সুলতান সোলায়মানের দুই ভুলের মাশুল দিচ্ছে ফিলিস্তিনিরা
২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:৫৪
॥ মোহাম্মদ হাসান শরীফ ॥
উসমানিয়া (অটোম্যান) সুলতানদের মধ্যে সবচেয়ে খ্যাতিমান হলেন সোলায়মান। মহামান্বিত, কানুনি ইত্যাদি উপাধিতে তাকে ভূষিত করা হয়। তাঁর আমলে উসমানিয়া সালতানাত সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত হয়েছিল। তিনি সাম্রাজ্য পরিচালনায় যে নিয়মকানুন তৈরি করে গিয়েছিলেন, তাতেই কয়েকশ’ বছর টিকে ছিল উসমানীয়রা। তবে তার দুটি ভুল অনেক পরে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে পরিচিত। আজ ফিলিস্তিনে যে দুগর্তি, সেটার জন্য তার উদারতাকেও অনেকাংশে দায়ী করা চলে। ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা বৃদ্ধি, ইউরোপিয়ানদের হস্তক্ষেপ এবং আল-আকসা কমপ্লেক্সে ইহুদিদের উপাসনা- এগুলোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন তিনিই। শুরুতে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচিত হয়নি। কিন্তু পরে দেখা যায়, বিশাল উসমানিয়া সাম্রাজ্যের যে সূচটি তার সময় বিঁধেছিল, তা কয়েকশ’ বছর পর ফাল হয়ে বের হয়ে আসছে।
উসমানিয়া সুলতান ‘দুর্ধর্ষ’ সেলিমের (সেলিম দ্য গ্রিম) আমলে জেরুসালেম আসে উসমানিয়াদের নিয়ন্ত্রণে। ১৫১৬ সালের ২৪ আগস্ট আলেপ্পোর কাছে মামলুকদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে তিনি নগরীর দায়িত্ব নেন। পরে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য এলাকাও জয় করেন। এর ধারাবাহিকতায় পরের ৪০০ বছর মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ এলাকা উসমানীয়দের হাতে থাকে। সেলিম ১৫১৭ সালের ২০ মার্চ জেরুসালেমের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য সেখানে পৌঁছান। আলেমেরা আল-আকসা এবং কোব্বাতুল সাখরার (ডোম অব রক) চাবি তুলে দিলে সেলিম সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন, চিৎকার করে বললেন, ‘আমি এখন প্রথম কিবলার অধিকারী।’ সেলিম খ্রিস্টান ও ইহুদিদের প্রতি ঐতিহ্যবাহী সহিষ্ণুতা অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা করেন। তারপর তিনি মসজিদুল আকসায় নামাজ পড়েন।
উসমানিয়া সালতানাতে সেলিমের উত্তরসূরি হন সোলায়মান। সিংহাসনে আরোহণের সময় সোলায়মানের বয়স ছিল মাত্র ২৫ বছর। তিনি ছিলেন লম্বা, হালকা-পাতলা গড়নের, মুখমণ্ডল ছিল গোলাকার। তিনি নিজেকে বলকান থেকে পারস্য সীমান্ত এবং মিশর থেকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্যের অধিপতি দেখতে পেলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘আমি বাগদাদে শাহ, বাইজান্টাইনে সিজার; মিশরের সুলতান।’ এগুলোর সঙ্গে খলিফা পদবিটিও গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, উসমানিয়া সভাসদরা তাদের শাসনকর্তাকে পাদিশাহ (সম্রাট) বলতেন।
উত্তরাধিকার সূত্রে জেরুসালেম ও মক্কা নগরীর অধিকারী হয়েছিলেন সোলায়মান। তিনি মনে করতেন, ইসলামী মর্যাদার কারণে তার কর্তব্য ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর সৌন্দর্যবর্ধন করা। সে অনুযায়ী কাজ শুরু করে দেন। তার সম্পর্কিত সবকিছুই ছিল বিশাল মাপের। তার উচ্চাকাক্সক্ষা ছিল সীমাহীন, শাসনকাল ছিল প্রায় অর্ধশত বছর। সাম্রাজ্য বাড়াতে দিগন্ত ছিল বিস্তীর্ণ- ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকা থেকে ইরাক ও ভারত মহাসাগর, ভিয়েনা গেট থেকে বাগদাদ পর্যন্ত তিনি প্রায়ই মহাদেশীয় যুদ্ধ করেছেন। জেরুসালেমে তিনি ব্যাপক নির্মাণকাজ পরিচালনা করেছিলেন। তার অর্জন এত ব্যাপক ছিল যে, বর্তমান পুরনো জেরুসালেম নগরী মনে হবে তারই গড়া।
সুলতান সোলায়মানের আমলে জেরুসালেম নগরীর জনসংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়ে ১৬ হাজারে দাঁড়িয়েছিল, পশ্চিম থেকে উদ্বাস্তুদের ঢলে ইহুদির সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে দুই হাজারে দাঁড়ায়। নতুন আসা এসব উদ্বাস্তেুর অনেকে সোলায়মানের প্রকল্পগুলোয় সরাসরি জড়িত হয়েছিল।
সোলায়মান মিশরের রাজস্ব থেকে জেরুসালেম নতুন করে গড়ার ব্যয়ভার মেটানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আর এ রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব ছিল আব্রাহাম ডি ক্যাস্ট্রোর ওপর। তিনি ছিলেন টাকশালের প্রধান ও কর-সংস্কারক। স্থানীয় গভর্নর বিদ্রোহ করার ষড়যন্ত্র করলে তিনি সুলতানকে হুঁশিয়ার করে আনুগত্যের প্রমাণ দিয়েছিলেন। নামের সূত্রে বলা যায়, ক্যাস্ট্রো ছিলেন পর্তুগালের উদ্বাস্তু ইহুদি। তবে তার ভূমিকা যোশেফ ন্যাসি নামের অপর অত্যন্ত ধনী পর্তুগিজ ইহুদির মতো ছিল না। ন্যাসি সোলায়মানের উপদেষ্টা এবং পরে ফিলিস্তিন ও জেরুসালেমের সর্বোচ্চ রক্ষাকর্তা হয়েছিলেন।
ইউরোপে ধর্মীয় যুদ্ধগুলোর অন্যতম পরিণতি হলো ইহুদি নির্বাসন-অভিবাসন। ১৪৯২ সালে অ্যারাগনের রাজা ফার্ডিন্যান্ড এবং ক্যাস্টিলের রানি ইসাবেলা স্পেনের শেষ মুসলিম রাজ্য গ্রানাডা জয় করার পর মুসলিম ও ইহুদিদের তাড়িয়ে তাদের সফল ক্রুসেড উদযাপন করেন। উল্লেখ্য, একই বছর আমেরিকা আবিষ্কারে বের হওয়ার সময় ক্রিস্টোফার কলম্বাস বেশিরভাগ ক্যাথলিক শাসককে লিখেছিলেন, ‘মহামান্য সম্রাটদের কাছে আমি প্রস্তাব করছি, এই অভিযান থেকে প্রাপ্ত সব মুনাফা জেরুসালেম উদ্ধারে ব্যবহৃত হবে।’ অর্থাৎ ক্রুসেড ইউরোপিয়ানরা ছাড়েনি। ফার্ডিন্যান্ড-ইসাবেলার ছেলে সম্রাট পঞ্চম চার্লস ছিলেন সোলায়মানের প্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি জেরুসালেমের অভিভাবক-রাজা মনে করতেন। তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে ক্রুসেডিং ঐতিহ্য লাভ করেছিলেন। আবার ক্রুসেডের মাধ্যমে জেরুসালেম দখল করার কথা প্রকাশ্যেই বলতেন তিনি। এ প্রেক্ষাপটে নগরীটির নিরাপত্তা জোরদার করেছিলেন সোলায়মান।
স্পেন দখলের পর খ্রিস্টান শাসকরা কেবল মুসলিমদেরই হত্যা বা বহিষ্কার করেননি, তারা ইহুদিদের ওপরও একই ধরনের নির্যাতন করেছিলেন। খ্রিস্টবাদের বিশুদ্ধ ধারায় ইহুদি রক্ত গোপনে মিশে যেতে পারে- এ আশঙ্কায় পাগলপারা হয়ে এবং টোমার টোরকুইমাদার ইনকুইজিশনের উপদেশে তারা এক লাখ থেকে দুই লাখ ইহুদিকে বহিষ্কার করেন। পরের ৫০ বছর পশ্চিম ইউরোপের একটি বড় অংশ সেটা অনুসরণ করে। সাতশ’ বছর ধরে স্পেন ছিল আরব-ইহুদি সংস্কৃতির বিকাশভূমি এবং ইহুদিদের প্রাচীন আবাসভূমির বাইরে ইহুদিদের প্রধান বসতি। উগ্র খ্রিস্টানদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে উসমানিয়া সাম্রাজ্য ছিল ইহুদিদের অন্যতম আশ্রয়কেন্দ্র। সুলতান সোলায়মানও তাদের স্বাগত জানাতেন। তিনি কেবল তাদের নিরাপত্তাই দেননি, বিভিন্ন কাজেও তাদের নিয়োজিত করেন। কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদেও অভিষিক্ত হয়েছিল।
সোলায়মানের ইহুদি চিকিৎসক ১৫৫৩ সালে তার সঙ্গে যোশেফ ন্যাসিকে পরিচয় করিয়ে দেন। যোশেফের পরিবারটি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের ভান করেছিল। পরে তারা পালিয়ে নেদারল্যান্ডস ও ইতালি হয়ে ইস্তাম্বুলে আসে। ইস্তাম্বুলে তিনি সুলতানের আস্থা অর্জন করেন, তার ছেলে ও উত্তরাধিকারের বিশ্বস্ত এজেন্ট হন। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের কাছে যোশেফ শ্রেষ্ঠ ইহুদি (গ্রেট জু) হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি জটিল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য পরিচালনা করার পাশাপাশি সুলতানের দূত ও আন্তর্জাতিক রহস্যমানব হিসেবেও কাজ করতেন। সেইসঙ্গে তিনি যুদ্ধ ও অর্থ লেনদেনে দরকষাকষি এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে মধ্যস্ততা করেন। তিনি ইহুদিদের ‘প্রতিশ্রুত ভূমিতে’ প্রত্যাবর্তনে বিশ্বাস করতেন। সোলায়মান তাকে গ্যালিলির টাইবেরিয়াসে জমিদারি দেন। সেখানে তিনি ইতালীয় ইহুদিদের পুনর্বাসন, নগর নির্মাণ, সিল্ক শিল্প বিকাশের জন্য তুঁত গাছ রোপণ করেন। তিনি ছিলেন ‘পুণ্যভূমিতে’ প্রথম ইহুদি বসতি স্থাপনকারী। তিনি গ্যালিলিতে তার ‘জেরুসালেম’ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। কারণ বিদ্যমান অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণমাত্রায় সচেতন থাকায় তিনি জানতেন, আসল জেরুসালেম সোলায়মানের জন্যই সংরক্ষিত।
ইহুদিরা ওইসময় আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্সের দেয়ালগুলোর আশপাশে মাউন্ট অব অলিভসের ঢালগুলোয় এবং তাদের প্রধান সিনাগগ র্যামব্যানে প্রার্থনা করত। আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্সে ইসলামী মর্যাদার ক্ষুণ্নকারী যেকোনো কিছু নিরুৎসাহিত করে সুলতান তাদের প্রার্থনার জন্য কিং হেরোড’স টেম্পলের সহায়ক দেয়ালের পাশে ৯ ফুটের একটি রাস্তা বরাদ্দ করেন। ইহুদিরা এ স্থানটিকে বলতে শুরু করল হা-কোটেল (দ্য ওয়াল), বহিরাগতেরা বলত ওয়েস্টার্ন বা ওয়েলিং ওয়াল (পশ্চিম দিকের দেয়াল বা কান্নার দেয়াল)। এরপর এ সোনালি, বিশাল পাথরখণ্ডগুলো ইহুদিদের কাছে জেরুসালেমের প্রতীক এবং পুণ্যময়তার উৎসস্থলে পরিণত হলো।
এ বরাদ্দই কাল হলো। ইহুদিরা তাদের তীর্থস্থান হিসেবে জায়গাটির স্বীকৃতি পেয়ে গেল। ওই স্থানটিকে কেন্দ্র করে তারা জড়ো হতে থাকে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর আশপাশের সব স্থান থেকে মুসলিমদের উৎখাত করে পুরো এলাকায় তাদের উপাসনার স্থান নির্বাচিত করে। সুলতান সোলায়মানের এ ভুলের মাশুল এখন দিতে হচ্ছে।
তার আরেকটি ভুল ছিল ফ্রান্সের সাথে চুক্তি করা। ১৫৩৫ সালে ফ্রাঙ্কো-অটোম্যান অ্যালায়েন্স বা ফ্রাঙ্কো-টার্কিশ অ্যালায়েন্স নামের চুক্তিটির মাধ্যমে জেরুসালেমে ফ্রান্সের প্রভাব বাড়তে শুরু হয়। মধ্য ইউরোপে হ্যাবসবার্গদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে তার একটি খ্রিস্টান মিত্রের প্রয়োজন ছিল। সামরিক সহায়তার বিনিময়ে তিনি পুরো উসমানিয়া সাম্রাজ্যে ফরাসিদের বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় সুবিধা দিলেন। এ চুক্তির রেশ ধরেই জেরুসালেমে ফরাসি ধর্মীয় প্রভাব বাড়তে থাকে। ক্রুসেডের পর এই প্রথম ইউরোপের হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি হয় জেরুসালেমে। তারা ক্যাথলিক মিশনের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের প্রভাব বাড়াতে থাকে। এসব মিশন আবার জেরুসালেমে স্কুলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করতে থাকে। উসমানীয়দের শক্তি যতক্ষণ প্রবল ছিল, তারা কিছু কম করেছিল। কিন্তু ১৯ শতক এবং ২০ শতকের প্রথম দিকে উসমানীয় শক্তি কমতে শুরু করলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে। এর রেশ ধরে ইংরেজ এবং অন্যরাও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বাড়াতে থাকে। জেরুসালেম হয় বিদেশি শক্তির খেলার জায়গা। এ পাশ্চাত্য শক্তিগুলোই বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিদের জেরুসালেমে আসার সুযোগ করে দেয়। পরিণতি সবার জানা।
সুলতান সোলায়মানের চুক্তি সই করার পরপরই জেরুসালেমে ফ্রান্সিসক্যানেরা চার্চের কাছে সেন্ট স্যাভিয়র্সে সদর দফতর স্থাপন করে, যা পরে নগরীর মধ্যেই বিশাল ক্যাথলিক নগরীতে পরিণত হয়েছিল। বিষয়টি এখানেই থেমে থাকেনি। ফ্রান্সিসক্যানেরা নীরবে মাউন্ট জায়নে তাদের সম্পত্তির পরিধি বাড়াতে থাকলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, খ্রিস্টান সেনাবাহিনীকে সুযোগ দিতে তারা মাল্টার সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করছেন। দুটি ভুলের মাসুল কেবল ফিলিস্তিনিরা দিচ্ছে না, পুরো মুসলিম দুনিয়াকেও দিতে হচ্ছে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, সাহিত্যিক।