জামায়াতে ইসলামীকে বঞ্চিত করায় দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে


২৬ জুন ২০২৫ ১১:১৪

॥ মাস্টার নজরুল ইসলাম ॥
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে বোঝার এবং জানার চেষ্টা কেউ করেনি বিগত পাঁচ দশকে। রাম-বাম, ধর্মনিরপেক্ষবাদী, জাতীয়তাবাদী, ভারতের সেবাদাস বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, বিশিষ্ট নাগরিকরা জামায়াতের বিরুদ্ধে অবিরাম কল্পিত বানোয়াট অভিযোগ তুলে ঘেউ ঘেউ করার কারণে কেউ আর সাহস করেনি জামায়াতের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, কর্মসূচি এবং দেশপ্রেম নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করার ও মতামত দেওয়ার। এতে জামায়াতে ইসলামী উপকৃত না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ ও জাতি। ইসলাম সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জীবনব্যবস্থা এবং মানুষের জীবনের ও রাষ্ট্রের সকল সমস্যা সমাধানের জন্য আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত জীবনাদর্শন। জামায়াত সেই জীবনাদর্শ প্রতিষ্ঠার কথা বলে রাজনীতি করে।
মহানবী (সা.) থেকে শুরু করে চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.)র শাসনকাল পর্যন্ত পৃথিবীতে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে সফলভাবে মানুষের জীবনের সকল সমস্যার সমাধান দিয়েছে। খেলাফত ব্যবস্থার বিলুপ্তির পর রাজতান্ত্রিক ইসলামী বিশ্বে খলিফা নির্বাচন ব্যতীত প্রায় সকল ক্ষেত্রে অর্থাৎ অর্থনৈতিক, সামাজিক, বিচার, আইন ও শাসনব্যবস্থায় ইসলামের বিধান বলবৎ ছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় ইসলামী বিশ্ব ছিল সবার শীর্ষে। যার কারণে রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ইসলামের প্রসার ঘটেছে ব্যাপকভাবে। ইসলামের মুজাহিদগণ দেশ জয়ের সাথে সাথে স্থানীয় জনগণের মন জয় করে নিয়েছিলেন উদারতায়, যার কারণে স্থানীয় জনগণ ইসলাম গ্রহণ করতে ইতস্তত করেনি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সেই ইসলামকে জীবনাদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে দেশ ও জাতিকে দাওয়াত দিয়েছে ইসলামের সুমহান আদর্শ দিয়ে দেশ ও জাতিকে শাসন করার জন্য। দুঃখের বিষয় হলো, ইসলামের এ সুমহান আদর্শকে একমাত্র বাংলাদেশে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীকুল বিতর্কের বিষয় বানিয়ে জনগণের সামনে একটা ঘৃণার দেয়াল খাড়া করে রাখে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক যাবত। জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার জন্য তখন রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেছিল এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় সচেষ্ট ছিলÑ এ কথা জামায়াতের নেতারা কখনোই অস্বীকার করেননি। কিন্তু তারা কখনোই অস্ত্র হাতে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেনি বা নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেনি। তাদের অবস্থান ছিল রাজনৈতিক, তা কখনোই সামরিক বিবেচনায় নয়। একাত্তর-পরবর্তী ভারতের বিজয়ের পর ভারত সুযোগ লুফে নেয় এবং এদেশের তাদের দাসতুল্য রাজনৈতিক নেতা ও দলের মাধ্যমে জামায়াতের সমালোচনা করতে গিয়ে মূল ইসলামকে দেশ ও জনগণের প্রতিপক্ষ বানিয়ে সমালোচনার তুলাধুনো করেছে। এখানে একটি কথা বলা দরকার যে, তারা মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টি এবং চীনপন্থি কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে কোনো উচ্চবাচ্য করে না। এর কারণ রাজনীতিতে তারা টেকেনি একমাত্র জামায়াতে ইসলামী ছাড়া। আর জামায়াতের আদর্শ যেহেতু ইসলাম, সেহেতু ভারতের মুশরিককুল সুযোগ হাতছাড়া করেনি। মুশরিকী আদর্শ সবসময় তাওহীদবাদী দর্শনকে ঘৃণা করেছে এবং তাওহীদবাদী আদর্শকে নির্মূলের সকল চেষ্টা করেছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের দাবির কাছে পরাজিত হয়ে মুশরিকরা মোক্ষম একটা সুযোগ তালাশ করছিল, কীভাবে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করা যায়। তাদের আশা ছিল হিমালয় থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠা করার। পাকিস্তানি আদর্শ ইসলামের কাছে মুশরিকী রামদর্শন চরমভাবে মার খেয়ে তারা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং ব্রিটিশের ছেড়ে যাওয়া অর্ধশতাধিক স্বাধীন দেশকে কয়েকদিনের মধ্যে সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে দখল করে নেয়। বাংলা প্রদেশকে তারা রামরাজত্বের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল কিন্তু এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলামী আদর্শের অনুসারী হওয়ার কারণে তারা রামরাজত্বের মাহাত্ম্য আগেই বুঝে গিয়েছিল, তাই তারা আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। পাকিস্তানে যদি ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠা হতে পারে, তাহলে সেটা ভারতের জন্য মাথাব্যথার কারণ হবে। তাই তারা পঁয়ষট্টির যুদ্ধে হেরে গিয়ে পাকিস্তানের বিরদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করে। তখন ভারত পাকিস্তানকে ভাঙার জন্য গোয়েন্দ সংস্থা ‘র’ প্রতিষ্ঠা করে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবকে টার্গেট করে। মুজিবকে দিয়ে তারা পাকিস্তান ভাঙার গোপন এজেন্ডা হাতে নেয়। শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের নেতা হয়ে ক্ষমতার নেশায় গণতন্ত্র স্বাধিকার ইত্যাদির নামে পাকিস্তানের কাছে একের পর এক দাবির পসরা তুলে ধরে, যা পূরণ করা হলে পাকিস্তান আর অখণ্ড থাকে না। শেখ মুজিব ও তার বুদ্ধিদাতারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বৈষম্যের কাল্পনিক অভিযোগ উত্থাপন করে ব্যাপক প্রোপাগান্ডা চালায় এবং ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের মধ্যে ঘৃণার উদ্রেক করে। শেখ মুজিবের এসব অপকর্মকে ইতিবাচকভাবে ব্যাপক প্রচার চালায় তখনকার দৈনিক ইত্তেফাক এবং বিবিসি বাংলা। শেখ মুজিব প্রকাশ্যে পাকিস্তানের বিভাজন চাননি। মুখে কখনোই শেখ মুজিব স্বাধীনতার কথা বলেননি। পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হোক এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হোক, শেখ মুজিব চাননি। তৎকালীন অধিকাংশ ইসলামপন্থি দলই ভারতীয় আগ্রাসনের বিরোধিতা করেছে এবং সে কারণেই ভারতের সশস্ত্র সহযোগিতায় তারা পাকিস্তানের বিভক্তি চাননি। আলোচনার টেবিলে সমস্যার সমধানের পক্ষে ছিলেন। চীনপন্থি কমিউনিমস্টরাও পাকিস্তানের বিভক্তি চায়নি। চীনপন্থি বামরা প্রকাশ্যে বলেছে, মুক্তিযুদ্ধ ‘দুই কুকুরের লড়াই’।
স্বাধীনতার পর ভারতীয় বয়ান শক্তিশালী হয়। ভারতের অর্থ ও অন্যান্য সহযোগিতায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত নাটক ও সিনেমায় ইসলামকে টার্গেট করে ঘৃণা ছড়ানো হয়। বাংলাদেশে বসবাসকারী ভারতের গোলাম বুদ্ধিজীবীরা ভারতের হয়ে জামায়াতে ইসলামের নামে ইসলামী আদর্শের পক্ষে কোনো ন্যারেটিভ তৈরি করতে দেয়নি। বরং তারা জামায়াতের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েছে। তারা ইচ্ছামতো মনের মাধুরী মিশিয়ে রাতকে দিন এবং দিনকে রাতে পরিণত করেছে। এদেশের ভারতীয় মিডিয়া মানুষের চোখে ঠুলি পড়িয়ে দিয়ে সাদাকে কালো এবং কালোকে সাদা দেখতে বাধ্য করেছে।
ভারতের সেবাদাসরা অবৈধ টাকায় মিডিয়ার ব্যাঙের ছাতার মতো মিডিয়া হাউজ গড়ে তুলেছে। ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টের পর থেকে ভারতের তল্পিবাহক বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিককর্মী ও মিডিয়া ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদের মোড়কে ইসলাম কোপানোর পক্ষে উগ্রবাদী ন্যারেটিভ তৈরি করে জাতিকে বিভ্রান্ত করেছে। বিশেষ করে হাসিনার দেড় দশকে তারা এ কাজ করেছে এদেশের জনগণের টাকায় সরকারি মদদে। কিন্তু আশার কথা হলো তারা সফল হয়নি। এদেশের তরুণদের একটি বিশাল অংশ সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালোই দেখেছে। তারা বিভ্রান্ত হয়নি বলেই ২০২৪-এর ৫ আগস্ট তরুণদের ভাষায় ৩৬ জুলাই এ বাংলাদেশ আবার নতুন করে স্বাধীনতা লাভ করেছে। এ স্বপ্নের আলোকে দেশ গড়তে চলছে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ তৈরি এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের কাজ। এখন মিডিয়া স্বাধীনভাবে লিখতে বলতে ও চিন্তা করতে পারছে। বিশেষ করে সামাজিক মিডিয়া স্বাধীনতায় একদম এগিয়ে আছে।
জনগণ এখন জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বক্তব্য আগ্রহভরে শোনার সুযোগ পেয়েছে। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় জনগণ যদি স্বাভাবিক পন্থায় ভোটের মাধ্যমে জামায়াতকে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ দেয়, তাহলে দেশ ও জাতি আর তিমিরে থাকবে না। আজকের বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। তারা বিশ্ববাসীকে একটি নতুন কল্যাণ উপহার দেবে- এমনটাই প্রত্যাশা জনগণের। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করায় বিশ্ব এতদিন মানবকল্যাণের একটি অনুসরণীয় মডেল থেকে বঞ্চিত ছিল। এবার সত্যিকারে সেই কল্যাণ রূপ প্রত্যক্ষ করবে। তারা আরো ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাবে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী উগ্রবাদ নয়, শান্তি, ইনসাফ, অর্থনৈতিক মুক্তি, সম্প্রীতি, মানবিক মর্যাদা এবং বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সুদৃঢ় করতে এবং আধিপত্যবাদী গোলামি থেকে মুক্তির জন্য কাজ করছে।