মাটির মায়া
৩ জুলাই ২০২৫ ১২:৪২
পি এম শরিফুল ইসলাম : যা, হাত-মুখ ধুয়ে আয়, ভাত খাবি।
মায়ের কথা শুনে শোয়া থেকে উঠে পুকুর ঘাটে গেল শফিক।
হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসলো বারান্দায়। মা সালেহা বেগম পুঁইশাক দিয়ে টেংরা মাছের ঝোল রান্না করেছেন। এটা শফিকের খুব পছন্দের। ওর বাবারও। মা যেন মমতা মিশিয়ে রান্না করেন ঘরের সব ধরনের খাবার।
শফিকের বাবা আফজাল হোসেন গাঁয়ের বাজারে দর্জির কাজ করেন। বাড়ির পাশে খানিকটা জমি রয়েছে ওদের। ওটাতে শাকসবজি ফলন করেন তিনি।
শফিকের পুরো নাম শফিকুল ইসলাম স্বাধীন। গ্রামের সবাই ওকে শফি নামে ডাকলেও স্কুলের সবাই ওকে স্বাধীন নামে ডাকে। এতে শফিকও অনেক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। হোসেনপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী আমীর আলী উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। শফির ছোট ফুটফুটে পিচ্চি একটা বোন আছে। ক্লাস ওয়ানে পড়ে সে। দারুণ সুন্দর ও দুষ্টু। ওরা দুজনই দুরন্তময়। সারাক্ষণ দুই ভাই-বোন দুষ্টুমি আর খুনসুটিতে মেতে থাকে।
ওদের ঘরটা একচালা টিনের। পাশে বাঁশ ও খড় দিয়ে তৈরি রান্নাঘর। তারপাশে ছোট্ট একটা গোয়ালঘর। সেখানে থাকে শফি ও সামিয়ার আদরের রেণু। গরুটার নাম শফি’ই রেখেছে। স্কুল থেকে এসে রোজ বিকেলে ঘাস খাওয়ায়। কখনো বাঁশপাতা ও খড় খাওয়ায়। ওদের বাড়ির সামনে ছোট্ট একটি পুকুর। দক্ষিণে বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেত। বাড়ির পিছন দিয়ে বয়ে গেছে সুদীর্ঘ খাল। শফি স্কুল থেকে ফিরে প্রায়ই বিকেলে খালপাড়ে বসে থাকে আনমনা হয়ে। কত কিছুই ভাবে সে!
প্রকৃতির ভাবনায় ডুবে থাকে শফি। অসীম আকাশ, গাছপালা, ফুলফল, পশুপাখি, ফসলের ক্ষেত, সবুজ ছায়াঢাকা গ্রাম ও বৃক্ষ এসবকিছু কে বানালো?
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য সৃষ্টির রহস্য খুঁজতে থাকে সে। মহান রবের সৃষ্টিপানে তাকিয়ে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে।
বারান্দায় বসে ভাত খেতে খেতে শফি ওর মা’কে উদ্দেশ করে বললো, “আচ্ছা মা, কতদিন হলো নানুবাড়িতে যাওয়া হয় না। চলো না একদিন গিয়ে বেড়িয়ে আসি?”
“হু মা, ভাইয়া ঠিকই বলেছে। চলো না যাই। নানু আর নানা ভাইকে মিস করছি খুব।”
ভাইয়ার সাথে সুর মেলালো সামিয়া।
“আচ্ছা দেখি তোদের বাবার সাথে কথা বলে, কবে যাওয়া যায়।”
বলে সান্ত্বনার বাণী শোনালেন সালেহা বেগম।
দুপুরের খাবার শেষ করে বড়শি দিয়ে খাল থেকে মাছ ধরতে গেল শফি। সাথে ছোট বোন সামিয়াকেও নিল। বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে- খালের পাড়ে গিয়ে বসলো দুই ভাই-বোন।
শফি আটা গুলিয়ে দলা পাকিয়ে বড়শির আগায় ভালোভাবে গেঁথে নিল। কিছুক্ষণ পর খালের পানিতে টোপ ফেলতেই ধরা পড়লো বেশ বড়োসড়ো একটা তেলাপিয়া মাছ। খুশিতে হাততালি দিতে লাগলো সামিয়া। ছোট বোনের নিষ্পাপ মুখের মায়াবী হাসির দিকে তাকিয়ে রইলো শফি। ওর খুশিতে সেও খুশি হয় খুব!
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে অনেকগুলো মাছ পেয়ে গেল ওরা। তেলাপিয়া, টেংরা, সরপুঁটিসহ বেশ কয়েক ধরনের মাছ পেলো। খুশিতে নাচতে নাচতে ডেগভর্তি মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরলো দুই ভাই-বোন।
বিকেলে আসর নামাজ পড়ে রেণুর জন্য ঘাস কাটতে মাঠে গেল শফি। ক্ষেতের আল ও আশপাশ থেকে অনেকগুলো ঘাস কাটলো সে। মাগরিবের আগেই ঘাস নিয়ে বাড়িতে আসলো। ঘাসগুলো পুকুরের পানিতে ভালো করে ধুয়ে রেণুকে খেতে দিলো। গোয়ালঘরে রেণুর সামনে ঘাস রাখতেই গোগ্রাসে খাওয়া শুরু করলো রেণু। শফি রেণুর গলা জড়িয়ে আদর করে দিলো। এমন সময় মাগরিবের আজান শুনে, নামাজ পড়তে মসজিদে রওনা হলো সে।
মাগরিবের নামাজ আদায় করে পড়তে বসলো শফি। পড়ার টেবিলে সামিয়াকেও বসালো। নিজেও পড়ছে। ছোট-বোনকেও পড়াচ্ছে। জানালা দিয়ে উঠোন থেকে এমন দৃশ্য দেখে ভালো লাগলো মায়ের। খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন। যদিও রোজ নিয়মিত ওরা সন্ধ্যার পর পড়তে বসে এভাবে।
ওদের পড়ার ঘরে প্রবেশ করলেন মা সালেহা বেগম। ছেলের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“তোর ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন রে শফি? পড়াশোনা ঠিকমতো করছিস তো?”
“জ্বি মা, আলহামদুলিল্লাহ! প্রস্তুতি ভালোভাবেই নিচ্ছি। আমার জন্য দোয়া করো।”
“আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে, ভালো করে পড়। সামিয়াকেও একটু ভালোভাবে পড়াবি। ওর-ও তো সামনে বার্ষিক পরীক্ষা।”
শফি মুচকি হাসি দিয়ে হ্যাঁসূচক মাথা নাড়লো।
মা ওদের দুজনের কপালে চুমু খেয়ে রান্নার কাজে চলে গেলেন।
এশার পর বাজার থেকে কাজ শেষ করে বাড়িতে ফিরলেন ওদের বাবা আফজাল হোসেন। ছেলেমেয়েকে পড়ার টেবিলে দেখে অত্যন্ত খুশি হলেন তিনি। পকেট থেকে ওদের জন্য আনা মজা (চকলেট ও কোকোনাট বিস্কুট) বের করে দুজনের হাতে দিতেই খুশিতে লাফাতে লাগলো সামিয়া।
পরদিন শুক্রবার সকালে ওরা নানুবাড়ির উদ্দেশে রওনা হলো। ওদের বাবা দোকানে কাজ থাকায় এবং রেণুকে দেখে রাখতে হবে এজন্য যাননি।
গাঁয়ের মেঠোপথ দিয়ে চলতে লাগলো ওদের বহনকৃত অটোরিকশা। হোসেনপুর গ্রাম পেরিয়ে আসানপুর গ্রামে আসতেই ওরা দেখতে পায়- রাস্তার দু’পাশে সারি সারি সুপারি গাছ আর নয়নাভিরাম দৃষ্টিনন্দন বিস্তৃত বিলের সৌন্দর্য। প্রকৃতির এমন দৃশ্য দেখে মুগ্ধতায় হারিয়ে গেল শফি।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে ওদের নানাবাড়ি মজিদপুর গ্রামে পৌঁছাল ওরা। অনেকদিন পর নানা ভাই আর নানুকে দেখে খুশিতে ওদের চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে পড়লো। দীর্ঘদিন পর নাতি-নাতনিকে দেখতে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগলেন নানা-নানিও।
নানুবাড়িতে এসে বেশ আনন্দের সাথে কয়েকদিন কেটে গেল ওদের। মামাতো ভাই-বোনদের সাথে বেশ জমিয়ে খেলাধুলা করলো। নানু ওদের জন্য মজাদার সব খাবার তৈরি করলেন। নারিকেলের নাড়ু, ভাপা পিঠা, পুলি পিঠা, চিতই পিঠা, চিড়ার মোয়া, চাল কুমড়োর মোরব্বাসহ আরও নানা রকমের মজাদার খাবার বানিয়ে ওদেরকে খাওয়ালেন।
এদিকে রেণুর জন্য ওদের মন খারাপ খুব। রেণু কেমন আছে? ঠিকমতো খাচ্ছে কিনা! এ চিন্তায় দুই ভাই-বোন মা’কে জানালো ওদের মনের কথা। অর্থাৎ ওরা বাড়ি ফিরে যেতে চাচ্ছে। অবশ্য প্রায় প্রতিদিনই বাবার কাছে ফোন করে রেণুর খোঁজখবর নিয়েছে। তবুও ওরা রেণুকে না দেখে যে থাকতে পারছে না আর!
পরদিন খুব সকালেই বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলো শফিরা। বাড়িতে পৌঁছেই সবার আগে গোয়ালঘরে ঢুকলো ওরা। রেণু শুয়ে শুয়ে খড় চিবুচ্ছিল। ওদের দেখেই পরিচিত সুরে হাম্বা হাম্ব ডাকতে লাগলো। ওরাও রেণুর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগলো। সামিয়া বললো, “ভাইয়া দেখেছো, রেণু কেমন শুকিয়ে গেছে।”
“হুম, তাই তো। কিন্তু বাবা তো ঠিকমতোই ওর দেখভাল করেছে। সম্ভবত রেণুও আমাদেরকে খুব মিস করেছে। তাই আমাদের দেখতে না পেয়ে অভিমানে ঠিকমতো খায়নি। তাই হয়তো শুকিয়ে গেছে। তাই না?”
সামিয়া খিলখিলিয়ে হেসে মাথা নাড়লো।
দেখতে দেখতে ঈদুল আজহা অর্থাৎ কুরবানির ঈদ চলে এলো। আগামী সোমবার হোসেনপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী গরুর হাট বসবে। তাই সবাই নিজেদের পালিত গরু কিংবা ছাগল বিক্রির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। শফির বাবাও রেণুকে বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজছে এবং রেণুকে ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করাচ্ছে। সোমবার সকালে রেণুকে গোসল করিয়ে তেল মাখিয়ে হাটের জন্য প্রস্তুত করালো।
শফি-সামিয়ার দুজনেরই মন খারাপ খুব। রাতে কিছু খায়নি। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গিয়েছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে উঠোনের এক কোণে বসে আছে ওরা। ক্ষণে ক্ষণে আবেগাপ্লুত হয়ে ডুকরে কাঁদতে লাগলো। ওদের মা সালেহা বেগমেরও দু’চোখ অশ্রুসিক্ত।
বাবারও যে কষ্ট হচ্ছে না, তা না। কত আদর, মায়া, ভালোবাসা দিয়ে দীর্ঘ এক বছর সন্তানের মতো লালন করে বড় করেছে রেণুকে, ওদের বাবা। তা তো ওরা ভালো করেই জানে। কিন্তু রেণুকে বিক্রি না করলে ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন বাবা?
প্রতি বছর কুরবানি ঈদের গরুর হাটে যায় শফি। কিন্তু এবার আর বাবার সাথে গেল না সে। যেতে পারলো না, রেণুর বিচ্ছেদ বেদনায় কাতর হয়ে। সামিয়াকে কোলে নিয়ে রান্নাঘরের দরোজার সামনে বসে রইলেন মা।
শফির বাবা রেণুকে নিয়ে হাটের উদ্দেশে রওনা হলেন। সারা দিন কেটে গেল। অনেক ক্রেতা রেণুকে পছন্দ করলেও দরদাম ঠিকমতো না হওয়ায় বিক্রি করতে পারলেন না আফজাল হোসেন। শেষ বিকেলে একজন ক্রেতা আসলো। কাক্সিক্ষত মূল্যে রেণুকে বিক্রি করা হলো শফিদের পাশের মহল্লার এক ক্রেতার কাছে।
রাতে বাবা যখন বাড়িতে এলেন, দেখলেন ওরা দুজন মুখ গোমড়া করে শুয়ে আছে। কেঁদে দু’চোখ ফুলে গিয়েছে। বাবা বললেন, “রেণুকে (গরু) বিক্রি করেছি পাশের মহল্লার হাসেম নামে একজন ক্রেতার কাছে। রেণুকে ঈদের দিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর নামে কুরবানি দেওয়া হবে। তোমরা দুজন সেখানে উপস্থিত থাকবে। আমি তোমাদেরকে নিয়ে যাবো, ইনশাআল্লাহ।”
এরপর বাবা দুই ভাই-বোনকে কুরবানির তাৎপর্য বুঝিয়ে বললেন এবং ঈদুল আজহার প্রেক্ষাপটসহ নবী ইবরাহিম আ. ও ইসমাইল আ.-এর ঐতিহাসিক ঘটনা আর আত্মত্যাগের ইতিহাস শোনালেন। সত্য গল্প শুনতে শুনতে একটা সময় দুজন ঘুমিয়ে পড়লো।
দুদিন পর ঈদ এলো। ঈদের দিন বাবার হাত ধরে ঈদগাহে গেল শফি-সামিয়া। বাবা ওদের দুজনকে নতুন জামা কিনে দিয়েছেন। কিন্তু বাবা গত বছরের পুরনো একটা পাঞ্জাবি পরেছেন। শফি ভাবলো- এটাই বাবাদের সেক্রিফাইস। শখ কিংবা ইচ্ছের কুরবানি।
ঈদের নামাজ শেষে ঈদগাহে বাবার সাথে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলো ওরা। সবাই কোলাকুলি করছে পরস্পরের সাথে। ওরাও সববয়সী বন্ধুদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করছে।
রেণুর কথা শফির মনে পড়লেও সে এ মুহূর্তে রেণুর কথা স্মরণ করে ছোট বোন সামিয়ার আনন্দঘন মনটাকে পুনরায় খারাপ করে দিতে চাচ্ছে না। কিন্তু বাড়ি আসার পথে ঠিকই সামিয়া বাবার দিকে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে বলল, বাবা, রেণুকে দেখতে যাবা না? তুমি না বলেছিলে ঈদের দিন রেণুকে দেখাতে নিয়ে যাবে?
ও আচ্ছা, তাই তো। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। আচ্ছা মা, চলো তাহলে, আমরা রেণুকে দেখতে যাই।
বাবা ওদের নিয়ে পূর্বপাড়ায় যার কাছে রেণুকে বিক্রি করেছিলেন উনার বাড়িতে গেলেন। হাসেম মিয়া ওদেরকে দেখে খুশি হলেন। ইমাম সাহেব ছুরি হাতে প্রস্তুত রেণুকে কুরবানি দেওয়ার জন্য। শফি সামিয়া শেষবারের মতো দৌড়ে গেল রেণুর কাছে। রেণুর গলা জড়িয়ে, মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগলো ওরা। বাবা অশ্রুচোখে ওদের ছাড়িয়ে নিলেন। অবুঝ একটা পশুর প্রতি ওদের এমন মায়া, ভালোবাসা দেখে উপস্থিত অনেকের চোখেই পানি চলে এলো।
রেণুকে শোয়ানো হলো। ইমাম সাহেব বিসমিল্লাহ “আল্লাহু আকবার” বলে রেণুকে জবেহ করলেন। আল্লাহর জন্য কুরবানি দেওয়া হলো রেণুকে। খানিকটা দূর থেকে তাকিয়ে কাঁদতে লাগলো ওরা দু’জন। কিন্তু কুরবানির ইতিহাস ও তাৎপর্য স্মরণ হতেই ওদের অশ্রু, আনন্দাশ্রুতে রূপ নিল…।