েশা (রা.) হাদিস বর্ণনা, ইসলামী আইন, ফিকহ, ইতিহাস, বংশলতিকা, কবিতা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) ও উম্মে আবদুল্লাহ বিন জুবায়ের হাদিস বর্ণনায় পারদর্শী ছিলেন। আয়েশা বিনতে তালহা কবিতা, সাহিত্য, জ্যোতিষশাস্ত্র ও নভোমণ্ডল বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন।
ইসলামের প্রাথমিক যুগের কথা- যখন পুরুষরা দীনের জন্য তাদের প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগ করেছেন, নারীরাও তাদের সঙ্গে তখন জন্মভূমি ছেড়েছেন। পুরুষরা যখন তাকবির-ধ্বনি তুলে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন, নারীরাও তখন তাদের সঙ্গে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। নজিরবিহীন সাহসিকতা ও বীরত্ব প্রদর্শন করে ইতিহাসের সোনালি পাতায় নারীরা স্থান করে নিয়েছেন। নারীরা কঠিন থেকে কঠিনতর পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছেন। কষ্ট-ক্লেশ এবং বিপদ-আপদের পাহাড় অতিক্রম করেছেন। আল্লাহর দীন বুলন্দ করার জন্য পুরুষের সঙ্গে তারাও সবটুকু দিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে যুগে যুগে সাহসী ও মহীয়সী মুসলিম নারীরা পরিবার, সমাজ, সভ্যতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-কাব্য এবং ইসলামের প্রচার-প্রসার ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে অবিস্মরণীয় অবদান রেখে পরবর্তী লোকদের জন্য আদর্শ স্থাপন করেছেন, তা মানবেতিহাসে বিস্ময়কর ও বিরল দৃষ্টান্ত।
তাদের বদৌলতেই প্রথম যুগে ইসলাম সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশ্বসভ্যতা-সংস্কৃতির ইতিহাসে নির্যাতিত নারীর পাশে ইসলামই সর্বপ্রথম দাঁড়িয়েছে। সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন একজন নারী, যার নাম হযরত খাদিজা (রা.)। সর্বপ্রথম ইসলামের জন্য শহীদও হয়েছেন একজন নারী, যিনি হযরত সুমাইয়া (রা.)। ইতিহাস গবেষণা করলে দেখা যায়, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী পদ্ধতিতে জীবনযাপন করে মুসলিম নারীরা পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রে অনুপম ও উজ্জ্বল কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তাদের তালিকা ও নির্ঘণ্ট বেশ দীর্ঘ। সংক্ষিপ্তাকারে কিছু নাম তুলে ধরা হলো-
হযরত আয়েশা (রা.); হাদিস বর্ণনা, ইসলামী আইন, ফিকহ, ইতিহাস, বংশলতিকা, কবিতা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রা.) ও হযরত উম্মে আবদুল্লাহ বিন জুবায়ের; তারা উভয়েই হাদিস বর্ণনায় দক্ষ ও পারদর্শী ছিলেন। হযরত আয়েশা বিনতে তালহা; তিনি কবিতা, সাহিত্য, জ্যোতিষশাস্ত্র ও নভোমণ্ডল বিষয়ে অত্যন্ত পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সাকিনা বিনতে হোসাইন ও খানসা; তারা কাব্য ও সাহিত্যে প্রবাদতুল্য ছিলেন। হযরত মায়মুনা বিনতে সাদ (রা.); হাদিসশাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলী (রা.)ও তার কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। কারিমা মারজিয়া (রহ.); হাদিসের বিজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন। ইমাম বুখারী (রহ.) তার কাছ থেকে হাদিস সংগ্রহ করেছেন।
ফাতিমা বিনতে আব্বাস; প্রখ্যাত ইসলামী আইনবিদ। তিনি মিশর ও দামেস্কের প্রভাবশালী নেত্রী ছিলেন। উখত মজনি (রহ.); তিনি ছিলেন ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর শিক্ষক। আল্লামা মারাদিয়ি (রহ.) তাঁর কাছ থেকে জাকাতবিষয়ক মাসআলা বর্ণনা করেছেন। হুজায়মা বিনতে হায়ই (রহ.) প্রখ্যাত তাবেঈ ও হাদিসবিদ ছিলেন। ইমাম তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ (রহ.) তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। আয়েশা বিনতে আহমদ বিন কাদিম স্পেনের অধিবাসী ছিলেন। ক্যালিওগ্রাফিতে অনন্যতার পরিচয় দিয়েছেন। লুবণী (রহ.) ভাষাবিদ হওয়ার পাশাপাশি আরবি ব্যাকরণশাস্ত্রে প্রাজ্ঞ ছিলেন। ফাতিমা বিনতে আলী বিন হোসাইন বিন হামজাহ ছিলেন হাম্বলি মাজহাবের পণ্ডিত। সমসাময়িক আলেমরা তার কাছ থেকে হাদিস শিখেছেন এবং প্রসিদ্ধ হাদিসগ্রন্থ দারেমি শরিফের সনদের অনুমতি নিয়েছেন। রাবিয়া কসিসাহ সুপ্রসিদ্ধ বক্তা ছিলেন। হাসান বসরি (রহ.)ও তার কাছ থেকে বিভিন্নভাবে উপকৃত হয়েছেন। ফাতিমা বিনতে কায়েস শিক্ষাবিদ ও আইনজ্ঞ ছিলেন। উম্মে ফজল, উম্মে সিনান হাদিস বর্ণনাকারী ছিলেন। শিফা বিনতে আবদিল্লাহ প্রখ্যাত আইনতাত্ত্বিক ছিলেন। ওমর (রা.) তাকে ইসলামী আদালতের ‘কাজাউল হাসাবাহ’ (জবাবদিহি আদালত) ও ‘কাজাউস সুক’ (বাজার প্রশাসন) ইত্যাদির দায়িত্বভার অর্পণ করেন।
শায়েখ আলাউদ্দিন সমরকন্দি (রহ.) ‘তুহফাতুল ফুকাহা’ নামে একটি কিতাব লিখেছেন। এটির ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন তারই ছাত্র আবু বকর ইবনে মাসউদ কাস্তানি (রহ.)। ব্যাখ্যাগ্রন্থটির নাম ‘বাদায়েউস সানায়ি’। ইসলামী ফিকহশাস্ত্রে এটি নজিরবিহীন কিতাব। এটা দেখে শিক্ষক তার ছাত্রের কাছে নিজ মেয়েকে বিয়ে দেন। মেয়েটির নাম ফাতিমা। সমকালীন রাজা-বাদশাহরা মেয়েটিকে বিয়ে করতে আগ্রহী ছিলেন। সেই মেয়েটি ছিলেন মুফতি। তার স্বাক্ষরিত অসংখ্য ফতোয়া প্রকাশিত হয়েছে। ইবনে কায়েসের বর্ণনায় দেখা যায়, প্রায় ২২ নারী সাহাবী ফতোয়া ও ইসলামী আইনশাস্ত্রে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাদের মধ্যে সাতজন উম্মাহাতুল মুমিনিন বা নবীপত্নী ছিলেন। ১১ শতাব্দীতে মামলুক শাসনামলে তৎকালীন মুসলিম নারীরা দামেস্কে ৫টি বিশ্ববিদ্যালয় ও ১২টি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পূর্ণরূপে মুসলিম নারীদের দ্বারা পরিচালিত হতো।
যুদ্ধক্ষেত্রে নারী সাহাবীদের অবদান
হযরত আয়েশা (রা.) ও হযরত উম্মে সালমা (রা.) ওহুদ যুদ্ধে অংশ নেন। মহানবী (সা.)-এর ফুফু সুফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব (রা.) খায়বর যুদ্ধে অংশ নেন। উম্মুল খায়ের, জুরকা বিনতে আদি, ইকরামা বিনতে আতরাশ ও উম্মে সিনান অসংখ্য যুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক কাজে সহযোগিতা করেন। আজরা বিনতে হারিস বিন কালদা সেনাদলের নেতৃত্ব প্রদান ও আহলে বিসানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। উম্মে আম্মারা (রা.) ওহুদের যুদ্ধে মহানবী (সা.)-এর জীবন রক্ষায় প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছিলেন। মহানবী (সা.) তাকে ‘খাতুনে ওহুদ’ উপাধি দিয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম সামুদ্রিক অভিযানে প্রথম শাহাদাতবরণ করেন উম্মে হারাম বিনতে মিলহান (রা.)।
উম্মে আতিয়া আনসারী (রা.) মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশ নেন। উমাইয়া বিনতে কায়েস কিফারিয়া খায়বর যুদ্ধে অংশ নেন। উম্মে হাকিম বিনতে হারিস রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন। উম্মে আয়মন হাবসি (রা.) ওহুদ, হুনাইন, খায়বর ও মোতার যুদ্ধে অংশ নেন। উম্মে সুলাইম (রা.) খায়বর ও হুনাইনের যুদ্ধে অংশ নেন। উম্মে হারাম বিনতে মিলহান ইসলামের প্রথম নারী নৌযোদ্ধা। রাবি বিনতে মুয়াওয়াজ (রা.) বদর যুদ্ধে অংশ নেন। নাসিবাহ বিনতে কাব আনসারিয়া ওহুদ, বনি কুরাইজা, হুদায়বিয়া, খায়বর, হুনাইন ও ইয়ামার যুদ্ধে অংশ নেন।
জ্ঞানচর্চায় নারী সাহাবীদের আবদান
জ্ঞানচর্চায় নারীদের মধ্যে হযরত আয়েশা (রা.)-এর নাম সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। তিনি কুরআন, হাদিস, ইসলামী আইন প্রভৃতি বিষয়ে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। যে আটজন সাহাবী সর্বাধিকসংখ্যক হাদিস বর্ণনা করেছেন, তাদের মধ্যে আয়েশা (রা.) তৃতীয়। অনেক বিশিষ্ট সাহাবী ও তাবিয়ী তার কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। প্রিয়নবী (সা.)-এর লক্ষাধিক সাহাবীর মধ্যে ১ হাজার সাহাবীর জীবনবৃত্তান্ত লেখা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫০ জন নারী। এ থেকে অনুমান করা যায়, তৎকালে নারী শিক্ষার ওপর কতটা গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। প্রিয়নবী (সা.)-এর স্ত্রী হাফসা (রা.)-এর নিকট নারীরা লিখন পদ্ধতি শিক্ষা করতেন।
হাদিসে এসেছে, ‘আবু মুসা বলেন, আমরা রাসূলের সাহাবীগণ যখনই কোনো সমস্যায় পতিত হয়ে আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছি, তখনই তাঁর নিকট থেকে সেই বিষয়ে ইলম লাভ করেছি।’ অপর একজন আয়েশা- যিনি সা’দের কন্যা ছিলেন, তিনি তার পিতার নিকট লেখাপড়া শিখতেন। নারীদের শিক্ষা প্রশিক্ষণ লাভের সঠিক, উপযুক্ত ও উত্তম ক্ষেত্র হচ্ছে তাদের ঘর ও পারিবারিক পরিবেশ। এ কারণে তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব মা-বাবা ও স্বামীর ওপর অর্পণ করা হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের পরিবারবর্গের নিকট চলে যাও, তাদের সঙ্গে বসবাস করো, তাদের জ্ঞান শিক্ষা দাও এবং তদনুযায়ী আমল করার জন্য তাদের আদেশ করো।’ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুসলিম নারী সাহাবীদের আদর্শিক জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণের তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : সাংবাদিক।