সবাই মিলে দেশ গড়তে হবে


১৯ জুন ২০২৫ ১২:০৪

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
স্বৈরাচার ও তার দোসররা ছাড়া সবাই জুলাই বিপ্লবের সৈনিক। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার সেই বিপ্লবেরই ফল। স্বৈরাচার হাসিনা ও তার দোসর ভারতীয় দালালরা দেশকে সব ক্ষেত্রে তলানিতে ফেলে দিয়েছিল। বিচার বিভাগকে তাদের দলীয় কার্যালয়ে পরিণত করেছিল। সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনকে একেবারেই তাঁবেদারে পরিণত করেছিল। দেশের সম্পদ, ব্যাংকের টাকা সবই তাদের দোসরদের দিয়ে বিদেশে পাচারের ব্যবস্থা করে দেশকে চিটা বানিয়ে ফেলেছিল।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন বিভাগে যোগ্য লোক বসিয়ে ব্যাংক-বীমা অর্থনীতির চাকা সবল করার চেষ্টা অব্যাহত রেখে ছিদ্রগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করছে। বৈদেশিক বাণিজ্য লাইনে এসেছে। ভারত ট্রানিজট বন্ধ করলেও সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের মাধ্যমে রফতানি বাণিজ্য সক্রিয় করা হয়েছে। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একালের সবচেয়ে বেশি জমা হয়েছে। সরকারের প্রতি মানুষের আস্থার কারণে বিদেশে অবস্থানরত লোকজন দেশে অধিক পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অনুকূল। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বেড়েছে। নিত্যপণ্যের দাম ইতোমধ্যেই ক্রেতাসাধারণের নাগালের মধ্যে এসেছে। বর্তমানে উৎপাদন ভালো হওয়ায় বাজারে প্রচুর পরিমাণ আম, জাম, কাঁঠাল ও লিচু পাওয়া যাচ্ছে। পরিবহন সিন্ডিকেটের প্রভাব কমার কারণে জিনিসপত্রের দাম স্বাভাবিক হতে চলেছে।
দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমতে শুরু করেছে। স্বৈরাচার হাসিনার দল ও তাদের সমর্থক ১৪ দল ছাড়া দেশের কল্যাণে সবাইকে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। জুলাই বিপ্লবের সনদ সম্পন্ন করে তার ওপর গণভোট ও গণপরিষদ গঠন এবং স্থানীয় নির্বাচন করলে তৃণমূল প্রশাসন ঘুরে দাঁড়াবে।
সংস্কার চলমান কাজ। তাই প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষ করে লেডি হিটলার হাসিনা ও তার দোসরদের বিচারকাজ শেষ করতে হবে। বিচার শুরু হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে স্বচ্ছ বিচার করা জরুরি।
বড় দলের কিছু নেতার লম্ফঝম্ফ কিছুটা কমে এসেছে লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা ও তারেক রহমানের বৈঠকের পর। রাজনীতিতে উত্তাপ কমেছে। যদিও সব দলের সাথেই আলাপ করে যৌক্তিক সময়ে জাতীয় নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচনে যাতে কেউ প্রভাব খাটাতে না পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে অস্ত্র উদ্ধার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ বেদখল সব কিছু দখলমুক্ত করতে হবে।
দলবাজি করে কাউকে নির্বাচনের মাঠে কাজ করতে দেয়া যাবে না। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও গতানুগতিক পদ্ধতিতে না করে নতুন নিয়মনীতি প্রণয়ন করতে হবে। কোনোভাবেই চাঁদাবাজ, ঋণখেলাপি, টাকা পাচারকারীরা যাতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে।
ইতোমধ্যেই দেশে করোনা ও ডেঙ্গুর প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। এর দ্রুত প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা গত ৩ নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি, তাদের ভোটদানে উৎসাহিত করতে হবে। সৎ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত লোক ভোটে নির্বাচিত করতে পারলে দেশ ভালো হবে। তবেই দেশের উন্নয়নকাজ দ্রুত বাড়বে। জনগণের উপকার হবে।
ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে দুনিয়াব্যাপী অর্থনৈতিক ও মানবিক দিক বিপর্যস্ত শুরুর আশঙ্কা বাড়ছে। দখলদার ইসরাইল একদিকে গাজার মুসলমানদের হত্যা করছে। খাদ্য, পানি, ওষুধ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। তাদের ন্যায্য অধিকার বসবাসের জায়গা থেকে বিতাড়িত করছে, প্রতিনিয়ত মানবিক লঙ্ঘন করছে। আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদদে তারা জাতিসংঘের আদেশ-নির্দেশের তোয়াক্কা করছে না।
অতর্কিত ইরান আক্রমণ করে তাদের সেনাপ্রধান ও পরমাণু বিজ্ঞানীদের হত্যা করেছে। সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে অনবরত কাপুরুষের মতো হামলা করে বিশ্বযুদ্ধের আগমনী বার্তা দিচ্ছে। এখানেও আমেরিকা মদদ দিচ্ছে। ইসরাইলের এ অমানবিক আচরণে মুসলিম দেশগুলোর ভূমিকা খুবই ন্যক্কারজনক। ওআইসি একেবারেই অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যা খুবই লজ্জাজনক। দুনিয়া ও আখিরাতের ভয় তাদের কিছুতেই তৎপর করতে পারছে না, যা খুবই নিন্দনীয়।
এবারের যুদ্ধে যদিও পাকিস্তান, ইয়েমেন, তুরস্ক ভালো ভূমিকা রাখছে। আমরা সৌদি আরব, কুয়েত, কাতারসহ মুসলিম দেশগুলোকে আমেরিকার দম্ভ ও ভীতি উপেক্ষা করে আল্লাহকেই ভয় করে তাঁর প্রতি দৃঢ় ঈমান এনে দখলদার ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলকে প্রত্যক্ষভাবে মোকাবিলা করার জোর দাবি জানাচ্ছি।
ভালো খবর হলো, পারমাণবিক শক্তিধর রাশিয়া ও চীন ইরানের পক্ষ নিয়েছে। ২১টি মুসলিম দেশও ইরানের পক্ষ নিয়েছে। মহান আল্লাহ মুসলিম দেশের নেতাদেরকে সঠিক বুঝ দিন এবং ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে এক হওয়ার তাওফিক দিন। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অবস্থা ভালো নয়। তাই ট্রাম্প চমক দেখানোর জন্য ইরানের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিচ্ছে। আসলে আমেরিকার শক্তি এখন আর আগের মতো নেই এবং অর্থনৈতিক অবস্থাও ভালো নয়। ফলে আমেরিকা এ যুদ্ধে জড়িয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনছে।
ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ইরান তেলসমৃদ্ধ দেশ। গোটা পৃথিবীতে তেল সরবরাহে ইরানের ভূমিকা অনেক। তাই যুদ্ধ চলতে থাকলে বাংলাদেশসহ গোটা পৃথিবীতেই মন্দাভাব পরিলক্ষিত হবে, যা কেউই আশা করে না।
দেশে ১৮ কোটি মানুষের ঐক্য ধরে রাখতে হবে। জুলাই-আগস্টে যেমন ছাত্র-জনতা আপামর মানুষ মাঠে নেমে এসেছিল স্বৈরাচার হাসিনার পতনের লক্ষ্যে, তা বজায় রাখতে হবে। হাসিনার দোসররা তাদের চুরি করা টাকার পাহাড়, প্রতিবেশী দেশের মদদে আমাদের দেশটাকে অশান্ত করতে চায়। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করব। মহান আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন, ইনশাআল্লাহ।
দেশের সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে দেশের ইসলামী দলগুলোর ঐক্য হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীসহ চরমোনাই, হেফাজতে ইসলামসহ সব ইসলামী দল একমত হয়ে কাজ করলে দেশের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে, ইনশাআল্লাহ। স্বৈরাচারী হাসিনাসহ তার দোসর ১৪ দল ছাড়া আমরা দেশের আপামর ইসলামী জনতা এক হয়ে দেশের ভেতর ও বাইরের সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে দেশের আগামীদিনের রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূলে আনার চেষ্টা করব সবাই মিলে। শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জের মানুষ তাকিয়ে আছে আমাদের ইসলামী দলগুলোর ঐক্য দেখার জন্য। তাই সব বাধা মোকাবিলা করে আমরাই আমাদের দেশ গড়তে চাই। ভালো দেশ বানাতে চাই। জনগণের মুখে হাসি ফোটাতে চাই। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবিক দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। বিভেদ নয়, ঐক্য গড়েই ১৮ কোটি মানুষকে নিয়ে দুনিয়ার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই। মহান আল্লাহর সাহায্য চাই।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।