সম্পাদকীয়

কোনো দলের নয়, ৩৬ জুলাই চেতনার পক্ষের জনমতকে গুরুত্ব দিতে হবে


২৬ জুন ২০২৫ ১০:৪৭

৩৬ জুলাই বিপ্লবের পর এ চেতনার আলোকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য বিরামহীনভাবে বৈঠক করছে কমিশন। দেশবাসী তাকিয়ে আছে ইতিবাচক ফলাফলের প্রত্যাশায়। কিন্তু মত-দ্বিমত, আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে। এ সম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন- সংবিধানে এমন বিধান যুক্ত করার বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বেশিরভাগ দল একমত হয়েছে। তবে বিএনপিসহ তিনটি দলের আপত্তি থাকায় এ বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি।
এছাড়া সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতির উল্লেখ আছে। সেগুলো হলো জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের প্রস্তাবে মূলনীতি হিসেবে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছে। তবে বিদ্যমান মূলনীতি অক্ষুণ্ন থাকবে কিনা, সে বিষয়ে কিছু বলেনি কমিশন। মূলনীতি প্রশ্নে দলগুলো মোটাদাগে দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। বামপন্থি দলগুলো বিদ্যমান চার মূলনীতি অক্ষুণ্ন রেখে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার যুক্ত করার পক্ষে। বাকি দলগুলোর বেশিরভাগ বিদ্যমান চার মূলনীতি বাদ দিয়ে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র প্রতিস্থাপন করার পক্ষে। আর ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রস্তাব হলোÑ মূলনীতিতে ‘মহান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস’ও যুক্ত করা হোক। তারা ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়ার পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরে। এক্ষেত্রে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমেদ আলোচনায় বলেন, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে যেভাবে মূলনীতি ঠিক করা হয়েছিল, তাঁরা তার পক্ষে। এর সঙ্গে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার যুক্ত করতে তাঁদের আপত্তি নেই।
বিদ্যমান মূলনীতির বিপক্ষে জামায়াতে ইসলামী। তারা সাম্য, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং মানবিক মর্যাদা প্রতিস্থাপনের পক্ষে মত দেয়। দলের অবস্থান তুলে ধরে জামায়াতে ইসলামীর নেতা হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, তাঁরা জনমতকে প্রাধান্য দিয়ে ‘আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস’Ñ এটিও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ও সংবিধানের প্রস্তাবনায় যুক্ত করার পক্ষে। বিদ্যমান সংবিধানকে ‘মুজিববাদী’ আখ্যা দিয়ে এনসিপির জাবেদ রাসিন বলেন, এই চার মূলনীতি রেখে আলোচনা চলতে পারে না। আলোচনার একপর্যায়ে বিষয়টি পরবর্তী সংসদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে কিনাÑ এমন মতও আসে। জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, যারা ক্ষমতায় যাবে, তারা ঠিক করবে, এমন হলে ঐকমত্য কমিশনের কোনো প্রয়োজন থাকে না। এক্ষেত্রে বরং গণভোটই একটি উপায় হতে পারে। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক সাংবাদিকদের বলেন, অনেকগুলো বিষয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এসে একমত হচ্ছি আমরা। কিন্তু এখানে কিছু কিছু দল একবারে নিজেদের অবস্থানে অনড়। এভাবে চলতে থাকলে কিয়ামত পর্যন্ত কোনো ঐক্যের সম্ভাবনা দেখি না।
আমরা মনে করি, ঐকমত্য কমিশনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামত দেবে। কিন্তু সবাই একমত হবেÑ এমন ভাবনা বাস্তবসম্মত নয় কারণ প্রত্যেক দলেরই নিজস্ব দর্শন আছে, তার ভিত্তিতেই তারা তাদের মতামত দেবে। এক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৩৬ জুলাই বিপ্লবের চেতনা সব রাজনৈতিক দল সমানভাবে ধারণ করে না। কারণ অনেক রাজনৈতিক দলেরই জুলাই বিপ্লবে কোনো ভূমিকা নেই। তারা জাতীয় চেতনা নয়, বরং ক্ষমতার পালাবদলকেই বড় করে দেখছে। তাই কমিশনের উচিত সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত এবং জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের কাজ এগিয়ে নেয়া। তারপর প্রয়োজনে জনমত যাচাইয়ে গণভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত সংস্কার সম্পূর্ণ করা। না হলে ৩৬ জুলাইয়ের চেতনার আলোকে দেশ গড়ার কাজ বাধাগ্রস্ত হবে, যা আমাদের কারো কাম্য নয়।