৫ আগস্ট যুগে যুগে প্রেরণা জোগাবে
৩১ জুলাই ২০২৫ ১৪:৫১
॥ মাহবুবুল হক ॥
বাংলাদেশ দেশ হিসেবে ছোট, কিন্তু জাতি হিসেবে বড়। জনসংখ্যার দিক থেকেও বড়। স্বাধীনতাকামী একটি জাতি ইতিহাসে নানা কারণে উজ্জ্বলতর অবস্থানে পৌঁছাতে পারলেও বার বার স্বাধীনতা হারিয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সুদূর অতীত থেকেই এখানকার মানুষ পূর্বে কখনো এক ধর্ম বা এক আদর্শে স্থির ছিল না। তাদের মধ্যে সত্যকে পাওয়ার দুর্দান্ত কৌতূহল ছিল। বহির্বিশ্ব থেকে যখন কোনো দল বা গোষ্ঠী এদেশে পদার্পণ করেছে, তখনই এখানকার মানুষ তাদের ওয়েলকাম করেছে। তাদের সাথে মিশেছে। বসবাস করেছে। বিয়ে-শাদী করেছে। এভাবেই এদেশের সহজ-সরল সনাতন ধর্মের মানুষ ধর্মান্তিরত হয়েছে। কখনো তারা আর্যদের হিন্দু ধর্মকে ভালোবেসেছে, কখনো পালদের বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছে। একটি বড় অংশ ইসলাম ধর্মের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের অনেকেই ইসলামকে যথাযথভাবে ধারণ করতে পারেনি। এভাবে এ বদ্বীপের মানুষের ধর্ম, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও জীবনাচরণ বার বার বিক্ষিপ্ত হয়েছে। খণ্ড-বিখণ্ড হয়েছে। কোনো ধর্মকেই তারা ভালোভাবে না ধরতে পেরেছে, না ছাড়তে পেরেছে। এখানকার ভূমিপুত্রদের মনে আলোকিত হওয়ার বাসনা থাকলেও ন্যায় ও সত্যের পুণ্য সোপান তারা সহজে আয়ত্ত করতে পারেনি।
ইবরাহীম (আ.)-এর মধ্যে সত্যের যে আকুলতা আমরা দেখি, সেই একই আকুলতা আমরা এদেশের ভূমিপুত্রদের মধ্যে দারুণভাবে প্রত্যক্ষ করি। কিন্তু ইবরাহীম (আ.) এবং তাঁর বংশধররা যেভাবে সত্যকে আঁকড়ে ধরে রাখতে পেরেছিলেন, এ ভূখণ্ডের আদি সেভাবে অগ্রসর হতে পারেননি। তাঁরা হিন্দু+মুসলমান, বৌদ্ধ+মুসলমান, খ্রিস্টান+মুসলমান হতে হতে এখন এ ভূখণ্ডে ১৫ কোটি মুসলমান হলেও প্রায় ৩ কোটি অন্যান্য ধর্ম ও উপধর্মের লোক বসবাস করে। এখন এখানে একক কোনো ধর্ম বা আদর্শের মানুষ বসবাস করে না। এটা এখন বহু ধর্ম ও বহু আদর্শের দেশ। প্লুরাষ্ট্রিক দেশ। এখানে নানা মতের মানুষের বসবাস।
দেশ বিভাগের সময় যদিও এ ভূখণ্ডকে দ্বিজাতিতত্ত্বের মাপকাঠিতে একক ধর্মের বা একক জাতির দেশ বানানোর প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে তা ফলবতী হয়নি। এর কারণ ছিল মোটাদাগে দুটি। এক. এ ভূখণ্ডের মানুষ অন্যান্য ধর্ম থেকে বেরিয়ে এসে মুসলমানদের ধর্ম বা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। ফলে পরিচিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেই অধিকাংশ মানুষ ধর্মান্তরিত হয়েছিল। একে-অপরের সঙ্গে জানাশোনা ছিল, ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল, সামাজিকতা ছিল এবং মসজিদ ও মন্দিরও ছিল প্রায় একই জায়গায়। বিদ্বেষ ও হিংসা ভেতরে ভেতরে অবস্থান করলেও সামাজিক চাপের কারণে সেসব সবসময় উদ্ভাসিত হতো না। দুই. যারা সে সময় মুসলিম ধর্মগ্রহণ করেছিল, না তারা কট্টর ছিল এবং যারা নিজস্ব ধর্মের মধ্যেই অবস্থান করছিল, তারাও তেমন কট্টর, মৌলবাদী বা সাম্প্রদায়িক ছিল না। নানারকম ইতিহাস থাকলেও সবার সঙ্গে সবার যে মোটামুটি মেলবন্ধন ছিল, তা তো অনুমান করাই যায়। এসব কারণে স্থানান্তরটা পুরোপুরি হয়নি। আংশিকভাবে হয়েছে। অধিকাংশ সাধারণ মানুষ তখন সহজ, সরল ও সঠিক ছিল। সমাজে পরস্পরের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা প্রবল ছিল।
একটা বড় দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়েছিল দেশ ভাগের পূর্বে। সেটা সংঘটিত হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে অথবা স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক কর্মীদের কারণে। সমাজ ভালো হলেও সমাজে কিছু দুর্বৃত্ত মানুষ থাকে। এরা হলো স্বার্থপর ও সুবিধাবাদী। এরা যেকোনো কিছুর বিনিময়ে অর্থ-সম্পদ হস্তগত করার নেশায় বিভোর হয়ে থাকে। আবার সমাজ খারাপ হয়ে গেলেও এমন কিছু ভালোমানুষ অবশিষ্ট থাকে, যারা মানুষকে ভালো মানুষ হওয়ার আহ্বান জানায়। এ বিষয়ে যতটুকু সম্ভব বিভিন্নভাবে চেষ্টা-প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলো। ব্রিটিশরা চলে গেল। মুসলিম অধ্যুষিত দুটি প্রদেশ নিয়ে পাকিস্তানের সৃষ্টি হলো। পূর্ব বাংলা হলো পূর্ব পাকিস্তান আর কয়েকটি বিভাগ নিয়ে তৈরি হলো পশ্চিম পাকিস্তান। কিন্তু রয়ে গেল আরও কিছু রাজ্য কাশ্মীর, জুনাগড়, হায়দরাবাদ- সে রাজ্যগুলো ছিল মুসলিম অধ্যুষিত। কিন্তু সেগুলোকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হলো না বা পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে তৈরি করা হলো না। এসব রাজ্যের মুসলিমরা স্বাধীনতা পেল না। আমরা স্বাধীনতা পেলাম সত্য, কিন্তু তা ছিল কাগজে-কলমে। পরিপূর্ণ স্বাধীনতা আমরা পেলাম না।
অন্যদিকে পাকিস্তানের এ দুর্দশাই চাইছিল প্রতিবেশী বড় দেশ ইন্ডিয়া। পাকিস্তানের দুটি প্রদেশের অবস্থান ছিল ইন্ডিয়ার পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে। স্থলপথে যাতায়াতের কোনো সুবিধা ছিল না। দুই প্রদেশের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল আকাশ ও সমুদ্র। শুরুতেই মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্যগুলো নিয়ে যদি পাকিস্তান সৃষ্টি করা হতো, তাহলে হয়তো ধীরে ধীরে যত সমস্যা সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা হতো না। ব্রিটিশরা ইন্ডিয়া ভাগ করার সময় একটি দেশকে বানালো বড় ভাই এবং আরেকটি দেশকে বানালো ছোট ভাই। এখানেই ছিল এ অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ। যে অভিশাপ হয়তো কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। যে মুসলিম রাজ্যগুলো ছেড়ে দিয়ে পাকিস্তান গড়া হলো, তা ছিল একান্তভাবে অনৈতিক এবং অমানবিক। কাশ্মীর, জুনাগড় ও হায়দরাবাদ এখনো জ¦লছে। স্বাধীনতা তো দূরে থাক, স্বায়ত্তশাসনও তাদের দেয়া হয়নি। এসব রাজ্য বা অঞ্চলের মুসলিমরা ইন্ডিয়ার শত্রু। তাদের ইন্ডিয়া বরাবর শত্রু হিসেবেই গণ্য করে আসছে। গত ৭৮ বছর ধরেই মুসলিমরা যাতে শক্তিশালী না হয়, স্বয়ম্ভর না হয়, সে চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে ইন্ডিয়া। কারণ এরা শক্তিশালী হলেই ইন্ডিয়া ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
পূর্ব পাকিস্তানিরা ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ার অভিযোগে যে আন্দোলন শুরু করেছিল, তাতে সবসময় ইন্ধন জুগিয়েছে ইন্ডিয়া। ১৯৬৫ সালে ইন্ডিয়া-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলে। অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানের বর্ডারে। পূর্ব পাকিস্তানে ইন্ডিয়া কোনো আক্রমণ করেনি। পূর্ব পাকিস্তানবাসীকে তারা আশ্বস্ত করেছে এই বলে যে, তোমরা আমাদের দুশমন নও, দুশমন বা শত্রু হলো ঐ পাকিস্তান। যারা তোমাদের ন্যায্য পাওনা দিচ্ছে না। তারা শুধু তোমাদের শত্রু নয়, তারা নিজ এলাকায় গরিবদেরও শত্রু।
ইন্ডিয়া একদিকে পূর্ব পাকিস্তানবাসীকে বাহবা দিয়েছে; অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানসহ মুসলিম রাজ্য বা অঞ্চলগুলোয় অত্যাচার, অবিচার, নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন চালিয়েছে। উদ্দেশ্য মুসলিমদের দুর্বল করে রাখা। এ চেষ্টা ও প্রচেষ্টায় ইন্ডিয়া অনেকটা সফল হয়েছে। এসব প্রেক্ষাপট ও পটভূমিতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের জন্ম। স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন। মাঝে ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে ইন্ডিয়া পূর্ব বাংলাকে সাহায্য করেছে, এটা মুদ্রার এক পিঠ। অপর পিঠের সামান্য বর্ণনা এখানে আমরা পেশ করলাম। ইন্ডিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে যে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেÑ তা পূর্ব বাংলার মানুষের স্বার্থে নয়, তাদের নিজেদের স্বার্থে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে সংঘটিত পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠান। স্বাধীনতার লড়াই করলো পূর্ব বাংলার সেনাবাহিনী, বিডিআর, পুলিশসহ আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা। নেতৃত্ব দিল বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার। অথচ পরাজিত পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করল ইন্ডিয়া সেনাবাহিনীর কাছে। এতে কী প্রমাণিত হয়? প্রমাণিত হয় সে সময় বাংলাদেশের কোনো সরকার বা সেনাবাহিনী ছিল না। যুদ্ধ হয়েছে ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানের সাথে। সে কারণেই পরাজিত বাহিনী বিজয়ী বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধকে ইন্ডিয়া সম্পূর্ণভাবে ধুলায় লুণ্ঠিত করে দিয়েছে। আমাদের সকল গৌরবগাথাকে ইন্ডিয়া ম্লান করে দিয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সব ক্রেডিট ইন্ডিয়া প্রকাশ্যে ছিনতাই করেছে।
এখানেই শেষ নয়, যুদ্ধ শেষে পরাজিত সৈন্যদের তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর সকল দায় ও দায়িত্ব বহন করেছে ইন্ডিয়া। এ পর্ব সেরে যুদ্ধে ব্যবহৃত ও অব্যাহৃত বাংলাদেশের সব অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ ইন্ডিয়া প্রকাশ্যেই নিয়ে গিয়ে এটাই প্রমাণ করেছে যে, ‘আমরাই পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করেছি এবং জয়লাভ করেছি।’
তারপরের ইতিহাস (গত ৫৪ বছরের) তো সবার জানা। বাংলাদেশ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলেছে। ইন্ডিয়ার একটি করদরাজ্যের মতো। এ যাবত যত সরকার এসছে-গিয়েছে, তার সবই ছিল ইন্ডিয়ার পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণে।
১৯৪৭ থেকে ইন্ডিয়া আমাদের পক্ষে-বিপক্ষে কী কী করেছে, আমরা তা জানি। বিশ্ববাসীও তা জানে। এই ছোট নিবন্ধে সেসব উদ্ভাসিত করা দুরূহ। তবে সংক্ষেপে বলা যায়, ২০০৯ সালে ইন্ডিয়া আমাদের উপহার দিয়েছে একটি নির্মম-নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী সরকার। যারা ধ্বংস করেছে অর্জিত আমাদের সবকিছু। আমাদের ঈমান-আমান থেকে শুরু করে সবই। এ কারণে গত ১৬ বছর যাবত আন্দোলন-সংগ্রাম কম হয়নি। কিন্তু ফ্যাসিবাদী শক্তি এতই নির্মম ও নিষ্ঠুর ছিল যে, তাদের পরাভূত করা কোনোভাবেই সম্ভব হয়নি। তারা শুধু ইন্ডিয়ার সাহায্য পায়নি, পেয়েছে গোটা সেক্যুলার জগতের সাহায্য-সহযোগিতা। বাংলাদেশকে জঙ্গি দেশ ট্যাগ দিয়ে, মৌলবাদী দেশ ট্যাগ দিয়ে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড তারা করেছে, ইতিহাসে তা বিরল।
সবকিছুর একটা শেষ আছে। শিশু ও কিশোরদের ওপর ফ্যাসিবাদী শক্তি যখন নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লো, তখনই মনে হয় মহান আল্লাহর আরশও কেঁপে উঠলো। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্দোলন শুরু করল শিক্ষার্থীরা। যোগ দিল জনতা। যোগ দিল নানা রাজনৈতিক দল। যোগ দিল গোটা দেশবাসী।
সূরা ফিলের ঘটনা চাক্ষুষ করল বিশ্ববাসী। এমন বিজয় বিশ্ববাসী কখনো দেখেনি। কিন্তু ৩৬ দিনে এমন বিজয় কী কেউ স্বপ্নে দেখেছে, না কল্পনা করেছে? এটা নিঃসন্দেহে জাগতিক কোনো বিজয় নয়। বদরের যুদ্ধে মহান আল্লাহ যেমন তাঁর ফেরেশতা পাঠিয়ে মুসলিমদের বিজয় এনে দিয়েছিলেন, মনে হয় এটা তেমনই এক মহান বিজয়। এ বিজয়কে অবহেলা বা উপেক্ষা করার অর্থ হবে আবার ফ্যাসিবাদের দিকে ফিরে যাওয়া। মহান আল্লাহর নিয়ামত ও রহমতকে অস্বীকার করা। ইনশাআল্লাহ, ৫ আগস্ট ইতিহাসে জাজ¦ল্যমান থাকবে। যারা এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, ইনশাআল্লাহ তারাও জাতীয় বীর হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষয় ও অমর হয়ে থাকবেন।