জুলাই বিপ্লবের এক বছর : প্রাপ্তি, ঘাটতি ও করণীয়


৭ আগস্ট ২০২৫ ১৪:০২

একেএম রফিকুন্নবী

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
জুলাই বিপ্লবের এক বছর কেটে গেল। আমাদের হিসাব করতে হবে- কী পেলাম, কী পেলাম না, কী করতে হবে। হিসাব মেলাতেই হবে সচেতন নাগরিক হিসেবে। গত ২০২৪ সালের আগস্টের ৫ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে আমি ছেলেসহ স্বৈরাচার লেডি হিটলার হাসিনার কারাগারে ছিলাম। দুপুর ২টার দিকে জেলের এক ঝাড়ুদার এসে আবেগের সাথে জানাল, লেডি হিটলার পালাইছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই জেলের সব তালা খুলে দিল। আমরা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের নেতৃত্বে জেলখানার মধ্যেই মিছিল আকারে সবাই ক্যান্টিনে গিয়ে আনন্দ-উল্লাসের সাথে সাথে চা-টা খেলাম। বিএনপির সিনিয়র নেতা রিজভী সাহেবও ছিলেন। রিজভী সাহেব আমার পূর্বপরিচিত, সম্পর্ক ভালো।
পরের দিন একে একে প্রায় ৪ হাজার অকারণে বন্দী জেল থেকে মুক্ত হলাম। শুধু তাই নয়, সব জেল থেকে জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীরা মুক্ত হলেন। বেগম খালেদা জিয়াসহ অন্য নেতা আটক সবাই মুক্ত হলেন এবং তারেক রহমানসহ সকলের মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার হওয়া শুরু হলো। এটা জুলাই বিপ্লবের একটা বড় প্রাপ্তি।
জুলাই বিপ্লবের বড় ঘাটতি হলো- আমরা বিপ্লবী সরকার গঠন করতে পারলাম না। দোষ চাপিয়ে লাভ নেই। আমরা পারিনি- এটাই ব্যর্থতা।
শুরু হলো ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার। যে ইউনূস সাহেবের জন্য স্বৈরাচার হাসিনার জেল প্রস্তুত হচ্ছিল, তিনিই হয়ে গেলেন দেশের প্রধান উপদেষ্টা। এটাও আমাদের প্রাপ্তির খাতায় ধরতে হবে। কারণ একমাত্র দেশের নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস, যার পরিচিতি দুনিয়ার দেশ থেকে দেশান্তরে। কিন্তু অন্য উপদেষ্টারা অনেকেই এনজিওভুক্ত লোক হওয়ার কারণে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহস দেখাতে পারছেন না। এটাও আমাদের ঘাটতির মধ্যে পড়ে।
গত এক বছরে প্রাপ্তির ঘরে অনেক কিছু যোগ হয়েছে। পত্রপত্রিকাসহ মিডিয়াগুলো আওয়ামী বর্বরতার বিষয়ে চটকদার বয়ানে প্রচার করতে পারছে না। ইচ্ছায় হোক আর ছাত্র-জনতার ভয়ে হোক, দেশের স্বাথেই প্রচার-প্রচারণা চালাতে হচ্ছে। এর মধ্যেও প্রথম আলোসহ কয়েকটি পত্রিকা বাইরের দেশের ওপর আস্থার নজির রাখছে। কয়েকদিন পূর্বে এ পত্রিকায় বিএনপি নেতার সাক্ষাৎকার প্রচার করেছে। হেডিং হলোÑ দেশে ডানপন্থিদের উত্থানে ফখরুল সাহেব উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা দেশের ১৮ কোটি মানুষের আবেগকে মূল্যায়ন করেনি। অর্থাৎ সাধারণ ছাত্র-জনতার বিপ্লবের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। শুধু এ বক্তব্যেই নয়, ফখরুল সাহেব বিপ্লবের সময়ও প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে, তারা ছাত্রদের আন্দোলনের সাথে নেই। আজকে বিএনপির কিছু লোকদের কথায় মনে হয়, তারাই বিপ্লব ঘটিয়েছে, যা ডাহা মিথ্যা। তাদের কারণেই বিপ্লবী সরকার গঠন করা সম্ভব হয়নি। এখনো বিপ্লববিরোধীদের বিচারকার্য সচল রাখার বিরোধিতা করছে। সংস্কারের কাজ বাধাগ্রস্ত করছে। তারা স্বৈরাচারের সংবিধানের ধারায় আছে। তারা হাসিনার মতো দেশের মানুষকে বোকা মনে করছে। হাসিনার সময়ে সংবিধান কোথায় ছিল। তারা কি গত ৩টি নির্বাচন সংবিধানের মধ্যে করেছিল। দিনের ভোট রাতে, ভোট ছাড়া নির্বাচন, আমরা মামুরাই প্রার্থী হয়ে নির্বাচনকে প্রহসনে রূপান্তরিত করেছিল। ফখরুল সাহেবরা দেশের মানুষকে আর বোকা মনে করবেন না।
ইতোমধ্যেই আপনাদের নেতাকর্মীরা দেশের সচেতন মানুষের কাছে চাঁদাবাজ, দুর্নীতিতে রেকর্ড করে ফেলেছে। আপনারা হাজার হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়েছেন। জনগণ আর চাঁদাবাজ, দুর্নীতিপরায়ণ লোকদের ভোট দিয়ে নেতা বানাবে না। তাই তো দ্রুত নির্বাচনের দাবি নিয়ে আদায়ে ব্যস্ত কিছু রাজনৈতিক দল। কারণ যতদিন যাচ্ছে, তাদের ভোট দ্রুত কমতে শুরু করেছে।
জনগণ আর কারো পাতানো ফাঁদে পা দেবে না। জুলাই বিপ্লব আমাদের শিখিয়ে গেছে, কোনো স্বৈরতন্ত্র, চাঁদাবাজ বা দুর্নীতিবাজদের এ দেশে ঠাঁই হবে না। ছাত্র-জনতা ঠকতে ঠকতে সচেতন হয়েছে। তাই ছাত্র-জনতা আর ঠকতে রাজি নয়। আমরা শোষণমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে কোনো ছাড় দেব না।
প্রাপ্তির মধ্যে স্বৈরাচার হাসিনার বিচারকাজ ট্রাইব্যুনালে শুরু হয়েছে। সঠিক নিয়মেই স্বচ্ছ বিচারের মাধ্যমে হাসিনা ও তার দোসরদের বিচার দ্রুতই সম্পন্ন হবে। হত্যা, গুম, খুন, আয়নাঘরের নির্যাতনের প্রতিনিয়ত সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে। তাই বিচারকাজ দ্রুতই এগিয়ে যাবে।
নিত্যপণ্যের দাম অনেকটাই কমেছে। সিন্ডিকেট পুরোপুরি ভাঙা যায়নি। তবে ভুক্তভোগীরা সচেতন হলে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি কমে যাবে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকটাই গতি পেয়েছে। বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৫৪ বছরের মধ্যে বেশি হয়েছে। ৩০ বিলিয়নের চেয়েও বেশি বর্তমানে রিজার্ভ। পতিত সরকারের ফেলে যাওয়া বৈদেশিক ঋণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পরিশোধ করেছে এ সরকার। বিশেষ করে জ¦ালানি কেনার ঋণ পুরোটাই পরিশোধ করা হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর পুঁজির শতকরা আশি ভাগ চুরি করে বিদেশে পাচার করেছে হাসিনার দোসররা। তাই ব্যাংকের দৈনন্দিন কাজ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ব্যাংকগুলো ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে।
দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই চীনের প্রায় ২০০ ব্যবসায়ী বাংলাদেশ সফর করেছেন এবং বিনিয়োগের বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়েছেন।
বিদেশে লোক পাঠানোর দ্বার উন্মোচন হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার বিদেশ সফরের ফলে জাপান, মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যে লোক পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিদেশে লোক পাঠানোর ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেট ভাঙার কাজ চলছে।
দেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনার সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে নৌবাহিনী বন্দর ব্যবস্থা পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যেই বন্দরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পতিত সরকার দেশের সকল বিভাগে তাদের সিন্ডিকেট চালু করে বিরোধীদের ব্যবসা-বাণিজ্যের সব ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছিল। বর্তমানে সবাই অবাধে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারছে।
জুলাই সনদ তৈরিতে দেরি হলেও সনদ তৈরি হচ্ছে। দেশের সব রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মতামত নেয়া হয়েছে। তার আলোকেই জুলাই সনদ সম্পন্ন হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস মানিক মিয়া এভিনিউতে ছাত্র-জনতার সামনে ঘোষণা পড়ে শুনিয়েছেন। আমরা চাই এ জুলাই সনদ ঘোষণার আলোকে সুষ্ঠু নির্বাচানের আয়োজন করা হোক। সংস্কারের কাজ চলছে। বিচারের কাজও এগোচ্ছে।
সবচেয়ে ঘাটতি আমাদের সামনে পুলিশ বিভাগের সংস্কার সম্পন্ন করা যায়নি। হাজার হাজার পুলিশ কাজে যোগ দেয়নি। আবার অনেক জায়গায় পূর্বের লোকেরাই দায়িত্ব পালন করছে, যা বিপ্লবোত্তর প্রশাসনের জন্য ভালো নয়। পুলিশ বিভাগে লোক নেয়ার চেষ্টা চলছে। দ্রুত নিয়োগ দিয়ে, প্রশিক্ষণ দিয়ে সততা এবং দুর্নীতির মূলোৎপাটনে যাতে তাদের কাজে লাগানো যায়, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। ঘাটতির বড় খাত হলো আমলাদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা যায়নি। পতিত স্বৈরাচারের দোসররা এখনো অনেক মন্ত্রণালয়ে ঘাপটি মেরে তারা তাদের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। বড় ব্যাপার হলো সামরিক বাহিনীর চলতি দায়িত্বে থেকেও মেজর সাদিক কীভাবে হল ভাড়া করে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির প্রশিক্ষণ দিতে পারলো? এটা সামরিক বাহিনীর জন্য অপমানজনক এবং তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
এ ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করব সর্বক্ষেত্রে কঠোরভারে অনিয়ম দূর করতে হবে। কোনো ছাড় দেয়া যাবে না। সামরিক হোক আর বেসামরিক কোনো বিভাগে হোক, কঠোর হস্তে অন্যায় দূর করতে হবে। বিশেষ করে সড়কপথ বন্ধ করে কোনো দাবি-দাওয়ার মিটিং করা যাবে না। অবশ্যই দাবি-দাওয়ার কথা প্রশাসনকে জানাতে হবে। তবে কোনোভাবেই জনমানুষের ভোগান্তি করে নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারকে জনগণের দাবি-দাওয়া সঠিকভাবে পর্যালোচনা করে ন্যায়বিচারের মাধ্যমে দাবি পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে- জনগণই সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতি নজর দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের মুখ্য ভূমিকা আমরা দেখতে চাই। অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্র-জনতার রায়েই ক্ষমতায় আছে। তাই তাদের হেয় করার কোনো সুযোগ নেই। আমরা ভুয়া নির্বাচনের সরকারকে দেখেছি। তারা জনগণের কথা না ভেবে দল ও আত্মীয়করণে নজর দিয়েছে, লাখকোটি টাকা পাচারের সুযোগ করে দিয়েছে। বিদেশে বেগমপাড়া বানানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছে। স্বৈরাচার হাসিনার পিয়নেরও ৪০০ কোটি টাকা থাকার কথা জনসম্মুখে হাসিনা গর্বের সাথে প্রকাশ করেছে। জাতির জন্য কলঙ্কজনক।
আমরা কোনোভাবেই স্বৈরাচার, দুর্নীতি, চাঁদাবাজ, দখলদার কোনো শক্তিকে রাজনীতিতে সক্রিয় দেখতে চাই না। যেহেতু জনগণই সকল শক্তির উৎস, তাই দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে ভালো মানুষের স্থানীয় সরকার দেখতে চাই। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সীমানা যেহেতু ছোট, তাই জনগণের তাদের সৎ প্রার্থী খুঁজতে কোনো অসুবিধা হবে না। দুই মাসের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন করা সম্ভব। নির্বাচন কমিশনের পরীক্ষা হয়ে যাবে। সাথে সাথে প্রশাসনের লোকদেরও দায়িত্ব পালনে প্রশিক্ষণ হয়ে যাবে।
একটা কথা না বললেই নয়- জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান অসুস্থ অবস্থায় লাখো জনতার সামনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, আমরা স্বৈরাচার তাড়িয়েছি এবং দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ব। জনগণ তার ঘোষণা বাস্তবায়নে তৎপর আছে। আমীরে জামায়াত দেশে আরেকটি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তার হার্টের চারটি ব্লক দেশেই অপারেশন করিয়েছেন। তিনি বর্তমানে সুস্থ আছেন, আলহামদুলিল্লাহ।
দেশের নেতাকর্মীদের ছুতায়-নাতায় বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার প্রবণতার ঘাড়ে চপেটাঘাত করে আমীরে জামায়াত ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। ছোট-বড় সবাই আমীরে জামায়াতের এ ঘটনা দেশের জন্য ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট, প্রধান উপদেষ্টা, সেনাপ্রধান থেকে শুরু করে বিভিন্ন দলের নেতারাও আমীরে জামায়াতের খোঁজখবর নিয়েছেন। ভালো পরিবেশ।
আমরা আমাদের দেশটাকে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার জন্য শপথ নিয়েছি। সবাইকে সাথে নিয়েই স্বৈরাচারমুক্ত দেশ গড়তে একত্রে কাজ করে উন্নত দেশ গড়ার কাজে আসুন শরিক হই। মহান আল্লাহ আমাদের দেশটাকে হেফাজত করবেন।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।