বিগত ৫৪ বছরে বিভিন্নি দল ও মাকতাবে ফিকারের ওলামায়ে কেরামের অবদান
১৯ জুন ২০২৫ ১২:০২
॥ ড. মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মাদানী ॥
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন : এ দুরাবস্তার প্রধান কারণ এটাই ছিল যে, পূর্ব বাংলাকে ব্রিটিশ আমলে কোলকাতার পশ্চাৎভূমি (হিন্টারল্যান্ড) বানিয়ে রাখা হয়েছিল। এখানকার চাউল, মাছ, মুরগি, ডিম, দুধ, পাট ও যাবতীয় কাঁচামালে কোলকাতার প্রয়োজন পূরণ হতো। তদুপরি শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ইত্যাদি অমুসলিমদেরই কুক্ষিগত ছিল। ঢাকার নওয়াব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে পূর্ব বাংলা ও আসামের মুসলমানরা নিজেদের এলাকার ও এর অধিবাসীদের উন্নয়নের প্রয়োজনে ঢাকাকে রাজধানী করে একটি আলাদা প্রদেশ করার আন্দোলন চালায়, যাতে কোলকাতার শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে এ এলাকাটি উন্নতি করতে পারে। এ দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করে ইংরেজ সরকার ১৯০৫ সালে ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম এলাকা নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করে। ১৯০৬ সালে এ নতুন প্রাদেশিক রাজধানীতে নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের জন্ম হয়। এ সম্মেলনে গোটা ভারতবর্ষের বড় বড় মুসলিম নেতা যোগদান করায় ঢাকার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
# বঙ্গভঙ্গ বাতিল আন্দোলন : নতুন প্রদেশে মুসলমানদের প্রাধান্য, প্রভাব ও উন্নতির যে বিরাট সম্ভাবনা দেখা দিল, তাতে কোলকাতার কায়েমী স্বার্থে তীব্র আঘাত লাগল। অমুসলিম রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী ও অন্যান্য পেশাজীবীগণ বাংলা-মায়ের দ্বিখণ্ডিত হওয়ার বিরুদ্ধে চরম মায়াকান্না জুড়ে দিলেন। অখণ্ড মায়ের দরদে তারা গোটা ভারতে তোলপাড় সৃষ্টি করলেন।
এ আন্দোলনে ব্যারিস্টার আবদুর রাসূলের মতো কিছুসংখ্যক মুসলিম নামধারী বুদ্ধিজীবীও শরিক হয়ে অখণ্ড বাংলার দোহাই দিয়ে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ময়দানে নেমে পড়েন। এ আন্দোলনের পরিণামে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রহিত না হতো, তাহলে ১৯৪৭ সালে ঢাকাকে একটি উন্নত প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে এবং চট্টগ্রামকে পোর্ট হিসেবে রেডি পাওয়া যেত। তাছাড়া শিক্ষা ও চাকরিতে মুসলমানরা এগিয়ে যাবার সুযোগ এবং এ এলাকায় শিল্প ও বাণিজ্য গড়ে ওঠত। মজার ব্যাপার এই যে, ১৯৪৭ সালে গোটা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে বলিষ্ঠ যুক্তি থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেসের প্রবল দাবিতে ব্রিটিশ সরকার বাংলাকে বিভক্ত করে পশ্চিশবঙ্গকে ভারতের হাতে তুলে দিল। যে অমুসলিম নেতৃবৃন্দ ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রহিত করিয়েছিলেন, তারাই ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গ করিয়ে ছাড়লেন। স্বার্থ বড় বালাই!
# দুনিয়ার মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কায়েম হবার পর সব ইসলামপন্থি দল ও ব্যক্তি স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকার করে নিজেদের জন্মভূমিতে সাধ্যমতো ইসলামের খেদমত করার চেষ্টা করছে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার নারায়ে তাকবির-আল্লাহু আকবার ধ্বনি স্বাধীনতাবিরোধী চক্রান্তকে নস্যাৎ করতে সক্ষম হয়। ১৯৭৭ সালে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ খতম করে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, আল্লাহর প্রতি ঈমান ও দৃঢ় আস্থা এবং সমাজতন্ত্রের ভিন্ন ব্যাখ্যা সংবিধানে সন্নিবেশিত করার পর জনগণ রেফারেন্ডামের মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানাবার ফলে ইসলামপন্থি দলগুলো বাংলাদেশ ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য শাসনতান্ত্রিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। এভাবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এদেশের মুসলমানদের জন্য তাদের ঈমান নিয়ে বেঁচে থাকার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে চলেছেন।
বাংলাদেশ ভৌগোলিক দিক দিয়ে মুসলিম বিশ্ব সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটা এলাকা। আর কোনো মুসলিম দেশ এমন বিচ্ছন্ন অবস্থায় নেই। তদুপরি আমাদের এ প্রিয় জন্মভূমিটি এমন একটি দেশ দ্বারা বেষ্টিত, যাকে আপন মনে করা মুশকিল। তাই এদেশের আযাদীর হিফাজত করা সহজ ব্যাপার নয়। জনগণ এ ক্ষেত্রে একেবারেই বন্ধুহীন। আশপাশ থেকে সামান্য সাহায্য পাওয়ারও কোনো আশা করা যায় না। এ দেশবাসীকে একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করে নিজেদের শক্তি নিয়েই প্রতিরক্ষার কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হবে।
যেকোনো জাতির আদর্শ ও বিশ্বাসই তার শক্তির উৎস হবে। সুতরাং এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনাদর্শ ইসলামই স্বাধীনতার আসল গ্যারান্টি। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামপন্থি সকলেই এ মহান উদ্দেশ্যেই কাজ করে যাচ্ছে। তাই জনগণের নিকট তাদের চেয়ে বেশি আপন আর কেউ হতে পারে না।
# যারা বাংলাদেশ আন্দোলনে শরিক হয়নি তার কি স্বাধীনতা বিরোধী ছিল?
১৯৭০-এর নির্বাচনের দীর্ঘ অভিযানে যে, ‘আমরা ইসলাম বিরোধী নই’ এবং ‘আমরা পাকিস্তান থেকে আলাদা হতে চাই না’। জনগণ তাকে ভোট দিয়েছিলেন তাদের অধিকার আদায়ের জন্য। পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার কোনো ম্যান্ডট তিনি নেননি। নির্বাচনের পরও এ জাতীয় সুষ্পষ্ট কোনো ঘোষণা তিনি দেননি। তাই ১৯৭১-এর যারা বাংলাদেশ আন্দোলনে শরিক হয়নি, তারা দেশের স্বাধীনতার বিরোধী ছিল না। ভারতের স্বাধীন হবার ভয় এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও সমাজতন্ত্রের খপ্পরে পড়ার আশঙ্কাই তাদের ঐ আন্দোলন থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করেছিল। তারা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত ছিল না বা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করেনি। ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা এ বিশ্বাসের ভিত্তিতেই কাজ করেছে। তাই আইনগতভাবে তাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।
নৈতিক বিচারে ব্যক্তিগতভাবে যারা নরহত্যা, লুটতরাজ, ধর্ষণ ও অন্যান্য অন্যায় করেছে, তারা অবশ্যই নরপশু। যাদের চরিত্র এ জাতের, তারা আজও ঐসব করে বেড়াচ্ছে। পাক সেনাবাহিনীর যারা এ জাতীয় কুকর্মে লিপ্ত হয়েছিল,তারাও নরপশুদেরই অন্তর্ভুক্ত। যাদের কোনো ধর্মবোধ, নৈতিক চেতনা ও চরিত্রবল নেই, তারা এক পৃথক শ্রেণি। পাঞ্জাবী হোক আর বাঙালি হোক, এ জাতীয় লোকের আচরণ একই হয়।
# শেরে বাংলার উদাহরণ : ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবই পাকিস্তান আন্দোলনের ভিত্তি ছিল। শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক ঐতিহাসিক দলিলের প্রস্তাবক ছিলেন। অথচ মুসলিম লীগ নেতৃত্বের সাথে এ ব্যাপারে মতবিরোধ হওয়ায় তিনি শেষ পর্যন্ত মুসলিম লীগ বিরোধী শিবিরের সাথে হাত মিলান এবং পাকিস্তান ইস্যুতে ১৯৪৬ সালে যে নির্বাচন হয়, তাতে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করেন। পাকিস্তান হয়ে যাবার পর তিনি কোলকাতায় নিজের বাড়িতে সসম্মানে থাকতে পারতেন। তিনি ইচ্ছা করলে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের মতো ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হতে পারতেন। কিন্তু যখন পাকিস্তান হয়েই গেল, তখন তার মতো নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিক কিছুতেই নিজের জন্মভূমিতে না এসে পারেন নি। পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত থাকা সত্ত্বেও এদেশের জনগণ শেরে বাংলাকে পাকিস্তানের বিরোধী মনে করেনি। তাই ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তারই নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট মুসলিম লীগের ওপর এত বিরাট বিজয় লাভ করে। অবশ্য রাজনৈতিক প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় সরকার তাকে “রাষ্ট্রদ্রোহী” বলে গালি দিয়ে তাঁর প্রাদেশিক সরকার ভেঙ্গে দেয়। আবার কেন্দ্রীয় সরকারই তাকে প্রথমে গোটা পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বানায় এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরও নিযুক্ত করে। এভাবেই তার মতো দেশপ্রেমিককেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ রাষ্টদ্রোহী বলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে।
# শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উদাহরণ : সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম বড় নেতা ছিলেন। কিন্তু শেষ দিকে যখন বঙ্গদেশ ও আসামকে মিলিয়ে “গ্রেটার বেংগল” গঠন করার উদ্দেশ্যে তিনি শরৎ বসুর সাথে মিলে চেষ্টা করেন। তার প্রচেষ্টা সফল হলে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতো না। তিনি পশ্চিমবঙ্গের লোক। পশ্চিমবঙ্গের বিপুল সংখ্যক মুসলমানের স্বার্থরক্ষা এবং কোলকাতা মহানগরীকে এককভাবে হিন্দুদের হাতে তুলে না দিয়ে বাংলা ও আসামের মুসলমানদের প্রাধান্য রক্ষাই হয়তো তার উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু পরে যখন তিনি পূর্ববঙ্গে আসেন, তখন তাকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে পাকিস্তানের দুশমন বলে ঘোষণা করা হয় এবং চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কোলকাতায় ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। অবশ্য তিনিই পরে পাকিস্তানের উজিরে আযম হবারও সুযোগ লাভ করেন। বলিষ্ঠ ও যোগ্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করার প্রয়োজনে দুর্বল নেতারা এ ধরনের রাজনৈতিক গালির আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের গালি দ্বারা কোনো দেশপ্রেমিক জননেতার জনপ্রিয়তা খতম করা সম্ভব হয়নি। তাই ’৭১-এর ভূমিকাকে ভিত্তি করে যেসব নেতা ও দলকে “স্বাধীনতার দুশমন” ও “বাংলাদেশের শত্রু” বলে গালি দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যতই বিষোদাগার করা হোক, তাদের দেশপ্রেম, আন্তরিকতা ও জনপ্রিয়তা ম্লান করা সম্ভব হবে না।
# বিগত ৫৪ বছরে বিভিন্নি দল ও মাকতাবে ফিকারে উলামায়ে কেরামের অবদান
স্বাধীনতা উত্তর এক দ্বান্দ্বিক পরিবেশে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে দেশকে উদ্ধার করে শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে এ দেশের উলামায়ে কেরাম সব সময়ে গুরুত্বর্পূণ ভূমকিা পালন করছেন।
দেশ গঠন, উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আযাদী আন্দোলনে আলেম সমাজ আপসহীন ভূমিকা ও অবদান রেখেই ক্ষান্ত হননি। পাশাপাশি ইসলামী মৌলিক আকিদা-বিশ্বাস ও মূল্যবোধ রক্ষায় উপমহাদেশের সকল ইসলামী দল, সংগঠন, সংস্থা, মারকায, দরবার ও ইসলামী ব্যক্তিত্বসমূহের মাঝে ঐক্য, সংহতি, সম্প্রীতি মজবুতিকরণ এবং ইসলামী ইস্যুতে অভিন্ন আন্দোলনও গড়ে তুলেছেন। মূলধারার ইসলামী আন্দোলন সবসময় অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে আসছে। নিম্নে এক নজরে নিকট অতীতে ইসলামী সংস্থা ও দলসমূহের সংক্ষিপ্ত কার্যক্রম তুলে ধরা হলো:
বেশ কিছু অরাজনৈতিক দীনি সংস্থা ও ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠন দেশ গঠন ও আর্দশ নৈতিক সমাজ বিনির্মাণে নানামুখী র্কম তৎপরতা অব্যাহত রাখে অরাজনতৈকি দল ও সংস্থাগুলোর মধ্যে ডক্টর কাজী দীন মোহাম্মদের নেতৃত্বে জাতীয় সীরাত কমিটি, মাওলানা আলাউদ্দনি আল আযহারীর নেতৃত্বে বাংলাদশে মসজিদ মিশন, মাওলানা মো. মাসুমের নেতৃত্বে ইসলামী সংগ্রাম পরিষদ, বায়তুশ শরফের পীর মাওলানা আব্দুল জব্বার, চরমোনাই পীর সৈয়দ ফজলুল করিমসহ শীর্ষ আলেমদের নেতৃত্বে ইত্তেহাদুল উম্মাহ, নেছারাবাদের মাওলানা আজিজুর রহমান কায়েদ সাহেব হুজুরের নেতৃত্বে “আল ইত্তেহাদু মা’য়াল ইখতেলাফ,” ঢাকা আলিয়া মাদরাসার সাবেক মুহাদ্দিস বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা ওবায়দুল হকের নেতৃত্বে জাতীয় শরিয়াহ কাউন্সিল, মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের নেতৃত্বে সম্মিলিত ওলামা-মাশায়েখ পরিষদসহ বেশকিছু সংগঠন বিভিন্ন ইস্যুতে গুরুত্বর্পূণ কর্মসূচি পালন করে।
অপরদিকে ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদশে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে খিলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট, পরর্বতীতে শায়খুল হাদীস আজজিুল হকের নেতৃত্বে খিলাফতে মজলিস, চরমোনইয়ের পীর সৈয়দ ফজলুল করিমের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনসহ বেশ কিছু সংগঠন দেশ গঠন, দেশের উন্নয়ন সাধন এবং ইসলামী ও দীনি সভ্যতা, সংস্কৃতি ও চেতনা লালন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বর্পূণ ভূমকিা রেখেছেন। এদেশের সকল মাকতাব-মারকাযের হকপন্থি শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম এসকল সংগঠন ও সংস্থায় সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখেন।
* অরাজনৈতিক দলের উলামায়ে কেরামের পাশাপাশি সরকারি, আধা সরকারি-বেসরকারি মাদরাসার শিক্ষক, আলিয়া ও কওমী মাদরাসার শিক্ষকবৃন্দ, মারকায, দরবার, খানকা, সিলসিলাহ, পীর-মুরিদি সংশ্লিষ্ট ওলামায়ে কেরাম, মসজিদের ইমাম-খতিব, মুয়াজ্জিন ও বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত ওলামাগণের বিগত সময়ে দেশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখার পক্ষে জোরালো অবস্থান, যেকোনো আগ্রাসী শক্তির মোকাবিলায় কঠোর কর্মসূচি ও বিবৃতি প্রদান, সীমান্তে হত্যা বন্ধ, ফারাক্কা মরণফাঁদ ইস্যুতে লংমার্চ, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার পক্ষে জনমত গঠন ও কর্মসূচি পালনে সবসময়ে সক্রিয় ছিল। অপরদিকে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের আকিদা-মৌলিক বিশ্বাস, দীনি চেতনা ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি লালন করতে সকলেই সম্মলিত প্রয়াস চালিয়েছেন।
* বিভিন্নি ইসলামী রাজনৈতিক দল ও সাধারণ রাজনৈতিক দলের মাঝে দেশের স্বনামধন্য ওলামায়ে কেরামগণ আপন আপন অবস্থানে থেকে গুরুত্বর্পূণ অবদান রেখেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খিলাফত আন্দোলন, খিলাফত মজলিস, বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোটসহ বিভিন্নি দলের ওলামায়ে কেরামদের অবদান লক্ষণীয়।
* সাধারণ রাজনৈতিক দলের মধ্য থেকে মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর অবদানও কম নয়।
* বিভিন্নি সরকারি সিদ্ধান্তে উলামায়ে কেরামদের অবদান-ইসলামিক ফাউন্ডশেন স্থাপন, বাংলাদেশ ওআইসির সদস্য পদ লাভ, রেডিও-টিভিতে আজান দেওয়ার প্রথা মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশসহ এদেশের ওলামায়ে কেরামেরর পরামর্শেই সরকারি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
* মন্ত্রিসভায় আলেমদের গুরুত্বর্পূণ অবদান : যারা বিভিন্নি সময়ে সরকাররে মন্ত্রিসভায় থেকে গুরুত্বর্পূণ অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে স্বাধীনতাপূর্ব শায়খুল হাদিস মাওলানা আবুল মোহাম্মদ ইউসুফ, মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক, আব্বাস আলী খান, আর স্বাধীনতা পরবর্তীতে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, মাওলানা শাহ আজিজুর রহমান, মাওলানা এম এ মান্নান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মুফতি ওয়াক্কাস গুরুত্বর্পূণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে দুর্নীতিমুক্ত আদর্শ নমুনা উপস্থাপন করেছেন। পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতিবাজদের সন্ধানে নেমে দেশি-বিদেশি সব শক্তি একত্রিত হয়েও নিজামী-মুজাহিদ মন্ত্রীদ্বয়ের চুল পরিমাণ দুর্নীতি খুঁজে পায়নি যা খোলাফায়ে রাশেদার পরে একেবারেই বিরল ইতিহাস।
* ঢাকা আলিয়া মাদরাসার সাবেক প্রধান মুহাদ্দিস ও জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা ওবায়দুল হক ২০০৪ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে এক সেমিনারে সভাপতির বক্তৃতায় বলেন, “আমার জীবদ্দশায় দুইজন ব্যক্তিকে দেখেছি একাধারে উজির (মন্ত্রী) ও স্বনামধন্য লেখক হিসেবে-
এক. ভারতের মাওলানা আবুল কালাম আযাদ,
দুই. বাংলাদেশের মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী।
* বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ওলামায়ে কেরামের সক্রিয় ভূমিকা : বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ও রাষ্ট্র পরিচালনায় এদেশের এক ঝাঁক ওলামায়ে কেরাম গুরুত্বর্পূণ অবদান রেখেছেন। বাংলাদশে জাতীয় সংসদে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, মাওলানা আবদুস সোবহান, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মাওলানা আতাউর রহমান খান নদভী, আব্দুর রহমান ফকির, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ, মুফতি ফজলুল হক আমিনীসহ বিভিন্ন ওলামায়ে কেরাম দেশ গঠনে সংসদের ভিতর-বাহিরে গুরুত্বর্পূণ অবদান রেখেছেন।
* উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদে ওলামায়ে কেরামের অবদান : সারা দেশে অনেকে গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে ওলামায়ে কেরাম নির্বাচিত হয়ে দেশ জাতি ও উম্মাহর জন্য গুরুত্বর্পূণ অবদান রেখে চলেছেন। তারা দুর্নীতিমুক্ত ও নিরপেক্ষ শাসনের নমুনার স্বাক্ষর রেখেছেন।
# ইসলাম প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের এক সময়ের সিপাহসালার, তাবলিগ জামায়াতের এদেশের সচেতন মুরুব্বি, ডাকসুর সাবেক জিএস ও ভাষা আন্দোলনের সিংহপুরুষ অধ্যাপক গোলাম আযম (রহ.) এদেশের সকল ইসলামী দল ও ব্যক্তিদের কাছে চিঠি দিয়ে ইসলামী দলসমূহকে কাছাকাছি নিয়ে আসার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বিভিন্ন ইসলামী মনীষী, নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন মাকতাবে ফিকরের মুরুব্বি, বড় বড় মাদরাসার প্রিন্সিপাল ও মুহতামিমদের কাছে তার ঐক্যের আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া পড়ে।
# ডক্টর কাজী দীন মোহাম্মদ এর নেতৃত্বে জাতীয় সীরাত কমিটি,
# মাওলানা আলাউদ্দিন আল আযহারীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ মসজিদ মিশন,
# মাওলানা সাইয়েদ মো. মাসুম এর নেতৃত্বে ইসলামী সংগ্রাম পরিষদ,
# বায়তুল শফরের পীর মাওলানা আব্দুল জব্বার, চরমোনাই পীর সৈয়দ ফজলুল করিমসহ শীর্ষ আলেমদের নেতৃত্বে ইত্তেহাদুল উম্মাহ।
# নেছারাবাদের মাওলানা আজিজুর রহমান কায়েদ সাহবে হুজুরের নেতৃত্বে “আল ইত্তেহাদ মা’য়াল ইখতেলাফ” সহ বেশকিছু সংগঠন বিভিন্ন ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে।
# ‘জাতীয় শরীয়াহ কাউন্সিল : এদেশে ইসলাম রক্ষা ও ইসলামী মূল্যবোধ অক্ষুন্ন রাখতে ঢাকা আলিয়া মাদরাসার সাবেক হেড মুহাদ্দিস বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা ওবায়দুল হকের নেতৃত্বে ১৯৯৭ সালে ৯ ফেব্রয়ারি ‘জাতীয় শরিয়াহ কাউন্সিল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। তৎকালীন মুরুব্বিদের পরামর্শেই শাইখুল হাদীস মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ (রহ.) শরিয়াহ কাউন্সিল প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। রাজধানী ঢাকার দারুসসালাম, মিরপুর, ফুরফুরা মারকাযে এক সর্বদলীয় মতবিনিময় সভা ও সম্মেলনের মাধ্যমে উক্ত জাতীয় শরিয়াহ কাউন্সিল আত্মপ্রকাশ করে। উক্ত সম্মেলনে সারা দেশের ওলামা সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও মহানগরীর প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন। উক্ত জাতীয় শরিয়াহ কাউন্সিল দেশের প্রতি ভালোবাসা, বিভিন্ন ইসলামী ইস্যুতে সভা, সমাবেশ ও যৌথ বিবৃতি প্রদানের কাজ অব্যাহত রাখে। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর আব্দুল কাহ্হার সিদ্দিকীর (রহ.) এর ওফাতের পর ও জাতীয় শরিয়াহ কাউন্সিল যেকোনো ইসলামী ইস্যুতে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। ইসলামী দলসমূহের পক্ষ থেকে কর্মকৌশল নির্ধারণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও সামগ্রিক সহযোগিতা প্রদান করা হতো। (চলবে)