আলোকে তিমিরে

সহাবস্থানের জন্য প্রকৃষ্ট মনন তৈরি করা জরুরি


৭ আগস্ট ২০২৫ ১৪:০৬

॥ মাহবুবুল হক ॥
ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুলের পরিচ্ছন্নকর্মী সন্তোষ লাল প্রায় পঞ্চাশ বছর একই স্কুলে চাকরি করার পর অবসর গ্রহণ করেছেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ খুব ধুমধাম করে তাকে ‘ফেয়ারওয়েল’ দিয়েছে। সেই অনুষ্ঠানে ফেনী জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে এবং ভাইরাল হয়েছে। বিষয়টি গত ১ আগস্ট শুক্রবার বিকেলে আমার নজরে আসে। ফেসবুকে ভিডিওটি দেখার সুযোগ আমার হয়। মনে হয়েছে, একটি জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের আসরের মতো অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে স্কুলের বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীরা তো স্কুল ড্রেস পরে উপস্থিত ছিলই, তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল সাবেক ছাত্র-ছাত্রীদের এক বিরাট অংশ, যাদের বসয় আঠারো থেকে ষাট বছর। স্কুলের বর্তমান শিক্ষকসহ সকল স্টাফ তো উপস্থিত ছিলেনই, তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল সাবেক শিক্ষকবৃন্দ ও স্টাফ। সর্বশ্রেণির নাগরিক তথা আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা এ মহতি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল। প্রথমে বিষয়টিকে আমি তেমন গুরুত্ব দিইনি। মনে করেছিলাম, সন্তোষ লাল প্রায় পঞ্চাশ বছর একই স্কুলে নিষ্ঠার সাথে চাকরি করেছেন। সে কারণে খুশি হয়ে তাকে রাজসিক সম্মাননা প্রদান করা হচ্ছে। আর তাছাড়া ফেনীর মানুষ একটু আবেগী। আবেগের বশেই তারা এ ধরনের একটা চমৎকার অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। কিন্তু যতই ‘কমেন্টস’-এর ভেতর ঢুকছি, ততই আমি হতবিহ্বল হচ্ছি। অনবরত বা অবিরত ধারায় মতামত আসছিল। শুধু বাংলাদেশ থেকে নয়, ইন্ডিয়ার নানা রাজ্য থেকেও। আমি বেশ সময় দিয়ে মন্তব্যগুলো পড়লাম। পড়ছি, পড়ছি এবং পড়ছি, শেষ করা যাচ্ছে না। মন্তব্য আসছে, মতামত আসছে। আসছে ধন্যবাদসহ নানারকম আলোচনা ও সমালোচনা। আলোচনার বিষয় শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত হয়ে যায়। শুরুটা করলেন একজন মুসলমান। তিনি বিনা কারণে ইন্ডিয়া এবং ইন্ডিয়ার সনাতন ধর্মের লোকদের আঘাত দিয়ে কথা বললেন। সাথে সাথে সনাতন ধর্মের একজন ‘মব জাস্টিসে’র ওপর কথা বললেন। আরেকজন ইদানীং আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের কোনো সম্মান ও মর্যাদা নেই- এ নিয়ে কথা উঠালেন। আমি অনুভব করলাম, আলোচনা অকারণে অন্যদিকে গড়াচ্ছে। আমি অপরিণামদর্শী মুসলমান ভাইকে বিনীতভাবে অনুরোধ করলাম মূল বিষয়ের মাঝে অবস্থান করতে। তিনি আমার কথা শুনলেন। আমি বসে বসে যারা বিষয়ের মাঝে থাকছেন, তাদেরকে আমার সাধ্যমতো ধন্যবাদ দিয়ে চলেছি। এর মধ্যে আরেকজন মুসলমান খুব ক্ষেপে গেলেন। ইন্ডিয়া যে এখন হাজার হাজার মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানা ভাঙচুর করছে, সে হিসাব তুলে ধরলেন। এ বক্তব্যে বিরক্ত হয়ে একজন সনাতন ধর্মের লোক আমাদের জীবনবিধানের ওপর আঘাত হেনে কথা বলে ফেলেন। আমি তাকে সরাসরি বললাম, আপনি কিন্তু সীমালঙ্ঘন করছেন এবং দয়া করে সুন্দরভাবে কথা বলবেন। তিনি নীরব হলেন। কিন্তু দেখা গেল, যে ভদ্রলোক (মুসলমান) বিষয়ের বাইরে কথা বলা শুরু করেছিলেন, তিনি আবারও এসে হাজির। তিনি আবারও ইন্ডিয়া ও সনাতন ধর্মের লোকদের বিরুদ্ধে নানা কথা বললেন। আমি তাকে আর কোনো উপদেশ বা পরামর্শ না দিয়ে অন্যদের বলতে লাগলাম- আসুন, আমরা বিষয়ের মধ্যে অবস্থান করি। তাহলে আর আমরা বিবাদে জড়াবো না। কিন্তু কে কার কথা শোনে? টিট ফর ট্যাট চলছিল। আমি ৬০০ মন্তব্য পড়েছি এবং প্রায় ৫০ জায়গায় বলেছি, সুন্দর একটি বিষয়কে আমরা যেন অসুন্দর করে না ফেলি।
এ বিষয়ের খুব লক্ষ করে দেখলাম, সনাতন ধর্মের লোকেরাই বেশি অংশগ্রহণ করেছে। একপর্যায়ে আমার মনে হলো, সারা দেশের সনাতন ধর্মের শিক্ষিত লোকেরা বোধ হয় অংশগ্রহণ করছে, তা না হলে একটি জেলার একটি স্কুলের একটি অনুষ্ঠানের খবর এত চাউর হলো কী করে? প্রোফাইলগুলো দেখতে লাগলাম। দেখলাম, অনেক ইন্ডিয়ান মন্তব্য ও মতামত প্রদানে অংশগ্রহণ করেছে। তবে তারা সবাই যে বাংলাদেশিদের মন্দ বলেছে, এমনটি নয়। অনেকে বাহবা দিয়েছে। বলেছে, ‘এটা তো আমাদের কাছে অকল্পনীয় বিষয়।’ বলেছে, যে দেশে মুসলিম শিক্ষকরাই অপদস্থ হয়, অপমানিত হয়, সে দেশের একটি স্কুলে সনাতন ধর্মের একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পঞ্চাশ বছর চাকরি করেছেন এবং চাকরি শেষে গণসংবর্ধনা পাচ্ছেন- এটা তো কম কথা নয়, অনেক বড় কথা। তারা অনেকেই এ মনোভঙ্গি বা দৃষ্টিভঙ্গিকে সাধুবাদ জানিয়েছে।
আমি তাদের নানাভাবে বলেছি যে, এটাই বাংলাদেশ, এটাই বাংলাদেশের অবিকল চাল-চিত্র। বলতে ছাড়িনি যে, আপনারা ইন্ডিয়ায় বসে অসত্য, বানানো এবং অবাস্তব খবর পান। শুধু যে সনাতন ধর্মের লোকেরা এ ধরনের খবর পাঠায়, তা নয়। পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে, সেক্যুলার মুসলিমরাও এ ধরনের খবর পাঠায়- নিজের স্বার্থে বা দলের স্বার্থে।
এবার দেশের সনাতন ধর্মীরা বক্ষমাণ বিষয়ে কী ধরনের ‘রোল প্লে’ করলেন, তা একটু দেখা যাক। প্রায় ৭০% সনাতন ধর্মের লোক এ উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন এবং ৩০% বিশ্বাসই করতে পারেনি এমন অপূর্ব ঘটনা বাংলাদেশে ঘটতে পারে। কেউ কেউ এর মধ্যে কোনো কিন্তু আছে বলে মন্তব্য করেছেন। বর্তমান সরকারের ওপর বা ছাত্র-জনতার বিপ্লবের ওপর ওদের কোনো বিশ্বাস বা আস্থা নেই। তাদের মনে কোনো আশাবাদ নেই। বর্তমান সরকার, বিপ্লবীরা এবং বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্র সংগঠন সনাতন ধর্মের লোকদের জান-মাল রক্ষার জন্য যে ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, বিশ্ববাসীর প্রশংসা অর্জন করলেও দেশের সনাতনীরা সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তারা এ বিষয়ে কোনো কথা উচ্চারণও করেনি। নির্বাচন সংক্রান্ত ভালো বা মন্দ, তাও উল্লেখ করেনি। তারা ভালো নেই, তারা জুলুমের মধ্যে আছে, উৎকণ্ঠার মধ্যে আছে- এসব কথা তারা লিখেছে। তবে গত সরকার থাকলে ভালো হতো বা গত সরকার ফিরে এলে ভালো হবে- এমন কথাও তারা বলেনি। বিএনপির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে, তাও বোঝা গেল না। ইসলাম ভালো, মুসলিমরা ভালো, ইসলামী দল ভালো, এরা ক্ষমতায় এলে ওদের ভালো হবে- এমন কোনো লাইন আমার চোখে পড়েনি। একজন মাত্র সাহস করে বলেছেন, আমরা বাংলাদেশি, বাংলাদেশ আমাদের মাতৃভূমি। আসুন, আমরা সবই মিলে দেশটাকে গড়ে তুলি। তাকে আমি অভিনন্দন জানিয়েছি।
হঠাৎ মনে হলো বিষয়টা শেয়ার করে রাখি। একটা ছোট বিষয় হলেও এর মাধ্যমে দেশ ও দশের অনেক কিছু জানা গেল। পজিটিভ ও নেগেটিভ অনেক বিষয় মাথার মধ্যে এলো। আমার প্রোফাইলে শেয়ার করলাম। দেখলাম, শুধু ভিডিওটি এসেছে। সাথে লাইক, রিপ্লাই ও কমেন্টসগুলো আসেনি। আমি জানতাম সবকিছু একসাথে আসে। ফেসবুক অহরহ নিয়ম পরিবর্তন করছে। যিনি এটা ফেসবুকে দিয়েছেন, তার ওয়ালেও কিছু পেলাম না। অবশ্য আমার খুব দরকারও নেই, আমি মূল ধারণাগুলো পেয়ে গিয়েছি। আমার দেখার ইচ্ছা ছিল কতজন কমেন্ট করেছে এবং নতুন করে কেউ কিছু লিখলো কি না। শুরুতে ভাইরাল হয়েছিল, মিনিটে ৫-৬টি করে কমেন্টস আসছিল, দু’ঘণ্টায় আমি মূল বিষয়টা পেয়ে গিয়েছিলাম। সেটাই আমাদের ‘রেফারেন্স’।
সন্তোষ লালের বিষয়টি নিয়ে আরো অনেক গবেষণা করা যেত। কেন কী উদ্দেশ্যে উদ্যোক্তারা এত বিশাল আয়োজন করলেন? কোথায় এত টাকা-পয়সা পেলেন? সন্তোষকে কী উপহার দিলেন? সন্তোষ কোনো দলের কর্মী ছিলেন কিনা, তার পরিজন বা সংসারের কী অবস্থা? ইত্যাদি এবং আরও খুঁটিনাটি নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল। সেদিকে আমরা গেলাম না। সকলই লিখেছেন তিনি অনন্য মানুষ।
উদ্যোক্তাদের ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সব ধর্মের, সব দলের, সব আদর্শের ও সব মতবাদের লোক থাকাই স্বাভাবিক। তারা বিষয়টি আনন্দের সাথে উদযাপন করেছেন। অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই ফেসবুকে আনন্দ উদ্ভাসিত করেছেন। কোনো মুসলিম এ অভিনব অনুষ্ঠানকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেননি বা এ ইভেন্টের সমালোচনা করেননি। সকলেই বলেছেন নিজের নিজের ভাষায় অভূতপূর্ব ও অচিন্তনীয়। বড়দের জন্য, যদি স্কুলের কথাই ধরি- তাহলে বড়জোর প্রবীণ শিক্ষকদের জন্য দায়সারা গোছে কোনো কোনো স্কুলে কখনো কখনো হয়তো হয়। পরিচ্ছন্নকর্মীর জন্য বাংলাদেশের কোথাও কখনো এমন জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান হয়েছে, এমনটি জানা যায়নি। এ এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা সকলের জন্য। এটা একটা বিরল দৃষ্টান্ত। এ দৃষ্টান্ত সামনে রেখে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসা, তথা শিক্ষালয়গুলো মমতার সঙ্গে এগিয়ে আসে, তাহলে আমাদের বর্তমান মননে একটা ধাক্কা তো লাগবেই। এখন এমন কিছু বড় বড় ধাক্কার খুব প্রয়োজন। ধাক্কা একটা দিয়েছে ফেনীর সেন্ট্রাল হাইস্কুল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্কুল ও সন্তোষ লালকে অনন্য পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোও এগিয়ে আসতে পারে। ভালো কাজের মধ্যে প্রতিযোগিতা তো আছেই। দেখাদেখি উত্তম কাজ করলে কারো কোনো ক্ষতি হয় না। কেউ ছোট এবং কেউ বড় হয় না। বরং সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সৃষ্টি হয়।
পূর্বের সব কথা, সব কিংবদন্তি ও সব ইতিহাস আপাতত স্থগিত থাক। নির্বাচনের পর আবার সব কথা শুরু হবে। এখন যে বিষয়টি দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার, তা হলো সনাতন ধর্মের অধিকাংশ মানুষ হতাশা ও নিরাশায় ভুগছেন। তারা আশাবাদী হতে পারছেন না। দেশটা তো তাদেরও। আমাদের দেশে তো রাজা নেই যে- সনাতন ধর্মের লোকেরা আমাদের প্রজা। আমরা রাজা হলে তারাও রাজা। আমরা প্রজা হলে তারাও প্রজা। শুধু পূজার সময় তাদের খোঁজখবর নিলে হবে না। শুধু ধর্মের জন্য সাহায্য করলে হবে না। তাদের জীবন ও জগৎ আমাদের দেখতে হবে। দ্বিজাতিতত্ত্বের পর তারা কেন এখানে রয়ে গেলেন, সে প্রশ্ন তোলা সর্বাংশে অমানবিক। ঐ তত্ত্বের পর ইন্ডিয়ার সব মুসলিম তো পাকিস্তানে চলে যায়নি। ইন্ডিয়ার শাসকরাও বহুবার এ ধরনের নিকৃষ্ট কথা উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু এসব নিয়ে কি কোনো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে? হয়নি। ইন্ডিয়া অত্যাচার, অবিচার, জুলুমসহ নানাবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে- যাতে মুসলিমরা ধীরে ধীরে ইন্ডিয়া ত্যাগ করে। জুলুমের কারণে কিছু মানুষ হয়তো বিদেশে চলে গেছে- বৈধ বা অবৈধভাবে। সেটা কোনো সমাধান নয়। চল্লিশ দশকের শেষ দিকেও যারা দেশত্যাগ করেননি বা করতে পারেননি, তারা ভূমিপুত্র। তারা এ দেশের সন্তান। এটা তাদের মাতৃ ও পিতৃভূমি। তারা নিজের দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যায়নি। তারা দেশপ্রেমিক। দেশকে তারা ভালোবাসেন বলেই দেশের মাটি আঁকড়ে ধরে পড়ে আছেন। তাদের দিলে আশা জাগাতে হবে। স্বপ্ন জাগাতে হবে। তাদেরকে দেশবাসী বলে মেনে নিতে হবে। তারা আমাদের প্রতিবেশী। প্রতিবেশীর হক তো আমাদের দিতে হবে।
রাসূলুল্লাহ সা. মদিনা সনদের মাধ্যমে যে সহাবস্থানের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখানে তো মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না। বিভিন্ন ধর্ম, সম্প্রদায়, গোষ্ঠী ও গোত্রের সঙ্গে চুক্তি করেই তো রাষ্ট্রটি চলছিল। সেই মূল্যবোধের দিকেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।