জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্ব বেড়ে গেল

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো জনতার প্রত্যাশা


২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:৩৬

একেএম রফিকুন্নবী

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
গত ১৯ জুলাই শনিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় সমাবেশ ছিল। প্রস্তুতি ছিল সমাবেশে উপস্থিত জনসমুদ্রের লোকেরা যাতে ঠিকমতো বসতে পারে, কথা শুনতে পারে, সমাবেশের আগের দিনও ঢাকার আকাশে ছিল মেঘ। মাঝে মাঝে বৃষ্টির আনাগোনা। যেহেতু সমাবেশের ঘোষণা দেয়া ছিল পূর্বেই। তাই নেতা-কর্মীরা মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে মন খুলে দোয়া করছিলÑ সমাবেশের দিনে যাতে আবহাওয়া সমাবেশ উপযোগী থাকে। মহান আল্লাহ জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের দোয়া কবুল করে সমাবেশের দিন এলাকার আবহাওয়া অনকূল রেখেছিলেন। না বৃষ্টি, না রোদ। স্বাভাবিক গরমকালের জন্য কিছুটা গরম উপলব্ধি থাকলেও সকাল-সন্ধ্যা ছিল সমাবেশের অনুকূল পরিবেশ। আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান তো প্রকাশ্যে বলেই ফেললেন, আল্লাহ তায়ালা বাতাসকে এয়ারকন্ডিশন বানিয়ে দিয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ।
সমাবেশে রাত থেকেই জমায়েত হতে থাকে। দূর থেকে যারা এসেছেন, তারা সরাসরি মাঠে চলে এসেছেন। আমি নিজ চোখে দেখেছি, লোকজন মাঠের মধ্যে খোলা আকাশে ভেজা মাটিতে সাধারণ পলিথিন বিছিয়ে জুতা-স্যান্ডেল মাথায় দিয়ে ঘুমাচ্ছে বা বসে গল্প করছে। কোনো বিরক্তি ভাব চোখে দেখা যায়নি। তারা তাদের ছোট ব্যাগে চিড়া-মুড়ি-গুড়, রুটি-ভাজি নিয়ে এসেছে খাওয়ার জন্য। সবাই জানতো এত লোক আসবে যে, তাদের খাদ্য পাওয়া যাবে না। তারপরও দেখা গেছে, নিজ উদ্যোগেও পানি ও খিচুড়ি বিক্রয় করছে মাত্র ১০০ টাকায়। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল। বিভিন্ন জায়গায় পায়খানা-প্রস্রাব করার ব্যবস্থা ছিল। অজু করারও ব্যবস্থা ছিল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিভিন্ন এলাকায় ডাক্তারসহ মেডিকেল টিম কাজ করেছে।
এলাকায় ছিল না কোনো বিড়ি-সিগারেটের দোকান। গোটা এলাকার পরিবেশ ছিল শান্ত এবং কোলাহলমুক্ত। প্রায় ৪০টি মনিটর, ৩৫০টি মাইক লাগানোর পরও মাইকের স্বল্পতা পরিলক্ষিত হয়েছে। তারপরও কোনো ঠেলাঠেলি নেই, নেই আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। প্রত্যেকেই তার সুবিধাজনক স্থানে বসে গেছেন। গোটা এলাকাব্যাপী বড় আকারে জনসমাগম হয়ে গেল। কোনো বিশৃঙ্খলা চোখে পড়েনি। বেশ কয়েকজনের সাথে আলাপ হলো। এ জাতীয় সমাবেশ কি পূর্বে হয়েছে? সবাই বলেছে, না। তবে ৭ মার্চের জনসভায় শুধুমাত্র সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরের মাঠে জনতা ছিল। বাইরের সড়কপথে ১৯ জুলাইয়ের মতো লোকসমাগম ছিল না। আমার মনে হয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে যত লোক ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল চতুর্দিকের সড়কগুলোয়। পূর্বদিকের রমনা পার্কেও লোক ছিল দেখার মতো। অন্যদিকে মৎস্য ভবন, চানখাঁরপুল, ঢাকা মেডিকেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, এলিফ্যান্ট রোড, শাহবাগ পুরোটাই ছিল লোকে লোকারণ্য। সুবিধা ছিল সব জায়গায় টিভি প্রদর্শনীর মাধ্যমে মূল সমাবেশে স্টেজ এবং বক্তাদের চেহারা দেখা গেছে। জনতা উৎসাহের সাথে জনসভার ভাষণ শুনতে ও দেখতে পেরেছে।
জামায়াতের বক্তারা এবং বাইরের মেহমান বক্তা কেউই কারো প্রতি কটাক্ষ করে বক্তব্য দেননি। খুব ভালো পরিবেশে সমাবেশের কাজ চালানো গেছে। কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সঠিক সময়ে সমাবেশের কাজ শুরু হয়। আসরের আজানের মাধ্যমে সমাবেশের শেষ হয়।
আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের দরদভরা বক্তব্য সমাবেশের জনসমুদ্রের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। আমীরে জামায়াতের বক্তব্যের সময় তিনি মঞ্চের মধ্যেই হঠাৎ পড়ে যান। এর মধ্যেই আবার বক্তব্য শুরু করেন। তিনি আবার পড়ে যান। পাশেই ডাক্তার ছিল, তারা তাকে বক্তব্য না দিতে পরামর্শ দেন। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে বলেন, আমার মৃত্যু যথাসময়েই হবে। তিনি বসে বক্তব্য শেষ করেন। সর্বশেষ কথা ছিল ফ্যাসিবাদ তাড়িয়েছি, এবার দেশ দুর্নীতিমুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ যদি আমাদের দেশসেবার সুযোগ দেন, তবে আমরা হব দেশের সেবক। শাসক হবো না। ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আমরা ব্যবহার করব না। ব্যক্তিগত কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করব না। ভাত, কাপড়, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা মানুষের মৌলিক চাহিদা আমরা পূরণ করব। মদিনা সনদের আদলে আমরা দেশ চালাব। কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। আমীরে জামায়াতের বক্তব্যের সময় মুহুর্মুহু নারায়ে তাকবীর স্লোগানে এলাকা মুখরিত হয়।
জাতীয় সমাবেশে উপস্থিত জনতার সাথে আমার কথা হয়েছে। তাদের সাথে মুড়ি, চানাচুর খাওয়ায় শরিক হয়েছি। জনতার মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা গেছে। দেশের উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম থেকে প্রতিটি গ্রামের লোকেরা এ সমাবেশে উপস্থিত ছিল। জানতে চাইলে তারা বলেন, আমরা আমাদের নিজের টাকা খরচ করে সবাই মিলে বাস ভাড়া করে এসেছি। সাথে রুটি, ভাজি, চিড়া, গুড় নিয়ে এসেছি। মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনায় মনে হয়েছে সত্যিই তারা দেশে ইসলামী হুকুমত কায়েম করতে চায়। ঢাকার সমাবেশে হাজিরা দিয়ে জনমতের জানান দিতেই তারা দূরদূরান্ত থেকে সকাল থেকেই সমাবেশ স্থলে হাজির হয়েছে। পর্যাপ্ত মাইক থাকলেও দূরদূরান্তের লোকদের বক্তব্য শুনতে কষ্ট হয়েছে। কিন্তু কোনো হুড়োহুড়ি নেই। ডিঙিয়ে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা নেই। ভালো পরিবেশ। ছোট-বড়-বৃদ্ধ সবাই এসেছিল জামায়াতের আগামী দিনের পরিকল্পনা শোনার জন্য। আমীরে জামায়াতসহ সব বক্তার মুখেই ছিল জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ঘাতকদের উপযুক্ত বিচার। রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক সংস্কার। জুলাই সনদ ঘোষণা ও তার বাস্তবায়ন। সংখ্যানুপাতের নির্বাচন পদ্ধতি বাস্তবায়ন অর্থাৎ জনগণের প্রকৃত রায়ের প্রতিফলন। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার দৃপ্ত শপথ নেয়ার ঘোষণা। আমরা মনে করি, জনমতের একটি বড় ঘোষণা পেয়ে গেল ১৯ জুলাই জনসমাবেশের উপস্থিতি দেখে।
শুধু তাই নয়, আমি মনে করি এ সমাবেশের লোকসমাগম জানান দিয়ে গেলÑ জামায়াতে ইসলামীকে দেশের দায়িত্ব দিতে হবে। দেশ পরিচালনার জন্য যোগ্য ঈমানদার লোক তৈরি করা দরকার। ইসলামের আলোকে দেশ চালাতে হলে সৎ, যোগ্য দায়িত্বশীল লোক তৈরি করতে হবে। যাতে করে প্রত্যেক বিভাগে দায়িত্বরত পালন করতে যেন চুরি, বাটপারি, চাঁদাবাজি উপেক্ষা করে সততার সাথে, যোগ্যতার সাথে যার যার পাওনা আমরা জনগণকে বুঝিয়ে দিতে পারি। আমাদের দায়িত্বের হিসাব যেমন দুনিয়াতে জনগণের কাছে দিতে হবে, তেমনি আখিরাতে মহান আল্লাহর কাছেও দিতে হবে। আমরা দুনিয়া ও আখিরাতে ভালো চাই। জনগণের সেবা করেই জনগণের কল্যাণ কামনা করেই দুনিয়াতে ভালো চাই, আখিরাতে মহান আল্লাহর কৃপা চাই।
জামায়াতে ইসলামীর সমাবেশে জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব ডা. গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক তার বক্তব্যে বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর কাছেই দেশ নিরাপদ। কারণ ইতোমধ্যেই বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জামায়াতের ভূমিকায় দেশের মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অধিকার সংরক্ষণ করা হবে।
লাখ লাখ লোকের সমাবেশে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ও তার আশপাশের এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য জামায়াতের কর্মীরা রাত থেকেই কাজে লেগেছে। জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল এ কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। তার আলোকেই জামায়াত কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব এলাকা পরিচ্ছন্ন করেছেন।
জামায়াতের দুজন মন্ত্রী শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ৫ বছর ৩টি মন্ত্রণালয় চালিয়েছেন দুর্নীতিমুক্ত, স্বজনপ্রীতিমুক্ত ও সততার সাথে। তারপরও ফ্যাসিস্ট হাসিনা তাদের ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়েছে। ফলে মহান আল্লাহ হাসিনাকে দেশছাড়া করেছে। বিদেশের মাটিতে বন্দি জীবনের মতো বাস করছে। হয়তো তার কবরও বাংলাদেশে হবে না। হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের লাখকোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। তার দোসররা দেশের টাকা বিদেশে পাঠিয়েছে অন্যায়ভাবে। দেশের প্রতি মায়া না থাকলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের হাসিনা জেলে ঢুকিয়েছে, গুম করেছে, খুন করেছে, আয়নাঘরে বছরের পর বছর নির্যাতন করেছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে বছরের পর বছর জেলে নির্যাতন করেছে। যার ফল এ সমাবেশে আল্লাহ বরকত দিয়েছেন। আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি। তারই সাহায্য চাই।
আগেই বলেছি, জামায়াতের এ গণজোয়ারে জামায়াতের দায়িত্ব আরো বেড়েছে। আমাদের তাই শহরে-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে জামায়াতের নেতাকর্মীদের সততার সাথে, যোগ্যতার সাথে মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে। ভালোকে ভালো বলতে হবে। মন্দকে পরিত্যাগ করতে হবে। অন্য ধর্ম অবলম্বনকারীদের মানবিক সব সাহায্য করতে হবে। এলাকার নারীদের মর্যাদা দিতে হবে। তাদের কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। এলাকার স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। বিনা টাকায় স্বাস্থ্যসেবা দিতে হবে।
গ্রামের লোকদের কর্মসংস্থান করতে হবে। মাছের চাষ বাড়াতে হবে। সাথে সাথে হাঁস-মুরগি চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।
সর্বোপরি জামায়াতে ইসলামীকে জনগণের কাছে নিয়ে যেতে হবে। মৌলিক মানবিক সংগঠন হিসেবে এলাকায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। জামায়াত আমীরের আওয়াজ ফ্যাসিবাদ শেষ হয়েছে, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে হবে।
আবার বাংলাদেশের ইতিহাসে গত ২১ জুলাই সোমবার প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা সবাইকে ব্যথিত করেছে। প্রধান উপদেষ্টাসহ জামায়াতের আমীর শোকবাণী দিয়েছেন। ডা. শফিকুর রহমান জরুরি মিটিং বাদ দিয়ে সরেজমিন নিহত ও আহতদের দেখতে গেছেন। জামায়াতে ইসলামী মানবতাবাদী দল। জামায়াতে ইসলামীর সমাবেশে লোকের উপস্থিতিতে ইসলামপ্রিয় জনতার আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা ভাবতে শুরু করেছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা ইসলামপ্রিয় জনতাকে খুন, গুম, জেল-জুলুম করে স্তব্ধ করতে পারেনি বরং মহান আল্লাহ আমাদের ত্যাগ, কুরবানিকে গ্রহণ করে অনেক বরকত দিয়েছেন। অন্যদিকে ইসলামবিরোধীদের মনে ভয়ভীতি কাজ করছে। চাঁদাবাজদের মনে ভয় ঢুকে গেছে। ইতোমধ্যে বন্ধু সংগঠনের একজন বলেছেন, জামায়াত কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে পারবে না। মনে হয় তিনি বাপ-দাদার সম্পত্তি বাংলাদেশ। তিনি ডিবি অফিসে হারুন সাহেবের মেহমান হয়ে খাওয়া-দাওয়া করেছেন আবার চাঁদাবাজির দেশ গড়ার পাঁয়তারা করছেন। যা হবার নয়। জনগণ বুঝে গেছে কাদের হাতে দেশ নিরাপদ। মানুষ আর প্রতারিত হতে চায় না। ৫৪ বছর সব দলকে দেখেছে এবার আল্লাহর দল জামায়াতে ইসলামীকে ক্ষমতা দিতে চায়। আমরাও তার প্রত্যাশায় আছি।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।