দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি


১০ জুলাই ২০২৫ ১১:১৯

একেএম রফিকুন্নবী

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
পত্রিকা খুললেই দেখা যাচ্ছে চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, দখল-বাণিজ্যে একদল যেন উঠেপড়ে লেগেছে। দেশের অবস্থা স্থিতিশীল করে পতিত সরকারের লোকদের উপযুক্ত বিচার, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন করে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার প্রমাণ পেলে জাতীয় নির্বাচনের পালা শেষ করে এ সরকারের কাজ শেষ করে বিদায় নিতে হবে।
কিন্তু কিছু লোক মনে করেছে, তারা ক্ষমতায় চলে গেছে। তাই তাদের কথায় প্রশাসন-পুলিশ সবই চলবে। কয়েকদিন পূর্বে লালমনিরহাটে থানা আক্রমণ করে আসামি ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়া এবং পুলিশকে মারধর করে আহত করেছে। অন্যদিকে ফেনীতে ধর্ষণের ঘটনা থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জে চাঁদাবাজি চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫ হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। তাতে কী প্রমাণ হলো- নেতাকর্মীরা দলের নির্দেশ মানছে না বা তাদের কন্ট্রোল করা যাচ্ছে না। জনগণ কী বার্তা নিচ্ছে। পতিত সরকারের লোকেরা যেভাবে হাটবাজার, নদী-ঘাট দখল করে খাচ্ছিল, তাদের কাজে অতিষ্ঠ হয়ে কোটা সংস্কারের দাবি শেষ পর্যন্ত হাসিনাকে বিদায়ের আন্দোলনে পরিণত হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত হাসিনা পালাতে বাধ্য হয়, তাদের নেতাকর্মীকে ছেড়ে।
নতুন বাংলাদেশের গঠনে ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার উপদেষ্টাদের নিয়ে তাদের যোগ্যতানুসারে কাজ করে যাচ্ছেন। ঢাকা দক্ষিণের মেয়রের পালানোর কারণে সেখানে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক স্বঘোষিত মেয়রের দাবি করে এক মাসের অধিক কাজকর্ম বন্ধ করে মেয়র অফিস বন্ধ করে রাখে ছিল। সরকার শক্ত ভূমিকা নেয়ার কারণে ইশরাক সরে যেতে বাধ্য হয়। বর্তমানে সরকারের প্রশাসক ঠিকঠাকমতো অফিস চালাচ্ছে।
থানা আক্রমণ, অফিস দখল, হত্যা, ধর্ষণ, মহাখালীতে অবস্থিত জাকারিয়া হোটেলে আক্রমণ কোনোটাই দ্রুত নির্বাচনের অনুকূল নয়। ৩০০ সংসদীয় এলাকায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে না এনে কোনোভাবেই ভালো নির্বাচনের চিন্তা করা যায় না। দেশ আমাদের, আমাদেরই আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। পতিত সরকার দেশের পুলিশ বাহিনীকে দলীয় বাহিনী করার কারণে তারা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ঘুষ-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছিল। যাকে-তাকে যখন-তখন ঘরে-বাইরে থেকে গ্রেফতার নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গত ২৮ জুলাই আমাকে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছেলেসহ ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। কারণ জানানোর সুযোগ দেয়নি। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লব হওয়ায় আমরা জেল থেকে বের হই ৬ আগস্ট।
সমাজকে মানবিক সমাজ করতে না পারলে ভদ্রসমাজ গড়া কঠিন। স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার ব্যবসা-বাণিজ্য, হাট-বাজার, নিয়োগ-বাণিজ্য, দেশীয় ও বৈদেশিক বাণিজ্য সব ক্ষেত্রে নিজস্ব লোক নিয়োগ করে দেশকে বাপের জমিদারি বানিয়ে ফেলেছিল। তাই মানুষ ক্ষেপে তাদের পতনে সার্বিক সহযোগিতা করেছে।
বর্তমানে মুক্ত-স্বাধীন দেশে মানুষ হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। তারপরও আওয়ামী ভূত তাড়ালেও আবার নতুনরূপে একদল চাঁদাবাজি, দখলবাজিতে তৎপর হয়ে উঠেছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করি। সাথে সাথে নতুন সমাজ গড়ার আহ্বান জানাই।
বর্তমানে একটি নতুন কথা চালু হয়েছে মব জাস্টিস। এটা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। মব বলে কিছু নেই। কারো প্রকৃত চাওয়া-পাওয়ার দাবি থাকলে দেশের প্রচলিত আইনে প্রতিবাদের সুযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের নিয়মের মধ্যে তাদের কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। এ ব্যাপারে কোনোভাবেই সাধারণ জনগণের চলার পথ আটকানো যাবে না। জনগণের রাস্তাঘাট বন্ধ থাকলে দেশের প্রভূত ক্ষতি হয়। কারো বিমানে যেতে হবে, কারো ট্রেনে চড়তে হবে। কারো রোগীদের হাসপাতালে নিতে হবে, ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার হলে যেতে হবে সময়মতো। তাই কোনোভাবেই চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দাবি-দাওয়া আদায়ের পথ রুদ্ধ করা যাবে না। আমরা সবার ন্যায্য দাবি আদায়ের পক্ষে। বর্তমান পুলিশপ্রধান ভালো মানুষ। আমি আগেও পরামর্শ দিয়েছি, আবার বলছি, বর্তমানের অবস্থার আলোকে প্রত্যেক থানায় সব দলের প্রতিনিধিসহ দুজন করে ছাত্র প্রতিনিধি নিয়ে বেসরকারি কমিটি করে স্থানীয় প্রশাসনের সুবিধার্থে কাজে লাগানো যেতে পারে। কোথাও দুর্ঘটনা ঘটলে এদের কাজে লাগানো যেতে পারে। স্থানীয় চাঁদাবাজদের ধরতেও এরা ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে। এদের সম্মানীর ব্যবস্থা করতে হবে।
পতিত সরকারের দোসররা বসে নেই। তারা ছুঁতানাতায় অফিস-আদালতে দাবি-দাওয়ার ছলে কাজকর্ম স্থবির করতে চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যেই আনসারদের সেক্রেটারিয়েট দখল, এনবিআরের ধর্মঘটসহ নানা অপকর্ম চালানোর চেষ্টা করেছে। সব ক্ষেত্রেই প্রশাসনকে নড়েচড়ে বসতে হবে। কোনো অবৈধ কাজে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। কঠোরহস্তে দমন করতে হবে। সাথে সাথে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে কারা এর পেছনে কলকাঠি নাড়াচ্ছে, তা উদ্ঘাটন করতে হবে। দুষ্টলোক ধরতে পারলে এ জাতীয় ধর্মঘট বন্ধ করা যাবে, যা ইতোমধ্যেই প্রমাণ হয়েছে।
বর্তমান সরকারকে অকার্যকর করার জন্য দেশীয় ও বৈদেশিক কারিগররা লেগে আছে। হাসিনার লোকদের চুরি করা টাকার পাহাড় এবং পাশের দেশের কুমতলব আমাদের দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। বর্তমান সরকারের উপদেষ্টাদের রাজনৈতিক দক্ষতা কম থাকলেও যেহেতু তারা দুর্নীতির সাথে যুক্ত হচ্ছে না, তাই তাদের যতদূর সম্ভব সহযোগিতা করতে হবে।
আমাদের দেশ ছোট হলেও আমাদের জনবল, আমাদের মাটি, পানি, আবহাওয়া দেশ গড়ার উপযোগী। আমরা আমাদের মেধা কাজে লাগিয়ে একদিকে উৎপাদন বাড়াবো; অন্যদিকে দেশের জিনিস ব্যবহার করে দেশের উন্নয়ন করব। বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করব।
দেশের আইনশৃঙ্খলা ভালো থাকলে বৈদেশিক বিনিয়োগ আসতে সুবিধা হবে। ইতোমধ্যেই চীনের প্রায় ২০০ ব্যবসায়ী আমাদের দেশ সফর করে গেছেন এবং বিনিয়োগের জায়গা পরিদর্শন করেছেন। আমরা আসা করব, তাদের এ সফর বাংলাদেশের জন্য ব্যবসার দ্বার খুলে যাবে। উৎপাদিত পণ্য দেশে ব্যবহার করে বাকিটা বিদেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে।
আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য ছোট-বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। কেন্দ্রীয়ভাবে এবং স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক দলের লোকদের আইনশৃঙ্খলা আয়ত্তে আনার ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা নিতে পারে। যারা শহরে এবং গ্রাম-গঞ্জে অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম, চাঁদাবাজি করছে তাতে এ রাজনৈতিক দলের লোকরাই জড়িত। তাদের মাধ্যমেই এগুলো দূর করতে হবে। এক্ষেত্রে এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবদের কাজে লাগানো যেতে পারে। প্রত্যেক নামাযের পূর্বে ৫ মিনিট এলাকার আইনশৃঙ্খলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য দিলে মানুষের সচেতনতা বাড়বে। তারা ভূমিকা রাখতে সহযোগিতা করতে পারবে।
দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজকেও দেশের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে। মিটিং, গোলটেবিল বৈঠক, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন ও আইন মেনে চলার যুগোপযোগী নির্দেশনা দিতে হবে। নিজেরা আইন মেনে চলব, অন্যকে আইন মেনে চলার উপদেশ দেব। সচেতন মানুষগুলো সামনে এলে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ আইনশৃঙ্খলার প্রতি সচেতন হবে এবং মেনে চলার চেষ্টা করবে। এক্ষেত্রে যুবসমাজকে বেশি করে সামনে ডাকতে হবে। ছাত্র-যুবকরা মাঠে ভালো কাজ করার উদ্যোগ নিলে খারাপ দূর হতে বাধ্য।
আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে, আমাদের চতুর্দিকে শত্রুভাবাপন্ন দেশ। তারা কখনোই আমাদের ভালো চায় না। আবার ভবিষ্যতেও চাইবে না। তারাও ভালো অবস্থায় আছে, তা কিন্তু নয়। আমাদের পূর্ব-উত্তর দিকে ভারতের ৭টি রাজ্য নিয়ে তারা স্বস্তিতে নেই। আমরা কারো ঘরে আগুন লাগাতে চাই না। আমাদের নিয়েও যাতে কেউ মাথা না ঘামায়, তাও দেখতে চাই। ভালো কাজের ফল ভালো আর মন্দের ফল মন্দ হতে বাধ্য।
দেশের বর্তমান সরকার ঐকমত্যের মাধ্যমে একটি জুলাই সনদ করতে চেষ্টা করছে। সব দলই এ কাজে সহযোগিতা করছে। সবাই মিলে এ মাসের মধ্যেই এ সনদ তৈরি করে গণভোটে জনগণের মতামত নিলে ভবিষ্যতে কোনো সরকার যাতে এ সনদ বাতিল না করতে পারে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর দেশের প্রতি দরদভরা মন নিয়ে সামনে এগোতে হবে। পতিত সরকার ও তাদের দোসররা বসে নেই। আমাদের বিভিন্ন দলের মনে রাখতে হবে- জুলাই বিপ্লবের পূর্বে আমরা কেউ স্বাধীন ছিলাম না। খালেদা জিয়াসহ বিএনপি-জামায়াতের বিপুলসংখ্যক লোক জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে। আবার মনগড়া মামলা থেকেও রেহাই পেয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আয়নাঘরের লোকরাও দীর্ঘদিন ৩ বাই ৩ ফুট ঘর থেকে মুক্তি পেয়েছে। তাই জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসন, দোষী ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে আগে স্থানীয় নির্বাচন এবং পরে জাতীয় নির্বাচন দিতে হবে- অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। যারাই ক্ষমতায় আসুক, তারা যেন আগের আওয়ামী লীগ মার্কা না হয়। সৎ, যোগ্য, চাঁদাবাজমুক্ত ব্যক্তিকে সর্বক্ষেত্রে নির্বাচিত করতে হবে। সে যে দলেরই হোক না কেন।
আমাদের দেশের মানুষের মুক্তির জন্য সততা, বিশ্বস্ততা, ন্যায়পরায়ণতা খুবই জরুরি। ৫৪ বছর আমরা সব দল দেখেছি, এবার ভালো মানুষের জনপ্রতিনিধি চাই। নির্বাচন কমিশনকে প্রার্থী যাচাইয়ের শর্তে সততার মূল্যায়ন দেখতে চাই। গত ৩টি নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এবার নতুন ভোটারসহ সবাই যাতে স্বাধীনতভাবে মতপ্রকাশ করতে পারে, সে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আইনশৃঙ্খলায় স্বাভাবিক অবস্থা সৃষ্টি হলেই নির্বাচন দিতে হবে- যাতে সবাই ভোটে অংশগ্রহণ করতে পারে। ভোট ডাকাতি করতে না পারে।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।