৩৬ জুলাইয়ের বর্ষপূর্তি : সাধু সাবধান


২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:৫১

॥ শহীদ সিরাজী ॥
জুলাই ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৫! বছর পাড়ি দিয়েছে ঐতিহাসিক ৩৬ জুলাই বিপ্লব; যা দেশ ও জাতিকে এক ভয়ঙ্কর খাদের কিনারা থেকে উদ্ধার করেছে। যখন দেশে চলছিল ভয়ঙ্কর স্বৈরশাসনের অগ্ন্যুৎপাত, জ্বলে-পুড়ে ছারখার হচ্ছিল স্বাধীনতা। অত্যাচারের নির্মমতায় কাটা মুরগির মতো ছটফট করছিল দেশ- এমন একটা পরিস্থিতিতে দেশে ঘটেছিল ছাত্র-জনতার বিপ্লব।
জুলাই ২৪-এর এ পটপরিবর্তনের পর দেখতে দেখতে বিপ্লবের বর্ষপূর্তি হাজির হয়েছে। প্রত্যাশা ছিল অতি দ্রুতই এ বিপ্লবের ফসল কাটা শুরু হবে, বৈষম্য দূর হবে, সকলের গোলা ভরে যাবে অধিকারপ্রাপ্তিতে। অনেক প্রত্যাশার মধ্যে মোটাদাগে বিপ্লবের অনিবার্য প্রত্যাশা ছিল-
১. ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন ও প্রকাশ
২. সংবিধান সংশোধন/ নতুন সংবিধান প্রণয়ন
৩. স্বৈরশাসক ও তাদের কুশীলবদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার। ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ থাকবে।
৪. প্রয়োজনীয় দৃশ্যমান সংস্কার বিশেষ করে-
সংবিধান, নির্বাচন, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন, জনপ্রশাসন সংস্কার ও
৫. সকলের অংশগ্রহণের আনন্দঘন পরিবেশে একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন।
সবকিছুই চলছে, তবুও কোথায় যেন শুভঙ্করের ফাঁকি। নানা মনির নানা মত। রাজনীতিবিদরা একমত হতে পারছে না। রীতিমতো চলছে রশি টানাটানি। বলা যেতে পারে তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে উপরে ওঠানামার মতো ঘটনা ঘটছে।
যে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে তা নিয়েও চলছে বিতর্ক। সংস্কার আগে না ভোট আগে। অনেকে আবার বলছে না, সংস্কার না ভোট; বরং তার আগে প্রয়োজন খুনি শেখ হাসিনা ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের বিচার।
এসব নিয়ে চলছে লঙ্কাকাণ্ড। রীতিমতো মিডিয়াযুদ্ধ। টকশোতে, ইউটিউবে, ফেসবুক স্ট্যাটাসে চলছে রীতিমতো যুদ্ধ। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ফিরে এসেছে বটে; তবে চলছে নানারকম ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিবিপ্লব ঘটানোর চেষ্টা। চারদিকে যেভাবে ষড়যন্ত্র চলছে; দুশ্চিন্তা সকলের মনকে আতঙ্কিত করছে, দেশের গণতন্ত্র কি সুরক্ষিত হবে!
ভাবনা মোটেও অপ্রাসঙ্গিক নয়। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার হেন অপরাধ নেই যে করেনি। বিচার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে মিথ্যা বিচার ও মিডিয়াট্রায়ালের মাধ্যমে নিরাপরাধ মানুষকে তারা খুন করেছে। অনেককে বছরের পর বছর জেলে আটকে রেখেছে।
নির্বাচন কমিশনকে ধ্বংস করে তিন তিন বার ভুয়া নির্বাচন করেছে। দেশের মেধাবী সেনাসদস্যকে হত্যা করার জন্য বিডিআর ম্যাচাকার করে শত শত দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে হত্যা করেছে দেশকে করদ রাজ্যে পরিণত করার চেষ্টা করেছে। ক্রসফায়ারের নাটক করে শত শত বিরোধীশিবিরের লোককে হত্যা করেছে।
ক্ষমতায় থাকার জন্য অসংখ্য মানুষকে খুন করেছে, অনেককে গুম করে বছরের পর বছর আয়নাঘরে নির্যাতন করেছে। মিছিল মিটিংয়ে পাখির মতো গুলি করে গণতান্ত্রিক দেশে ছাত্র-জনতাকে পেটোয়া বাহিনী দিয়ে হত্যা করেছে। হত্যা করে আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে নিরপরাধ জনগণের ওপর গুলি পর্যন্ত ছুড়েছে।
দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে কোটি কোটি টাকা পাচার করেছে। ব্যাংক লুট করেছে, বিদেশে বেগমপাড়া বানিয়েছে। সরকারের অনেক সচিব, মন্ত্রী, বড় বড় ব্যবসায়ীরা দেশের বাইরে গিয়ে শত শত ফ্ল্যাট কিনেছে, সুইস ব্যাংকে টাকা জমিয়েছে। উন্নয়নের নামে নানা প্রজেক্টের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুট করেছে।
শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য তারা নাস্তিক্য শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিল, শিক্ষার মাধ্যমে কচি বয়সের ছেলেদের মধ্যে যৌনতা ছড়িয়ে দিয়েছিল। ধর্ষণ, হোস্টেলের ছাত্রীদের সাথে জোরপূর্বক মেলামেশা ছিল দলীয় ক্যাডারদের নিয়মিত কর্মসূচি। ধর্ষণ করে তারা ধর্ষণ সেঞ্চুরি পর্যন্ত পালন করেছে।
দেশের মানুষের ছিল না কোনো ধরনের অধিকার। গণতন্ত্রকে তারা দেশ থেকে পুরোপুরি নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। এভাবেই তারা দেশটাকে সন্ত্রাসী মাফিয়া রাষ্ট্র পরিণত করেছিল।
এহেন রাষ্ট্রে ঘটেছিল ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান।
এ গণঅভ্যুত্থানে ঘটেছিল বিস্ময়কর ঘটনা। দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদের সকল সদস্যই হাওয়াই মিলে গিয়েছিল। কেউ দেশত্যাগ করেছিল। কেউ আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার, স্বৈরাচারী সরকারের নিয়োগকৃত প্রধান মসজিদের ইমাম পর্যন্ত দেশত্যাগ করেছিল। এমন ঘটনা পৃথিবীতে বিরল।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে এসেছে পূর্ণ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। বিপ্লবোত্তর সকলের দাবি দেশে সেই স্বৈরাচারী খুনিদের আগে বিচার করতে হবে। তারপর প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে নির্বাচন।
বাস্তবে কি দেখা যাচ্ছে? সচেতন নাগরিকরা বলছে বিচারের নামে চলছে সময় ক্ষেপণ। সংস্কার, বিচার না চেয়ে চাওয়া হচ্ছে নির্বাচন। অনেকের মতে এটা পতিত স্বৈরাচারেই কৌশল। বিদেশে থেকে তারা কলকাঠি নাড়াচ্ছে। তাদের পরিকল্পনা, নির্বাচন হয়ে গেলে সংস্কারে যেমন ভাটা পড়বে, তেমনি বিচারও বন্ধ হয়ে যাবে। সেই সুযোগেই আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে পতিত স্বৈরাচার। এসব নিয়ে গোপনে চলছে নানা পরিকল্পনা। তারা যে কোটি কোটি টাকা লুট করেছিল; সেই টাকা খরচ করে দেশে কোনো কোনো রাজনীতিবিদকে তারা কিনছে। পতিত স্বৈরাচারের দোসরদের দিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে। চলছে সংস্কার ও বিচার ভণ্ডুল করার চেষ্টা।
এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে ইতিহাস। পৃথিবীর ইতিহাসে রয়েছে বড় বড় গণহত্যার বিচারের কথা। আমরা জানি হলোকাস্ট, রুয়ান্ডার গণহত্যা এবং কম্বোডিয়ান গণহত্যার কথা। এসব গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মাধ্যমে হয়েছে, যেমন নূরেনবার্গ ট্রায়াল এবং রুয়ান্ডা গণহত্যার বিচার।
১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় সংখ্যালঘু হুটু সম্প্রদায়ের হাতে বিপুলসংখ্যক টুটসি ও কিছু হুটু জনগোষ্ঠীর মানুষ নিহত হয়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত খেমারুজ শাসনের অধীনে কম্বোডিয়ায় প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। এসব গণহত্যার বিচার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আদালতে হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মানিতে ইহুদিদের ওপর পরিচালিত গণহত্যা করেছিল। এ বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির শীর্ষস্থানীয় নাৎসি নেতাদের বিচার করা হয়েছে।
এসব ইতিহাস পাঠ করে আমাদের সতর্ক হতে হবে। বিচারকে ত্বরান্বিত করে যথাসময়ে বিচার শেষ করতে হবে। না হলে দেশে আবার কোনো না কোনোভাবে স্বৈরাচার ফিরে আসতে পারে। স্বৈরাচারীর দোসর যারা তাদের ছদ্মাবরণে স্বৈরাচার ফিরে আসতে পারে।
তখন সম্ভাব্য কী কী ঘটতে পারে?-
১. যেহেতু আগে বিচার সম্পন্ন হয়নি, তখন নির্বাচিত সরকারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা স্বৈরাচারের দোসররা নির্বাচন করতে দেবে না। আবারও তারা স্বৈরাচার কায়েম করবে, দেশে আবার স্বৈরাচার ফিরে আসবে।
২. নির্বাচনের আগে যদি ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন ও অনুমোদন করা না হয়, তাহলে সময়ের পরিক্রমায় জুলাইয়ের যারা কুশীলব, তাদেরকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে- এমনকি বিচারের সম্মুখীন হওয়ার মতো ঘটনাও ভবিষ্যতে ঘটতে পারে। সুতরাং ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন ও প্রকাশের আগে আর কোনো কাজ থাকতে পারে না।
৩. সংস্কারের আগে নির্বাচন ভয়ানক বিপদ ডেকে আনতে পারে। এমনকি নব্য স্বৈরাচারও কায়েম হয়ে যেতে পারে। কীভাবে সেটি হতে পারে? এ মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের যে শক্তি, সামর্থ্য ও আইনের ফাঁকফোকর তা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য মোটেও উপযোগী নয়। তাছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে শক্তি-সামর্থ্য তা দিয়ে এ মুহূর্তে সারা দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন করাও সম্ভব নয়। স্বৈরাচারী শাসনের সময় নানা অপরাধ; এমনকি খুনের সঙ্গে জড়িত বর্তমান পুলিশ বাহিনী নির্বাচনের সময় শৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা রাখে কী? এই পুলিশ বাহিনী দিয়েই তো অতীতে স্বৈরাচার সরকার তিন তিনটে ভুয়া নির্বাচন সম্পন্ন করেছিল সুতরাং তাদের কতটুকু বিশ্বাস করা যায়, এ জন্য নির্বাচনের আগে অবশ্যই পুলিশ বাহিনীর সংস্কার এবং নতুন পুলিশ নিয়োগ করা অতি আবশ্যকীয়। এছাড়া সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না।
নির্বাচনের আগে সংবিধান সংস্কার করা না হলে আবার এদেশে ৭২ সালের মতো দুর্ভিক্ষ যেমন জন্ম দেবে, তেমনি স্বৈরশাসন বা নতুন করে কায়েম হতে পারে …। সেই সংবিধানই আওয়ামী সরকার স্বৈরাচারে পরিণত করেছিল। সুতরাং নির্বাচনের আগে এ বিষয়েও পরিষ্কার সিদ্ধান্ত নিতে হবে যেন কোনো অবস্থায় পতিত স্বৈরাচার আবার ফিরে আসতে না পারে।
উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারকে নির্বাচনের আগে কী কী কাজ করতে হবে? কতটুকু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে এ সরকার যদি নির্বাচনের আগে ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন ও প্রকাশ করতে না পারে, সংবিধানের প্রয়োজন সংস্কার করতে ব্যর্থ হয়, পতিত স্বৈরাচারী সরকার প্রধান শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের দৃশ্যমান বিচার করতে না পারে এবং নির্বাচন কমিশনের সংস্কার, পুলিশ প্রশাসন ও শৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ সংস্কারের আগেই নির্বাচনের ব্যবস্থা করে, তাহলে নিজেদের পায়ে কুড়াল মারার মতোই ঘটনা ঘটবে। বিস্ময়কর নয় যে- এসব ক্ষেত্রে যথার্থ ব্যবস্থা গ্রহণের আগে নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে যেমন দেশে আবার আগের মতন স্বৈরাচার ফিরে আসতে পারে, তেমনি তাদেরই বিচারের সম্মুখীন হওয়া লাগতে পারে। অতএব সাধু সাবধান!